ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 January 2019, ১১ মাঘ ১৪২৫, ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ক্ষতিকর বোতলজাত পানি

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিউশন- বিএসটিআইয়ের এক সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে এমন পাঁচটি ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি মানসম্মত তথা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়। জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশ অনুযায়ী ১৫টি কোম্পানির বোতলজাত পানি পরীক্ষা করে বিএসটিআই এ সম্পর্কে জানতে পেরেছে। মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, আগেরদিন বোতলজাত পানি সংক্রান্ত রিপোর্ট পেশ করার পর মাননীয় বিচারপতিরা বিএসটিআইয়ের উদ্দেশে নতুন এক নির্দেশে বলেছেন, ওই পাঁচটি ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে কি আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাইকোর্টকে জানাতে হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২২ মে একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে বোতলজাত পানি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পর একজন আইনজীবী জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেছিলেন। ৩ ডিসেম্বর মাননীয় বিচারপতিরা তাদের আদেশে বেআইনিভাবে বোতলজাত করা খাবার পানি বিক্রি ও সরবরাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ওই আদেশে বিএসটিআই এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল। মাননীয় বিচারপতিরা একই সঙ্গে জানতে চেয়েছিলেন, প্লাস্টিক বোতল ও জারে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে সরকারের ব্যর্থতাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। হাই কোর্টের এই আদেশের পরই বিএসটিআই বাজারের ১৫টি ব্র্যান্ডের পানির রং, স্বাদ, পিএইচ ভ্যালু, ক্যালসিয়াম ও ক্যাডিয়ামসহ বিভিন্ন উপাদানের পরীক্ষা করে। সে পরীক্ষাতেই পাঁচটি ব্র্যান্ডের পানি মানসম্মত নয় বলে জানা যায়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মান তথা স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়া সত্ত্বেও খোলা বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি বিক্রির খবর নিঃসন্দেহে আশংকাজনক। পণ্যের মান যাচাই করার জন্য বিএসটিআইয়ের মতো একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা নিয়োজিত থাকার পরও আলোচ্য পাঁচটি ব্র্যান্ডের পানি কিভাবে খোলা বাজারে বিক্রি হতে পেরেছেÑ প্রসঙ্গক্রমে সঙ্গত কারণেই সে প্রশ্ন উঠেছে। আমরা মনে করি, কেবলই মানসম্মত নয় বলে চিহ্নিত করে হাই কোর্টে রিপোর্ট পেশ করাটাই যথেষ্ট হতে পারে না। বরং অভিজ্ঞতার আলোকে ধরে নেয়া যায়, বাজারজাত করার প্রক্রিয়ায় বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত রয়েছে এবং নগদ অর্থে ঘুষের বিনিময়ে তারাই পাঁচ কোম্পানিকে লাইসেন্স তথা অনুমতি দিয়েছিল। সুতরাং অনুসন্ধানের মাধ্যমে ওইসব ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজকেও চিহ্নিত করা এবং আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া দরকার। কারণ, ঘুষের বিনিময়ে তারা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করেছে।   
প্রসঙ্গত বলা দরকার, বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত সকল গবেষণাতেই দেখা গেছে, রাজধানীসহ সারাদেশের পানিই মারাত্মকভাবে দূষিত। গত বছর ২০১৮ সালের অক্টোবরেও পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এক রিপোর্টে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত আশংকাজনক বলে মন্তব্য করেছিল। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বিভিন্ন পন্থায় সরবরাহ করা ৪১ শতাংশ পানিতেই রয়েছে ডায়ারিয়ার জীবাণু। আর পাইপলাইনের মাধ্যমে যে পানি সরবরাহ করা হয় তার ৮০ শতাংশেই রয়েছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক এই জীবাণু। সেই সাথে সারাদেশের ১৩ শতাংশ পানিতে পাওয়া গেছে আর্সেনিকের উপস্থিতি। বিশ্বব্যাংকের ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছিল, পানি ও স্যানিটেশনের দুর্বলতা ও সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশে পেটের পীড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ বাড়ছে। দরিদ্র মানুষের সঙ্গে শিশুরা এতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এসব রোগের কারণে নষ্ট হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে জানা গেছে, বিভিন্ন কারণে ধনী জনগোষ্ঠীর তুলনায় দরিদ্ররা অনেক বেশি রোগের শিকার হচ্ছে। এমন অবস্থায় দরকার যখন ছিল পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট তথা সরকারি ব্যয় বাড়ানো বাস্তবে সেখানে বিগত কয়েক বছরে বরাদ্দ উল্টো অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে বলে মন্তব্য করেছিল বিশ্বব্যাংক। রিপোর্টে আশংকা প্রকাশ করে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সাল নাগাদ এই বাজেট ঘাটতি ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ বাড়ানোর পরিবর্তে সরকার বরং বরাদ্দ কমানোর পথেই এগিয়ে যাবে।
এমন অবস্থায় সরকারের উচিত অবিলম্বে নীতি ও পরিকল্পনায় ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো এবং রিপোর্টে আলোচিত খাতগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় উন্নতি সাধনের পদক্ষেপ নেয়া। নাহলে গ্রামের তো বটেই, শহরাঞ্চলের মানুষেরাও ডায়ারিয়া ও আর্সেনিকের মতো পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের শিকার হতে থাকবে। বিশেষ করে শিশুদের অবস্থা হবে মারাত্মক। এর ফলে সব মিলিয়েই বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি হবে অপূরণীয়। আমরা তাই মনে করি, উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিদের আদেশ অনুয়ায়ী শুধু পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই চলবে না, সুচিন্তিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ভিত্তিতে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য খাতে সুফলপ্রসূ ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। ‘পানির অপর নাম জীবন’ কথাটাও সরকার এবং বিএসটিআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনে রাখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ