ঢাকা, মঙ্গলবার 05 February 2019, ২৩ মাঘ ১৪২৫, ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ইসলামী ঐক্য : সময়ের অপরিহার্য দাবি

ড. মো. নূরুল আমিন : গত বৃহস্পতিবার সড়ক পথে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। ২০১৭ সাল থেকে আমি নিয়মিত কক্সবাজার যাই এবং আকাশপথকেই প্রাধান্য দেই। এ পথের সুবিধা হচ্ছে ঢাকা থেকে ৪৫ মিনিটেই আপনি কক্সবাজার পৌঁছে যেতে পারেন। এয়ার লাইন্সগুলোর সার্ভিস মোটামুটি ভাল। তবে ভাড়াটা তাদের ইচ্ছামত বৃদ্ধি করে। ওয়ানওয়ে ভাড়া ৪৭০০ টাকা থেকে কখনো কখনো ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়েছে। সময় বাঁচানো এবং নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সারার জন্য কেউ এর প্রতিবাদ করেন না, আসা-যাওয়ায় ৯৪০০.০০ টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করেন। এবার খবর নিয়েছিলাম একটি এয়ারলাইন্সে ওয়ানওয়ে ৪৭০০.০০ টাকা, অন্যগুলোতে ৫২০০.০০ টাকা অর্থাৎ আসা যাওয়া জনপ্রতি ৯৪০০.০০ টাকা থেকে ১০৪০০.০০ টাকা। আমার আরো দু’জন সাথী ছিলেন। ভাবলাম এবার সড়ক পথে যাই। তেল, গ্যাস টোল সব মিলিয়ে ড্রাইভার সাড়ে তের হাজার টাকার বাজেট দিলেন। দেখলাম তুলনামূলকভাবে খরচ কম। ২০০৩ সালে সর্বশেষ সড়কপথে কক্সবাজার সফর করেছিলাম। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ৫ ঘন্টা এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার আড়াই ঘন্টা অর্থাৎ সাড়ে সাত ঘন্টা সময় লেগেছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজ সম্পন্ন হবার পর হিসাব অনুযায়ী এই দূরত্ব পার হতে আরো কম সময় নেয়ার কথা। যাইহোক, সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে তিনটায় চট্টগ্রাম এবং সাড়ে সাতটায় কক্সবাজার পৌঁছলাম। কুমিল্লার মিয়ামিতে চা-নাস্তা, সাতকানিয়ায় দুপুরের খাবার ও জোহরের নামাজ সেরেছি। শুক্রবার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছি এবং শিবিরের সদ্য বিবাহিত কয়েকটি রোহিঙ্গা দম্পতির সাথে কথা বলেছি।
বলা নিষ্প্রয়োজন যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধভিক্ষুদের হাতে নির্যাতিত হয়ে পালিয়ে আসা প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান উদ্বাস্তু হিসাবে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ এবং রামুর বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। এর মধ্যে কুতুপালং, বালুখালী, হাকিমপাড়া, টেংখালী, জামতলি প্রভৃতি ক্যাম্পেই অবস্থান করছেন প্রায় ১২ লাখ শরণার্থী। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে দ্বিতীয় পর্যায়ে শরণার্থী সমাগম শুরু হবার পর বহুবার কক্সবাজার সফর করেছিলাম। তাদের আবাসন, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা, রান্না-বান্না, গোসল ও টয়লেট ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পানির সংস্থান, পয়ঃনিষ্কাশন প্রভৃতি ক্ষেত্রে শুরুতে সীমাহীন বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল। প্রশাসন শক্ত হাতে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে একটি সুশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। এবার এই অবস্থাটি দেখে খুব ভাল লাগলো। রাস্তার দু’ধারে রিলিফ সামগ্রীর জন্য শরণার্থীদের হুমড়ি খেয়ে পড়তে হচ্ছে না। বিক্ষিপ্তভাবে সাহায্যদাতা দেশি-বিদেশি এনজিওগুলো ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে নিজেরাও সমস্যায় পড়ছে না। অন্যদেরও সমস্যায় ফেলছে না। সেনাবাহিনী ত্রাণ বিতরণ সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ করছে। এ জন্য তারা ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। শরণার্থীদের ভরণপোষণের বিষয়টি এখন অনেকটা সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে। তবে মেইক শিফট বেসিসে তাদের জন্য যে তাঁবুগুলো তৈরি করে দেয়া হয়েছিল সেগুলোর অবস্থা ভাল নয়। বাঁশের ফ্রেমের উপর পলিথিন শীট দিয়েই এগুলো তৈরি করা হয়েছিল। দেড় দু’বছরের ব্যবধানে এগুলো এখন নষ্ট হবার পর্যায়ে। আগামী বর্ষা মওসুমের আগে যদি মেরামত করা না হয় তাহলে বর্ষায় শরণার্থীদের ভোগান্তি বেড়ে যাবে।
শিবিরগুলোতে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি সংস্থা ত্রাণ কাজে জড়িত ছিল। এদের অনেকেই এখন নাই। জানা গেছে, সরকার ৪৭টি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওকে কক্সবাজারে কাজ করার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলিম এনজিও। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা শরণার্থীদের মধ্যে ইসলামী উন্মাদনা সৃষ্টি করে তাদের ‘জঙ্গিবাদে’ উৎসাহ দিচ্ছেন। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির অথবা তার বাইরে এর কোন লক্ষণ আমার নজরে পড়েনি। একটি মুসলিম দেশে নির্যাতিত মুসলমানদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ সরকার একটি প্রশংসনীয় কাজ করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম বা ইসলামী এনজিওগুলোকে তাদের মধ্যে কাজ করতে না দিয়ে তারা নিন্দিত হবার পথ কেন বেছে নিলেন তা বুঝা মুশকিল। ব্যাপ্টিস্ট মিশন, ইভেঞ্জালিষ্ট ইউনিয়ন, কেয়ার, কেরিটাস প্রভৃতির ন্যায় খৃস্টান এনজিওগুলো সেখানে কাজ করছে এবং বহু লোককে ধর্মান্তরিত করছে। রোহিঙ্গারা মুসলমান। মুসলমান হবার কারণেই মিয়ানমারে মার খাচ্ছে, জানমাল ইজ্জত হারিয়ে বাংলাদেশে এসে অমানবিক জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। তাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মিশনারীরা ধর্মান্তরের কাজ করছে। বহু এতিম ও অসহায় শিশুকে তারা দত্তক নিয়ে খৃস্টান বানানোর সুযোগ গ্রহণ করছে। তাদের টার্গেট ধর্মান্তর। সেটা না পারলে অন্ততঃ ভাল মুসলমান হিসাবে তারা যাতে থাকতে না পারে তার ব্যবস্থা করছে। অভিযোগ এসেছে যে, এমনকি ইউনিসেফের মত প্রতিষ্ঠানও রোহিঙ্গা মেয়েদের পর্দা নিরুৎসাহিত করছে। কিশোরী ও যুবতি মেয়েদের নাচগান ও উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে সেখানে যৌন উৎপীড়ন ও যৌন নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমা দেশের কিছু এনজিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, রয়াল পার্টির লোকজন এমনকি কিছু রোহিঙ্গা যুবকও এর সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তারা মেয়েদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মাঝিরা এখানে নীরব। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার কিশোরী ও যুবতি মেয়ে আছে। অনেক মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে, বিয়ে দিতে পারছে না। তাদের বাপ-মা সারারাত জেগে থেকে তাদের নিরাপত্তা দেয়। এটি বিরাট সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। ক্যাম্পসমূহে বিয়ের উপযুক্ত বহু ছেলেও আছে। এদের যদি বিয়ের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে এ সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে। মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য তাদের স্বামী শ্বশুররাও এগিয়ে আসবেন এবং বাংলাদেশের মাটি বিরাট একটি নৈতিক স্খলন থেকে রক্ষাই শুধু পাবে না আল্লাহর গজবও মুক্ত হবে। বিয়ে প্রতি ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা এখানে যথেষ্ট। বিত্তশালী/দানশীল ব্যক্তি এবং দেশি-বিদেশি এনজিওগুলো এই নৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে পারে বলে আমি মনে করি।
মুসলমান বলেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার। তাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব বিলীন হতে পারে না। ক্যাম্পের বাসিন্দা ও কিছু কিছু এনজিওর উদ্যোগে সেখানে বেশ কিছু মসজিদ ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা ও স্কুল গড়ে উঠেছিল। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। একইভাবে টয়লেট-বাথরুমসমূহের মেরামত এবং টিউবওয়েল পুনঃস্থাপন অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মধ্যে অনেকেই এখন তাদের কর্মসূচি সংকুচিত করে নিয়েছে। এই কাজগুলোর ব্যাপারে তারা সহায়তা করতে পারে।
রোহিঙ্গা শিবিরে সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি এবার আমার নজরে পড়েছে তা হচ্ছে যৌন হয়রানির সমস্যা, নৈতিক সমস্যা, মেয়েদের ইজ্জত আব্রুর সমস্যা। এই সমস্যাকে বড় সমস্যা এ জন্য মনে করছি যে এটা মানবজাতির অস্তিত্বের সমস্যা। টাকা হারালে টাকা পাওয়া যায়, স্বাস্থ্য হারালে তারও নিরাময় হয় কিন্তু চরিত্র হারালে সব কিছুই যায়। এই সংকটটি অধুনা বাংলাদেশে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও দেখা যাচ্ছে এবং ত্বরিৎ এর প্রতিকার দরকার। দ্বিতীয় বৃহত্তম যে সমস্যাটি এখানে রয়েছে সেটা হচ্ছে কর্মসংস্থানের সমস্যা। প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু এখানে আশ্রয় নিয়েছে, যার মধ্যে অন্তত: ৭ লক্ষ কর্মক্ষম ও বেকার। এখানে পুরুষ ও নারীর সবার একই অবস্থা। অলস মন শয়তানের কারখানা। ফলে সেখানে ঝগড়াঝাটি নিত্য ব্যাপার, অপরাধ প্রবণতা বেশি। দেশে থাকতে যে সমস্ত রোহিঙ্গা ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করতো এখানে তারা সে সুযোগ পাচ্ছে না। এই বিষয়গুলো ভেবে দেখা প্রয়োজন। শরণার্থীর এই বিশাল স্রোত কক্সবাজারের ডেমোগ্রাফির ভারসাম্য যেমন পাল্টে দিয়েছে তেমনি ল্যান্ড স্কেপও পাল্টে দিয়েছে। অর্থনীতিতে এসেছে বিরাট ধাক্কা। স্থানীয় জনসংখ্যা চাপে পড়েছে। এদের কর্মসংস্থানের যদি ব্যবস্থা না হয় তাহলে সংকট আরো বৃদ্ধি পাবে। এই সমস্যাটির সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে তাদের জন্য উপযোগী শ্রম ঘন (Labour intensive) কলকারখানা স্থাপনের জন্য এবং প্রয়োজন বোধে একটি Expot Processing Zone (EPZ)  স্থাপনেরও উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাসমূহ এবং এনজিওগুলোর সহযোগিতা চাওয়া যায়। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে তারা তো অস্থায়ী শরণার্থী, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে তারা তো আর ফেরৎ যাবে না। কথাটা যৌক্তিক। কিন্তু তাদের আমরা কখন ফেরৎ দিতে পারবো তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাদের Productivity কে যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি তাহলে দেশ উপকৃত হবে, তারাও ভাল থাকলো। রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরিতে পটু অনেক লোক আছে। তাদেরও কাজে লাগানো যায়। রোহিঙ্গা সমস্যার সবচেয়ে বড় ও যৌক্তিক সমাধান হচ্ছে তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। যতদিন পর্যন্ত সেটা না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত তারা যাতে সম্মানজনক জীবিকা ও ইমান আকিদার সাথে ইজ্জত আব্রু নিয়ে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করা আমাদের দায়িত্ব। এবার একদিনের ক্যাম্প পরিদর্শনে এটিই আমার অভিজ্ঞতা। শনিবার সকাল আটটায় রওনা হয়ে রাত ১১টায় আমি ঢাকা পৌঁছেছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ