ঢাকা, শুক্রবার 25 January 2019, ১২ মাঘ ১৪২৫, ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন ও দেশ শাসন

মোহাম্মদ আবু নোমান : নির্বাচনে মহাজোটের বিজয় ছিল যেমন চমকে দেয়ার মতো। সেই চমকের ওপর আলোর ঝলক নিয়ে এক ঝাঁক মন্ত্রিসভা, নয়া চমকের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের ফলের মতোই পেল্লায় চমক নিয়ে প্রধানত নতুনদের নিয়েই গঠিত হয়েছে মন্ত্রিসভা। রাষ্ট্রপতি সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আগামী ৩০ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ডেকেছেন। নতুন সরকারও এর মধ্যে যাত্রা শুরু করেছে। একথা ঠিক যে, নতুনদের অভিজ্ঞতা দরকার। কাজের সুযোগ না পেলে অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে না। নতুনদের জায়গা করে না দিলে তারা সে সুযোগ পাবেন না। 

আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীণ, জ্যেষ্ঠ ও বরণীয় সংসদ সদস্যের স্থান হয়নি এবারের মন্ত্রিসভায়। আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, নুরুল ইসলাম নাহিদ, বেগম মতিয়া চৌধুরী, শাজাহান খান ও শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মতো নেতারা বাদ পড়বেন বলে কেউ ধারণাও করেননি। গত কেবিনেটেও প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন প্রথম দফায় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী, দ্বিতীয় মেয়াদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সরিয়ে তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ মন্ত্রণালয় সাধারণত দলের সাধারণ সম্পাদককে দেয়া হয়। কিন্তু সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সরিয়ে ঐ পদে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফকে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই রীতি ও প্রথাভঙ্গ করেছিলেন। প্রথাভঙ্গের ধারায় এবার চমকের ওপর চমক হলো, রাজনীতির ময়দানে অনেকটাই অপরিচিত কুমিল্লা লাকসামের তাজুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী করা। প্রধানমন্ত্রী তারুণ্যের ও নতুনের ওপর আস্থা রেখেছেন। কারণ নতুনরা অধিক এনারজেটিক ও পরিশ্রমিক হয়ে থাকবেন। তাছাড়া নতুনরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। এক ঝাঁক নতুন মুখ নিয়ে মন্ত্রিসভার চিরাচরিত রীতি ও প্রথাভঙ্গের এ ধারার কাছে মানুষের আশা ও প্রত্যাশাকে দারুণভাবে স্পর্শ করেছে, সে কথা নতুনদের এবং প্রধানমন্ত্রীর স্মরণ রাখতে হবে। নতুনরা যেন সুশাসন, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতি দূরীকরণের ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখে সে প্রত্যাশাই সর্বসাধারণের।

প্রধানমন্ত্রী পূর্ববর্তী নীতি, রীতি-রেওয়াজ ভেঙ্গে সাহসের পরিচয় দিলেন। নতুনদের নিয়ে দেশ গড়ায় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। নতুন সরকারের নতুন সব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নতুন মুখ নিয়ে কাজ করাটা আরো বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন মুখ মানেই সম্ভাবনা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করার জন্য নতুনদের নিয়ে আসা প্রধানমন্ত্রীর দুরদর্শীতার পরিচয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, সবার কর্মকা- ও অগ্রগতি মনিটরিং করা হবে। নতুনরা কঠোর নজরদারিত্বে থাকবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। 

একথাও ঠিক যে, একই ব্যক্তির বারবার মন্ত্রী ও দলের নেতা হওয়া ঠিক নয়। মানুষ নতুন মুখ দেখতে চায়। তাই হয়তো মানুষের চাহিদার ব্যাপার বিবেচনায় নিয়েই প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগ নিয়েছেন। নতুন সরকারের সামনে অনেক নতুন বিষয়, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ থাকে। মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকবে, সন্দেহ নেই। অনেকে এবার এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। নতুন সরকারের মন্ত্রীদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও আইনের শাসন নিশ্চিতকরণে প্রজ্ঞার পরিচয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারের সামনের দিনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। দেশের আর্থিক খাতে নানা অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ইতিমধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব নিরসনের দায় সরকার এড়াতে পারে না।  অনেকের মধ্যে এই জিজ্ঞাসা রয়েছে- নতুন মন্ত্রীরা কি জনপ্রত্যাশা পূরণে তাদের দূরদর্শিতা, দক্ষতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রদর্শনে সক্ষম হবেন? চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ও চমক গ্রহণে দেশব্যাপী প্রধানমন্ত্রীর অনেক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্ত ও মেধার পরিচয় দেশব্যাপী গ্রহণীয় হয়েছে। কেননা, শেখ হাসিনাই পারেন সাহস ও চ্যালেঞ্জ নিতে। বলা হয়ে থাকে তিনিই পারেন, তিনিই পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর মেধা, বিচার-বিবেচনা সবসময়ই প্রশংসার দাবি রাখে। জনগণও দারুণভাবে আশাবাদী নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে। বাংলাদেশকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে নতুন মন্ত্রিসভা তাদের মেধা, শ্রম আর সততার স্বাক্ষর রাখবেন, এ প্রত্যাশা সবার। 

সর্বাগ্রে নতুনদের স্বচ্ছতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। একই সঙ্গে সর্বসাধারণের কাছে জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার বিষয়েও স্মরণ রাখতে হবে। দেশের উন্নয়ন দরকার, তবে গণতন্ত্রহীন বাকরুদ্ধ উন্নয়ন নয়। যে উন্নয়নে ফার্মের মুরগীর মত মাংস-চর্বি সবই থাকবে, কিন্তু সে মুরগির থাকবে না কোন ‘নড়নচড়ন’, থাকবে শুধু অপেক্ষা- কখন কে ধরে নিয়ে ছুরি(!) চালিয়ে দেবে! তেমনই কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাউকে কেন এ সঙ্কায় থাকতে হবে, কখন না জানি খুন, গুম ও ক্রসফায়ারের কবলে পড়তে হয়? যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের দায় নিতে সক্ষম নয়, তাকে কী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা যায়...? দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও সংবিধান থাকলেও প্রচলিত রাজনীতি নিছক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়ায় আমরা সে লক্ষ্য থেকে যোজন যোজন দূরেই অবস্থান করছি। বাংলাদেশের সংবিধানে বহুদলীয় গণতন্ত্র স্বীকৃত। কালপ্রবাহে গণতন্ত্রের বিবর্তন হয়েছে। এসেছে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন। এবার সংসদ নির্বাচন কেমন হয়েছে তা কারোই অজানা নয়। এই নির্বাচনে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, তা হয়েছে বলে দেশের বেশির ভাগ মানুষই মনে করছেন না। 

আমাদের দেশে নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ অতীতে ছিল, এখনো আছে; হয়তো আগামী দিনে আরো জোরালো হবে। অতীতে নির্বাচনে সূক্ষ্ম ও স্থূল কারচুপির অভিযোগ ছিল বহুল আলোচিত। ভোট গণনায় অনিয়ম, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্ব, একজনের ভোট আরেকজন দেয়ার অভিযোগ অতীতেও ছিলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেন্দ্র দখল করে বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে গণহারে সিল মারার অভিযোগও পুরনো নয়। কিন্তু এবারে সারা দেশেই ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করা, হুমকি-ধমকি দেয়াসহ টিআইবির গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫০ আসনের মধ্যে ৪১ আসনে জাল ভোট; ৪২ আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা; ৩৩ আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল; ২১ আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা; ৩০ আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট; ২৬ আসনে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা; ২০টিতে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা; ২২টিতে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া; ২৯টিতে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া, ইত্যাদি দেশব্যাপী নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।’ গণমুখী অনুচ্ছেদগুলো শুধু সংবিধানেই লিপিবদ্ধ রয়েছে; কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ থাকছে উপেক্ষিত।

ক্ষমতাসীনরা উন্নয়ন করেছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ভিন্নমতাবলম্বী ও সাধারণ মানুষ যে অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তা বর্ণনাতীত। উন্নয়ন যদি মানবিকতা এবং মানবতাকে উন্নত করতে না পারে, সে উন্নয়ন কার জন্য আর কতোটা স্থায়ী হতে পারে...। দেশব্যাপী অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সড়ক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন মানেই উন্নয়ন নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় উন্নয়নের মধ্যে পড়ে। গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ ও আইনের শাসন হতাশাব্যঞ্জক রেখে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা যায় না।

অতীতে দুর্নীতি রোধে উদাসীনতা, দলীয় কর্মীদের অপরাধের বিচারে নিষ্ক্রিয়তা ছিল লক্ষণীয়। নিরপরাধ ও নির্যাতিতদের বিচার না করে বরং অপরাধীদের আশ্রয়, প্রশ্রয়, আনুকূল্য ও পক্ষপাত করা হয়েছে। যাতে ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। মামলা-হামলা, গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে এক ভীতি ও ত্রাসের রাজত্ব। পরাধীন দেশে মানুষকে নির্যাতন করা হয় সবাই জানে। কিন্তু স্বাধীন দেশের মানুষ নির্যাতনের স্বীকার হবে কেন? গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকা গেলে আইয়ুব খানের পতন হতো না। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশের ইতিহাসও আইয়ুব খান থেকে ভিন্ন নয়। অতীতে একই মার্জিনে ও রূপে জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। যখন যারাই ক্ষমতায় ছিলো ততদিন পর্যন্ত অন্য দল আর নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারবে না, আমাদের দেশ, সমাজ, সংস্কৃতিতে এটাই ছিল স্বাভাবিক!

হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে, ব্যাংকগুলো লুট হয়ে যাচ্ছে। দেশে সৃষ্টি হয়েছে দুর্বৃত্তায়ন ও লুণ্ঠনের অর্থনীতি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, স্বাধীনতা পদকের সোনায় খাঁদ! স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা স্মারক হিসেবে দেয়া ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতি করা হয়েছিল। ৩৪৪টি ক্রেস্টে ৭ কোটি ৩ লাখ ৪৬ হাজার ২৮০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। আমলাতন্ত্র ও শোষক ছাউনির উচ্চাভিলাষে প্রমাণ হয়েছে, মানুষের অসীম-অনন্ত চাহিদা বা নিজের কু-মানসিকতা তাকে নিয়ে যায় এক অন্ধ জগতে। নৈতিকতার অবক্ষয় সম্পর্কে কমবেশি সবাই ওয়াকিবহাল। কিন্তু সেটি কোন পর্যায়ে নেমে গেছে, তা ক্রেস্ট জালিয়াতির ঘটনা থেকে বুঝা যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে জনগণকে।

নতুন উদ্যোক্তা ও শিল্পপতীদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তা সমাধান ও পরিত্রাণের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। স্বচ্ছতা, সুনিশ্চিত জবাবদিহির মাধ্যমেই উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পেঁৗঁছে দেয়া সম্ভব। দেশে চলমান উন্নয়নের যে বিশাল বা মেগা প্রজেক্টগুলো আছে, এসবে খুব বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে এবং কাজের সময়ের সঙ্গে সমন্বয় থাকছে না। কাজ শেষ করতে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আবার সময় বাড়ানো হচ্ছে। এতে আবার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দুর্নীতির কারণে খরচ বেড়ে যায়। দুর্নীতি যে হয়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে দুর্নীতির বিষয়টি জড়িয়ে আছে। এটির পরিবর্তন আনতে নতুন সরকারকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ