ঢাকা, রোববার 03 February 2019, ২১ মাঘ ১৪২৫, ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জলদস্যুদের কবল থেকে নগরীর সুরক্ষায় নির্মিত ঐতিহাসিক মুঘল স্থাপত্য ‘ইদ্রাকপুর দুর্গ’

 

মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান:

নদীবেষ্টিত রাজধানী ঢাকা। মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের কবল থেকে নগরটিকে সুরক্ষিত রাখতে মুঘল আমলে ইছামতী নদীর তীরে নির্মাণ করা হয় ইদ্রাকপুর কেল্লা বা দুর্গ। ইছামতী ও মেঘনার সঙ্গমস্থলে দুর্গটি তখন সামরিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ধারণা করা হয়, এটির নির্মাণকাল বাংলার মুঘল সুবাদার মীর জুমলার শাসনকালে (১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দ)। মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের কালের সাক্ষী অনেক ইমারতের মধ্যে একটি হলো ইদ্রাকপুর কেল্লা। সে সময়ে সামরিক কারণে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইটের তৈরি এই দুর্গটি তৎকালীন মগ জলদস্যু ও পর্তুগিজ আক্রমণের হাত থেকে ঢাকা ও নারায়নগঞ্জসহ সমগ্র এলাকাকে রক্ষা করার জন্য নির্মিত হয়। মোঘল স¤্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলার সুবাদার ও সেনাপতি মীর জুমলা ১৬৬০ খ্রীস্টাব্দে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরে তদানীন্তন ইছামতি নদীর পশ্চিম তীরে ইদ্রাকপুর নামক স্থানে এই দুর্গটি নির্মান করেন। প্রায় ৩৬০ বছরের পুরোনো স্থাপনাটির অবস্থান বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরে। কালের পরিক্রমায় সেই ইছামতীর গতিপথ পাল্টে গেছে। তবে দুর্গটির এক থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে ধলেশ্বরী, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদী এখনো বহমান। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর সম্প্রতি ইদ্রাকপুর কেল্লা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুর্গের ভেতরে জাদুঘর ও সংস্কৃতিকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। প্রথম ধাপের কাজও ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আর দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরুর প্রক্রিয়াও প্রায় চূড়ান্ত।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রকাশিত মুন্সিগঞ্জের ইতিহাস (২০০৩) বইয়ে দুর্গটি সম্পর্কে লেখা হয়েছে, বারভূঁইয়াদের দমনের উদ্দেশ্যে এবং ঢাকাকে জলদস্যুদের কবল থেকে রক্ষার জন্য সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬০ সালে ইদ্রাকপুর দুর্গ নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, এ দুর্গকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মুন্সিগঞ্জের বসতি। স্থাপনাটি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ইদ্রাকপুর নামে একটি এলাকাও রয়েছে।

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় মুঘলদের পতন হলে ইদ্রাকপুর দুর্গটি ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ কর্তৃপক্ষ ইদ্রাকপুর দুর্গটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে মহকুমা গঠিত হওয়ার পর প্রশাসকেরা ইদ্রাকপুর দুর্গকে বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। জেলা প্রশাসকেরাও একই ধারা অনুসরণ করেন। একপর্যায়ে দুর্গটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়লে জেলা প্রশাসকদের জন্য নতুন বাংলো নির্মাণ করা হয় এবং দুর্গের ওপরে নির্মিত বাংলোটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর গত বছর দুর্গটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ইট নির্মিত চার কোনা দুর্গটি উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত এবং এর দৈর্ঘ্য ৮৬.৮৭ মিটার ও প্রস্থ ৫৯.৬০ মিটার। দুর্গটির গায়ে বন্দুকের গুলি চালানোর উপযোগী ফোকর আছে। লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, ড্রামের পাদদেশে ভূগর্ভস্থ একটি কুঠুরি এবং কুঠুরিতে অবতরণের জন্য নির্মিত সিঁড়ি। জনশ্রুতি আছে, সিঁড়িটি ছিল একটি গোপন সুড়ঙ্গপথের অংশ, যার মধ্য দিয়ে দুর্গে অবস্থানকারীরা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরে যেতে পারত। আসলে সিঁড়িটি ছিল ভূগর্ভস্থ একটি গোপন কক্ষে অবতরণের পথ। আর কক্ষটি ছিল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত রাখার গুদামঘর। ইন্দ্রাকপুর কেল্লার  দর্শনীয় দিকসমুহ: চতুর্দিকে প্রাচীর দ্বারা আবৃত দূর্গের মাঝে মূল দূর্গ ড্রামের মধ্যে। দূর্গের প্রাচীর শাপলা পাপড়ির মতো। প্রতিটি পাপড়িতে ছিদ্র রয়েছে। ছিদ্র দিয়ে কামান ব্যবহার করা হতো। দূর্গের উত্তর দিকে বিশালাকার প্রবেশদ্বার রয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে মূল দূর্গের চূড়ায় উঠা যায়। দুর্গটি নারায়নগঞ্জের হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দা দুর্গের চেয়ে আয়তনে কিছুটা ছোট ৮২ মি. * ৭২ মি. আয়তাকার নির্মিত ইটের তৈরি। সুরঙ্গপথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সাথে এই দুর্গের যোগাযোগ ছিল বলে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। সুউচ্চ প্রাচীরবিশিষ্ট এই দুর্গের প্রত্যেক কোনায় রয়েছে একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী। দুর্গাভ্যন্তর থেকে শত্রুর প্রতি গোলা নিক্ষেপের জন্য প্রাচীরের মধ্যে অসংখ্য চতুষ্কোনাকার ফোঁকর রয়েছে একমাত্র খিলানাকার দরজাটির অবস্থান উত্তর দিকে। মূল প্রাচীরের পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে ৩৩ মিটার ব্যাসের একটি গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে। দূর থেকে শত্রুর চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য প্রায় প্রতি দুর্গে এই ব্যবস্থা ছিল। এই মঞ্চকে ঘিরে আর একটি অতিরিক্ত প্রাচীর মূল দেয়ালের সাথে মিলিত হয়েছে। দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সূদৃঢ় করার জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল। কেল্লাটির তিন কিলোমিটারের মধ্যেই ইছামতী, ধলেশ্বরী, মেঘনা এবং শীতলক্ষা নদীর অবস্থান। মোঘল স্থাপত্যের একটি অনন্য কীর্তি হিসেবে ইদ্রাকপুর দুর্গটি ১৯০৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। দুর্গটির অপর লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য হলো ড্রামের পাদদেশে ভূগর্ভস্থ একটি কুঠরি এবং কুঠরিতে অবতরণের জন্য নির্মিত সিড়ি। লোকশ্রুতি মতে, এ সিড়িটি ছিল একটি গোপন সুরুঙ্গপথের অংশ যার মধ্যে দিয়ে দুর্গে অবস্থানকারীরা কোনো জরুরি অবস্থায় নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরে যেতে পারত। বস্তুত এ সিড়িটি একটি গোপন ভূগর্ভস্থ কক্ষে অবতরণের পথ এবং সে কক্ষটি ছিল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত রাখার গুদামঘর। 

ইট নির্মিত চতুর্ভুজাকৃতির এ দুর্গটি উত্তর দক্ষিণে প্রসারিত এবং এর দৈর্ঘ্য ৮৬.৮৭ মিটার ও প্রস্থ ৫৯.৬০ মিটার। দুর্গটিতে রয়েছে দুটি অংশ। এর প্রথম অংশ হলো শীর্ষভাগ খিলানকার ফোকর বিশিষ্ট মারলন শোভিত প্রাচীর বেষ্টিত উন্মুক্ত চত্বর। বেষ্টন প্রাচীরের চারকোণে রয়েছে শীর্ষভাগ মারলন শোভিত চারটি গোলাকার সন্নিহিত বুরুজ। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর ঢাকা অঞ্চল কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে দুর্গ সংস্কার ও জাদুঘর নির্মাণের জন্য ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের জুন থেকে ২০১৪ সালের জুনের মধ্যে ওই অর্থ ব্যয় করা হয়। এ কাজের অংশ হিসেবে দুর্গের ওপরের বাংলোটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে আঞ্চলিক সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। জাদুঘর স্থাপন ও সংস্কারের বাকি কাজের জন্য দ্বিতীয় ধাপে পাঁচ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্প নিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর। সেই প্রকল্পটি এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়। 

দুর্গের ড্রামের উপরিভাগে পরবর্তী সময়ে নির্মিত ভবন বর্তমানে জেলা প্রশাসকের আবাসস্থল। দুর্গটি এখন কারাগাররূপে ব্যবহৃত।  

সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্গের প্রাচীরে চুন-সুড়কি দিয়ে রং করা। পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত পুরোনো জেলখানা ভবনে জাদুঘর স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। দুর্গের ভেতরে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয় ও তাদের কর্মচারীদের থাকার জন্য ছোট ছোট নির্মিত ঘর সার্বিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে। বাইরে প্রধান ফটকের পাশে পৌরসভার নির্মিত শৌচাগারটি দুর্গের সৌন্দর্যে আরও একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগ সূত্র জানায়, দুর্গের ভেতরে ও বাইরে শৌচাগার, ডাকবাংলো, কার্যালয়সহ যেসব স্থাপনা আছে এগুলো সরিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ এগুলো দুর্গের সৌন্দর্য বিনষ্ট করছে।

ইন্দ্রাকপুর দুর্গে যেভাবে যাবেন: এই দুর্গটির তিন কিলোমিটারের মধ্যেই ইছামতি, ধলেশ্বরী মেঘলা এবং শীতলক্ষা নদীর অবস্থান । এইসব নদীর কারনে দুর্গটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মুন্সীগঞ্জ সদরের কাছে পুরাতন কোর্ট অফিস সংলগ্ন মুক্তারপুর থেকে অটো রিক্সায় আনুমানিক ১০ টাকা বা রিক্সা যোগে আনুমানিক ২০-২৫ টাকায় ইদ্রাকপুরের কেল্লায় যাওয়া যায়। এছাড়াও আপনি নিজস্ব মাইক্রো অথবা প্রাইভেট কার নিয়েও যেতে পারেন এই স্থানে। আবার ঢাকার গুলিস্তান থেকে মুন্সিগঞ্জগামী বাসে সদরের কাচারি নামতে হবে। এখান থেকে রিক্সায় ইন্দ্রাকপুর কেল্লায় যেতে হবে। অথবা যেকোন যায়গা থেকে কমলাপুর, সেখান থেকে ট্রেনে নারায়নগঞ্জ। এরপর সময় লাগবে ১ ঘন্টার মত, তারপর বন্দরে যেয়ে মুন্সিগঞ্জগামী ছোট লঞ্চ এ চড়ে মুন্সিগঞ্জ। সময় লাগে ৩৫-৪০ মিনিট। ৩০ মিনিট পর পরই লঞ্চ ছাড়ে। মুন্সিগঞ্জ ঘাটে নেমে রিকশায় ২০ টাকা ইদ্রাকপুর দুর্গের সামনে।

থাকার জায়গা : ঢাকা থেকে দিনে দিনে মুন্সিগঞ্জ ভ্রমণ শেষ করে ফিরে আসা সম্ভব। তাছাড়া জেলাশহরে থাকার সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। শহরের দু-একটি হোটেল হলো হোটেল থ্রি স্টার এবং হোটেল কমফোর্ট। এসব হোটেল ১৫০-৬০০ টাকায় থাকার ব্যবস্থা আছে। ভ্রমণে গেলে মুন্সিগঞ্জের জায়গাগুলো দেখে সবশেষে পদ্মা রিসর্টে এসে থাকলে ভালো লাগবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ