ঢাকা, শনিবার 02 February 2019, ২০ মাঘ ১৪২৫, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মুসলিম সভ্যতার বিপর্যয়ের কারণ

মনসুর আহমদ

বিশ্ব প্রকৃতির গোটা ব্যবস্থাপনাই এমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে, এখানে কোন স্থিতি ও বিরতির অবকাশ নেই। এখানে এক অবিশ্রাম গতি, পরিবর্তন ও আবর্তন বিদ্যমান। এটি কোন জিনিসকেই এক অবস্থায় টিকে থাকতে দেয় না। এখানে সৃষ্টির সাথে লয়, ভাঙ্গার সাথে গড়া, উত্থানের সাথে পতন হাত ধরাধরি করে চলছে। এমনিভাবে এর বিপরীত নিয়মও চালু রয়েছে। আজ একটি মাষা পরিমাণ বীজ যেখানে বাতাসের বেগে উড় উড়ে বেড়ায়, কাল তাই মাটিতে স্থিতি লাভ করে এক প্রকা- ডাল পালা যুক্ত বৃক্ষে পরিণত হয়। অবার পর দিন তা ই শুকিয়ে মাটিতে একাকার হয়ে যায়। অতঃপর প্রকৃতির সঞ্জীবনী শক্তিগুলো তাকে ত্যাগ করে অপর কোন বীজের লালন- পালনে নিয়োজিত হয়। এই হচ্ছে জীবনের ভাঙ্গা গড়া ও উত্থান পতনের নিয়ম। কিন্তু মানুষ এর কোন একটি অবস্থাকে একটু বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে দেখলেই মনে করে যে, এ অবস্থা একেবারেই চিরস্থায়ী। সে অবস্থাটা যদি নিম্নগামী হয়,তবে মনে করে যে, চিরকাল এ রূপ নিম্নগামী থাকবে। আবার যদি তা ঊর্ধ্বগামী হয় তো ধারণা করা হয় যে চিরদিন এমনি ঊর্ধ্বগামী থাকবে। কিন্ত এখানে পার্থক্য যা কিছু তা বিলম্ব আর অবিলম্বের, আসলে কোন অবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। ‘তিলকাল আইয়ামু নুদায়েলুহা বাইনান নাস’।

গোটা পরিবেশই আবর্তিত হচ্ছে এক ধরনের গতিক্রমের মধ্যে। জন্ম- মৃত্যু, যৌবন-বার্ধক্য, শক্তি-দৌর্বল্য, শীত- বসন্ত, শুষ্কতা-সজীবতা এই আবতনের বিভিন্ন রূপ মাত্র। এই আবর্তন ধারায় পালাক্রমে প্রত্যেক জিনিসেরই একবার সুদিন আসে তখন শুরু হয় তার বিকাশ বৃদ্ধি, প্রকাশ পায় তার শৌর্য-বীর্য। পরাকাষ্ঠা দেখায় সে আপন রূপ ও সৌন্দর্যের। একদিন সে উন্নতি ও প্রগতির চরম প্রান্তে উপনীত হয়। এ সময় সে ক্ষীণখর্বকায়, দুর্বল ও অক্ষম হয়ে পড়ে এবং যে শক্তিগুলো বিকাশ- বৃদ্ধির সূচনা করেছিল, শেষ পর্যন্ত তাই তাকে ধ্বংস করে দেয়। 

 গোটা সৃষ্টিজগতে এই হচ্ছে আল্লাহর বিধিবদ্ধ নিয়ম। দুনিয়ার অন্যসব জিনিসের মতো মানুষের উপরেও রয়েছে এ নিয়ম পুরাপুরি কার্যকর।(১) হোক তা ব্যক্তি অথবা হোক তা জাতি, সবই একই নিয়মের অধীনে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। 

প্রকৃতি জগতের পরিবর্তন ও বিবর্তনের উপর মানুষের কোন কর্তৃত্ব নেই।, কিন্তু একটি জাতির ভাঙ্গা-গড়ার পিছনে রয়েছে মানবসৃষ্ট রহু কারণ। এসব কারণ সৃষ্টির রহস্য উদঘাটনের প্রচেষ্টা চলছে যুগ যুগ ধরে। বিভিন্ন জনে বিভিন্নভাবে তার কারণ সমূহ ব্যাখ্যা করেছেন। মুসলিম দার্শনিক ইবনে খলদুন রাষ্ট্রের আয়ুষ্কাল সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, “জ্যোতির্বিদ্যানুসারে আয়ুষ্কালের কিছুটা হেরফের হতে পারে। তবে সাধারণতঃ এটাই স্বাভাবিক যে, কোন রাষ্ট্রই তিন যামানার বেশি টিকে না। তার অর্থ একটি যামানাকে ৪০ বৎসর ধরলে ১২০ বৎসরের বেশি একটি রাষ্ট্র তার সকল গৌরব নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। 

এই তিনটি পর্যায়ের প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্র সংগঠনকারীদের মধ্যে গোত্রীয় সংহতি এতই প্রবল থাকে যে, তারা তাদের সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য অপরের দ্বারা সম্মানীত ও স্বীকৃত হন। ফলে দিনকে দিন রাষ্ট্রও তাদের হাতে সংগঠনের পথে এগিয়ে চলে। 

দ্বিতীয় পর্যয়ে স্থিতিশীল নগর জীবনে যদিও এই গোত্রীয় সম্বন্ধজনিত সংহতি ভোগ বিলাসের কারণে অনেকটা শ্লথ হয়ে পড়ে, তবুও তখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে তাদের পূর্ব পুরুষের বীর্যবত্তায় কিছুটা রেশ থাকে। ফলে, তাদের মধ্যে নিয়ত এমন একটা প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় যে, তারা তখনও নিজেদেরকে পূর্বপুরুষের সুযোগ্য ঐতিহ্যবাহী বলে জাহির করতে চায়।

কিন্তু সর্বশেষ তৃতীয় পর্যায়ে-এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারীদের যে বংশধরেরা শাসনকার্য পরিচালনার ভার পায়, তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থায় দিনের পর দিন শাসনব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার পূর্বপুরুষের সাহসিকতা আর তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। সুখী জীবনের আরাম আয়েশ তাদের একেবারে নি¤œস্তরে নামিয়ে দেয়। তারা দুশ্চরিত্র, লম্পটও দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে। এই স্তরে এসে শাসকরা দেশবাসীকে রক্ষা করবে কি, নিজেরাই অসহায় বালক-বালিকা ও বৃদ্ধাদের মতো আত্মসংরক্ষণের পরমুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে সামাজিক সংহতি এতই শিথিল হয়ে যায় যে, তারা তখন না পারে নিজেদের সংরক্ষণ করতে না পারে শত্রু পক্ষকে প্রতিরোধ করতে।(২) 

ইবনে খলদুনের এই রাষ্ট্রদর্শন বিভিন্ন জাতির পতনের ইতিহাসের গভীর বীক্ষণের ফল মাত্র। বিভিন্ন জাতির পতনের কারণ থেকে মুসলমান জাতির পতনের কারণ কোন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবি রাখে না। একই নিয়ম-বিধানের অধীনে মুসলিম জাতির বিপর্যয় ঘটেছে।”

মুসলমান জাতির রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ঐতিহ্য। জাতি হিসেবে হজরত ইবরাহীম (আঃ) ই প্রথমে মুসলমানদেরকে জগতে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই উত্তম ও আদর্শবাহী জাতিটি কাল পরিক্রমায় বিভিন্ন রসুলদের মাধ্যমে সামনে এগুতে থাকে। অবশেষে হজরত মুহাম্মদ (স.)-এ হাতে এ জাতির পরিপূর্ণতা ঘটে। জাতির প্রতিষ্ঠাতা রসুল (স.) বিভিন্ন সময় জাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। রসুলের উপযুক্ত সাথী হজরত ওমর (রাঃ) এ জাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে কথা বলেছেন তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেললে মুসলিম জাতির পতনের কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। একবার তিনি বলেন, “হে আবু ওবায়েদা! আমরা খুবই অপমানিত জাতি ছিলাম। কিন্তু আল্লহ তাঁর দীনের বদৌলতে আমাদিগকে সম্মান দান করেছেন। তাই আমরা যখনই ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্মান পেতে চাইবো তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে অপমানিত করবেন, সম্মান ও ক্ষমতা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হবে, কুফর ও শিরকের গোলামী ও অধীনতা আমাদের ভাগ্যে এসে যাবে।”(৩)

হজরত ওমর (রাঃ) মাত্র একটি বাক্যে মুসলমান জাতির বিপর্যয়ের যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা-ই বিপর্যয়ের সঠিক কারণ। দীন থেকে সরে যাওয়া, জাতীয় জীবন থেকে দীনের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলাই জাতির বিপর্যয়ের কারণ। জাতির পুনরুত্থান ও পুনর্গঠনের জন্য এ সব হারাণ বৈশিষ্ট্য আবার মুসলমান দেরকে অর্জন করতে হবে। 

 প্রথম যুগের মুসলমানদের মধ্যে দীনের বৈশিষ্ট্য পুরোপুরিভাবে বর্তমান ছিল। ধীরে ধীরে তাদের মাঝ থেকে বৈশিষ্ট্যবলী হারিয়ে  যেতে থাকল, পরিণামে মুসলমান জাতির বিপর্য়য় ঘনিয়ে এল। বিপর্যয় ঘটার কারণসমূহের মধ্যে তিনটি কারণ :

১) দাওয়াতীকাজ থেকে বিরত থাকা 

২) চিন্তার এক্যে ফাটল সৃষ্টি

৩) আলেম সমাজের অথর্বতা ও ইজতেহাদ থেকে বিরত থাকা। 

এসব ঐতিহাসিক কারণসমূহের প্রতি নজর দিলেই জাতি ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হতে সক্ষম হবে।

ইসলাম প্রকৃতপক্ষে একটি দাওয়াতী দীন। এক ব্যক্তি প্রথমে মানুষদেরকে আহ্বান জানালেন এ দীনকে গ্রহণ করার জন্য। তার পর তাঁর সাথীরা এ কাজ করলেন বহুদিন ধরে। দাওয়াতী কাজ এ জাতির বুনিয়াদী কাজ। পবিত্র কালামুল্লাহে দাওয়াতের উপর গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশ এসেছে- “আপনার পালনকর্তার পথের দিকে আহ্বান করুন। জ্ঞানের কথা দিয়ে বুঝিয়ে এবং উত্তম রূপে উপদেশ শুনিয়ে, এবং তাদের সাথে (প্রয়োজন হলে) তর্ক বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।”(৪) 

অন্যত্র এরশাদ হচ্ছেÑ “এবং তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা আবশ্যক যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।”(৫) 

প্রথম যুগের মুসলমানরা খোদার কালেমা প্রচারকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছিলেন। তারা দুনিয়ার বিভিন্ন কাজ কারবার সম্পাদনকালে এ লক্ষ্য সামনে রাখতেন। ফলে তাঁরা ব্যক্তিগত জীবন থেকে যতটা সময় ও ধন মাল বাঁচাতে পারতেন, তা তাঁরা ইসলামের সেবায় নিয়োজিত করতেন। যে কারণে তাঁরা জাতি হিসেবে কয়েকটি বছরের মধ্যে এমন শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হলেন যে, দেখতে না দেখতে গোটা আরব ভূমি তাদের শাসন ক্ষমতায় এসে গেল। পরবর্তী কয়েক বছরে তারা পৃথিবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লেন। 

মুসলমান জাতির অগ্রগতির আসল শক্তিই হল দাওয়াতী কাজ চালু রাখা। ইতিহাসের দিকে তাকালেই এ সত্য ফুটে ওঠে। এ ব্যাপারে অধ্যাপক ম্যাক্সমুলারের অভিমত হল : “ইসলাম মূলতঃ একটি প্রচারমূলক ধর্ম। তাবলীগ বা প্রচারের উপরেই এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। প্রচারের বলেই তার অগ্রগতি ও বিকাশ সাধিত হয়েছে এবং প্রচারের উপরেই তার অস্তিত্ব নির্ভরশীল।” 

মিশর বিজেতা আমর ইবনুল আস আরব মুসলমানদেরকে যে কথা বলেছিলেন তার মাঝে এ সত্যই প্রস্ফুটিত হয়েছে। তিনি বলেন, “তোমরা সদা সর্বদা একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ঘাটির পাহারায় নিয়োজিত আছ। তোমরা এটা মনে কর না যে, তোমরা কিবতী (মিশরের আদীম অধিবাসী কপট সম্প্রদায়)দেরকে পরাজিত করেছে এবং রোম সা¤্রাজ্যের সর্বোত্তম এলাকা তোমাদের কব্জায় এসে গেছে। জযীরাতুল আরব একেবারে কাছে এবং এখানে সার্বিক ব্যবস্থাপনা তোমরা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছ। এ ব্যাপারে তোমরা যেন প্রতারিত না হও। আনতুম ফি রিবাতেন দায়েমেন - তোমরা এমন এক স্থানে দাঁড়িয়ে আছ যে, চোখ বুজেছ কি মরেছ। এখনে তোমাদেরকে সব সময় সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তোমরা একটা পয়গামের বার্তাবাহী, তোমরা একটি দাওয়াত নিয়ে এসেছ; তোমরা একটি সীরাত একটি জীবনাদর্শ ও জীবন- চরিত নিয়ে এসেছ। যদি দাওয়াতের ক্ষেত্রে তোমরা কোন রূপ অলসতা এবং গাফলতির আশ্রয় নাও তা হলে তোমরা মারা পড়বে। তোমরা যদি নিজেদের সীরাত ও জীবনাদর্শ হারিয়ে ফেল যা তোমরা আরব থেকে বয়ে নিয়ে এনেছিলে, যা তোমরা নবীর কোল থেকে এবং মারকায -ই- মদীনা মুনাওয়ারা থেকে নিয়ে এসে ছিলে তা হলে তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রধান্য বিলুপ্ত হবে। যদি কখনো তোমরা মনে কর যে, রুটি রুযী কামাই করার জন্য তোমরা এখানে এসেছ, তোমর এখানকার উর্বর ভূখ- থেকে, এখানকার শ্যামল সবুচজ সৌন্দর্যের সমারোহ থেকে লাভবান হতে এসেছ, তোমরা যদি এখানকার আরাম আয়েশ ও বিলাসিতার মধ্যে ডুবে যাও, আর তোমরা যদি এতটুকু অলসতার প্রাশ্রয় দাও তবে তোমাদেরকে কেউ করুণা দেখাবে না, তোমরা এখানে বাঁচতে পারবে না।(৬)

ইসলামের দাওয়াতী কাজ চালু না থাকার কারণে মুসলমান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শত শত বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেও এক সময় সে সব দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছ্।ে উদাহরণস্বরূপ স্পেনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। যারা স্পেনের ইসলাম ও মুসলমানদের অবনতির কারণ গুলো পর্যালোচনা করেছেন তারা বলেছেন যে, “এর বড় কারণ হ’ল, আদনান গোত্রের ও হেজাজী গোত্রের লোকেরা চাইত যে স্পেনের ক্ষমতার বাগডোর থাকবে তাদের হাতে। তারা কখনো ইসলামের তাবলীগ ও প্রচার প্রসারের দিকে এতটুকু মনোযোগ দেয়নি। তারা ক্রমান্বয়ে দক্ষিণ দিকে সরে গেছে যেখান থেকে মুসলিম রাষ্ট্র দূর প্রাচ্য(মরক্কো)ছিল নিকটবর্তী, উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা তারা করেনি। তারা নির্মাণ- শৈলী ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা ও মেধা ব্যয় করেছে, ... ... কিন্তু ইসলামের দৃঢ়তা বিধানে এবং ইসলামকে সেখানকার অধিবাসীদের অন্তর রাজ্যে ঠাঁই করে দেবার এতটুকু প্রয়াস তারা নেয়নি। তারা আয্ যাহরা প্রাসাদ নির্মাণ করেছে, তারা আল হামরা কেল্লা তৈরী করেছে, তারা কর্ডোভা মসজিদও বানিয়েছে, স্থাপত্য শিল্পে যার তুলনা মেলা ভার ... ...। কিন্তু এর পরিবর্তে তাদের আশে পশের লোকদেরকে ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও পরিচিত করার দরকার ছিল, জাবালুত তারিক ( জিব্রাল্টার)-এর দিকে পিছু হটবার পরিবর্তে দরকার ছিল সম্মুখে অগ্রসর হবার এবং ইউরোপের দিকে অগ্রাভিযানের। কিন্তু তা না করে তারা সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নতি, সূক্ষ্ম শিল্প কলার পৃষ্ঠপোষকতা ও নির্মাণ কর্মে লেগে গেল। কবিতা ও কাব্যচর্চায় লিপ্ত হয়ে পড়ল”(৭) কিন্তু তারা ইউরোপে বিশুদ্ধ ও মৌলিক ইসলামের ইসলামের প্রসার ঘটাল না। তাদের এই মৌলিক কর্মের বিচ্যুতির কারণে আল্লাহ তাদের কাছ থেকে দেশটাই নিয়ে গেলেন। 

এ অবস্থা শুধু স্পেনেই নয়, পাক ভারত উপমহাদেশেও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটে। “এরপরে বাংলা-পাক-ভারতে মুসলমানদের বিজয় অভিযানের আসল ধারাক্রম শুরু হয়। কিন্তু তখন বিজেতাদের মধ্যে সোনালী যুগের মুসলমানদের মতো বৈশিষ্ট্য- বিশেষত্ব বর্তমান ছিল না। তারা এখানে ইসলাম প্রচারের পরিবর্তে রাজ্য বিস্তÍারের কাজেই নিজেদের সমগ্র শক্তি ব্যয় করেন এবং লোকদের কাছে খোদা ও রাসুলের আনুগত্যের বদলে নিজেদের আনুগত্য ও রাজস্ব দাবি করেন। এরই অনিবার্য ফলে কয়েক শ’ বছর রাজ্য শাসনের পরও এ উপমহাদেশের বেশির ভাগ অধিবাসীই অমুসলিম রয়ে গেল এবং ইসলামী কৃষ্টি ও সভ্যতা এখানে বদ্ধমূল হতে পারল না। ... ... অবশেষে ঈসায়ী আঠার শতকে ভারতে ইসলামী সভ্যতার সব চেয়ে বড় সহায়ক সেই রাষ্ট্রশক্তিও মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গেল।(৮)

দ্বিতীয় কারণ- চিন্তার অনৈক্য :

ইসলাম হুকুম করেছে, “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত ভাবে আকড়িয়ে ধর। বিচ্ছিন্ন হয়েও না।” ... এ নীতিতে মুসলমান যত দিন অবিচল ছিল ততদিন মুসলিম জাতি সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পৃথিবীতে আসন করে নিয়েছিল। কিন্তু যখনই মুসলমান কোরআন ছেড়ে দিল তখনই মুসলমানদের মধ্যে চিন্তার অনৈক্য দেখা দিল। মুসলিম সমাজে অসহিষ্ণুতা ও কর্মধারায় বিভিন্নতা দেখা দিল, ফলে মুসলিম,সমাজে বিপর্যয় নেমে এল। ইতিহাসের পৃষ্ঠার বিরাট স্থান জুড়ে আছে এ বেদনার ও লজ্জার ইতিকথা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, “কোন জাতির নৈতিক অধঃপতন আগে শুরু হয়, আর রাজনৈতিক অধঃপতন হয় পরে। গ্রীক, রোম, সাসানী সা¤্রাজ্য, প্রাচীন ভারতীয় সা¤্রাজ্য এবং ইসলামী সালতানাত সমূহের ইতিহাস এ কথারই সাক্ষ্য দেয়।”(৯)

মুসলমান জাতির বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ চিন্তা ও রাজনীতির মতপার্থক্য। স্পেনে মুসলমানদের অবনতির ইতিহাস ও তার কারণ খুঁজে দেখলে এ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে আরব গোত্রগুলির পারস্পরিক শত্রুতা, দ্বন্দ -সংঘাত ও অনৈক্য অর্থাৎ রাবীয়া ও মুদার, আদনানী ও কাহতানী, হেজাজী ও ইয়ামেনীদের মতানৈক্য ছিল এর বড় কারণ। 

ইসলামের বিপর্যয় তখনই ত্বরান্বিত হল যখন চিন্তার ক্ষেত্রে মতানৈক্য শুরু হল এবং তা পরিণতিতে দ্বন্দ্বে রূপ নিল। প্রথম যুগে মুসলমানরা সরাসরি কোরআন ও হাদিস থেকে জীবন সমস্যার সমাধান নিত। পরবর্তীতে “ আমাদের ধর্মনেতারা খুটিনাটিতে এত দূর লিপ্ত হয়ে পড়েন যে,তার ফলে মূল ভিত্তিই তাদের হাত ছাড়া হয়ে গিয়েছে। অতঃপর খুটিনাটিই মূলনীতির জায়গা দখল করে নিয়েছে এবং তার থেকে আরো অসংখ্য খুটিনাটি বেরিয়ে এসেছে আর এগুলোই প্রকৃত ইসলাম বলে আখ্যা পেয়েছে। অথচ ইসলামে এগুলোর আদৌ কোন গুরুত্ব ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী জাতীয়তার প্রাসাদটি এই ধরাক্রমের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, প্রথমে কোরআনে মজীদ, তারপর সুন্নাতে রাসুল (স.) এবং সর্বশেষে জ্ঞানী ও মনীষীদের ইজতেহাদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই ধারাক্রমকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়া হয় এবং এইভাবে ধারাক্রম রচনা করা হয় যে, প্রথমে একটি বিশেষ যুগের মনীষীদের ইজতেহাদ, পরে সুন্নাতে রাসুল (স.) এবং সর্ব শেষে কোরআন মজীদ। এই নয়া ধারাক্রমই হচ্ছে সমস্ত জড়তা ও ক্লীবতার জন্য দায়ী, যা ইসলামকে একটি অকেজো ও নিস্ক্রিয় বস্তুতে পরিণত করেছে।”(১০)

ইসলামের প্রারম্ভিক কালে মুসলমানেরা ধর্ম প্রচার ও ধর্ম পালনেই মশগুল ছিলেন। রসুল (স.) -এর ইন্তেকালের পর চলমান জীবনের ক্রমবর্ধমান সমস্যার মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম চিন্তাবিদগণ কোরআন ও হাদিসের মূলনীতি সমূহকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কোরআন ও হাদিসের এই ব্যাখ্যা ক্রিয়ায় চিন্তার বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এবং এই মতভেদকে কেদ্র করে বিভিন্ন চিন্তা গোষ্ঠী ও ফের্কার উদ্ভব ঘটে। যাদের এক দলকে বলা হয় ধর্মীয় রাজনৈতিক সম্প্রদায় (Religio political school),  যাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সুন্নী মজহাব, শিয়া সম্প্রদায়; দ্বিতীয় দলকে বলা চলে ধর্মতাত্ত্বিক সম্প্রদায় (Theological school), তৃতীয় দলকে বলা চলে দার্শনিক স্প্রদায় (Philosophical school) যার মধ্যে রয়েছে মুতাজিলা, আশারিয়া ও সূফী সম্প্রদায়।  

ইসলামী চিন্তার জগতে সম্প্রদায় বা ফের্কা সৃষ্টি ইসলামী সভ্যতার বিপর্যয়ের একটি বিশেষ কারণ। চিন্তার বিভিন্নতাই তাদেরকে এক আপরের শত্রুতে পরিণত করেছে। আমরা দেখতে পাই পাশ্চাত্য দেশে “শাফেয়ী’ বংশের প্রতিষ্ঠাতা শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং তজ্জন্যই তার সুন্নী প্রতিবেশী, পশ্চিমে উসমানীয়দের এবং পূর্বে উজবেগদের প্রতি স্বীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্য ছল প্রদর্শন করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দী থেকে শিয়া সুন্নীদের সংগ্রাম এমন এক নির্মম পর্যায়ে উপনীত হল যে, মধ্য যুগের কোন সময়ই তেমনটির অস্তিত্ব ছিল না। শিয়া সুন্নীরা তখনই প্রথম বারের মত স্ব স্ব মতবাদের আলেমদের মতামতকে ভিত্তি করে পরস্পর পরস্পরকে মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলো। সংগ্রামশীল শিয়াবাদ পারস্যের জন্য এক প্রকারের রাজনৈতিক রক্ষা কবচে পরিণত হল।”(১১)

চিন্তার বিভিন্নতা মুসলিম সভ্যতাকে কিভাবে ধ্বংস সাধন করেছে তা আলোচনার জন্য বিস্তর সময়ের দাবি রাখে। সংক্ষেপে তাদের বিশ্বাস ও কার্য পদ্ধতি আলোচনা করলে দেখা যাবে কিভাবে তারা ইসলামের ক্ষতি সাধন করেছে। খারেজীরা মনে করে যারা তাদের মতের সংগে এক্যমত পোষণ করে না তারা ধর্মদ্রোহী বা কাফের। খারেজীদের কর্তব্য তাদেরকে ধ্বংস করা। সাধারণ মুসলমানদের প্রতি খারেজীদের মনোভাব ছিল অত্যন্ত শত্রুতামূলক এবং খারেজীদের এই শত্রুতা মুসলমানদের মধ্যে প্রচুর রক্তপাত ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছে। 

জাবারিয়া ও কাদেরিয়া সম্প্রদায় দুটির আবির্ভাব হয়েছিল যখন খেলাফত ধ্বংস হয়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। জাবারিয়া চিন্তাবিদগণ অদৃষ্টবাদ প্রচার করতে থাকেন। উমাইয়া শাসকগণ মানুষের ইখতিয়ার ও স্বাধীনতার আকীদাকে বিলোপ করে জাবারিয়া মতবাদের প্রবক্তাদেরকে উৎসাহ দিতে থাকেন। এ মতবাদ প্রচারের ফলে ইসলামী সালতানাতের দুর্দশা ও দুরাবস্থা ও সাধারণ মানুষের অত্যাচারিত হওয়ার সব দায় দায়িত্ব ও অপকর্মের বোঝা শাসকগণণ তাদের মাথা থেকে সরিয়ে আল্লাহর কাধে ফেলে দিল। এ চিন্তাধারার ফলে মুসলমানগণ তাদের সামষ্টিক কর্ম কা-ের মূল্যায়ন ত্যাগ করলো। ফলে মুসলমানদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন সাধনের ও উন্নয়নের পথে পদচারণা বন্ধ হয়ে গেল। 

খিলাফতে রাশেদার পর রাজনৈতিক টানা পোড়েন, ধর্মতাত্মিক বিচার বিশ্লেষণ ও বিতর্কের কোন্দল থেকে দূরে থাকার প্রবণতা থেকে জন্ম নেয় সূফীবাদ। “খিলাফতে রাশেদার পরই ইসলামী জীবনব্যবস্থায় নানারূপ বিশৃংখলার সৃষ্টি হলে আমাদের সূফী সম্প্রদায়ও এই প্রক্রিয়ার অনুকরণে বিভিন্ন জায়গায় খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ খানকার কথাটির এমনি অর্থবিকৃতি ঘটেছে যে, শব্দটি শোনামাত্রই লোকদের মনে আলো হাওয়া বর্জিত একটি বিদঘুটে জায়গার চিত্রই ভেসে ওঠে। কিন্তু আসলে এই খানকাহ ছিল মদীনায় বিশ^নবী (স.) প্রতিষ্ঠিত আদর্শের একটি অনুকরণ মাত্র। যে সব লোকের মধ্যে কিছুটা প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যেত, শ্রদ্ধেয় সূফী সম্প্রদায় তাদেরকে বহির্জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে কিছুদিনের জন্য খানকায় রেখে দিতেন এবং মহানবী (স.) ও সাহাবায়ে কিরামের অনুকরণে সেখানে তাদেরকে উন্নত মানের ট্রেনিং দান করতেন।(১২)

প্রথম দিকের সূফী সাধকগণ শরিয়তের বাহ্যিক আইন -কানুনের পাবন্দীর সাথে সাথে ইসলামের আধ্যত্মিক ও নৈতিক প্রাণ সত্তার এক সুন্দর সংমিশ্রণ সৃষ্টি করলেন। তাদের এ অবস্থা বেশি দিন টিকেনি। “যখন সূফী আন্দোলন আরব থেকে বের হয়ে সিরিয়া, তুর্কিস্তান ও হিন্দুস্তানে প্রবেশ করলো, তখন তার রূপ, উদ্দেশ্য, আকীদা ও চিন্তাধারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। তখন একটি বাহ্যিকতার বিরুদ্ধে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার রক্ষাবুহ্য থাকেনি বরং জীবন থেকে পলায়ন, রাজনীতির প্রতি অমনোযোগিতা এবং জাগতিক পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার প্রতি বিমুখতার একটি দর্শনে পরিণত হল।”(১৩) যা পরিণতিতে মুসলমানদের ধর্মের মধ্যে সামাজিক লাভ -উন্নতি ও জনসেবার কোন স্থান রইল না। তখন তা শুধু আল্লাহ ও মানুষের সম্পর্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। এ ভাবে রাজনৈতিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক সমস্যা থেকে সম্পর্কহীনতা মুসলিম সভ্যতার বিপর্যয় ডেকে আনে। যখন তাসাউফের উপর প্রাচ্যবাদ ও দর্শনের উপর নিউপ্লাটোবাদের প্রভাব দৃঢ় হয়ে দাঁড়াল তখন সূফী সম্প্রদায় ও আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ ইসলামের প্রাথম যুগের সত্যিকার সূফীবাদ পরিহার করে বিভিন্ন মরমীবাদীদের অনুসরণ করে চলছিলো। যে কারণে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের উন্নতির ধারা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। এলো চিন্তা গবেষণায় বন্ধ্যাত্ব । তাই বলাচলে মুসলমানদের অধপতনের অন্যতম কারণ চিন্তার বিভিন্নতার ফসল সূফীবাদ।

চিন্তার অনৈক্য যে শুধুমাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রেই মুসলমানদের জন্য অনগ্রসরতার কারণ ঘটিয়েছে তাই নয়, বরং বিজ্ঞান জগতেও মুসলমানদের অগ্রযাত্রাকে বাধা দিয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, “বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাদের অভিভাবক হয়ে সেলজুক সুলতানরা সুন্নী চিন্তা রীতি ও ধর্মীয় সমাজব্যবস্থা রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ধর্ম মত, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর যারা এই প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধী তারা আব্বাসীয়দেও প্রতিদ্বন্দ্বী শিয়া ইসমাইলী মতবাদের স্বপক্ষে বিকল্প রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য গোপন প্রচার ও জনমত সংগঠনে সচেষ্ট ছিল। এই প্রচারের ফলশ্রুতি হল দশ শতকের মাঝামাঝি বিকল্প ব্যবথা হিসেবে মিশর ও উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমী বংশের নেতৃত্বে ইসমাইলী খিলাফত প্রতিষ্ঠা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কায়রোতে ইসমাইলী ধর্মমতপ্রচারর পদ্ধতি শেখানোর জন্য আল -আজহার প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাষ্টীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে ইসমাইলী আইডিওলজিকাল অনুপ্রবেশ থেকে আত্মরক্ষা করতে তাই আব্বাসীয় সেলজুক নেতাদেরকেও প্রতিকল্প ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হয়। সেলজুক উজীর নিজামুল মুলক তখন বাগদাদে নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইরাক-ইরানের বিভিন্ন শহরে মাদ্রাসা স্থাপন করে সুন্নী মতবাদের পবিত্রতা রক্ষা ও ইসমাইলী মতবাদের প্রসার রোধ করতে আব্বাসীয় রাষ্ট্র ও সমাজ নায়কদের সচেষ্ট হতে হয়।  সনাতন সুন্নী ইসলামের বিশ^াস ও আচরণের শৈথিল্যকে প্রশ্রয় দেয়। প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থা ও তত্ত ¡নিয়ে কোন প্রশ্ন বা সন্দেহ জন্ম্য়া এমন সব বই পুস্তকের প্রতি রাজশক্তির তরফ থেকে সমাজ মনে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হতে থাকে, এবং সেই সঙ্গে জ্ঞান বিজ্ঞানের গবেষণায় অনুমোদিত ও প্রতিষ্ঠিত তথ্যের বাইরে চিন্তার স্বাধীনতা সঙ্কুচিত করারও চেষ্টা চলতে থাকে। 

এগারো শতকের শেষে নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমাম গাজ্জালী সূফীবাদ, দর্শন, আইন ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে যে বিপুল সংখ্যক গ্রন্থ রচনা করে মুসলমানদের ধর্মচিন্তাকে সংহত ও নিয়ন্ত্রিত করতে সফল প্রভাব বিস্তার করেন, তাতেও স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও গবেষণাতে স্পষ্ট নিরুৎসাহ ও নিন্দা ব্যক্ত করা হয়েছে। কেননা তার ফলে সৃষ্টির সূচনা ও স্রাষ্টার প্রতি ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে।”

তখন থেকে উদার ধর্মমত ও মুক্ত চিন্তার প্রতি সমাজ মনে যে বিরোধের সৃষ্টি হতে থাকল তার ফলে ৯ থেকে ১১ শতক পর্যন্ত যে যুগ মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণ যুগ বলে খ্যাত, জ্ঞান বিজ্ঞানের অনুশীলন ও মৌলিক সৃষ্টির জন্য যখন মুসলমানরা সভ্য জগতের নেতা বলে পরিগণিত হতো, সে যুগের অবসান হল এবং সাহিত্য, ইসলামী শাস্ত্র, ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদের বাইরে কোন নতুন বৈজ্ঞানিক আলোচনা বা জিজ্ঞাসার সুযোগ আর থাকল না। এ ভাবে মুসলিম জগতে চিন্তার অনৈক্য অকল্যাণ বয়ে আনল। 

তৃতীয় কারণ :

আলেম সমাজের ফের্কাবাজী ও অথর্বতা : মুলিম সভ্যতার জন্য যেমন খোদা পোরস্ত আলেমদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম, তেমনি মুসলিম সভ্যতার পতনের জন্যও তারা কম দায়ী নন। আলেমদের শাখা প্রীতির কারণে ভারত, ইরান ও খোরসানী মুসলমানদের প্রভাবশালী শ্রেণীর মধ্যে দলগত ও ফের্কাগত সংকীর্ণতা মুসলিম ঐক্য বিনষ্টের জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। ভারতবর্ষে ইংরেজরা আলেমদের মাধ্যমে ফেরকাগত, বংশগত ও জাতিগত দলাদলি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। হিন্দুস্তানে ওহাবী আন্দোলনের ব্যর্থতার পিছনে ছিল ফের্কাগত মতপার্থক্যের কারণ। তুকীর্ জাতির ইসলাম থেকে ফিরিঙ্গিপনার দিকে ধাবিত হওয়ার  কারণও আলেমদের অথর্বতা। তুর্কী ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, উনিশ শতকের প্রারম্ভে সুলতান সলীম তুর্কী জাতির উন্নতি কল্পে শাসনব্যবস্থা সংস্কার, আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রচার ও আধুনিক পাশ্চাত্যের যুদ্ধাস্ত্র প্রচলন শুরু করেন।। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা ও ভাবধারা সম্পর্কে মুর্খ সূফী সম্প্রদায় ও সংকীর্ণমনা আলেম সমাজ ধর্মের নামে এই সংস্কার কার্যের বিরোধিতা করলেন। এমনকি শ্য়াখুল ইসলাম আতাউল্লাহ আফেন্দী ফতোয়া দিলেন যে, যে বাদশাহ কোরআন বিরুদ্ধে কাজ করে সে বাদশাহরই উপযুক্ত নয়। ফলে সলীমকে পদচ্যুত করা হয়।  

“সলীমের পর সুলতান মাহমূদ সংস্কার কার্যের চেষ্টা করলেন। আলেম সম্প্রদায় ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ আবার তাঁর বিরোধিতা করলেন। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রমের পর ১৮২৬ সালে মাহমুদ আধুনিক সামরিক সংগঠনের নীতি চালু করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু আলেম সমাজ ও সূফী সম্প্রদায় এই অবিরাম এই প্রচার চালাতে লাগলো যে, এই ধরনের সংস্কার কার্য বিদয়াতের শামিল, এর দ্বারা ইসলামকে বিকৃত করা হচ্ছে; সুলতান বেদীন হয়ে গিয়েছেন এবং আধুনিক কায়দার ও সেনাবাহিনীতে ভর্তি হলে মুসলমানদের ঈমান নষ্ট হতে বাধ্য।”(১৪)

১৯০৮ সালে এক বিপ্লবের মাধ্যমে খলিফা আবদুল হাকিমকে সিংহাসনচ্যুত করা হল। বিপ্লবীরা ঐক্যের প্রতি নিস্পৃহতা প্রদর্শন শুরু করেন। মুষ্টিমেয় বিপ্লবী গোষ্ঠী ইসলামকে আধুনিক মতাদর্শের ছাঁচ ঢালাই করতে শুরু করল। এত সব বিপ্লবী কর্মসূচীর মধ্যে তুর্কী আলেম সমাজ ও ধর্মনেতাগণ সপ্ত শতকের পরিবেশ খেকে বাইরে বেরুতে প্রস্তুত ছিলেন না। আলেম সমাজ ও ধর্মীয় নেতাগণ এমন ভ্রান্ত নীতি অনুসরণ করে যে, যে মুজাহিদ কমিটি দীর্ঘ পাঁচ শো বছর ধরে ইসলামের জন্য একক ভবে সংগ্রাম করেছিল, এই সব আলেম ও ধর্মনেতাদের অথর্বতাই তাদেরকে ইসলাম থেকে ফিরে গিয়ে ফিরিঙ্গিপনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এভাবেই দেশে দেশে আলেম সমাজ শাখা প্রশাখা ও খুটিনাটি কাজে মশগুল হয়ে জাতির অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াল। মুসলিম সভ্যতার অগ্রগতি শিল্প, সাহিত্য- সংস্কৃতি ও আধুনিক বিজ্ঞানের দিকে আলেম সমাজ এখনও পুরাপুরি মনোনিবেশ করেননি। এখনও তাঁদেরকে দেখা যায় ফির্কাবাজী ও পরস্পর পরস্পরের প্রতি বিষোদগার নিয়ে ব্যস্ত। 

দুর্ভাগ্যের ব্যাপার এই যে, যে নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে প্রথম দিকে আলেম সমাজ ব্যর্থতার গ্লানি বরণ করে নিয়েছিলেন, আজও প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশেই তারা একই দৃষ্টিভঙ্গীর ওপরেই অবিচল রয়েছেন। কতিপয় ব্যতিক্রম ব্যক্তিকে বাদ দিলে আলেম সমাজর সাধারণ অবস্থা এই যে, যুগের গতি প্রকৃতিও মানসিকতার নতুন গড়নকে উপলব্ধি করার কোন চেষ্টাই তারা করেন না। যে সব বিষয় মুসলমানদের নব্য বংশধরগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেগুলোর প্রতি যত খুশী ঘৃণা প্রকাশ করতে প্রস্তুত, কিন্তু যে হলাহলের প্রতিকার করার মত ঝুঁকি গ্রহণ করতে তারা অসমর্থ, আধুনিক পরিস্থিতিতে মুসলমানদের জন্য যে জটিল বৈজ্ঞানিক ও বাস্তব সমস্যাবলী সৃষ্টি করেছে, সেগুলির সমাধান করতে তারা হামেশাই অপারগ।

মুসলিম জাতির বিপর্যয়ের এই তিনটি মৌলিক কারণ ছাড়াও রয়েছে অনেক গুলো কারন। যার মধ্য থেকে খেলাফত থেকে রাজতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন প্রধান। খেলাফত ব্যবস্থায় শাসকশ্রেণী ছিলেন ইসলামের পাবন্দ। তাঁদের কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ফলে যে সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তা ছিল নবূয়তী নূরে প্রদীপ্ত। কিন্তু খেলাফত স্থানে রাজতন্ত্র স্থান করে নেয়ায় মুসলমানদের মধ্যে অদৃষ্টবাদের ভ্রান্ত ধারনা ও মানুষের ক্ষমতার আকীদা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আর এ সব আকীদ্ ামুসলমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়ে দীনগত, শাস্ত্রগত এবং চিন্তাগত উদ্ভাবনী চিন্তার ক্রম বিকাশকে থামিয়ে দেয়। যদিও অনেক রাষ্ট্রশক্তি বৈজ্ঞানিক ও প-িতদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, কিন্তু তাদের কাজকে সরকারী কর্মচারীদের কাজের তুলনায় নি¤œমানের বলে বিবেচনা করেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, “খলিফা হাকিম (৯৯৬-১০২১)কর্তৃক কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান সভায় বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র ২৫৭ দিনার (১৮২.৫০ সিরকা ),তন্মধ্যে পা-ুলিপি নকল করার কাগজের জন্য ৯০ এবং গ্রন্থগারিক ও কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৬৩ দিরহাম ব্যয় হত।”(১৫) পক্ষান্তরে একজন কর্মচারীকে মাসিক এক হাজার দিরহাম ভাতা দিলেও খুশি হত না। 

আধ্যাত্মিক ধর্ম প্রচার এবং পার্থিব ধর্মপ্রচার দুটিই অবিচ্ছেদ্য। ‘লুই মেসিগণ’-এর মতে কোরআন হল একটি ‘বিশ্ব রাষ্ট্রের প্রত্যাদিষ্ট বিধান।’ কিন্তু রাজ তন্ত্র তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য কোরআনকে বিধান হিসেবে ত্যাগ করল। ফলে তাদের মধ্যে জন্ম নিল আত্মপূজা ও প্রতিহিংসার প্রবণতা, যা তাদের প্রশাসনিক যোগ্যতা ও সামরিক যোগ্যতাকে ধ্বংস করেছিল। আর এইসুযোগে বিভিন্ন শক্তি তাদেরকে দুর্বল করে দিল। খাওয়ারিজম রাজ্যের পতন, বাগদাদ নগরীর ধ্বংস ইত্যাদি ভ্রান্ত ‘রাজতন্ত্র’শাসন ব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি। 

শরিফ মারদিনের মতে রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বের উপর মুসলিম রাষ্ট্র শক্তি নির্ভর করে। সরকারি কোষাগার আল্লাহর কোষাগার, রাষ্ট্রের সৈন্যবাহিনী আল্লাহরই আনুগত্যশীল সৈন্যবাহিনী। সরকারী কর্মচারী আল্লাহরই আনুগত্যশীল কর্মচারী।(১৬) রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সার্বভৌম কর্তৃত্বের এই ধারণা পাল্টে যায়। যার পরিণতিতে ইসলামী শক্তিকে দুর্বল করার বিভিন্ন কারণ গুলো শক্তি অর্জন করে মুসলিম সভ্যতার বিপর্যয় ঘটায়। 

মুসলিম সব্যতার বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (র.) তাঁর বিখ্যাত ‘ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ গ্রন্থে লেখেন, “মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রধান্যের ভিত্তি স্থাপিত হয় চিন্তা- গবেষণা ও জ্ঞান সাধনার ওপর। যে জাতি এ পথে অগ্রগামী হয় সেই দুনিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তত্বের আসন অলংকৃত করে ; তার চিন্তাধারা গোটা দুনিয়াকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। পক্ষান্তরে যে জাতি এ ক্ষেত্রে পেছনে পড়ে থাকে, তাকে স্বভাবতই অন্যের অনুবর্তী ও অনুসারী হয়ে থাকতে হয়। ... ... মুসলমানরা যতদিন সত্যানুসন্ধিৎসা ও জ্ঞান সাধনার পথে অগ্রসর হচ্ছিল, দুনিয়ার সমস্ত জাতি তাদের অনুসরণ ও অনুবর্তন করে চলছিল। ... কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে চিন্তানায়ক ও গবেষকের আবির্ভাব যখন বন্ধ হয়ে গেল, চিন্তা -ভাবনা সত্যনুসন্ধিৎসা তারা ত্যাগ করল এবং জ্ঞান সাধনা ও চিন্তা গবেষণার পথে ক্লান্ত হয়ে পড়ল, তখন তারা দুনিয়ার নেতৃত্ব থেকেই যেন অবসর গ্রহণ করল। অন্যদিকে পাশ্চাত্য জাতিগুলো এই সকল ক্ষেত্রেই দ্রুত বেগে এগিয়ে চলল। আর চিন্তা গবেষণা শক্তিকে কাজে লাগাল; বিশ^প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনে আত্মনিয়োগ করল। প্রকৃতির অন্তর্নিহিত শক্তিগুলোর উৎস সন্ধান করল। এর অনিবার্য ফল যা হবার তাই হল। পাশ্চাত্য জাতিগুলো দুনিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসল দখল করে বসল। আর এক দিনে যেমন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের সামনে নতি স্বীকার করে ছিল, তেমনি-তাদেরকে পাশ্চাত্য জাতিগুলোর কর্তৃত্ব মেনে নিতে হল।”(১৭)

মুসলমানদের এ সব কারণসমূহ সামনে নিয়ে আবার সব মুসলমানদেরকে ভাবতে হবে এবং কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। মুসলমানদেরকে যদি উন্নতি ও প্রগতির পথে অগ্রসর হতে হয়, যদি শক্তিমান ও মর্যাদাবান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে হয়,তা হলে ঈমানের ক্ষেত্রে চরম মজবুতি, আইনানুবর্তিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ আনুগত্যশীল হতে হবে। ঈমান ও আনুগত্যতা তাদের মাঝে এমন নির্মল চরিত্র ও নৈতিকতা পয়দা করবে যার প্রভাব শক্তি দিক-দিগন্তে জনতার মাঝে ছড়িয়ে গিয়ে বিজয়ের সূচনা সৃষ্টি করবে। ঈমানের নৈতিক শক্তি তাদেরকে চিন্তার জগতে ঐক্য প্রতিষ্ঠার রক্ষ্যে পরস্পরকে কাছে টেনে আনবে। ফলে তারা এমন শক্তিশালী ও সুদৃঢ় জাতিতে পরিণত হবে যে,তাদের মোকাবেলায় অন্য সব শক্তি পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হবে। জ্ঞানের চর্চা ও আত্মিক আন্দোলন যদি শুধু নৈতিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে তাহলেই গোটা বিশে^র নেতৃত্ব এ সব ভাল মানুষগুলোর হাতে আসবে না। বরং চরিত্র মাধুর্যের সাথে জ্ঞান ও কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা অর্জন করবে গোটা বিশ^ সভ্যতা তাকে অনুসরণ করবে। যদি মুসলিম সমাজ এমন চিন্তাবিদদের জন্ম দিতে পারে যে যাদের চিন্তা গবেষণা, অন্বেষণ অনুশীলন ও বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের প্রবল বন্যা পাশ্চাত্য সভ্যতার গোটা ভিত্তিমূলকে ধসিয়ে দিতে সক্ষম হবে তাহলেই বিশ^ সভ্যতা নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য মুসলমানদেরকে সামনে এগিয়ে দেবে। 

এ জন্যই আজকের প্রয়োজন খোলাফায়ে রাশেদার আলোকে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। এমন ব্যবস্থা কায়েম হলে পুনরায় বিশ্বমুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তা পাশ্চাত্যের সামরিক-সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। আবার যদি মুসলমান কোরআনকে মজবুতভাবে আকড়ে ধরে, যদি কোরআন নির্দেশিত চিন্তা গবেষণা পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলীর পর্যবেক্ষণ ও রহস্যাবলীর অনুসন্ধান করে, কোরআনের শিক্ষা সামনে রেখে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নয়া ইমারত গড়ে তোলে, বিজ্ঞান, দর্শন,অর্থনীতি ও নীতিশাস্ত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে, তা হলেই গোটা বিশ^আবার মুসরমানদের ইমামত মেনে নেবে। স্থবিরতা দ্বারা গতিশীলতার মোকাবেলা করা যায় না। তর্ক শাস্ত্রের বদৌলতে যুগের গতি বদলিয়ে দেয়া যায় না। যুগকে বদলিয়ে দিতে চাই সিংহদিল একটি মজবুত দলের, যাদের দিলে স্থিতি লাভ করে কোরআনী জ্যোতি আর তাদের আচরণে ও কর্মতৎপরতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সাহাবাদের আদর্শ। যখন মুসলিম জাতি প্রকৃত ইসলামী চরিত্রের অধিকারী হবে, হবে সত্যনিষ্ঠ, বিশ্বাস পরায়ন ও মানবতার খেদমতগার, তখন তারা সক্ষম হবে গোটা বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে। 

তথ্য সূত্র :

১) ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব-পৃ. ৪৮-৪৯

২) ইতহাসের মুখবন্ধ-ইবনে খলদুন 

৩) তারগিবও তারহিব 

৪) সুরা নহল -১২৫

৫) আলে ইমরান -১০৪

৬) প্রাচ্যের উপহার -পৃ. ১৯৯-২০০; সাইয়েদ হাসান আলী নদভী।

৭) প্রাচ্যের উপহার- পৃ.-২০২-২০৩

৮) ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব-পৃ. -১৪-১৫

৯) প্রাচ্যের উপহার -সাইয়েদ হাসান আলী নদভী।

১০) ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব-পৃ. ১৩৪

১১) মুসলমান সংস্কৃতি-পৃ. ১০৫; ভি. ভি. বারটল্ড

১২) ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব-পৃ. ২২২

১৩) ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম- পৃ. ২৪০, ড. মাযহার উদ্দীন সিদ্দীকী

১৪) ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব-পৃ. ৮

১৫) মুসলমান সংস্কৃতি-পৃ. ৪৮; ভি. ভি. বারটল্ড

১৬) ইসলামী ফাউন্ডেশন পত্রিকা. জানুয়ারি -মার্চ-১৯৮১ 

১৭) ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব-পৃ. ৩-৪।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ