ঢাকা, শুক্রবার 01 February 2019, ১৯ মাঘ ১৪২৫, ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আব্দুল মান্নান সৈয়দের সকল প্রশংসা তাঁর

ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান : পুরোপুরি একজন বহুমাত্রিক লেখক, একজন নিরলস নিপুন সত্যসন্ধানী, সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অভিনব পন্থার পথিক; কীর্তিমান সাহিত্যিক-আব্দুল মান্নান সৈয়দ মাত্র বিশ বছর বয়সে ‘জন্মান্ধ কবিতা গুচ্ছ’ প্রকাশ করে আলোড়ন সৃষ্টি করে ছিলেন। পরে-‘জ্যোৎসা রৌদ্রের চিকিৎসা’ ‘মাতাল মানচিত্র’ ‘কবিতা কোম্পানী প্রাইভেট লিমিটেড’ এবং পরাবাস্তব কবিতা প্রকাশ ঘটিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার রাজপুত্তর হিসেবে পরিগণিত হলেন। 

সকল ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম এবং স্বকীয় সুন্দর নব নব পথ পরিক্রমায় অভ্যস্ত মান্নান সৈয়দ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখা তার স্বর্নালী ছোঁয়ায় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে। নিজস্ব শব্দ ও বাক্য ব্যবহারে পারঙ্গম মান্নাম সৈয়দ বাংলা কাব্যের আসরে আর্বিভূত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন। গল্পগ্রন্থ ‘সত্যের মতো বদমাশ’ লিখে বিতর্কের ঝড় সৃষ্টি করেছিলেন এক সময়। ‘রূপসী বাংলা’ খ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশের  উপর অত্যন্ত উঁচু মানের প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘শুদ্ধতম কবি’ লিখে উভয় বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।  রবীন্দ্রনাথের উপর ‘রবীন্দ্রনাথ’ লিখে তার সাহিত্যিক প্রজ্ঞার ব্যাপক প্রকাশ ঘটান। সর্বোপরি চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রে একজন ব্যতিক্রমী প্রজ্ঞাবান সাহিত্যিকের আর্বিভাব ও ব্যাপক পদচারণায় আধুনিক বাংলা সাহিত্য সুসমৃদ্ধ হয়।

সাহিত্যের প্রায় সকল বিভাগে ব্যতিক্রমী ফসল ফলিয়ে যেমন আলোড়ন সৃষ্টি করলেন- অন্যদিকে ‘মাতৃহননের নান্দীপাঠ’ লিখে ও কম হয়রানির শিকার হননি। তার এহেনো ব্যতিক্রম ও অভিনব সাহিত্যিক পদচারনায় এক সময়ে তাকে মনে করা হত- তিনি ধর্মে কর্মে অনিহ,অবিশ্বাসী এবং একদম উদাসীন, পাশ্চাত্যের পরাবাস্তববাদ বা স্যুররিয়ালিজমের একজন অন্যতম প্রবক্তা কবি লেখক- তার কোন আদর্শ চেতনা নেই। ¯্রফে সাহিত্যের জন্য সাহিত্য সাধনা, বিশেষ করে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ নামক গোলক ধাঁধাঁর শিকার হয়ে-এদেশের জনজীবনের মনোবাসনা এবং আদর্শ চেতনা বিরোধী মনোবৃত্তি গ্রহণ করে সাহিত্য চর্চা করছেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ। কিন্তু হঠাৎ করে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার সনেটগুচ্ছ- ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ একদম আরেক ব্যতিক্রমী এবং অভূতপূর্ব সাহিত্যকীর্তি। যা সকল মহলে চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। দীর্ঘ সময়ে যাকে নিয়ে ডানে-বামে কম টানাটানি হয় নি। তিনি কোন্ পথের পথিক, কোন দিকে তার অভিযাত্রা? কি তার আদর্শ চেতনা? তেমন কেউই উদঘাটনে  সক্ষম হননি। কিন্তু যখন ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ প্রকাশিত হলো- তাকে চিনতে আর কেউ ভুল করলেন না। এযে পুরোপুরি মৌলবাদী বলেই মনে হচ্ছে! অথচ তিনি তথাকথিত ‘মৌলবাদকে’ কখনো গ্রহন না করেও মহাসত্যের একনিষ্ঠ সাধক হিসেবে পরিচিত হলেন শেষমেশ। বাংলা সাহিত্যে অনেক সৈয়দেরই আর্বিভাব ঘটেছে ইতোমধ্যে; কিন্তু আব্দুল মান্নান সৈয়দ যে ব্যতিক্রমী কীর্তি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে উপহার দিলেন- এক কথায় তা অপূর্ব ও অতুলনীয়। 

মানুষ পৃথিবীতে বিশেষ করে কবি সাহিত্যিকরা কতো লেখালেখি করে, কতোনা রচনা সম্ভার রেখে যান। অগণিত বই পুস্তক লিখে প্রকাশ করে নামযশ ফলিয়ে ব্যাপক নাম ডাক বাগিয়ে, তোলপাড় করে গত হন-ধরাধামের পাঁ চুকিয়ে গেলে কে কার খবর নেয়? নেওয়ার মতো মানুষজনের অভাব তখন  প্রকট আকার ধারন করে- কতোজনের সাহিত্য সাধনা তখন মাঠে মারা যায়। কালের করাল গ্রাসে সবই হারিয়ে যায়। কারো কাছেই তা পাত্তা পায় না। কারণ তারা কেউই ঐশী আদর্শ চেতনা দ্বারা লালিত হয়ে সাহিত্য চর্চা করেননি। জনমানুষের হৃদয়ে পোষিত মনভাবনাকে বাদ দিয়ে করেছেন নিজ  প্রবৃত্তির তাড়না দ্বারা চালিত হয়ে অবিরাম কলম পেশার কারবার মাত্র। কিন্তু যারা ঐশী আদর্শ চেতনার নিরিখে সাহিত্য চর্চা করেন, আদর্শ চেতনার পাঠ আত্মস্থ করতে সক্ষম হন। দেশ ও জাতির আদর্শ চেতনাকে সম্বল করে কলম চালান-তারা কখনো হারিয়ে যাননা। কালের করাল গ্রাস তাদেরকে স্পর্শ কিংবা কাবু করতে সক্ষম হয় না।  বরং যুগে যুগে কালে কালে তারা পঠিত হন। আদর্শবাদী মানুষের কাছে তারা গৃহীত- বরিত হয়ে সম্মানিত হন। তাদের সৃষ্ট সাহিত্য মানুষকে পথ দেখায়, মানুষ আনন্দিত হয়। সত্য সুন্দরের পথে ধাবিত করে। ক্রমে তারা কালজয়ী হয়ে উঠেন, প্রায় সকলের কাছেই আদৃত হন। 

যদিও প্রাচীনতম আরব্য কবি কূল শিরোমনি ইমরুল কায়েসদের কবিতা চৌদ্দ পনেরোশো বছরেও পুরোনো হয়নি এবং এখনো সরব সতেজ; কিন্তু ঐশী আর্দশবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত না থাকার কারণে পাঠক পাঠিকার অভিনন্দনের সাথেসাথে অপরিসীম অভিশাপও তাদের প্রাপ্তি ঘটছে।  ইমরুল কায়েসের অশ্লীল সাহিত্য তাকে কোথায় নিয়ে যাবে- এটা যদি তার জানা থাকতো- তাহলে তিনি যৌনতাসর্বস্ব অশ্লীল কবিতা রচনা করে চিরকালের নিন্দিত গহবরে পতিত হতে কখনই সম্মত হতেন না কোনদিন। কারণ তার কবিতা শুনে রাসূলে আকরাম (সাঃ) এক সময়ে মন্তব্য করেছিলেনঃ এ কবির কবিতা সকলের শীর্ষে এবং কবিদের মধ্যে যারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবেন- তাদের শীর্ষ নেতাও হবেন এ কবি। পরকালীন  জীবনের এইযে মর্মন্তুদ পরিণতিপূর্বাভাস- এইটে কি কোন কবি সাহিত্যিকের কাম্য হতে পারে?

এই জীবনে কে কি করলেন, কে কি লিখলেন, কে কি রচনা সম্ভার উপহার দিলেন জাতিকে দেশকে- সে সবের যেহেতু হিসেব নিকেশ নেওয়া হবে একদা- পুংখানুপুংখ ভাবে তখন- বুঝে শুনে, আগ পিছ ভেবেচিন্তে কলম চালনা করা উচিৎ নয় কি? শতভাগ উচিৎ। এই মনোভাবে চারিত হয়ে সাহিত্য সাধনা  বলি আর লেখা লিখির কর্মবলি সকল কর্ম প্রচেস্টায় বুঝে শুনে পদক্ষেপ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। তা না হলে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা ষোলআনা শতভাগ।

যদি কোন কলমজীবী মনে করেন- তাকে এমনি এমনি সৃষ্টি করা হয়েছে, পরিকল্পনা ব্যতিত, মহান ¯্রষ্টার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যবিহীন  সৃষ্টি মানব জাতিকে এ ধরাধামে প্রেরণ করা হয়েছে খামোখা বা অকারণে-তবে  বিশাল ভুল করা হবে। ভুল ও বিভ্রান্তির শিকার হয়ে যদি কোন কর্ম করা হয়, যদি লেখালেখির জীবন বেছে নেওয়া হয়, মন যা চায় তাই লিখে যায়, প্রবৃত্তির দাসানুদাস হয়ে কুৎসিত কামনা বাসনা প্রকাশ করে বই পুস্তক রচনা করে যায়- তাহলে সমূহ বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।  প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের কড়ায় গন্ডায় হিসেব নেওয়া হবে। এর থেকে বাঁচার  অন্যকোন পথ তখন খোলা থাকবে না। তার জন্য বিশাল খেসারতের কোন সীমা সংখ্যাই থাকবে না। সর্বোপরি তার গোঁ মানব জন্মটাই তখন হবে চরম ভাবে ব্যর্থ ও অসফল। প্রচন্ড অনুতাপ এবং সীমাহীন মর্মজ্বালায় মনে হবে মানব জন্মটা না হলেই ভালো হতো।

বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু লেখক ও কলম জীবীর সন্ধান আমরা পাই- যারা  প্রথম জীবনে যৌবনের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের শিকার হয়ে অনেক কিছুই জাতিকে উপহার দিয়েছেন। যা দেশ ও জাতির জন্য  শুধু নয় কারো জন্যই প্রকৃত পক্ষে কোন কল্যাণ বয়ে আনেনি, বরং সমূহ বিপদের সম্ভাবনাই সৃষ্টি হচ্ছিল যেনো। কিন্তু যখন এরা অনুধাবন করলেন, মানব সৃষ্টির প্রকৃত রহস্য ও লক্ষ্য উপলব্ধি করলেন। তখন একমাত্র  শাশ্বত সত্যের সন্ধান পেলেন- ঘুরে গেলেন, সব সোনা হয়ে গেল। এদেরই  পুরোভাগে যারা তারা হলেন, কবি আল মাহমুদ, অধ্যাপক আবুজাফর এবং আব্দুল মান্নান সৈয়দ। এদের মধ্যে কেউ ছিলেন পাড় নাস্তিক কেউ মার্কসবাদী এবং কেউ রবীন্দ্রনাথকে মানতেন একমাত্র আরাধ্য দেবতা হিসেবে। বিভ্রান্তি এবং পথভ্রষ্টতা কতো প্রকার কাকে বলে ও  কি কি- এ থেকেই উপলব্ধি করা সম্ভব। আব্দুল মান্নান সৈয়দ জীবনে অনেক লেখালেখি করেছেন-সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করেছেন-কিন্তু কোন্ কর্ম যে তার জীবন কে সার্থক ও সফল করবে- সেইটে বুঝবার পরিবেশ ও সুযোগ যখন হলো সম্পূর্ণটাই পাল্টে গেলেন এবং লিখলেন ‘সকল প্রশংসা তাঁর’। দীর্ঘকাল স্বীয়সত্তার প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে, চিন্তা চেতনার নিগূঢ় রহস্য আড়াল করে, তার হাতে যেসব সাহিত্য রচিত হয়েছে- সেসব তাকে বড়মাপের লেখক সাহিত্যিক রূপে আত্মপ্রকাশে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে সন্দেহ নেই সামান্যতমও। তবু আব্দুল মান্নান সৈয়দ এর হৃদয় আত্মা পরিতৃপ্তির ছোঁয়া স্পর্শ হতে সকরুণ বঞ্চিত হচ্ছিল  বলেই যেন মনে হয়। একজন ইহলোকিকতা সর্বস্ব মানুষ যে এই বিশ্বটাকে মনে করেন- একটা মজা লুটবার স্থান, ফুর্তিফার্তি করে জীবনটাকে আনন্দ সায়রে ডুবাতে না পারলে জীবনটাতো সার্থক ও সফল হবার নয়। এই মনোভাবে তাড়িত ব্যক্তি ঐসব না লিখে পারেন? পারেন না। কিন্তু আব্দুল মান্নান সৈয়দ দীর্ঘ সময় বন্ধু বান্ধব, হিতাকাঙ্খী এবং বস্তুবাদী পথের পথিকদের উৎসাহ উদ্দীপনায় অনেক কিছুই লিখে অনেক আলোড়নের সৃষ্টি করলেও মনের গভীরে মর্ম যাতনার কাঁটা বিঁধে সীমাহীন কষ্ট অনুভূত হচ্ছিল যেন। কেনোনা তার  অস্থি মজ্জায় যে রক্তকণিকা প্রবাহিত-তাতে তো পৃথিবীর একমাত্র শাশ্বত সত্যের শ্রেষ্ঠতম বাণী বাহকের রক্তের যে সংযোগ রয়েছে-তাতো শেষমেশ কথা না বলে পারে না। আব্দুল মান্নান সৈয়দের বেলায়ও পারেনি। এবং জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সে সত্যের বিষ্ফোরণ ঘটে যায় এবং তখনই ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ সশরীরে বেরিয়ে আসে সৈয়দের হৃদয় মথিত আত্মার ঘোষণা হিসেবে, শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি হিসেবে একমাত্র পরম ¯্রষ্টার সপ্রশংস কথকতা; স্তবস্ততি, পরম ¯্রষ্টার পরম পরিচিতি, পরম নিষ্ঠায় প্রকাশিত হয় সুন্দরতম ভাব ও ভাষায়, মোক্ষম শব্দ বাক্যে; যা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে একদম অভিনব এবং হৃদয়কাড়া ছন্দ ও অপূর্ব কাব্যিক মাধূর্যে মন্ডিত হয়ে প্রকাশিত হলো। সুতরাং বাংলা ভাষা ও সাহিতের ইতিহাস নতুনভাবে লিখতে ও সাজাতে বাধ্য সমকালীন ভাষাবিদ ও ইতিহাস বেত্তাগণ।কারণ আব্দুল মান্নান সৈয়দ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্তর যে কর্মটি করলেন তা একেবারেই অলৌকিক এবং অভূতপূর্বও বটে। তিনি নতুনভাবে নতুন করে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে যে বিশাল তোলপাড় সৃষ্টি করলেন, তাতো মুছে ফেলা যাবে না, অস্বীকার করা একেবারেই অসম্ভব। একজন আধুনিক মানুষ হয়ে, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মান্নান সৈয়দ আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রাখলেন তা সর্বমহলে চমক সৃষ্টি না করে পারে না পারেওনি। পারেও নি।

যোগ্যতর ব্যক্তির হাতে যোগ্যতম কর্মটি যে সৃষ্টি হলো তাতো সর্ব পর্যায়ে  গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ার কথা নয়।  আব্দুল  মান্নান সৈয়দ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্তর শুধু নন, বরপুত্রও বটেন। ইতোপূর্বেই তিনি তার কর্ম ও কুশলী অবদানে আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে অনেক উঁচুতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং তার উপযুক্ত মহৎ সৃষ্টি কর্মকে প্রতিক্রিয়াশীলতার বহিঃপ্রকাশ বলে এড়িয়ে যাওয়া অথবা এ সম্পর্কে কোন ধরনের খিস্তিখেওর করা কোন মতেই সঠিক যুক্তিযুক্ত বলে বিবেচিত নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ