ঢাকা, শনিবার 26 January 2019, ১৩ মাঘ ১৪২৫, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নিজের ভাষার প্রতি নজর দেয়া প্রয়োজন

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : দেখতে দেখতেই ভাষা-আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি করাঘাত করছে দুয়ারে। যদিও ফেব্রুয়ারি না ফাল্গুন এনিয়ে একটা বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাদিবস হিসেবে স্বীকৃতির পর সে বিতর্ক বোধহয় শেষ হয়ে গেছে। বাংলাভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলা মাস ফাল্গুনের একটা রক্তসম্পর্ক থাকলেও তা ইংরেজি ফেব্রুয়ারির সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। তাই এনিয়ে আর কোনও বিতর্ক সৃষ্টির অবকাশ নেই।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। অবশ্য পিতৃভাষাও। ভগ্নি এবং ভ্রাতৃভাষাও। এ ভাষা কেবল মায়ের কাছ থেকেই শেখা হয় না। পিতা বা বাবার কাছ থেকেও শেখা হয়। এমনকি বোন এবং ভাইয়ের কাছ থেকেও মানুষ ভাষা শেখে। বাংলাভাষার ক্ষেত্রেও তাই। শুধু মায়ের কাছ থেকেই আমরা ভাষা শিখি না। পিতা, ভাই, বোনের কাছেও আমরা ভাষা শিখে থাকি। তাই বাংলা আমাদের শুধু মাতৃভাষাই নয়, পারিবারিক ভাষাও বটে।
যেদিন এ নিবন্ধটি লেখতে শুরু করি, সেদিন সকালে প্রতিদিনকার মতো পত্রিকার সঙ্গে দেয়া একটি লিফলেট হাতে পাই। শিরোনাম ‘পড়াতে চাই’। এটির নিচে তিনজনের নাম ও সেলুলার ফোন নম্বর লেখা। তিনজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে উল্লেখ করা আছে। এদের একজন পদার্থবিজ্ঞানের মাস্টার্স। একজন গণিতের। অন্যজন শুধু মাস্টার্স। কী বিষয় তার উল্লেখ নেই। যিনি পদার্থবিজ্ঞানের তিনি ডিগ্রিটা লেখেছেন “এম.এস.সি (পদার্থ বিজ্ঞান)”, যিনি গণিতের তিনি লেখেছেন “এম,এস,সি (গণিত)”। আর যিনি বিষয় উল্লেখ করেননি, তিনি লেখেছেন এম,এ।
পদার্থবিজ্ঞানের জন ডিগ্রিটা লেখেছেন দুটো ফুলস্টপ দিয়ে। গণিতের জন ডিগ্রি লেখেছেন দুটো কমা দিয়ে। আর নরমাল মাস্টার্সের জন লেখেছেন একটা কমা দিয়ে। অর্থাৎ তিনজনই অর্জিত ডিগ্রি লেখতে ভুল করেছেন। আর পদার্থবিজ্ঞানের জন বিষয় লেখতে মাঝখানে বিরাট ফাঁক রেখে দিয়েছেন। এটা যে একরকমের ফাঁকিবাজি তা হয়তো তিনি বোঝেননি।
বিতরণ করা লিফলেটে তাঁরা উল্লেখ করেছেন যে, ‘বাসায় গিয়ে অতিযতœসহকারে প্রাইভেট পড়াতে চাই।’ প্রশ্ন হচ্ছে, বিজ্ঞাপনদাতারা নিজেরাই যতœসহ পড়ালেখা করেননি বা শেখেননি। এতো তাঁদের ভুলেভরা লিফলেটই প্রমাণ করছে। তাহলে অন্যদের ‘অতিযতœসহ’ কীভাবে পড়াবেন?
হ্যাঁ, ‘পড়াতে চাই’ শীর্ষক বিজ্ঞাপনদাতারাই কেবল ভুল করেন এমন নয়। আরও অনেকই ভুল করেন। তবে সাধারণ মানুষের ভুল আর শিক্ষিত লোকের ভুল এক নয়। বিশেষত যারা শিক্ষক বা ছাত্র পড়ান তাঁদের এমন ভুল হওয়া অনুচিত। নিজে ভালো করে না শিখে অন্যকে শেখাতে যাওয়া অপরাধ। অন্যায়। তবে আজকাল অনেকই বাধ্য হয়ে বা অন্য উপায় না পেয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এখানেই সমস্যা হয় বেশি। শিক্ষক হতে মন সায় দেয় না। আগ্রহ নেই শিক্ষকতা পেশায়। অথচ শিক্ষক হতে যান বেকায়দায় পড়ে। তখনই ভুল হয়। জোর করে যেমন শিক্ষক হওয়া উচিত নয়; তেমনই ভালোভাবে না শিখে অন্যকে শেখাবার চেষ্টাও এক ধরণের প্রতারণা।
একসময় ঢাবি’র এক প্রফেসর আমাদের অফিসে আসতেন তাঁর লেখা নিয়ে। পরে তিনি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হন। কয়েকটি বিরাটকায় বইও লেখেছেন। একদিন তাঁর একটা এমন বই আমার হাতে পড়ে। ওতে লেখকের নামের সঙ্গে লেখা আছে ‘পি.এইচ.ডি’ এভাবে। একদিন ভদ্রলোককে কাছে পেয়ে শক্ত করে ধরলাম। বললাম, এটা কী ডিগ্রি এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া? প্রথমে উল্টো প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে?’ এরপর বুঝিয়ে বললে দোষটা যথারীতি ছাপাখানার ওপর চাপাতে চাইলেন। আমি প্রফেসরের মুখের ওপর ঠাস করে বলে  বসলাম, নিজের অজ্ঞতাজনিত ভুলটা অন্যের ঘাড়ে চাপানোর বদ অভ্যাসটা শুধরে নেয়া উচিত। এরপর ডক্টর অব ফিলোজফি ডিগ্রিটা কীভাবে লেখা হয় তা দেখালাম। হ্যাঁ, ওটা লেখতে হয় ‘পিএইচ.ডি.’ অথবা ‘পি-এইচ.ডি.’ এভাবে। অর্থাৎ গৃহশিক্ষক হবার আগ্রহীরা যেভুল করেছেন, এ প্রফেসরও একই ভুল করেছেন ডিগ্রি লেখতে। অবশ্য আজকাল ঝামেলা এড়াতে অনেকেই ‘পিএইচডি’ এভাবে লেখেন। যারা শুদ্ধ করে লেখতে পারেন না, তাঁদের জন্য এটা সহজ পদ্ধতি। মনে রাখতে না পারলে কী করবেন?
আমরা বিদেশি ভাষা যতœসহকারে শিখি। কিন্তু নিজের ভাষা শেখবার ব্যাপারে মনোযোগ দেই না। যেনতেনভাবে সেরে ফেলবার চেষ্টা করি। এটা খুবই দুঃখজনক। বাংলা মাতৃভাষা বলে অনেকেই অবহেলা করি। উপেক্ষা করি। কিন্তু না, মাতৃভাষা হলেও বাংলার অনেক কিছু শেখবার আছে। ভালোভাবে না শিখলে, না জানলে বলতে এবং লেখতে গিয়ে নানা ভুলভ্রান্তি হবে। হওয়াটা স্বাভাবিকও।
যারা মাতৃভাষা শুদ্ধ করে লেখতে বা বলতে পারেন না, তাঁরা অন্য ভাষাও ভালো করে শেখতে পারেন বলে মনে হয় না। আসলে নিজের ভাষা ভালো না জানলে অন্য ভাষাও ভালো করে জানা বা শেখা যায় না। এটা চিরন্তন সত্য কথা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে বিদেশি ভাষা তথা ইংরেজির প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি। ফলে বাংলা হয় উপেক্ষিত। এতে বাংলা যেমন শেখা হয় না ভালো করে; তেমনই ইংরেজিও শেখা হয় না। তাই ইংরেজি ভালোভাবে শেখতে বা জানতে হলেও সবার আগে মাতৃভাষা বাংলা শেখা জরুরি। এটা অন্তত বাংলাভাষীদের করতে হবেই। কারণ নিজের ভাষা উপেক্ষা করে অন্য ভাষা ভালোভাবে শেখবার দাবি পুরোপুরি ভন্ডামো। নষ্টামো বললেও অত্যুক্তি হয় না।
বাংলাভাষা ভুলভাবে উপস্থাপনে শিশুদের ওপর বাজে প্রভাব পড়ে। পাঠ্যবইয়ে ভুল। স্কুলের স্যার পড়ান ভুল। গৃহশিক্ষক শেখান একরকম। একেক পত্রিকার বানানরীতি একেক রকম। আর টিভি'র স্ক্রলে বাংলা বানান দেখা যায় অন্যরকম। কোনটা সঠিক তা বুঝে ওঠা শিশুকিশোরদের জন্য সত্যিই কঠিন!
সড়ক-মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন দোকান-পাট, অফিস-আদালতের সাইনবোর্ডে বাংলা বানানের যে বৈচিত্র্য এবং ভিন্নতা তা হতভম্ব হবার মতো। এসব দেখে হাসবো না কাঁদবো তা ঠাওর করা বড় কঠিন।
বাঙালি জাতি হিসেবে গৌরব করবার মতো যেসব বিষয় আছে তার মধ্যে আমাদের বাংলাভাষা অন্যতম। এ ভাষার মর্যাদা ও সম্মান মানে বাঙালি জাতির মর্যাদা এবং সম্মান। বাংলাভাষার গৌরব তথা আমাদেরই গৌরব বা অহঙ্কার। এ অহঙ্কার নেতিবাচক কিছু নয়। এ অহঙ্কার আমাদের বেঁচে থাকবার অঙ্গীকার। মাথা উঁচু করে বিশ্বদরবারে টিকে থাকবার দৃঢ়প্রত্যয়।
বাংলাভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখবার দায়িত্ব আমাদের সবার। তবে যারা শিক্ষক অর্থাৎ স্কুল-কলেজে, মাদরাসায় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান তাঁদের দায়িত্ব বেশি। বাংলাভাষা শিক্ষকদের যেমন যত্নসহকারে শেখতে হবে, তেমনই তা অন্যদের শেখাতে তথা অভিনিবেশসহকারে পাঠদানও করতে হবে। শিক্ষকরা নিজেরাই অভিনিবেশের সঙ্গে বাংলাভাষা না শেখলে শিক্ষার্থীদের তা কীভাবে শেখাবেন?
খুব উঁচু মাপের একজন শিক্ষক ছিলেন আমাদের। নামটা এখানে উহ্য রাখলাম। তাঁর তিনখ-ের বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসগ্রন্থে ‘ঐকমত্য’ শব্দটা ভুলভাবে ছাপা হয়েছিল ‘ঐক্যমত’। আমি এ ব্যাপারে একদিন স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে নেন। কারুর কোনও ভুল হলে তা শুধরে নেয়া মহত্বের লক্ষণ। স্যার কেবল ভুলটা স্বীকারই করলেন না। সেদিন থেকে তিনি আমাকে অনেকের কাছেই 'স্যার' বলে সম্বোধন করতেন। এই হচ্ছে মহৎ মানুষের মহত্ব এবং মহানুভবতা। অথচ আজকাল অনেক চুনোপুঁটি ভাষার 'ভ' শেখেননি। কিন্তু অহঙ্কারে তাঁদের পদযুগল মাটি পর্যন্ত স্পর্শ করতে চায় না। উল্লেখ্য, আমাদের বেশ চেনাজানা একজন জাঁদরেল সাংবাদিক আছেন। তিনিও শব্দটা ‘ঐক্যমত’ লেখেন। শুধু তাই নয়, নিজের নামের শেষাংশও ভুল বা বিকৃতভাবে লেখেন। এতে যে শিশুকিশোর শিক্ষার্থীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ভুল বা বিভ্রান্তিকর বার্তা পৌঁছে তাও অনেকে মানতে চান না। এটা দুশ্চিন্তার কারণ অবশ্যই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ