ঢাকা, শুক্রবার 25 January 2019, ১২ মাঘ ১৪২৫, ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঢাকার চারপাশের ৪ নদ-নদী

আখতার হামিদ খান : বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ অব্যাহতভাবে দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। নদ-নদীগুলো দখলমুক্ত করতে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু অভিযান শেষ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। আমরা একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এর আওতায় ওই চার নদ-নদী সম্পূর্ণভাবে দূষণমুক্ত না হলেও আর যেন দূষিত না হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করা হবে : নৌ মন্ত্রী।

ঢাকার চারপাশের গুরুত্বপূর্ণ চারটি নদী অব্যাহতভাবে দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে ছোট হয়ে গেছে। চার নদীর দখল ও দূষণমুক্ত করার কাজ চলছে ধীর গতিতে। নদীগুলো দখলমুক্ত করতে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু অভিযান শেষ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। বর্জ্য ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। কলকারখানার রাসায়নিক দ্রব্য ও বর্জ্যে পানি দূষিত হয়ে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোর দখল-দূষণ মুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তা কাজে আসছে না। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নথিপত্রে ওই চারটি নদীর দখল-দূষণমুক্ত করতে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফিরিস্তি থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকার চারপাশের কোনো নদীরই অস্তিত্ব থাকবে না।

এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, চারটি নদ-নদীর মধ্যে তুরাগের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এ নদীর পারে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে এটিকে এমনভাবে দখল করা হয়েছে, যা পরিণত হয়েছে সরু খালে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নদীর সীমানা নির্ধারণেও যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। টঙ্গী ব্রিজ থেকে আশুলিয়া হয়ে মিরপুর পর্যন্ত বেশ কিছু স্থানে নদীর পাড় থেকেও ৭ থেকে ১০ মিটার ভেতরে সীমানা পিলার নির্ধারণ করেছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, যা বেআইনি।

পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, সবচেয়ে দূষিত নদী বুড়িগঙ্গা। এরপর তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা। রাজনৈতিক কৌশলে এসব নদী দখল করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ করা উচিত সরকারের। নদী দখল ও এর দূষণ প্রতিরোধে মন্ত্রণালয়গুলোও তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না বলে মনে করেন তিনি।

তুরাগ নদ : টাঙ্গাইলের উজানে লৌহজং নদী ভাটিতে এসে তুরাগ নাম ধারণ করলেও এটি বংশী নদীর শাখা। এক সময় সারা বছরই এই নদের প্রবাহ থাকত। কিন্তু এখন তুরাগ তার ঐতিহ্য হারিয়ে ছোট খালে পরিণত হয়েছে। দখলদার ও শিল্প মালিকদের কবলে পড়ে দখল-দূষণে মরতে বসেছে নদটি। রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

শীতলক্ষ্যা নদী : আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী শীতলক্ষ্যা। এই নদী লক্ষ্যা নদী নামেও পরিচিত। এটি ব্রহ্মপুত্র নদের উপনদী। দখল-দূষণে ধ্বংসের পথে নদীটি। এটি এখনো খালে পরিণত হয়নি। তবে যে অবস্থায় আছে খালে পরিণত হতে সময় নেবে না। 

বালু নদী : রাজধানীর উত্তর-পূর্ব এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বালু নদী। এই নদীর গুরুত্ব হচ্ছে, এটি স্থানীয় পানি নিষ্কাশন ও নৌ-পরিবহন অব্যাহত রাখছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ নদী ড্রেজিং না করায় নদীটি এখন মরা নদীতে পরিণত হয়েছে।

বুড়িগঙ্গা নদী : ঢাকার প্রাণ বলে খ্যাত বুড়িগঙ্গা নদীর অবস্থা আরো খারাপ। গুরুত্বপূর্ণ এই নদীটি দখল-দূষণমুক্ত করতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। এসব প্রকল্পের কয়েকটিতে নামমাত্র কিছু কাজ করে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। দখলমুক্ত করতে প্রায়ই অভিযান চালানো হলেও ওই অভিযানে কোনো লাভ হচ্ছে না। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী বলেন, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর পানি দূষণমুক্ত করতে কাজ চলছে। এদের পানির প্রবাহ বাড়াতে যমুনার পানি বুড়িগঙ্গায় এনে গ্রোত সৃষ্টির যে প্রকল্প আছে তা বাস্তবায়ন হলে তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর পানি দূষণমুক্ত হবে। তবে ওই প্রকল্প কবে বাস্তবায়ন হবে তা তিনি সঠিক করে বলতে পারেননি। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষের বর্জ্য বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আতাহার আলী বলেন, ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোর দূষণ কমাতে বর্জ্য অপসারণের কাজ চলছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা.আব্দুল মতিন বলেন, শুধু ঢাকার চারপাশের চারটি নদ-নদী নয়, দেশের সব নদী আজ হুমকির মুখে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সভাপতি আবু নাসের খান বলেন, ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলো রক্ষার স্বার্থে বহু আন্দোলন হয়েছে। তাতে কোনো কাজ হয়নি। আমরা সরকারকে সচেতন করতে পারি। পরামর্শ দিতে পারি, কিন্তু কাজ করার দায়িত্ব সরকারের।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘আমরা ইকোলজিক্যাল রিস্টোরেশন অব ফোর রিভার নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এ প্রকল্পের আওতায় ওই চারটি নদ-নদী সম্পূর্ণভাবে দূষণমুক্ত না হলেও আর যেন দূষিত না হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করা হবে। নদী দূষণের সঙ্গে জড়িতদের জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে। এজন্য মোবাইল কোর্ট চালু করা হয়েছে।’

বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান কমোডর এম মোজাম্মেল হক বলেন, যেসব বর্জ্য নদীর তলদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তা অপসারণে আমরা দু’টি প্রকল্প হাতে নিয়েছি। নদীর পাড়ে দখল ঠেকানোর পদক্ষেপ হিসেবেও ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ৫০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ