ঢাকা, শুক্রবার 25 January 2019, ১২ মাঘ ১৪২৫, ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আজ মধু কবির ১৯৫ তম জন্মবার্ষিকী 

মোল্যা আব্দুস সাত্তার, কেশবপুর (যশোর) : আজ ২৫ জানুয়ারি, বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতার জনক ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক, প্রথম সার্থক নাট্যকার, প্রহসন রচয়িতা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৫ তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে কবির জন্মস্থান কেশবপুরের সাগরদাঁড়িতে ২২ জানুয়ারি থেকে চলছে ৭ দিন ব্যাপী মধুমেলা। এ মেলা চলবে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। ১৯৯৭ সালে জাতীয়ভাবে  দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ এ মেলা জেলা প্রশাসন ও  সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে পালন করছে। কোন কবি কিংবা সাহিত্যিককে নিয়ে এত বড় জন্মবার্ষিকী উদযাপন ও মেলা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।  

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারী (বাংলা ১২৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ মাঘ) কেশবপুরের অধুনা মৃত প্রায় কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর ছদ্মনাম টিমোথি পেনপোয়েম। বাবা জমিদার রাজনারায়ন দত্ত ও মাতা জাহ্নবী দেবীর কোলে শনিবার জন্মে ছিলেন মহাকবি মধুসূদন। কবির পূর্বপুরুষের আদি বাসস্থান খুলনা জেলার অন্তর্গত তালগ্রাম হলেও তাঁর শৈশব শিক্ষার সূত্রপাত হয়েছিল পিত্রালয় ও জন্মস্থান সাগরদাঁড়ি গ্রামের পাঠশালায় মাতা জাহ্নবী দেবীর তত্ত্বাবধানে। রামায়ন, মহাভারত কাহিনীর প্রতি আকর্ষণের প্রেরণা এই সময়ে মায়ের কাছ থেকেই তিনি প্রথম অর্জন করেছিলেন। উত্তরকালে মধুসূদন প্রতিভার বিকাশ, পুষ্টি ও সমৃদ্ধি ঘটেছিল মূলত এই প্রেরণাকে ভিত্তি করে। মধুসূদন দত্ত ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার হিন্দু কলেজের জুনিয়র বিভাগে ভর্তি হন। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজের সিনিয়র বিভাগে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি স্ত্রী শিক্ষা সম্পর্কে প্রবন্ধ রচনা করে স্বর্ণ পদক পান। মধুসূদন ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারী ওল্ড মিশন চার্চে গিয়ে পাদ্রী ডিলটির কাছে দীক্ষা নিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং হিন্দু কলেজ ত্যাগ করে বিশপস কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর তিনি মাদ্রাজ যান। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজের ‘মেল অরফ্যান অ্যাসাইলাম’ এ ইংরেজী শিক্ষক হিসেবে চাকরি পান। সে সময় তিনি ‘মাদ্রাজ সার্কুলেটর’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক পদে চাকরি পান। একই বছর ৩১ জুলাই ওই বিদ্যালয়ের বালিকা বিভাগের ছাত্রী রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ যুবতীকে বিবাহ করেন। কবির এ দাম্পত্য জীবন সুখের না হলেও তিনি চার সন্তানের জনক হয়েছিলেন। এ দাম্পত্য জীবন শেষে এমিলিয়া আঁরিয়েতা সোফিয়া হেনরিয়েটা নামে এক ফরাসি তরুণীকে বিয়ে করেন। 

তিনি ১৮৫২ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যালয় বিভাগে দ্বিতীয় শিক্ষকের পদ গ্রহণ করলে জীবনে আবার গতি ফিরে আসে। কিন্তু যে কবির প্রকৃতির লীলাভূমি সাগরদাঁড়িতে জন্মেছেন, কপোতাক্ষের মাটি ও কাদার সাথে নিত্য অবগাহন করেছেন, তিনি কীভাবে বিজাতীয় সাহিত্যের প্রতি আজীবন আসক্ত থাকবেন। এক সময় তিনি বুঝে ছিলেন বিদেশী ভাষার প্রতি যতই অধিকার থাকুক না কেন, তাতে ভর করে কোনো চিরস্থায়ী কবি গৌরব অর্জন করা যায় না। তাই ভুল ভাঙার পর বাংলা সাহিত্যের মধ্য থেকে অমূল্য রতœ আহরণের জন্য তিনি অনুশীলন শুরু করেন। পাশ্চাত্য সাহিত্যের মহাকবিদের রচিত কাব্য থেকে তিনি যে রস-মধু আহরণ ও ছন্দগঠনের যে যাদুমন্ত্র আয়ত্ত করেছিলেন, অল্প দিনের মধ্যে তারই ফসল মধুকবির অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ কাব্য। বাংলা সাহিত্যে এই নতুন ছন্দে রচিত কাব্যের কথা শুনে বাঘা বাঘা পন্ডিতেরা মধুসূদনের প্রতিভাকে স্বীকার করে নিলেন। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ  ÔThe Captive Ladie’  প্রকাশিত হয়। ১৮৫৮ সালে তিনি রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক। ১৮৬০ সালে ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নামক দুটি প্রহসন লেখেন। ১৮৬১ তে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক মহাকাব্য ‘ মেঘনাদবধ’, আধুনিক রূপে রূপায়িত অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’, ১৮৬২ সালে প্রকাশ হয় ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্য। যা তার রচনার সর্বোত্তম নিদর্শন। ১৮৬৬ সালে ‘চতুর্দশপদী’ কবিতাবলী কবির বাংলা ভাষা ও ছন্দের নিরীক্ষাধর্মিতার শ্রেষ্ট কৃতিত্ব, পৌরানিক নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ ও ‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০), ঐতিহাসিক নাটক নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬১), বিয়োগান্ত নাটক ‘মায়াকানন’ (মৃত্যুর পর ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত), মধুকবি রচিত প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। এছাড়া অনুবাদমূলক গদ্য রচনা ‘হেক্টরবধ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।      

বাংলা সাহিত্যের এ মহাকবি ১৮৬২ সালের ৯ জুন ব্যারিষ্টারি পড়তে বিলেতের প্রেজইন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৬৩ সালে তিনি ফ্রান্সে গিয়ে ভার্সাই নগরে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। তিনি ১৮৬৪ সালের ২ জুন অর্থ সাহায্য চেয়ে বিদ্যাসাগরের কাছে চিঠি লেখেন। ১৮৬৬ সালের ১৭ সভেম্বর কবির স্বপ্নচারী ব্যারিষ্টারি পাশ করেন। ১৮৬৭ সালে কবি ভার্সাই থেকে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এ ব্যবসা ভালো না লাগায় চাকরি নেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে অনুবাদের পরীক্ষক পদে। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন মাত্র ৪৯ বছর বয়সে বেলা ২ টায় এ মহাকবি কলকাতা আলিপুর হাসপাতালে চিরবিদায় নেন। ৩০ জুন কলকাতা লোয়ার সার্কুলার রোডে খ্রিস্টীয় রীতি অনুযায়ী বাংলা সাহিত্যের মহাকবিকে সমাধিস্থ করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ