ঢাকা, রোববার 27 January 2019, ১৪ মাঘ ১৪২৫, ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে

এইচ এম আব্দুর রহিম : প্রকৃতির নৈসর্গিক লীলাভূমি এই সুন্দরবন। প্রকৃতির রাণী এই সুন্দরবন। বিশ্বের সেরা ম্যানগ্রোব জাতীয় সুন্দরবন। দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বঙ্গোপসাগরের তীরে ও বিশ্বেসেরা গহীন বন (ম্যানগ্রোব ফরেষ্ট) সুন্দরবনের নীড়ে গড়ে উঠা। গাঙেয় বদ্বীপ বাংলাদেশ যেন প্রকৃতির এক বিচিত্র বিলাস। তার মাথার উপর হিমালয় পর্বত, সাইবেরিয়ার হিমবাহ চলে অবিরত, পায়ের নীচে বঙ্গোপসাগর তার ধোঁয়ায় পা প্রতিনিয়ত। সে কারণেই কর্কটক্রান্তির কাছে দাড়িয়ে ও চরম নয় তার আবহাওয়া, নাতিশীতোষ তার; মওসুমী বায়ুর বরমাল্য বর্ষণে বাংলা সতত সবুজ শ্যামল। তাই কুরআনের সেই সূরা মূলকের আয়াতটির কথা মনে পড়ে যায়। “ফারজিয়িল বাসারা হাল তারা মিন ফুতুর, অর্থ- তুমি আমার সৃষ্টির দিকে যত তাকাবে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে তোমার দৃষ্টি ফিরে আসবে।” কবি বলেছেন, ‘এমন একটি দেশ তুমি কোথা খুঁজে পাবে নাকো তুমি’। প্রকৃত বাংলাদেশ তার বাসিন্দাদের রাণীও করেছে, আবার আল্লাহর ইচ্ছায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার। নদীর মোহনা ছোট বড় দ্বীপমালা ২৭৫ কিলোমিটার, সমতল ও সমুদ্র সৈকত ৩১০ কিলোমিটার। টেকনাফের মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল কালন্দি পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১৪টি উপকূলীয় জেলার বিস্তৃতি বাংলাদেশের উপকূলেই দেশের প্রধান দু’টি সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামও মোংলা বিশ্বের সেরা গহীন বন সুন্দরবন এবং বিশ্বের অন্যতম অখ-িত সমুদ্র সৈকত বা বেলাভূমি কক্সবাজার অবস্থিত। দেশের ২৫ শতাংশ জনগণ উপকূল এলাকায় বসবাস করে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির কম বেশি প্রায় ২৫ শতাংশ অবদান এ অঞ্চলেরই। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সুন্দরবন অঞ্চলের অবকাঠমো এবং বসবাসকারী জনগণের অর্থনৈতিতক জীবন নানা দৈব দুর্বিপাক, বৈষম্য ও অবহেলা আর অমনোযোগিতার শিকার। বলা নেই কয়া নেই সমুদ্র থাকে উত্তাল। তার মন পবনের ঠিকানা বাংলাদেশ আবহাওয়া দপ্তরে ঠাঁই পায় না। তার এ প্রয়াশ পাগলামি সুন্দরবন মাথায় পেতে নিয়ে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, বরগুনা পটুয়াখালীকে শেল্টার দিয়ে চলেছে। ১৭৮৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালের আইলা পর্যন্ত সময়ে শুমার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪৭৮টি বার মোটাদাগের ও মাঝারি ধরনের জলোচ্ছ্বাস, গোর্কি, হারিকেন, সিডর, নার্গিসেরা বাংলাদেশের সীমান্ত উপকূল ক্ষত বিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯টি। এসেছে ৫-১০ বছর পর পর। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে বিগত ৪০ বছরে ১৪৯টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের ঘটনা ঘটেছে ঘন ঘন। মাত্র একবছরের ব্যবধানে সর্বশেষ সিডর আইলার আঘাতে স্বয়ং সুন্দরবন পর্যুদস্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিরূপ আচরণের প্রথম প্রত্যক্ষ শিকার সব সময়ই। কৃষি প্রধান উপকূলীয় এলাকার অর্থনীতির সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে এটা প্রতিভাত হয়ে উঠে যে, জাতীয় অর্থনীতির অন্ত:সলীলা শক্তির উদ্বোধন যার হাতে; সেই সুন্দরবন বেদনায় বিবর্ণ। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো অর্থনীতি অনেক প্রবণতার সুচক সন্ধানে কালাতিপতি করে; উপকূলীয় এলাকার আর্থসামাজিক চাল চিত্র, থানা থেকে শুরু করে ভূমি বন্টন ব্যবস্থা, চাষাবাদের হালহাকিকত, প্রাণী সম্পদের সালতামামি অনেক কিছুর বাস্তবতার ব্যাখ্যা তাদের কাছে নেই। উপকূলীয় এলাকায় অর্থনীতি যেন দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মাথা ব্যথা সূত্রে উপস্থিত; শুধু আকালের দিনে নাকালের মোহনায় এবং একমাত্র মিডিয়ায়। নদীর মোহনায় মানব সভ্যতার সুতিগার, কৃষিই প্রাচীনতম জীবিকা আর শ্যামল নবুজ প্রান্তরে প্রাণী সম্পদের সমারোহ জীবনায়নের স্পন্দন। বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল সত্য সম্ভারে সমৃদ্ধ। দেখা যায় যে, তা তো চর্চাপদের পাতা থেকে জানা যায়। সমুদ্র, আর নদী মেঘলা প্রকৃতি আর শ্যামল সবুজ পরিবেশের সংমিশ্রণে উপকূল অঞ্চল গোটা দেশের, সমাজের অর্থনীতির জন্য অনিবার্য অবকাঠামো শুধু নয়, উন্নয়ন প্রয়াস প্রচেষ্টায় সার্বিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য জরুরী। এটা সুপ্রাচিনকাল থেকে ইতিহাসের পথ ধরে এ সত্য সততা সব ভূগোলে স্বীকৃতি থাকলে ও প্রাচিন জনপদে এটা যেন সব সময় নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হয়। যখন পালা করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে যখন সবাই। বৈশিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পড়ে, তাপমাত্রার প্রসুত তারতম্য সূত্রে সমুদ্র তলদেশ স্ফীত হওয়ার কারনে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে চলেছে বিশ্বের সমগ্র সমুদ্র উপকূল বেষ্টনিতে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাংলাদেশের জন্য তা মড়ার উপর খাড়ার হিসেবে দেখা দিয়েছে। বংলাদেশের নি¤œাঞ্চল বিশেষ করে অদুরবর্তী দ্বীপাঞ্চল সামান্য জলোচ্ছ্বাসের সূচনাতে তলিয়ে যাচ্ছে। তা উদ্ধারের বংশবদ কোনো কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। সুন্দরবনের প্রাণি বৈচিত্র্য বিপন্ন হতে চলেছে এর প্রভাবে। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য তা দারুন দুসংবাদ বৈকি! উপকূল অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির অবদান তুলনামূলকভাবে নি¤œমুখি। উপকূলীয় এলাকার কৃষি প্রধানত শস্য ও অনন্য (নন ক্রপ) এ দুভাগে বিভক্ত। প্রথমত বার বার প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত হওয়ার কারণে খাদ্যশষ্য উৎপাদন তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়নি। একটি পরিশীলিত সমীক্ষা গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যবর্তী মাত্র ১৩ বছরে জাতীয় পর্যায়ে যেখানে দ্বিগুণ পরিমাণ শস্য (খাদ্য অর্থকরী ফসল) উৎপাদিত হয়েছে। সেখানে উপকূলীয় এলাকায় শস্য উৎপাদন বাড়েনি বরং কমেছে। ফারাক্কার বিরূপ উজান থেকে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে চাষাবাদ যোগ্য জমি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলে ও চাষাবাদ প্রক্রিয়ায় নানান পরীক্ষা চালিয়ে কাক্সিক্ষত ফল ততটা আসেনি। দেশের অন্যতম দুটি সামুদ্রিক বন্দর, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বর্গভূমি সুন্দরবন এবং পর্যটনসমৃদ্ধ কক্সবাজারকে কার্যকর অবস্থায় পাওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য যে কতটা জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাম্প্রতিকালে সিডর আইলায় সুন্দরবন এবং অনন্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষ অন্যান্য প্রাণির সম্পদের ওপর দুর্বিষহ ও নেতিবাচক প্রভাব প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। তাতে উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ দেখা দিয়েছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রতিত্রিয়ায় সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে। চোরা শিকারি হাতে বিশ্বের এ বিরল প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রতিনিয়ত হত্যা করা হচ্ছে। সুন্দরবনের গন্ডার বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগে। শুকর কুমির কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। অজগর হাঙ্গর বন মোরগ বহু রকমের পাখি মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উজাড় হচ্ছে বন। আগের মত বড় বড়গাছ পালা এখন আর দেখা যায়না। সাগরেরর উচ্চতা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে লবণাক্ততা। ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় লবণাক্ত পানি বৃৃৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ গাছ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এ দিকে সুন্দববন সংলগ্ন বহুনদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মাইকেল মধুসুদনের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদ ভরে আগা নদী একেবারে মরে গেছে। ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মাঝে মাঝে সাতক্ষীরা সংলগ্ন পাটকেল ঘাটায় এ নদী খননের কাজ করা হয়। কোনোভাবে নদীটি রক্ষা করা সম্ভব হলো না। এ নদীতে সব ধরনের নৌযান চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এ দিকে জোয়ারের পানি উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সুন্দরবনের গাছপালা মরে যাচ্ছে। এ বনের ভূপৃষ্ঠ থেকে সমুদ্রতল বেশি নিচুতে নয়। জোয়ারের সময় ৪৫ সেন্টিমিটার পানি বাড়লে সুন্দরবন পৃষ্ঠ ৭৫ শতাংশ ডুবে যাচ্ছে। এ বন অভ্যন্তরে বালি খুড়লে মিষ্টি পানির সন্ধান পাওয়া যায়। লবণাক্ত পানির কারণে এখন আর তেমন মিষ্টি পানি পাওয়া যাচ্ছেনা। বিশ্বের বিরল এ বন রক্ষার জন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের ১৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৫ কোটি মানুষ দেশের নদী বেষ্টিত উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে। কিন্তু উপকূলীয় এলাকা এখন অরক্ষিত। বিশেষ করে টেকসই বাঁধ না থাকায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রতি বছর উপকূলীয় বাঁধ ভেঙ্গে নদীর পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালি, কক্সবাজার, ভোলা অন্যতম। প্রায় ডজন খানেক জেলার ভৌগলিক অবস্থান উপকূলীয় এলাকায়। এসব উপকূলীয় এলাকা জেলে, কৃষক, বাওয়ালী কামার, কুমারসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোক বসবাস করে। জাতীয় অর্থনীতিতে উপকূলীয় অধিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বিশেষ করে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে দেশের মৎস্য সম্পদের দুইয়ের তৃতীয়াংশ চাহিদা পূরণ করে উপকূলীয় জেলেরা। সাগরসহ স্থানীয় নদ নদী থেকে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বেদেশিক মুদ্রা অর্জন করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। বিশেষ করে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশ কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এ পেশার সাথে উপকূলীয় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত। মৎস সম্পদ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন প্রজাতির ফসল উৎপাদন হয়। যা দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু উপকূলীয় বাঁধগুলো এত জরাজীর্ণ যে এসব এলাকার কোটি কোটি মানুষ চরম আতংক উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। শুধু সাতক্ষীরা, খুলনা উপকূলীয় এলাকায় সাড়ে ৮শত কিলোমিটার ওয়াপদা বাঁধ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। যে কোনো মুহূর্তে এসব বাঁধ ভেঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে। জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। ১৯৬৯ সালে বঙ্গোসাগরের তরঙ্গমালা হতে রক্ষা করার জন্য মূলত এসব বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এ সব বাঁধের স্থায়িত্ব ধরা হয় বিশ বছর। কিন্তু ৪০ বছর উত্তীর্ন হয়ে যাওয়ার পর ও যথাযথ ভাবে এসব বাঁধ সংস্কার করা হয়নি। ফলে বিশাল বিস্তৃত এলাকা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। ১৯৮৮ সালের ২৯ নবেম্বর হারিকেন ঝড়, ২০০৭ সালের ১৫ নবেম্বর সিডর, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় উপকূলীয় এলাকা ল- ভ- হয়ে যায়। প্রায় ৩ শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে, হাজার হাজার বসত বাড়ি নদীর সাথে বিলীন হয়ে যায়। এর পর থেকে উপকূলীয় বাঁধ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। এসব বাঁধগুলো সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। এ দিকে বঙ্গোপসাগরে চরপাড়ায় জোয়ারের পানিতে উচ্চতা আগের তুলনায় অনেকে বেড়েছে। আগেকার দিনে ৫/৬ ফুট উঁচু রাস্তা দিয়ে জোয়ারের পানি থেকে লোকালয় রক্ষা করা যেত। তবে উপকূলীয় অধিবাসীদের আগলে রেখেছে সুন্দরবন। মংলা বন্দরের চলাচলকারী নৌযানের পোড়া তেল মবিলের কালো কালো দাগ সুন্দরবনের গাছপালার দিকে তাকালে নজরে পড়ে। সুন্দরবনের ভীতরের জাহাজসহ নানা রকম নৌযানের মেশিনের শব্দ রাতের বেলা সেগুলোর আলো এবং এর সার্জলাইট বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক পরিবেশ কে বিঘ্ন ঘটায় সিমেন্ট কারখানা সহ বড় ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে মংলায়। সেগুলো পরিবেশ দুষণ ঘটিয়ে চলেছে নীরবে। মোট কথা গোটা পরিবেশটা হুমকির মুখে পড়েছে। এ গেল বন্দরের স্বাভাবিক অবস্থার কথা, দুর্ঘটনার বিষয়টি আমলে নেয়া হয়নি। বনের ভেতর চলাচলকারী রাসায়নিকবাহী জাহাজ বা বন্দরের আশপাশ এলাকার কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটলে তা বনের জন্য কতটা বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে সে হিসাব কারো জানা নেই। ২০০ বা ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ চাঁদ সওদাগর এই এলাকায় একটি নগর গড়ে তোলেন। বাগমারা ফরেষ্ট অফিসে তার সন্ধান মিলেছে। সুন্দরবনের জরিপটি হয় মহামতি আকবরের সময়ে চৌতক মলের নেতৃত্বে। মনে রাখা দরকার যে, সুন্দরবনের বিশাল গভীর নদ-নদী আকীর্ণ জঙ্গলে জরিপ সে আমলে প্রায় অসম্ভব ছিল। অবশ্য সম্রাট আকবর নিজেই এ বন দেখতে এসেছিলেন। এর রূপ তাকে মুগ্ধ করেছিল। নবাব সিরাজুদ্দৌলা পরাজয়ের পর নবাবের আসনে আসীন হয়ে মীর জাফর বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিস্তীর্ণ এলাকা দিয়ে ছিলেন। তার ভেতর সুন্দরবনের একটি বড় অংশ ছিল। সুন্দরবনের অফুরন্ত সম্পদ কোম্পানিদের বড় কর্তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এই কোম্পানির পক্ষ থেকে ১৮১১ সালে শুরু হয় এ বনের জরিপ। কোম্পানির আমলে সুন্দরবনের জমি কৃষকদের মঝে বিলি বন্টন করে এই বন সাফ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সে থেকে সুন্দরবনে অস্তিত্ব সংকট শুরু হয়। গোট সুন্দরবন এখন বন্য দস্যুদের কবলে। বনের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ পেশাজীবি জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। জেলে বাওয়ালী, মৌয়ালী তাদের কাছ থেকে মাসোয়ারা ভিত্তিক টাকা আদায় করা হচ্ছে। নিয়মিত চাঁদা না দিলে র্নিবিঘ্নে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। এদের হাতে একযুগে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রশাসন নির্বিকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ