ঢাকা, শুক্রবার 01 February 2019, ১৯ মাঘ ১৪২৫, ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

লোভ

আব্দুস সালাম : দিনার ও হায়াত সাহেব সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারে একই ভবনের এলোটি। তারা ভবনের দুই প্রান্তের তিনতলা ও চারতলার বাসিন্দা। তারা একই অফিসে একই পদে চাকরি করে। দিনার সাহেবের পোস্টিং একটা গুরুত্বপূর্ণ শাখাতে আর হায়াত সাহেবের শাখা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পদের কারণে দিনার সাহেবকে সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়। মাঝে মাঝে অফিস টাইমের পরেও কাজ করতে হয়। ছুটির দিনেও দাপ্তরিক কাজে তার বাসাতে স্টেক হোল্ডারদের আসতে দেখা যায়। দিনার সাহেবের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা খুব টিপটপে থাকে। প্রতিমাসে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন নতুন চাকচিক্য পোশাক কেনেন। ঘরে পা ফেলার জায়গা নেই। দামি দামি ফার্নিচারে ভরা। নিজের ও শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা সবসময় তার বাড়িতে আসা যাওয়া করে। তাদের পিছনে দুই হাত ভরে খরচ করতে দিনার সাহেব কার্পণ্য করে না। 

ওদিকে হায়াত সাহেবের জীবনযাত্রা ঠিক দিনার সাহেবের বিপরীত অবস্থার মতো। সে অফিস থেকে সময়মতো বাসাতে ফেরে। ফোনে তাকে কেউ বিরক্ত করে না। চাকরির শুরু থেকে হায়াত সাহেব সৎভাবে জীবনযাপন করার চেষ্টা করেছে। অসৎ উপায়ে রোজগার করে ধনী হওয়ার সাধ তার মোটেও ছিল না। রাজধানীর বুকে পরিবার পরিজন নিয়ে তাকে কষ্ট করে চলতে হয়। ছেলেমেয়েকে সে নিজেই পড়ায়। কোন প্রাইভেট টিউটর রাখেনি। নীলক্ষেতের নোটবুকই তার একমাত্র ভরসা। সে বাড়িতে কোন গৃহকর্মী রাখে না। সব কাজ স্ত্রীকেই করতে হয়। সংসার ও ছেলেমেয়েদের সামলাতে হায়াত সাহেবের স্ত্রী রীতিমতো কাহিল। অভাব অনটনের মধ্যে জীবন-যাপন করতে স্ত্রীর মোটেই ভালোলাগে না। স্ত্রীর মেজাজ মর্জি বুঝে সে মাঝে মাঝে তাকে সৎভাবে জীবনযাপনের অনেক নীতিকথা শুনিয়ে সান্ত¡না দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। তার পোড়া কপাল। ঈদ-বকরিদের সময়ও সে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের খুশি করতে পারে না। প্রায় সময় তাকে বোনাসের টাকা দিয়ে ধারদেনা পরিশোধ করতে হয়। স্ত্রী তাকে প্রায়ই বলে, “তুমি খুব বোকা। তোমার ক্ষমতা নেই একটা ভালো শাখাতে পোস্টিং নেওয়া। দিনার সাহেবকে দেখেও কি কিছু শিখতে পার না? পেটে ভাত নেই নাকে লজ্জ্বা! এত সাধু সাজার কী আছে? মুরুদ নেই সেই কথা বলো। তোমার সব কলিগরাই ভালো আছে। শুধু তুমিই নেই। খোঁজ নিয়ে দেখ গা? আমি থাকব না ঢাকা শহরে। তুমি পারলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকো। আমাকে গ্রামে রেখে আস।” স্ত্রী যখন বিরক্ত হয়ে এই কথাগুলো বলে তখন সে চুপ করে থাকে। মুখ বুজে নীরবে সহ্য করে। কোন কথার প্রতি উত্তর করে না। 

হায়াত সাহেবের স্ত্রী যখন তাকে দিনার সাহেবের সঙ্গে তুলনা করে তখন সে খুব অসম্মান বোধ করে। স্ত্রীর কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। স্ত্রীর উৎপাতে তার নাভিশ্বাস চরমে ওঠে। এভাবে দিনের পর দিন স্ত্রীর মানসিক নির্যাতনে তার মনের মধ্যে যে ভালো গুণগুলো ছিল তা একসময় ভোতা হয়ে যায়। হায়াত সাহেব এখন স্ত্রীকে খুশি করার জন্য উপরি ইনকামের ধান্ধা করতে থাকে। কিন্তু শেষপর্যন্ত পারে না। কারণ তার শাখাতে উপরি ইনকামের কোন সুযোগ নেই। তবে কিছু পয়সা বাঁচানোর জন্য সে রিকশা ও বাসে না চড়া বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘ পথ হেঁটে চলে। বাজারে গিয়ে দর কষাকষি করে জিনিসপত্র ক্রয় করে। এভাবেই আরও কিছুদিন গত হলো। সত্যি সত্যিই একদিন হায়াত সাহেবের ভালো একটি শাখাতে বদলি হয়। তার বদলির সংবাদে স্ত্রী যার পরনাই খুশি হয়। সে মনে মনে ভাবে- আল্লাহ বহুদিন পর তাদের মুখ পানে তাকিয়েছে। এবার সংসারের অভাব কিছুটা হলেও দুর হবে। তার বিশ্বাস বিবাহের পর সে যে স্বপ্ন দেখেছিল তা এবার পূরণ হবে। কালক্রমে হায়াত সাহেবও সততা থেকে কিছুটা সরে আসে। স্ত্রীকে খুশি করায় যেন তার প্রধান কর্তব্য। স্ত্রীর পরমযতœ লালিত স্বপ্নচূড়ার সিঁড়িতে হায়াত সাহেব পা রাখে। তাই স্ত্রীর আদর সোহাগ আগের চেয়ে অনেকখানি বেড়ে যায়। ফলে হায়াত সাহেব দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে শুরু করে। নানান ধরণের লোভ তার হৃদয়ে বাসা বাঁধে। দিনে দিনে সেই লোভের শাখা প্রশাখা গজিয়ে একটা বিরাট মহিরূহে পরিণত হয়। একের পর এক লোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। সেই লোভের পিপাসা মেটাতে হায়াত সাহেব মরিয়া হয়ে ওঠে। মন থেকে হিতাহিত বোধটা বিলুপ্ত হতে শুরু করে। সেই লোভের কাছে হায়াত সাহেব পরাজিত হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যে সে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। 

হায়াত সাহেবের স্ত্রী বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছে যে অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় তার স্বামীর চাঁদমুখটায় গ্রহণ লেগে থাকে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে উত্তরে বলে, “ক’দিন ধরে অফিসে টে-ার সংক্রান্ত বিষয়ে ঝামেলা যাচ্ছে। কোনভাবেই মিটআপ করতে পারছি না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।” এর কিছুদিন পরেই সে জানতে পারে যে তার স্বামী জাল কাগজপত্র দাখিল করে কোন এক কোম্পানীকে কাজ পাইয়ে দিয়েছে। এ কারণে তাকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিষয়টি এখন কারোর অজানা নয়। এই কথাটা কোয়ার্টারের এলোটিদেরও মুখে মুখে। হায়াত সাহেব কিংবা তার স্ত্রীকে দেখলে অনেকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। হাওয়ায় যে দুই একটা কথা তাদের কানে ভেসে আসে না তা কিন্তু নয়। সেসব কথা তাদের কানে শর হয়ে প্রবেশ করে। আর তখন লজ্জ্বাবতী গাছের মতো তাদের মাথাটা নুইয়ে পড়ে। 

হায়াত সাহেব বেশিরভাগ সময় বাসাতে বসেই অলস সময় কাটিয়ে থাকে। অফিসে তার যাওয়া হয় না বললেই চলে। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ করে তার সময়টা ভালোভাবেই কেটে যায়। তবে স্ত্রীর মুখেও কিছু বাধে না। প্রতিটা কথার বিষমাখান জবাব দিতে ছাড়ে না। সেসব জবাব স্বামীর গায়ে জ্বালা ধরায়। আর সারাক্ষণ বিড়বিড় করে বলে, “দিনার সাহেব একজন দক্ষ অফিসার। সে সবকিছু ম্যানেজ করে চলতে পারে। তার কোন সমস্যা হয় না। আর আমার স্বামী একটা...! না সে কথা মুখে উচ্চারণ করতে চাই না।” এভাবে দেখতে দেখতে আরও মাস ছয়েক গত হয়। হায়াত সাহেব অফিসের ঝামেলা মিটআপ করতে পারে না। ইতোমধ্যে সে বেশকিছু টাকাও খরচ করে ফেলে। দিন দিন তার সঞ্চিত টাকা কমতে শুরু করে। স্বামী-স্ত্রী বুঝতে পারে কোয়ার্টারের এলোটিদের কাছে তাদের কোন মান-মর্যাদা নেই। তাদেরকে সকলে ঘৃণার চোখে দেখে। একসময়  দু’জনারই চেতনার ঘুম ভাঙে। তারা বুঝতে পারে লোভ করা তাদের কোনভাবেই ঠিক হয়নি। সৎভাবে জীবনযাপন করার মতো সুখ আর কোনকিছুতে নেই। তারা অতীত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়। সেই অনুতাপের আগুনে তারা প্রতিনিয়ত দগ্ধ হতে থাকে। অবশেষে হায়াত সাহেবের ঘৃণ্য কৃতকর্মের জন্য তাকে অফিস কর্তৃপক্ষ বিন্দু মাত্র ছাড় দেয়নি। তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করেছে। অনাগত দিনগুলোর কথা স্মরণ হলেই তার দু’চোখ অশ্রুতে পূর্ণ হয়ে যায়। সুখরাজ্যে পৌঁছানোর সিঁড়িতে ঘুণপোকাদের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। যেকোন সময় তা ভেঙে পড়বে আঁধারের অতল গহীনে। সেই অনাকাঙ্খিত দিনটির জন্য হায়াত সাহেবের পরিবার অপেক্ষা করতে থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ