ঢাকা, শুক্রবার 01 February 2019, ১৯ মাঘ ১৪২৫, ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নদী দখল ও উচ্ছেদ নিয়ে ‘কানামাছি  খেলা’ বন্ধ করতে হবে - হাইকোর্ট

 

স্টাফ রিপোর্টার: নদী দখল ও উচ্ছেদ নিয়ে ‘কানামাছি খেলা’ হচ্ছে মন্তব্য করে হাই কোর্ট বলেছে এ খেলা বন্ধ হওয়া উচিৎ।

তুরাগ নদীর অবৈধ স্থাপনা দখলমুক্ত করার নির্দেশনা চেয়ে করা একটি রিট মামলার রায় ঘোষণার মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাই কোর্ট বেঞ্চ থেকে এমন পর্যবেক্ষণ আসে।

আগের দিন এ মামলার রায় ঘোষণা শুরু করে এই আদালত অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা করতে তুরাগ নদীকে ‘লিগ্যাল পারসন’ ঘোষণা করে।

জীবন্ত সত্তা হিসেবে মানুষ যেমন সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে, আদালতের এই আদেশের মধ্যে দিয়ে নদীর ক্ষেত্রেও তেমন কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হবে বলে রিটকারীর আইনজীবীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।

কথা ছিল, গতকাল বৃহস্পতিবার নদী রক্ষার বিষয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা’ দিয়ে অবশিষ্ট রায় ঘোষণা করবে আদালত। কিন্তু জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন বা বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সেই রায়ের নির্দেশনা যেন সাংঘর্ষিক বা পরস্পরবিরোধী না হয়, সে জন্য বাকি রায় রোববার ঘোষণা করা হবে বলে বেঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার এ মামলার কার্যক্রম শুরুর পর বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক রিটকারী পক্ষের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, নদী রক্ষায় সরকার যে একটি কমিশন করেছে, একটি আইন করেছে, সেই তথ্য তিনি আদালতে কেন দেননি। ২০০৯ সালে চার নদী রক্ষায় হাই কোর্টের রায়ের আলোকে সরকার একটি নদী রক্ষা জাতীয় কমিশন করেছে। এ বিষয়ে আইনও হয়েছে। কমিশন কাজও করছে। বিচারপতি খায়রুল হক সাহেব যে সাজেশন দিয়েছেন, সরকার কাজ শুরু করেছে। যেখানে পারছেন না, সেখান থেকে আমরা শুরু করতে চাই।

রিটকারীপক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ তখন বলেন, কমিশন নদী সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি করবে এবং সে আলোকে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু নদী রক্ষা কমিশন ‘ সেভাবে কার্যকর না’। তারা সুপারিশ ছাড়া আর কিছু করতে পারে না।

বিচারপতি আশরাফুল কামাল তখন বলেন, নদী দখল করা হচ্ছে, আমরা নির্দেশ দিচ্ছি অবৈধ স্থাপনা ভাঙছে। কয়েকদিন নিরিবিলি থাকার পর আবার দখল শুরু হয়। এই কানামাছি খেলা বন্ধ হওয়া উচিৎ।

আইনজীবীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনার রিটের আলোকে একটি ল্যান্ডমার্ক রায় হতে যাচ্ছে। এই সমস্যার মাধান হওয়া উচিৎ। নদীকে দখলমুক্ত করার বিষয়টি যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। নদী থাকবে। আবার নদী দখল করার মনোবৃত্তিসম্পন্ন কিছু লোকেরও অভাব হবে না। কিন্তু এর একটা সুষ্ঠু সমাধান হওয়া উচিৎ। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ।

বিচারক রিটকারীপক্ষের আইনজীবীকে নদী রক্ষা কমিশনের কাজ, এখতিয়ার ও ক্ষমতা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে বলেন। সেসব বিষয় পর্যালোচনা করে রোববার একটি ‘গাইডলাইন’ দেওয়া হবে বলে জানান।

হাই কোর্টে এসব মামলা ‘আসাই উচিৎ না’ মন্তব্য করে এ বিচারক বলেন, বর্তমানে হাই কোর্টে ৫ লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আজকের পর আর যদি কোনো মামলা না নেওয়া হয় এবং আমরা বিচারকরা যদি দিনরাত কাজ করি, তাহলেও এই ৫ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করতে ৩০ বছর লাগবে।

নদী রক্ষা কমিশন ‘সঠিকভাবে’ কাজ করলে অনেক বিষয় আদালতে আসত না এবং এত মামলা জট সৃষ্টি হত না বলে মন্ত্য বরেন বিচারপতি আশরাফুল কামাল।

তিনি বলেন, সাংবাদিকরা অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলে আমরা অনেক অনিয়মের বিষয়ে জানতে পারছি। তবে ইনভেস্টিগেটিভ সাংবাদিকতা তো ওই অর্থে আমাদের দেশে নাই। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি প্রকাশ করেছিলেন দুজন সাংবাদিক, যার কারণে সেদেশের প্রেসিডেন্টকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।

বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এ সময় বলেন, আমাদের এখানেও কিছু কিছু অনুসন্ধানী সাবাদিকতা হয়। তারাই তো সমাজের হুইসেল ব্লোয়ার।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে তুরাগ নদীর অবৈধ দখলদারদের নাম ও স্থাপনার তালিকা হাই কোর্টে দাখিল করেছিল বিচারিক একটি তদন্ত কমিটি। ওই তালিকায় আসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা পরে এ মামলায় পক্ষভুক্ত হন। উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট বুধবার নদী রক্ষায় রায় ঘোষণা শুরু করে।

পরে এ মামলার আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক চার নদী রক্ষায় যে রায় দিয়েছিলেন, সেখানেই কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবৈধ দখল থেকে নদীকে মুক্ত রাখতে কমিশন ব্যর্থ হয়েছে।

“উনার (বিচারপতি খায়রুল হক) জাজমেন্টের স্পিরিটটা ছিল যে, একটি অথরিটির কাছে টোটাল বিষয়টা থাকবে। কিন্তু আইন প্রনেতারা যখন আইন করলেন, সেখানে কমিশনকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করা হল। কমিশন শুধু প্রতিবেদন দিতে পারবে, কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে না।”

আদালতকে উদ্ধৃত করে মনজিল মোরসেদ বলেন, আদালত বলেছেন-আমরা এমন একটি রায় দিতে চাই। যাতে নদী অবৈধ দখলমুক্ত করতে বার বার আদালতে আসতে না হয়, আদালতের উপর যেন বার্ডেন না হয়। তবে এ বিষয়টাও তারা দেখতে চান, যাতে অন্য যেসব নির্দেশনা আছে বা অন্য যে অথরিটি আছে, আদালতের নির্দেশনার সাথে অন্য অথরিটির নির্দেশনা বা ক্ষমতা যেন ওভারল্যাপ না হয়। একটার সাথে আরেকটা যেন সাংঘর্ষিক না হয়। এজন্য একটু সময় নিয়ে তারা আগামী রোববার জাজমেন্টটা দিতে চাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ