ঢাকা, সোমবার 28 January 2019, ১৫ মাঘ ১৪২৫, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ইয়াবার ‘গজব’ এবং টেকনাফের দোয়া মাহফিল

আশিকুল হামিদ : পাঠকদের অনেকে বিস্মিত হতে পারেন, কিন্তু আজকের নিবন্ধ শুরু করা হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি ‘সুখবর’ জানিয়ে। আগে থেকে বলে এলেও ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করার পর দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে নতুন পর্যায়ে প্রচারণায় নেমেছেন শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে গত  ২০ জানুয়ারি। সেদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি দেশকে শুধু মাদকমুক্ত করার নির্দেশ দেননি, একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের মধ্যে যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায় তাদের ব্যাপারে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, নেশার ভয়ংকর জগৎ থেকে ফিরে আসতে আগ্রহীদের সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে। তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির ব্যাপারেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, মাদক যারা আনে এবং মাদক যারা বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবেই দেশ থেকে পর্যায়ক্রমে মাদক নির্মূল করা সম্ভব বলে মত প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য ‘সুখবর’টি হলো, তিনি বক্তব্য রাখার পর মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় ২৭ জানুয়ারি শনিবার টেকনাফ পৌরসভার উপজেলা আদর্শ কমপ্লেক্স মাঠে এক অভূতপূর্ব দোয়া মাহফিল ও শুকরিয়া সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘অভূতপূর্ব’ বলার কারণ, এর উপলক্ষ ছিল উখিয়া ও টেকনাফের ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’। অর্থাৎ ওই আসনের নির্বাচন ‘সুষ্ঠু’ হওয়ার কারণেই শুকরিয়া সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রধান উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেছেন এমন একজন- সারাদেশে যার ‘সম্রাট’ হিসেবে ‘সুখ্যাতি’ রয়েছে এবং যিনি উখিয়া ও টেকনাফ আসনের সদ্য সাবেক এমপি হিসেবেও সুপরিচিত। সেদিনই একাধিক গণমাধ্যমের অনলাইনের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত বছর ২০১৭ সালের শেষদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭৩ জন শীর্ষ ইয়াবা কারবারীর হালনাগাদ যে তালিকা প্রকাশ করেছিল সে তালিকায় এক নম্বরে ছিল এই ‘সম্রাট’-এর নাম। তখনও তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। ওই তালিকায় টেকনাফের আরো ২২ জন ‘নির্বাচিত’ জনপ্রতিনিধির নাম রয়েছে। তাদের কয়েকজনকেও শনিবারের শুকরিয়া সভার মঞ্চে দেখা গেছে। বলা হয়েছে, টেকনাফ পৌরসভার চেয়ারম্যান নাকি ওই ‘সম্রাট’-এর চাচা। আর দোয়া মাহফিলে সভাপতিত্ব করেছেন টেকনাফ আল-জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার প্রধান পরিচালক মাওলানা মুফতি কেফায়েত উল্লাহ শফিক।
এসব কারণে শুধু নয়, অনলাইনের রিপোর্টটি আলোড়ন তুলেছে মাহফিলে দেয়া ওই ‘সম্রাট’-এর বক্তৃতার কারণেও। ইয়াবা যে অত্যন্ত ভয়ংকর এক মাদক এবং এই নেশার জন্য টেকনাফের মানুষকে যে সারাদেশে দুর্নামের শিকার ও নাজেহাল হতে হয়- সে কথাটাও ‘সম্রাট’ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ইয়াবার ছোবলে কেউ স্বামী, কেউ পিতা, কেউ সন্তান আবার কেউ বা তার ভাইকে হারিয়েছেন। নিজের সদিচ্ছা এবং দুর্বলতা প্রসঙ্গে ‘সম্রাট’ বলেছেন, টেকনাফকে ইয়াবামুক্ত করা তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য সকল স্তরের মানুষকে ‘এক কাতারে’ আসতে হবে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, প্রশাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করুন। অন্যথায় তাদের সার্বিকভাবে বর্জন করা হবে। ‘সম্রাট’ আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ইয়াবা কারবারীদের কোনো টাকা মসজিদ-মাদরাসাসহ ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কাজে গ্রহণ না করা হয়। সবশেষে আবেগে আপ্লুত হয়ে ‘সম্রাট’ বলেছেন, টেকনাফকে ইয়াবামুক্ত করে কলংকের দাগ মুছতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেয়া মাদক নির্মূলের কর্মসূচিকে সফল করতে হবে।
‘সম্রাট’-এর এই আহ্বানই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য ‘সুখবর’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এমন প্রতিক্রিয়াই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, বহু বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল এবং ইয়াবাসহ নেশার বিভিন্ন সামগ্রীর আশংকাজনক বিস্তার ঘটে চলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লেও নেশা এবং মাদক সামগ্রীর বিক্রি প্রতিরোধ ও বন্ধ করার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এখনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না বললেই চলে। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই বিক্রির পাশাপাশি মাদক আমদানির পরিমাণও কেবল বেড়েই চলেছে। ভীতি ও উদ্বেগের কারণ হলো, নেশার সামগ্রীর আমদানি যেমন চোরাচালানের অবৈধ পন্থায় করা হচ্ছে, তেমনি বিক্রি করার ক্ষেত্রেও আইনের সামান্য তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
এ সংক্রান্ত রিপোর্ট নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে গণমাধ্যমে। টেলিভিশনেও প্রচারিত হচ্ছে সচিত্র রিপোর্ট। এসব রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, দেশের খুব কমসংখ্যক বার ও দোকানেরই আইনসম্মত লাইসেন্স তথা আমদানি ও বিক্রির বৈধ অনুমতি রয়েছে। এদিক থেকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে রাজধানী ঢাকার নানা বাহারী নামের বার ও হোটেলগুলো। আইন অনুযায়ী বিদেশি নাগরিক ও দেশের লাইসেন্সধারী বক্তিদের কাছেই কেবল মদ, বিয়ার ও হুইস্কি ধরনের তরল পানীয় বিক্রি করা যায়। এজন্য সরকারের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি ও লাইসেন্স নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু শুল্ক ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দু’-তিন বছরের বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানোর সময় খুব কমসংখ্যক প্রতিষ্ঠানই বৈধ লাইসেন্স ও কাগজপত্র দেখাতে পেরেছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং ব্যবসার ধরনও চমকে ওঠার মতো। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হিসাবে সরকার প্রদত্ত বৈধ লাইসেন্স অনুযায়ী রাজধানীতে যেখানে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি বৈধ মদের বার এবং ১০৫টি ‘সিসা’ বার বা ‘সিসা লাউঞ্জ’ থাকার কথা, সেখানে হাজারেরও অনেক বেশি হোটেল ও বারে প্রকাশ্যে মদের বেচাকেনা চালানো হচ্ছে। এসব স্থানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মদ ও নেশার অন্যান্য পানীয় বিক্রি করা হচ্ছে। উদ্বেগের কারণ হলো, শুধু মদ বা নেশার তরল পানীয় নয়, এসব হোটেল ও বারে ইয়াবা থেকে শুরু করে গাঁজা, ভাঙ এবং ‘সিসা’ পর্যন্ত বহু ধরনের নেশার সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। এসবের মধ্যে ‘সিসা’ একটি নতুন  নেশার সামগ্রী, যাকে এখনো সরকার নিষিদ্ধ করেনি। অন্যদিকে ভয়ংকর এ নেশার সামগ্রীটি ইয়াবার মতোই বিশেষ করে তরুণদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সরকার এখনো যেহেতু আইনত নিষিদ্ধ করেনি সে কারণে এর বিক্রির ব্যাপারেও সকল বার ও হোটেল মালিকদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তরুণরাও ঝাঁপিয়ে পড়ছে ‘সিসা’র জন্য। বিভিন্ন সময়ে কোনো কোনো হোটেল ও রিসোর্ট থেকে ২০/৩০ কেজি পর্যন্ত ‘সিসা’ আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। ওদিকে সস্তা ও রঙিন ইয়াবা তো রয়েছেই।
এভাবে সব মিলিয়েই নেশার সামগ্রী ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। ঘটনাক্রমে কখনো কখনো কিছু বার ও হোটেলের নাম প্রকাশিত হয়ে পড়লেও এবং এসব ব্যবসার পেছনে কোনো কোনো জুয়েলারি ব্যবসার মালিক পক্ষের নাম জড়িয়ে গেলেও বাস্তবে মাদকের প্রতিরোধে কোনো পদক্ষেপই নেয়া হচ্ছে না। ভীতি ও আশংকার কারণ হলো, সরকারের এই অনিচ্ছা বা উদাসিনতার সুযোগে ইয়াবা ও সিসাসহ ভয়ংকর ধরনের সব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানী ও জেলা শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত। শুধু তা-ই নয়, এসবের মারণ নেশার ছোবলে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে নানা বয়সের বাংলাদেশিরা। বলা যায়, গোটা জাতির জন্যই নেশার সামগ্রীগুলো ভয়াবহ সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিকশা চালক থেকে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা পর্যন্ত সবাই এরই মধ্যে নেশার কবলে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। তারাও ছেলেদের মতোই নেশা করছে। এসবের দাম যেহেতু সাধারণের নাগালের অনেক বাইরে সেহেতু টাকা যোগানোর জন্য নেশাখোররা চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধের পথেও পা বাড়িয়েছে। অনেকে এমনকি নিজেদেরই বাবা-মায়ের অর্থ ও সোনা-গহনা চুরি করছে নেশার সামগ্রী কেনার জন্য। তাদের কেউ কেউ বাবা-মাকে পর্যন্ত হত্যা করছে। বলা যায়, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের পুরো সমাজেই পচন ধরেছে। এখনই যদি প্রতিহত না করা যায় তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে বর্তমান প্রজন্ম। আগামী প্রজন্মও তাদের অনুসরণ করবে। ফলে দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কোনো ক্ষেত্রেই তারা সামান্য অবদান রাখতে পারবে না। তেমন মেধা ও যোগ্যতাই থাকবে না তাদের।
একই কারণে ইয়াবা ও সিসাসহ মাদক সামগ্রীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে দরকার সর্বাত্মক অভিযান চালানো। এসবের চোরাচালান প্রতিহত করতে হবে যে কোনো পন্থায়। চাল-ডাল ধরনের পণ্যের মতো যেখানে-সেখানে নেশার সামগ্রী যাতে বিক্রি করা সম্ভব না হয় এবং ছাত্রছাত্রীসহ নেশাখোররারা যাতে সহজে এগুলো কিনতে না পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে সুচিন্তিতভাবে। নেশার ক্ষতি সম্পর্কে শিক্ষামূলক প্রচারণা চালাতে হবে গণমাধ্যমে। ভারতের পাশাপাশি বিশেষ করে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবেÑ সে দেশের সরকার যাতে ইয়াবা এবং অন্য কোনো নেশার সামগ্রী উৎপাদনকে প্রশ্রয় না দিয়ে বরং নিষিদ্ধ করে। বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তের অপর প্রান্তে স্থাপিত ইয়াবার সকল কারখানা অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাতে হবে। বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র‌্যাব ও পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও তৎপর করে তোলা দরকার, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে যাতে কোনো নেশার সামগ্রী ঢুকতে না পারে। একই ব্যবস্থা নিতে হবে ভারতীয় সীমান্তেও। কারণ, ভারত থেকেও ফেন্সিডিল ধরনের নেশার বিভিন্ন সামগ্রী বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আসে ইয়াবার চালানও। সুতরাং মিয়ানমারের পাশাপাশি ভারতের ব্যাপারেও সতর্ক নজর রাখতে হবে।
এমন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানের পাশাপাশি টেকনাফের দোয়া মাহফিলের বক্তব্যও সমাজের সচেতন সকল মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। অনেকের মনে আশাবাদেরও সৃষ্টি হয়েছে। দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, চিহ্নিত ওই ‘সম্রাট’ যদি প্রধানমন্ত্রীকে তোয়াজ করার উদ্দেশ্য থেকে সস্তা ‘পলিটিক্স’ না করে থাকেন তাহলে সরকার তাকেও ইয়াবাসহ মাদক বিরোধী অভিযানে ব্যবহার করতে পারে। বর্তমান পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি দরকার নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে অবৈধভাবে মদ এবং ইয়াবাসহ সকল ধরনের নেশার সামগ্রী বিক্রি বন্ধ ও প্রতিহত করার পদক্ষেপ নেয়া। চিকিৎসার মাধ্যমে মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করতে হবে। সব মিলিয়ে এমন আয়োজন নিশ্চিত করা দরকার, তরুণ প্রজন্মসহ বাংলাদেশের জনগণ যাতে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে আর ক্ষতবিক্ষত না হয়। পুরো সমাজেই যাতে পচন না ধরতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ