ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 January 2019, ১১ মাঘ ১৪২৫, ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সরিষা ক্ষেত থেকে যশোর অঞ্চলের ৬ জেলায় ১৬ হাজার কেজি মধু উৎপাদন

চৌগাছা (যশোর) সংবাদদাতা : চলতি রবি মৌসুমে যশোর অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে মৌচাষের মাধ্যমে মধু আহরণ কার্যক্রম। কয়েক মাসের ব্যবধানে এ অঞ্চলের চাষিরা সরিষা থেকে প্রায় ১৬ হাজার কেজি মধু পেয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় চাষি ও মৌয়ালরা সহজ পদ্ধতিতে এ মধু আহরণ করে বিপণন করেছেন। এতে সরিষার চাষ ও ফলনও ভাল হচ্ছে। যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর এ ৬ জেলা নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর জোন গঠিত। এ অঞ্চলের ৬ জেলায় মৌয়ালরা গত ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪ হাজার ১শ’ ৪০  হেক্টর সরিষার ক্ষেতে মৌচাষ করে ১৫ হাজার ৫শ’ ৫৪ কেজি মধু আহরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর অঞ্চলের অতিরিক্ত কার্যালয়ের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, চলতি ২০১৮-১৯ রবি মৌসুমে ৪৪ হাজার ৮শ’ ৫২  হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। এর ভেতর ৪ হাজার ১শ’ ৪০  হেক্টর সরিষার ক্ষেতে মৌচাষ করা হয়। ওই ক্ষেত থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৫ হাজার ৫শ’ ৫৪ কেজি মধু উৎপাদন হয়েছে। মধু আহরণের জন্য ২ হাজার ৬শ’ ৩৫টি মৌ-বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। যে সব সরিষার ক্ষেতে মৌ-বাক্স স্থাপনের মাধ্যমে মৌ-চাষ করা হয়েছে, সে সব ক্ষেতে সরিষার ফলনও ভাল হচ্ছে। সরিষার ফুলে মৌমাছি বিচরণ করলে ফুলে পরাগায়ন ভাল হয়। এতে সরিষার দানা বাঁধে বেশি। যে কারণে সরিষার ফলনও পাওয়া যাচ্ছে বেশি। চারকোণা বিশিষ্ট কাঠের বাক্স তৈরি করে সরিষার ক্ষেতের ভেতর তা স্থাপন করে মৌমাছি ছেড়ে দিতে হয়। ওই মাছি বাক্স থেকে বের হয়ে দিনভর সরিষার ফুলে বিচরণ করে। এরপর সন্ধ্যায় তারা (মৌমাছি) বাক্সের ভেতর প্রবেশ করে। এতে সরিষার ফুলে অতিরিক্ত পরাগায়ন হয়। কাঠের বাক্সের ভেতর মৌমাছির তৈরি চাক ভেঙে নিয়ে কৃষক ও মৌয়ালরা কাঠের চাপা মেশিনে চাপ দিলে মধু বের হয়ে আসে। ওই মধু ছেঁকে নিয়ে বোতলে কিংবা অন্য পাত্রে রেখে বাজারে বিক্রি করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানি ওই মধু কিনে নিয়ে বাজারজাত করছে। প্রতিকেজি ৩শ’ ৫০ টাকা থেকে ৪শ’ টাকা দরে মধু কিনে নিয়ে বাজারজাত করছেন। কোম্পানি কর্তৃক মধু বিপণন ব্যবস্থা করায় কৃষক বা মৌয়ালরা যেমনটি সরিষা চাষ করে অর্থ উপার্জন করছেন, তেমনি কোম্পানিও লাভবান হচ্ছে। সরিষা থেকে উৎপাদিত মধু অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন। এ মধু অন্য মধু থেকে সেরা বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানিয়েছেন।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক চন্ডিদাস কুন্ডুর সাথে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দেশে মধুর চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সরিষা ক্ষেতে মৌ-চাষ করে মধু উৎপাদন করা হচ্ছে। সরকারিভাবে সহায়তা দিয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। আবার কোন কোন কৃষক এর বিরোধিতা করেন। তখন তাদের কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে বোঝানো হচ্ছে। তিনি বলেন, সরিষার ফুলে মৌমাছি বসলে পরাগায়ন ভাল হয়। এতে সরিষা দানাদার ও ফলন ভাল হচ্ছে। পাশাপাশি মধুও উৎপাদিত হচ্ছে। বাড়তি টাকা পাচ্ছেন কৃষকরা। মৌয়ালরা সরিষার ক্ষেত ভাড়া নিয়ে মৌচাষের মাধ্যমে এ মৌসুমে মধু উৎপাদন করছেন চারকোণা বিশিষ্ট কাঠের বাক্স স্থাপন করে। চন্ডিদাস কুন্ডু বলেন, এতে দেশে মধুর চাহিদা অনেকটা পূরণ হচ্ছে। ধনিয়া, পেঁয়াজ, লিচু ও কালজিরা থেকেও মধু উৎপাদন কার্যক্রম চলছে দেশে। এ পদ্ধতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণায় নিয়োজিত বৈজ্ঞানিকদের অবদান উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ মধু সবচেয়ে ভাল ও পুষ্টিকর। বর্তমানে এ ধরনের মধু উৎপাদন কার্যক্রম কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।যশোর অঞ্চলের ৬ জেলার মৌচাষের মাধ্যমে মধু উৎপাদন কার্যক্রমের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ রবি মৌসুমে মোট ৪৪ হাজার ৮শ’ ৫২  হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। এর ভেতর মৌ-চাষের আওতায় এসেছে ৪ হাজার ১শ’ ৪০ হেক্টর সরিষা। ওই সব ক্ষেতে কৃষি বিভাগের সহায়তা ও ব্যক্তি উদ্যোগে ২ হাজার ৬শ’ ৩৫টি মৌ-বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। এ থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত কৃষি বিভাগের পাওয়া তথ্য মতে ১৫ হাজার ৫শ’ ৫৪ কেজি মধু পেয়েছেন চাষিরা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী যশোর জেলায় ৯ হাজার ৭শ’ ৭৫  হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২শ’ ১৪  হেক্টর সরিষার ক্ষেতে ৮শ’ ১০টি মৌ-বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। মধু পাওয়া গেছে ৩ হাজার ৩শ’ ৬৭ কেজি। ঝিনাইদহ জেলায় ৯ হাজার ৫শ’ ১৫  হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়। ২শ’ ১১  হেক্টর জমিতে মৌ-চাষ হয়েছে। এসব সরিষার ক্ষেতে ১শ’ ৭৯টি মৌ-বাক্স স্থাপন করে ২ হাজার ৯শ’ ৬৪ কেজি মধু আহরণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৫শ’ ৯০  হেক্টর জমিতে। মৌচাষ হয়েছে ২ হাজার ১শ’ ২০  হেক্টর সরিষার ক্ষেতে। এসব ক্ষেতে ১ হাজার ২শ’ ৩৪টি মৌ-বাক্স স্থাপন করে মধু আহরণ হয়েছে ৭ হাজার ৯শ’ ১০ কেজি। কুষ্টিয়া জেলায় সরিষার চাষ হয়েছে ৬ হাজার ৭শ’ ৫০  হেক্টর। মৌচাষ হয়েছে ৩শ’ ৩৫ হেক্টির সরিষার ক্ষেতে। এসব ক্ষেতে ২শ’ মৌ-বাক্স স্থাপন করে ৩শ’ ৯৫ কেজি মধু পাওয়া গেছে। 

চুয়াডাঙ্গা জেলায় সরিষার চাষ হয়েছে ২ হাজার ২শ’ ২২  হেক্টর জমিতে। এর ভেতর ৩০  হেক্টর সরিষার ক্ষেত মৌচাষের আওতায় এসেছে। এসব ক্ষেতে ৩০টি মৌ-বাক্স স্থাপনের মাধ্যমে ৩৮ কেজি মধু পেয়েছেন চাষিরা। মেহেরপুর জেলায় ৪ হাজার  হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। মৌচাষ হয়েছে ২শ’ ৩০  হেক্টর সরিষার ক্ষেতে। এসব ক্ষেতে ১শ’ ৮২টি মৌবাক্স স্থাপন করে চাষিরা ৮শ’ ৮০ কেজি মধু পেয়েছেন।২০১৬-১৭ সালে কৃষি ক্ষেত থেকে মধু আহরণের এ পদ্ধতি শুরু হয়েছে। সে মোতাবেক ২০১৭-১৮ সালে ১ হাজার ৬শ’ ৭৬  হেক্টর সরিষার ক্ষেতে মৌচাষ করে ৫ হাজার ৯শ’ ৯৮ কেজি মধু পাওয়া যায়। ৫০  হেক্টর জমিতে ধনিয়া চাষ করে সেখান থেকে অনুরূপ পদ্ধতিতে মধু পাওযা যায় ৫শ’ ১০ কেজি। এর আগে ২০১৬-১৭ সালে ৫ হাজার ৪শ’ ৫৩  হেক্টর জমিতে সরিষার ক্ষেতে মৌচাষ করে ১৭ হাজার ২শ’ ২০ কেজি মধু, ২০  হেক্টর পেঁয়াজের ক্ষেত থেকে ৩০ কেজি মধু, ৮০  হেক্টর ধনিয়ার ক্ষেত থেকে ৬শ’ ৪০ কেজি মধু ও ৪শ’ ১২  হেক্টর লিচু থেকে ৫ হাজার ১শ’ ১৩ কেজি মধু আহরণ করা হয়েছে বলে যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পরিচালকের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ