ঢাকা, সোমবার 04 February 2019, ২২ মাঘ ১৪২৫, ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

উপজেলা নির্বাচন কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া হবে?

এইচ এম আব্দুর রহিম : এ সরকারের অধীনে ঐক্যফ্রন্ট আর নির্বাচনে অংশ নিবে না বলে জানিয়েছে। ফলে এ উপজেলা নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যে কারণে সরকারি দলের প্রার্থীরা  দেশের সব উপজেলায় নিশ্চিতভাবে বিজয় অর্জন করতে যাচ্ছে। এদিকে নির্বাচন কমিশন আগামী মার্চে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ অবস্থায় বিরোধী দল উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা মানে নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া বলে মন্তব্য করেছেন।   
নিবাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। ১৯৮৫ সালে উপজেলা পরিষদ চালু হওয়ার পর ১৯৯০ ও ২০০৯ সালে একই দিনে সব উপজেলায় ভোট হয়ে ছিল। ২০১৪ সালে সব উপজেলায় ছয় ধাপে ভোট করেছিল তৎকালীন ইসি। সেই ধারা বজায় রেখে এবার বিভাগওয়ারী ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ৮বিভাগের ভোট হবে চার দিনে। একই দিনে দুই বিভাগের ভোট হবে। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি দেখে বাকীগুলোর ভোট হবে পঞ্চমধাপে। উপজেলা ভোটেও ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহার করবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন। আগে উপজেলা নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হলে এবার হবে দলীয় প্রতীকে। আদালতের আইনিবাধা কেটে যাওয়ার পর এরই ফাঁকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপ-নির্বাচন করে ফেলতে পারে ইসি এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। ফলে এ নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের কোন আগ্রহ নেই। নির্বাচনে প্রশাসন যন্ত্র ব্যবহার করে বিজয় নিশ্চিত করতে চায় তারা। এ ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ নেই। দলীয় সরকারের অধীনে দলীয় প্রতীক নিয়ে সরকার আর কাউকে হারাতে চাচ্ছে না। অনেকের মন্তব্য এ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে।  
 একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে শত প্রতিকূলতার মধ্যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে খানিকটা আলো দেখা দিয়েছিল। একাদশ সংসদ নির্বাচন সবার অংশপ্রহমূলক থাকলেও নানা প্রশ্ন ছিল নানা মহলে। অনেকে বলেছিল নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ বড় বিষয় নয় নির্বাচনটি অবাধ নিরপেক্ষ হওয়া বড় বিষয়। কিন্তু গত ৩০ ডিসেন্বরের নির্বাচনে সবার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এই নির্বাচন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও স্বচ্ছ রাজনীতির বিষয়ে নানা প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।  বাংলাদেশে কার্যকর গণতন্ত্র আছে কিনা প্রশ্নটি ইতিমধ্যে বহুবার উঠে এসেছে ভিন্ন পেক্ষাপটে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ও ২০১৮ সালের ৩০ শে জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রশ্নটি আবারও উঠে এসেছে এবং  বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করায়। একাদশ সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে এক কথায় বলা যায়, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত বার্তা দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে এদেশে চালু নেই এ নির্বাচনের মাধ্যমে তা  শতভাগ প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৯১সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সে নির্বাচনে পরাজিতদের কিছু অভিযোগ থাকলেও সে নির্বাচন সবার কাছে বৈধতা পেয়েছিল। দেশের অবস্থা  দেখে মনে হচ্ছে উল্টো চলছে গণতন্ত্র। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করা সম্ভব নয় তা আবার প্রমাণিত হলো। এই অবস্থায় গণতন্ত্রের দশা দিন দিন বিপন্ন থেকে বিপন্নতর হচ্ছে।  পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে কি না। নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট যে প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে, সেখানে গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। উপরন্তু বাংলাদেশ কে যেভাবে আখ্যায়িত করেছে তা লজ্জা ও অনুতাপের। একটি গণতান্ত্রিব রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনেক কিছু নির্ভর করে দেশে নির্বাচনের মান কতটা ভাল কিংবা স্বচ্ছ হল এর উপর। গণতন্ত্র একধরনের ব্যবস্থা। এ ধরনের সিস্টেম। সবার আশা-আকাক্সক্ষা ধারণ করে গণতন্ত্র। গণতন্ত্র বসবার জীবনকে স্পর্শ করে সবার জন্য। সবার জন্য রচনা করে বলিষ্ঠ জীবনবোধ। সম স্বার্থে ও মোহনায় সবাই কে করে।  সবার জন্য রচনা করে  এক বলিষ্ঠ জীবনবোধ। সমস্বার্থেও মোহনায় সবাইকে করে সম্মিলিত। সমস্বার্থের সুসম বন্ধনে সবাইকে করে সংগ্রথিত। সাম্যমৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্বের উপত্যকায় সবাইকে করে সংগঠিত। এই ব্যবস্থায় সংখ্যাগুরু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্ব সংখ্যা লঘুরও। অন্য দিক থেকে গণতন্ত্র এক প্রক্রিয়াও বটে। এই প্রক্রিয়া ব্যক্তি স্বীকৃতি হয় স্বতন্ত্র,অনন্য,একক রুপে। কারও  ওপর সে নির্ভরশীল  নয়। নয় কারও মুখাপেক্ষী।  আপন মহিমায় সবাই ভাস্বর। তার সম্মতি ছাড়া শাসন করার অধিকার কারো নেই।  তার সম্মতি ছাড়া তার ওপর কর ধার্য করার অধিকার নেই কারো। তা ছাড়া যে কোন নীতি নির্ধারণে এই প্রক্রিয়ায় সর্বাধিক সংখ্যক ব্যক্তির ইচ্ছা হয় প্রতিফলিত। সবার সম্মতি নিয়ে সমাজ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়।  সংখ্যাগুরু আর সংখ্যা লঘু একই সঙ্গে কাজ করে। আর এ দিক থেকে বলা যায় গণতন্ত্র এ দিক থেকে এক ধরনের নৈতিকতা। পরিশীলিত কর্ম প্রবাহ। রুচিকর এক যৌথ উদ্যোগ।  পরিচ্ছন্ন ও সচেতন এক পদক্ষেপ। গোপনীয়তার জমাট বাঁধা অন্ধকার ছাপিয়ে গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের শুরু হয়।  সর্ব সাধারণের সমক্ষে, মুক্ত আলোয়।  যড়যন্ত্রের অন্ধকার গুহা থেকে বের হয়ে আসে সামগ্রিক কর্মকাণ্ড। বেরিয়ে আসে প্রকাশ্য দিবালোকে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে হয় বলে সমমানসিকতা প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক কার্যক্রমে। অন্যের দিকে তাকিয়ে নির্ধারণ করে নিজেদের পদক্ষেপ। নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের আচার আচরণ। আমার জন্য যা পীড়াদায়ক অন্যের জন্য সুখকর হতে পারে না।  আমি যা খুশি করব তা তো হতে পারে না।  সত্যের ভিত্তিতে তৈরী হয়েছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।  এই সংস্কৃতি চর্চা ছাড়া গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে কৌশল রুচিসম্মত।  তার চর্চা হয় অবাধ মুক্ত পরিবেশে। নীরবে নয় তারস্বরে। নির্জনে নয়,জনারণ্যে। সুতরাং একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র হল উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি। সুরুচিকর প্রতীক। স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাতন্ত্র্যের প্রতিচ্ছবি। সাম্য, মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্বের নিশ্চিত নীড়।  প্রক্রিয়া হিসেবে গণতন্ত্র হল সহযোগিতার সূত্র। আস্থা ও বিশ্বাসের অন্তরঙ্গ সুর। সমঝোতার ক্ষেত্র। মুক্তবুদ্ধির বিস্তীর্ণ অঙ্গন। এ দিক থেকে গণতন্ত্র যেমন উপায়, তেমনি উপেয়। সমাজ জীবনে লক্ষ্য মাধ্যম। গন্তব্য ও পথ দুই ই। সফল গণতন্ত্রের কয়েকটি অঙ্গীকার রয়েছে  ও এক. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার যে ক্ষমতা প্রয়োগ করে তা জনগণের ক্ষমতা সরকার আমানত হিসেবে সেই ক্ষমতা ধারণ করে প্রয়োগ করে তা জনগণের ক্ষমতা সরকার আমানত হিসেবে সেই ক্ষমতা ধারণ করে প্রয়োগ করে রাজনৈতিক সমাজের অনুমোদিত পন্থায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ  হলে। সমাজ কর্তৃক অনুমোদিত পন্থা অনুসরণে ব্যর্থ হলে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। গণতান্ত্রিক এই সত্য স্বীকৃত হতে হবে। দুই. গণতন্ত্রে ব্যক্তি প্রাধান্যের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয় আইনের প্রাধান্য।  প্রতিষ্ঠিত হয় আইনের রাজত্ব। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন সার্বজনীন আইনের প্রতি আনুগত্য, কোন ব্যক্তির প্রতি নয়, তা তিনি যত প্রভাবশালী হন না কেন।  অথবা উঁচু পদে অধিষ্ঠিত থাকুক না কেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আর একটি ব্যবস্থা হল আইন মেনে চলতে হবে, যদিও তা খারাপ আইন হয়ে থাকে।  আইন প্রণয়ন করেন জনপ্রতিনিধিরা। আইন পরিবর্তনও করেন তারা । গণতন্ত্রে সবাই আইন মেনে চলতে হবে। মন্দ আইন হলে তা প্রবর্তিত হয়। কিন্তু যত দিন প্রবতির্ত না হবে তত দিন মানতে হবে।  তিন. গণতান্ত্রিক পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন।  এখানে জোরের যুক্তির পরিবর্তে যুক্তির জোর কার্যকর হয়। সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয় সমঝোতা ও বিশ্বাষের ভিত্তিতে । সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক কাঠামো, তেমনি প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মন।  প্রয়োজন কাঠামোর সর্বস্তরে স্পন্দিত অন্তঃকরণ।  কাঠামোকে সিক্ত করার জন্য গণতান্ত্রিক চেতনার আস্তরণ। গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে দুই অপরিহার্য কাঠামো সৃষ্টি করে নৈতিক এক পরিমন্ডল। রচনা করে গণতান্ত্রিক সমাজের প্রাথমিক পর্যায়। কিন্তু গণতান্ত্রিক কাঠামোর গণতান্ত্রিক মনের প্রসার ঘটানো,কাঠামোকে  প্রাণোচ্ছল করাই চূড়ান্ত পর্ব। উল্লিখিত বিষয়গুলো গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।  আমরা গণতন্ত্র গণতন্ত্র যতই কথা শুনছি না কেন কিন্তু এসব শর্তের কোন উপস্থিতি কি বিদ্যমান অবস্থার মধ্যে কি লক্ষ্য করা যায়?। আমাদের ক্ষমতাসীন মহল মনে করে, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মান নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠার অবকাশ নেই। তাদের নীতি নির্ধারকদের  বক্তব্য হলো, কিছু প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কে প্রশ্ন বিদ্ধ করার চেষ্ঠা করছে। আমরা মনে করি এ নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য একটি টেস্ট কেচ ছিল। কারণ বিগত ২৭ বছরের মধ্যে এবারই দলীয় ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে সব দলের অংশ গ্রহণে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দলীয় কিংবা ক্ষমতাসীনদের অধীনে ভাল নির্বাচন হতে পারে, নানা রকম সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই ধারণা পোষণ করতে পারেনি শাসক মহল।  এই ক্ষতের উপশম হবে কিভাবে? বিদ্যমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দেয় যে, বাংলাদেশের বেহাল অবস্থা। এ জন্য দায়ী অসুস্থ রাজনীতি। গণতন্ত্র কে গতিশীল করতে হলে রাজনীতি কল্যাণমুখী  করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। প্রয়োজন রাজনীতিকে ক্ষমতার-রাজনীতির পুঁতিগন্ধময় গহ্বর থেকে উদ্ধার করা। প্রয়োজন ব্যক্তি প্রাধান্যের নিগড় থেকে মুক্ত করে আইনের রাজত্বে ফিরিয়ে আনা। রাজনীতি তার সনাতন বিশুদ্ধ রুপ ফিরে পেলে আজকে সমাজ জীবন যে ঝড়ো হাওয়ার কবলে পড়ে অহর্নিশ ছটফট করছে তা থেকে অব্যাহতি পাবে। সন্ত্রাসের কবল থেকে মুক্তি লাভ করবে। সংঘাতময় পরিবেশের অবসান ঘটবে। শুচিতা ফিরে আসবে। যুক্তি-বুদ্ধির প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। জনগণ আবার হয়ে উঠবে শাসন-প্রশানের প্রধান নিয়ামক। এই অবস্থা আপনা-আপনি আসবে না। এ জন্য প্রয়োজন সচেতন উদ্যোগ। সমাজের বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী-জ্ঞানীগুনি ও সচেতন অংশের সচেতন উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরী।
Ñলেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ