ঢাকা, বুধবার 30 January 2019, ১৭ মাঘ ১৪২৫, ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শীতে দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি

আখতার হামিদ খান :

সমগ্র বিশ্বে বাসরত প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির মধ্যে ১৮৫৫ প্রজাতির পাখি পরিযায়ী বা যাযাবর স্বভাবের। অর্থাৎ শতকরা ১৯ প্রজাতির পাখি সমগ্র বিশ্বের কোথাও না কোথাও পরিযায়ন করে। তন্মধ্যে প্রায় ২৩০ প্রজাতির পাখি পরিযায়ন করে আসে বাংলাদেশে। দেশি এবং পরিযায়ী মিলিয়ে বাংলাদেশে বিচরণ করে প্রায় ৬০০ প্রজাতির পাখি (বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ২য় খ-)। এ তথ্য নিয়ে যৎসামান্য বিতর্কও রয়েছে যেমন : বিজ্ঞানী ডব্লিউজি হারভে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সালে ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রতিনিধি থাকাকালীন তার নিজের দেখা বাংলাদেশের পাখির প্রজাতির সংখ্যা লিপিবদ্ধ করেছেন ৬৬০টি। অপরদিকে অধ্যাপক কাজী জাকের হোসেন তার লেখা 'বার্ডস অব বাংলাদেশ' গ্রন্থে লিখেছেন যে,বাংলাদেশে ৫২০ প্রজাতির পাখির দেখা মিলে। প্রাণিবিজ্ঞানী ড. রেজা খান 'বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী' (২য় খণ্ডে) নামক গ্রন্থে লিখেছেন এ দেশের পাখির প্রজাতির সংখ্যা ৬০০টি। 'বাংলাদেশের পাখপাখালি' গ্রন্থে বন্যপ্রাণী গবেষক সাজাহান সরদার লিখেছেন দেশে মোট পাখির প্রজাতির সংখ্যা ৬৫০টি। অন্যদিকে 'বার্ড লাইফ ইন্টারন্যাশনাল'-এর তালিকা মোতাবেক বাংলাদেশে পাখির প্রজাতির সংখ্যা ৭০০-৭৩০টি।

পাখির প্রজাতির সংখ্যা নিরূপণে বিশাল হেরফের লক্ষ করে ড. রেজা খান আরও বলেছেন, আমাদের দেশে পাখিবিষয়ক গবেষণা এখনো আঁতুড় ঘরে। সেই সূত্র ধরে বলতে হয় বাংলাদেশে বিচরণরত পরিযায়ী পাখির সংখ্যা নিয়েও খানিকটা বিতর্ক রয়েছে। উল্লেখ্য কারও কারও মতে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা তিন শতাধিক, বাকিরা আমাদের দেশীয় প্রজাতির পাখি। দেশীয় পাখির মধ্যে আবার কিছু প্রজাতি রয়েছে যারা 'স্থানীয় যাযাবর' পাখি হিসাবে পরিচিত। এ পাখিরা দেশের বাইরে কোথাও যায় না। এরা দেশের ভেতরেই স্থানীয়ভাবে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়।

সাধারণত আমাদের দেশে পরিযায়ী পাখিরা আসে পূর্ব ইউরোপ, সাইবেরিয়া এবং হিমালয়াঞ্চল থেকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এদের অধিকাংশই আমাদের দেশে বেড়াতে এসে ডিম-বাচ্চা না ফুটিয়ে প্রজননকালীন চলে যায় নিজ বাসভূমিতে। আমরা লক্ষ্য করছি বেশ ক'প্রজাতির পাখিকেই এ দেশে মাসছয়েকেরও বেশি সময় কাটিয়ে দিতে। সে মতে পাখিপ্রেমিদের ধারণা এরা দেশীয় প্রজাতির পাখি। তাদের সেই ধারণাটি বিন্দুমাত্রও সঠিক নয়, কারণ হচ্ছে এ প্রজাতির পাখিরা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নয়। এ জন্যই মূলত এদের আমরা অতিথি পাখি নামে ডাকি। এখানেও আমরা একটু ভুল করি অবশ্য। সেটি হচ্ছে এরা অতিথি পাখি নয়, এরা হচ্ছে পরিযায়ী বা যাযাবর পাখি। কারণ নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির পাখি প্রতিবছর পরিযায়নে অংশগ্রহণ করে বিধায় ওদের নামকরণ হয় পরিযায়ী পাখি। এরা প্রতি বছরই কোনো না দেশে পরিযায়ন করে। ফলে এরা অতিথি পাখি হতে পারে না, সেই সংজ্ঞাটা ভিন্ন। আরেকটি তথ্য হচ্ছে, আমাদের ধারণা পরিযায়ী পাখিরা শুধু শীতেই বাংলাদেশে আসে, সেটিও সঠিক নয়। অনেক প্রজাতির পাখি আছে যারা গ্রীষ্মে কিংবা অন্যান্য মৌসুমেও এ দেশে চলে আসে।

পরিযায়ী পাখিরা উত্তর গোলার্ধে শীত শুরুর আগেই বিষুবরেখার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। অনেক পরিশ্রান্ত হয়ে অবশেষে ওরা এতদাঞ্চলে এসে পৌঁছায়। বিষুবরেখা অঞ্চলে শীত না থাকাতে ওরা উত্তর থেকে দক্ষিণে অপেক্ষাকৃত কম শীতাঞ্চলে আশ্রয় নেয়। আবার শীতের প্রকোপ কমে এলে অর্থাৎ বসন্ত শুরুর আগ মুহূর্তে নিজ দেশে ফিরে যায়। অনেকের ধারণা নিজ বাসভূমিতে শীতের প্রকোপ বেড়ে গেলে পরিযায়ী পাখিরা অপেক্ষাকৃত গ্রীষ্মাঞ্চলে আশ্রয় নেয়। আসলে এ ধারণাটিও তাদের সঠিক নয়। কেননা পাখিদের শরীরে বইছে উষ্ণরক্ত, গায়ের রেশমি পালক দিয়ে ওরা অনায়াসে শীত ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম। শারীরিকভাবে উত্তাপ অর্জন করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ওরা পরিযায়ী হচ্ছে শুধু খাদ্য সংকটের কারণে। উত্তর গোলার্ধে প্রচ- শীত নেমে এলে পোকামাকড় কিংবা শস্যবীজ বরফাচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। তখন পাখিদের খাদ্য সমস্যা প্রকটভাবে দেখা দেওয়ার ফলে এরা উত্তরণের পথ হিসেবে বেছে নেয় পরিযায়ী হতে। পাখি গবেষকদের ধারণা এর পেছনে আরও কিছু গভীর রহস্য রয়েছে। যে রহস্যটা আজও উদ্ঘাটন করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। সেই গভীর রহস্যটি উদ্ঘাটন করতে না পারলেও পাখিদের ওড়ার গতি রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছেন প্রাণী বিজ্ঞানীরা। বিস্ময়কর সেই গতি এবং ওদের শেষ পরিণতি নিয়ে নিম্নে আলোকপাত করা হচ্ছে। সূত্রমতে জানা যায়, সব ধরনের পরিযায়ী পাখিই রাত-দিন মিলিয়ে একটানা ছয় থেকে ১১ ঘণ্টা উড়তে সক্ষম। যা সম্ভব নয় যান্ত্রিকযান উড়োজাহাজের পক্ষেও। একটা উড়োজাহাজকে ১১ ঘণ্টা হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে হলে কমচেয়ে কম দেড়-দুই ঘণ্টার বিরতি নিতে হয়। অথচ প্রকৃতির এসব সন্তান কোনো রকম বিরতি ছাড়াই অনায়াসে ওই সময়টা পাড়ি দিতে সক্ষম হচ্ছে। দেখা যায়, শুধু হাঁস গোত্রের পাখিরাই ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। সারসদের ক্ষেত্রে দেখা যায় আবার ভিন্নচিত্র, ওরা একটানা ছয় ঘণ্টা উড়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। অপরদিকে প্লোভার গোত্রের পাখিরা একটানা উড়তে পারে ১১ ঘণ্টা। তাতে ওরা পাড়ি দিতে পারে ৮৮০ কিলোমিটার। আরও বিচিত্র তথ্য হচ্ছে, আলাস্কা অঞ্চলে 'প্যাসিফিক গোল্ডেন প্লোভার' নামক এক প্রজাতির (বাংলায় নাম সোনাবাটান) পাখির বাস রয়েছে। এসব পাখি প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে হাওয়াই দ্বীপে শীত কাটাতে আসে। দেখা গেছে, ওরা কোনো রকম বিরতি না দিয়েই একটানা চার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছে। প্লোভারদের চেয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে রয়েছে 'স্নাইপ' প্রজাতির পাখি (বাংলায় নাম কাদাখোঁচা)।

জানা গেছে, কাদাখোঁচারা প্রচণ্ড শীত থেকে রক্ষা পেতে জাপান ছেড়ে পূর্ব অস্ট্রেলিয়া ও তাসমানিয়া পর্যন্ত আশ্রয় নেয়। এ ক্ষেত্রে ওদের সমুদ্র পাড়ি দিতে হয় পাঁচ হাজার কিলোমিটার। তাও পথটি পাড়ি দিতে ওরা কোনো রকম বিরতি নেয় না। বিষয়টা আশ্চর্যই বটে! সমুদ্রের মাঝপথে কোথাও বিরতি নেওয়ার সুযোগ নেই এদের। কেননা কাদাখোঁচা গোত্রের পাখিরা জলচর হলেও সমুদ্র কিংবা নদীর জলে ভাসার অভ্যাস নেই, এরা জলার ধারে বিচরণ করে, জলাশয়ে নয়। শুধু যে উত্তর গোলার্ধের বা সাইবেরিয়া অঞ্চলের পাখিরা পরিযায়ী হয়, তা কিন্তু নয়। ভারতবর্ষের পাখিরাও পরিযায়ী হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে এক ধরনের কাঠঠোকরা পাখি দেখা যায়। ওরা ডিম পাড়ে হিমালয়াঞ্চলে গিয়ে। কিন্তু শীত কাটাতে আসে বাংলাদেশের নীলগিরিসহ দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন পাহাড়ে। জানা যায়, এসব কাঠঠোকরা পাখি একটানা উড়তে পারে ২৫০০ কিলোমিটার পথ। মাঝপথে এরাও কোনো বিরতি নেয় না।

আমাদের দেশীয় পাখিরাও পরিযায়ী হয়ে দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আশ্রয় নেয়। এরা মূলত পরিযায়ী পাখির তালিকায় না পড়লেও আমরা ওদের 'স্থানীয় যাযাবর পাখি' বলতে পারি। পরিযায়ী পাখিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও রয়েছে আমাদের দেশের মানুষের। প্রধান অভিযোগটি হচ্ছে, ওরা নাকি আমাদের ফল-ফলাদি কিংবা শস্য-বীজ খেয়ে ফেলে। অভিযোগটি একবারেই মিথ্যা নয়। ওরা মানুষের ফসলাদি নষ্ট করছে ঠিকই কিন্তু সেই ক্ষতিটি আমাদের জন্য 'শাপে বর' হয়ে দাঁড়ায় বেশির ভাগ সময়। যেমন পাখি আমাদের ফল খেয়ে ফেলেছে সত্যি, কিন্তু ফলের বিচিটা মলত্যাগের মাধ্যমে মাটিতে ফেলে দিতে বাধ্য হয় এক সময়। এতে করে দুর্গম এলাকায় বা নবদ্বীপে বনায়ন সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। আবার কিছু কিছু ফল রয়েছে যেগুলোর বিচি পাখির পরিপাকতন্ত্রে ঘূর্ণিপাক না খেয়ে বেরুলে অঙ্কুরোদগম হয় না (বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতেই প্রমাণিত)। সুতরাং সে ফলের বংশবিস্তার ঘটাতে হলে পাখ-পাখালির সরব উপস্থিতি একান্ত কাম্য। হাওরাঞ্চলের মানুষের আরেকটি বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে, পরিযায়ী পাখিরা তাদের ফসলাদি খেয়ে বিনষ্ট করছে ব্যাপকভাবে। এ অভিযোগটি আমলে নেওয়ার মতো হলেও সেখানে একটি দারুণ পজিটিভ দিক রয়েছে।

সেটি হচ্ছে পরিযায়ী পাখিরা হাওরের জলে ভেসে ভেসে ফসল সাবাড় করলেও ওরা প্রতিদিন গড়ে ওখানেই একটন বিষ্ঠা ত্যাগ করছে। যার ফলে যে কোনো ধরনের ফসলের গাছ-গাছালির জৈবসারের চাহিদা পূরণ হয়ে যাচ্ছে, অপরদিকে মাছগুলো পাচ্ছে ওদের উপযুক্ত খাবার। ফলে ফসলের গাছ যেমনি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি মাছেরও ওজন বাড়ছে দ্রুত।

এতসব উপকার করেও পাখিরা মানুষের হিংস্র থাবা থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি, পারেনি বন্ধু হতেও। বরং পরিযায়ী পাখিসহ অন্যান্য পাখিরা শিকারির কবলে পড়ে দেদার প্রাণ হারাচ্ছে। পাখির খাবারে বিষ মাখিয়ে কিংবা বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে শিকারিরা ওদের মরণ নিশ্চিত করছে। এসব করা হচ্ছে শুধু রসনা বিলাসের জন্য। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, প্রকাশ্যেই শিকারিরা এ ঘটনা ঘটাচ্ছে। শিকারিদের তাণ্ডব দেখে মনে হচ্ছে, এসব তদারকির কেউ দেশে নেই।

এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনার ফলে আজ দেশ থেকে অনেক প্রজাতির পাখি হারিয়ে গেছে। খাদ্যের সন্ধানে এসে নিজেরাই খাদ্যে পরিণত হওয়ায় অনেক প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এ দেশে আশ্রয় নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, অতীতে শিকারিদের কালো থাবায় পড়ে এ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে ফ্লোরিকান ময়ূর, গোলাপি মাথা হাঁস। আর হাল আমলের শিকারিদের দুষ্টচক্রে পড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে বাদিহাঁস, বালিহাঁস, দিগহাঁস, কালো তিতির, গগনবেড়, বাংলা শকুনসহ অনেক প্রজাতির পাখি। উল্লিখিত দৃষ্টান্ত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে অপারগ হলে দেশ থেকে আরও অনেক প্রজাতির পাখ-পাখালি হারিয়ে যাবে এবং সেটার জের ধরেই পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে যাবে এক সময়। তাই সময় থাকতে বন্যপ্রাণীদের প্রতি আমাদের সদয় হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ