ঢাকা, মঙ্গলবার 05 February 2019, ২৩ মাঘ ১৪২৫, ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

স্বামীর পরকীয়া স্ত্রীর সংকট

আখতার হামিদ খান : যেনো সে ভেজা বিড়াল। ভাবটা এমন যে, সে ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারে না। বিয়ের আগে এমনভাবেই চলতো। বিয়ের পর বাসর রাতেই বিড়াল ‘বাঘ’ হয়ে যায়। তবে সে বাঘ শুধু আমার কাছে। ভাবতাম এমনই। কেননা, আর সব মেয়েদের সামনে সে হাবাগোবা গো বেচারা হয়ে চলতো। কিন্তু সেই স্বামীই যে পর নারীর কাছে যাবে, আমার ভেজা বিড়াল অন্যের কাছে ‘বাঘ’ হবে স্বপ্নেও ভাবিনি। ভাবতে পারিনি। এখনও ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। এই দেহ ছাড়া কারও দেহে তার স্পর্শ-উহ! কি অসহ্য! আমার সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। তছনছ হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। ঘুমাতে পারছি না। খেতেও পারছি না। মনে হচ্ছে ওকে খুন করি। একথা অদিতির। স্বামীর পরকীয়া নিয়ে বড় সংকটে পড়েছেন অদিতি ইসলাম ওরফে অদিতি। তার মতো সংকট রয়েছে আরও অন্যের ঘরে। কেউ বলেন, কেউ বলেন না। তবে বলেছেন অদিতি তার কষ্টের কথা। বলেছেন অকপটে। তার পাশাপাশি জানা গেছে আরও কয়েকজন নারীর কথা। পাওয়া গেছে স্বামীদের ভাষ্য।
অন্যদের কথা বলার আগে অদিতির কথাই শোনা যাক। না, পাঠক অদিতি তার আসল নাম নয়। সে এতো গোপন কথা বলতে পারে, তার প্রকৃত নাম কি বলা উচিত? বলবো না অন্যদেরও প্রকৃত নাম। তবে জানাবো তাদের কাহিনী। অদিতির জন্ম মফস্বলের এক শহরে। সবুজে ঘেরা শহর। এ শহরেরই পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। হ্যাঁ নদী। এই নদীর পাড়েই একদিন পরিচয় হয়েছিলো অরূপের সাথে। বড় মেধাবী ছাত্র অপরূপ। তখন পড়তেন ঢাকায়। বুয়েটে। ভবিষ্যতের ইঞ্জিনিয়ার। সুদর্শন অরূপ অদিতির চেয়ে  বড়। অদিতি তখন পড়তেন কলেজে। বান্ধবীদের সাথে বেড়াতে গিয়েছিলেন নদীর পাড়ে। অরূপরাও গিয়েছিলো। অন্য ছেলেরা যখন অদিতিদের টিজ করেছিলেন, অরূপ ছিলেন চুপচাপ। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় অরূপ শুধু বলেছিলেন আমার নাম অরূপ। আপনারা? অদিতি বলেন, অদিতি।
অত:পর একদিন ঢাকা আসার সময় অদিতি দেখলেন তাদের বাসেই অরূপ। অদিতি-অরূপের কথা হলো আরিচা আসার সময়, ফেরীতে। অরূপ বলেছিলেন, অদিতি-আপনি খুব সুন্দরী। কিযে ভালো লাগা তার সেই কথা, আজো মনে পড়লে অদিতির মন ও দেহে শিহরণ লাগে। সেদিনের অরূপের সাথেই একদিন অদিতির বিয়ে হলো। অদিতির পরিবার প্রথমে আপত্তি করলেও পরে মেনে নিলো। বড় আনন্দের দিন ছিলো সে সময়। অদিতি-অরূপের দুই সন্তান। তারা বড় হচ্ছে। সন্তানদের ঘিরেই অদিতির সময় কাটে। তাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা, তাদের খাওয়া-দাওয়া, পড়ানো, পড়তে শিক্ষকের কাছে নিয়ে যাওয়া আসা, রান্না-এসব নিয়েই সময় কেটে যায় অদিতির। আর স্বামী অরূপ? অরূপ এখন তার অফিসের বড় কর্মর্কতা। সারাদিন অফিস নিয়েই থাকে। আগে অরূপ মাঝে মাঝে অফিস থেকে দেরি করে ফিরতেন। এখন রোজই দেরি করে ফেরেন। ব্যাপার কি? জিজ্ঞাসা করলে বলেন, কাজের চাপে দেরি হয়ে যায়। অদিতি বিশ্বাস করেন। কিন্তু তার বিশ্বাসই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে, চোখে না দেখলে বোঝা যেতো না।
অদিতি শিক্ষকের কাছে সন্তানদের পড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরছিলেন। ট্রাফিক সিগন্যাল পড়েছে রাস্তার মোড়ে। অদিতি দেখলেন, রাস্তার ওপাশে স্বামী অরূপের রিকশায় একটা মেয়ে বসে আছে। হুড খোলা রিকশা, চমকে ওঠেন অদিতি। একবার ভাবেন ২৪/২৫ বছরের ঐ মেয়েটিকে? ওরা এতো কাছাকাছি বসে কেন? অপরূপ ওর সাথে কথা বলছে, আর মেয়েটি ওভাবে অরূপের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে কেন? আরেকবার ভাবেন না, অফিসের যে নতুন সহকর্মীর কথা অরূপ বলেছিলেন, তার সাথেই হয়তো বাসায় ফিরবেন। পথে হয়তো মেয়েটি নেমে যাবে। এভাবে মিশলেই কি সব হয়ে যায়? অদিতি সেদিন অরূপকে এ বিষয়ে কিছু বলেন না। কিন্তু সেদিনের দৃশ্যটি মাঝে মাঝেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। দৃশ্যটি একদিন আবছা হতে থাকে। ঠিক এমনই মুহূর্তে আরেকদিন সন্তানদের স্কুলে দিয়ে বাসায় আসার পথে দেখলেন, অরূপ সেই মেয়েটির সাথে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকছেন। অদিতির মাথা গরম হয়ে গেলো। একটু থেকে অদিতি কৌশলে আড়ালে থেকে দেখলেন, তার স্বামীধন মেয়েটিকে নিয়ে রেস্টেুরেন্টের আলো-আঁধারময় ছোট একটি বিশেষ ঘরে বসেছেন। কিছুক্ষণ না যেতেই তারা একে অন্যের হাত ধরেছেন।  সেই থেকে যন্ত্রণা শুরু অদিতির। যে আগুন সেদিন জ্বলা শুরু হলো, তা যেনো তুষের আগুন, নিভছে না। অদিতি বলেছে অরূপকে সব ঘটনা। অরূপ প্রথমে পাত্তাই দেয়নি। পরে স্বীকার না করলেও চুপ থেকেছে।
অদিতি অরূপের সাথে এক বিছানায় ঘুমান, অরূপ তাকে মাঝে মাঝে কাছে টানার চেষ্টা করে। কিন্তু অদিতির মন ও শরীরের ভাষা হারিয়ে যায়। অদিতি কাঁদেন। কি করে বলা যায় স্বামীর লাম্পট্যের কথা, অন্যেরা কাছে? অদিতি কেমন যেনো হয়ে গেছেন। তার চোখের নিচে কালি পড়েছে। ঘুম হয় না। মুখে খাবার উঠতে চায় না। সন্তানদের বকাবকি করেন। স্বামীকে তার খুন করতে ইচ্ছা করে।
অদিতি তার স্বামীর কর্মকান্ড সম্পর্কে আরও খোঁজখবর নিয়েছেন। জেনেছেন, এভাবে শুধু বেড়ানোই নয়, মেয়েটি একা একটি ফ্ল্যাটে থাকে, ঐ ফ্ল্যাটে অরূপ মাঝে মাঝেই যান। বড় ভেঙে পড়েছেন অদিতি।
আর অদিতির মতো কাহিনী রোকসানা আহমদের না হলেও প্রায় একই। রোকসানাও সুন্দরী। বয়স অদিতির মতোই ৩৫/৩৬। তিনিও অদিতির মতো  ঢাকায় থাকেন। তার কোনো সন্তান নেই। তার স্বামী ‘ভদ্রলোক’। রোকসানা একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন। স্বামী আব্দুর রশিদ চাকরি করেন ব্যাংকে। স্বামী খুব ভালোবাসেন স্ত্রীকে। বাসায় থাকে উঠতি বয়সী কাজের মেয়ে। একদিন ঘুম ভেঙে রোকসানা তার স্বামীকে আবিষ্কার করলেন কাজের মেয়ের ঘরে। মেয়েটিকে রোকসানা তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু স্বামী ‘ভদ্রলোক’ এমন কাজ কিভাবে করলেন? স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল উঠে গেছে। আব্দুর রশিদ আমার পরিচিত। তিনিই বলেছেন তার কাহিনী।
জিজ্ঞাসা করেছি এভাবে ‘কাজের মেয়ের’ সাথে কেনো ছিলেন? সুন্দরী স্ত্রী পাশে থাকতে কেউ কি এমন কাজ করেন? আব্দুর রশিদ বলেন, ঠিক বলে বোঝাতে পারবো না। তবে এটুকু মনে রাখবেন, এসবের স্বাদই আলাদা। আব্দুর রশিদ আলাদা স্বাদে মত্ত আর রোকসানা দুর্ভাবনায়, কষ্টে বিপর্যস্ত। তবে কি রোকসানা এর প্রতিশোধ নিতে পরপুরুষের সাথে মিশবেন? সুযোগ হয়নি বলে জানতে পারিনি রোকসানার কথা। তবে জেনেছি মিসেস আলমের কথা। তিনি জানান তার নিজের কথা। জানান তার বান্ধবী ফরিদার কথা। মিসেস আলম জানান, ফরিদা নিজেই পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত। তিনি অবিবাহিত এক যুবকের সাথে পরকীয়া করছেন। যুবকটি থাকে ফরিদাদের বিল্ডিংয়ে। একা একটি রুম ভাড়া নিয়ে ৫ তলায় থাকে। ছাদের সাথে ছেলেটির রুম। ফরিদা মাঝে মাঝে বিকেলে ছাদে উঠে আকাশ দেখেন। একদিন ছেলেটির সাথে পরিচয় হয়। তারপর জানাশোনা। তবে ফরিদা কোনোদিন ছেলেটির রুমে যায়নি। তবে ফরিদার বাসায় দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসেছে। এভাবে যাওয়া-আসা করতে করতে এক সময় উভয়ের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে।
ফরিদার স্বামী ব্যবসায়ী। তিনি বাইরে গেলে ফরিদা ৫ তলায় ছেলেটির সাথে গল্প করেন। সিনেমা দেখেন। টিভি দেখেন। ছেলেটি একদিন সোফায় শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিলেন। এর মধ্যে ফরিদা জুড়ে দেন অন্যরকমের ছবি। যুবক ছেলেটি বিস্মিত হয়। ফরিদার সাথে ছেলেটির অন্যরকম জানিয়েছেন, সেই থেকে আজও চলছে সেই সম্পর্ক। ফরিদা মিসেস আলমকে তখনই জানিয়েছেন তার কাহিনী। যখন মিসেস আলম বলেন তার দু:খের কথা। স্বামীকে নিয়ে তার দুর্ভাবনা আর কষ্টের কথা। মিসেস আলমের কথা : আমার স্বামী শিল্পপতি। সংসারে কোনো অভাব নেই। সন্তানরা বড় হচ্ছে। ড্রাইভাররাই ওদের লেখাপড়া করতে নিয়ে যায়। বাড়িতে ৪টা কাজের মেয়ে। তাদের তাদরকি করা ছাড়া কার্যত কোনে কাজই তার নেই। সময় কাটে না তার। ছবি দেখে, গান শুনে, বই পড়ে কতক্ষণই বা তার সময় কাটানো যায়। স্বামী আলম মাঝে মাঝে বিদেশেও বেড়াতে নিয়ে যান। স্বামী মাঝে ড্রিংক করে বাসায় ফেরেন। মিসেস আলম জানতে পেরেছেন, তার স্বামী তার পি.এ-কে একটি ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন। পি.এ মেয়েটির ফ্ল্যাটেই আলম অনেক সময় কাটান। বয়স বাড়ছে ফরিদার। তাই বলে স্বামীকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না, এমনতো নয়। সবাই বলে তিনি সুন্দরী। একবার তো একজন বলেই ফেলেছিলো, আপনাকে এখনও বিয়ে দেয়া যায়। তাহলে তার স্বামী অন্য নারীতে আসক্ত কেন। ভাবনা তার কষ্টে দিন দিন কুঁকড়ে যাচ্ছেন মিসেস আলম। স্বামীর পাশে শুয়েও স্বামীকে কেন তার আর স্বামী মনে হচ্ছে না? এমন হচ্ছে কেন?
অদিতি থেকে মিসেস আলম সবার সমস্যাই এক। এ থেকে মুক্তির পথ কি? কথা বলেছি সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সাথে। তাদের কথা যারা লম্পট কি ছেলে কি মেয়ে তারা এসব করবেই। তবে যেহেতু পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষই ভালো, সেহেতু তাদের এসব থেকে বেরিয়ে আসার পথ আছে। সংসার একটা গাড়ি। চলমান গাড়ি, এর যেমন চলার গতি সব সময় এক থাকে না তেমনি সংসারে মানুষের গতিও এক থাকে না। সংসারে ক্লান্তি আসে। ক্লান্তি থাকে, একঘেয়েমী থাকে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতপাথর্ক্যও থাকে। শুধু মনই নয়, শরীরও স্বামী-স্ত্রীর চলার সঙ্গী। উভয়ই যখন ক্লান্ত হয়, তখন স্বামী বা স্ত্রী অন্যদিকে তাকায়। কিন্তু তারা একবার ভেবেও দেখে না অতীতে কতো মধুর ছিলো তাদের সম্পর্ক। একজন আরেকজনকে কতো ভালোবাসতো।
আর্থিক দিক থেকেও তারা অতীতকে স্মরণ করে না। পরকীয়া নিয়ে সংকট সৃষ্টি হলো। স্বামী বা স্ত্রী স্মরণ করে দেখতে পারেন তাদের অতীত কত সুন্দর ছিলো, সে স্মৃতিচরণ করে। আর চাওয়ারও যে একটা সীমা আছে তা ভাবতে পারেন। মধুময় অতীতকে সামনে এনে বর্তমানকে সুন্দর করা যেতে পারে। কেননা, ভালোবাসাই পারে সংসারে সুখ আনতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ