ঢাকা, মঙ্গলবার 05 February 2019, ২৩ মাঘ ১৪২৫, ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নৈতিকতার উৎকর্ষে নতুন সমাজ গড়ি

তামিমা : নৈতিকতার মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতিটি মানুষই নৈতিকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং তার শিক্ষা এবং পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব তাকে অনৈতিক করে তোলে। আমরা দেখছি অনৈতিকতার বিষবৃক্ষ কিভাবে আজ পুরো জাতিকে  করে তুলেছে বিষাক্ত।
অনৈতিকতার মূল উৎস:  'বস্তুবাদ' সকল  অনৈতিকতার উৎস। যাদের জীবনের দর্শন হলো "দুনিয়াটা মস্ত বড় খাও দাও ফুর্তি কর" তারা তাদের ভোগের লালসা মেটাতে নৈতিকতার সবগুলো রশি গলা থেকে খুলে ছুড়ে ফেলে দেয় এরপর তারা ভোগের সাগরে অবগাহন করে এর মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে অতৃপ্ত, পাপী আত্মা নিয়ে কবরে পৌঁছে যায় অসংখ্য মানুষের তপ্ত নিশ্বাস নিয়ে। কারণ তাদের নিকট দুনিয়ার সফলতাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। তারা আখেরাতকে ভুলে যায়, ফলে ন্যায় অন্যায় বিবেচনা না করে নিজের দুনিয়াবী স্বার্থে একের পর এক অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়।
বাংলাদেশ অনৈতিকতার প্রসারে যেসব বিষয় দায়ী:
 বাংলাদেশের বর্তমান এ অনৈতিকতার সয়লাব একদিনে তৈরি হয়নি বরং এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য কার্যকারণ। এর কয়েকটি এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১. নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা:
বর্তমান নৈতিকতার অবক্ষয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী এটি।। শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি হয়  জিপিএ ৫, শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি হয় বিসিএস ক্যাডার, শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি হয় কাড়িকাড়ি টাকা আর গগণচুম্বি স্ট্যাটাস  সে শিক্ষা কোনদিন শিক্ষা হতে পারে না বরং সে শিক্ষা হয় প্রহসন মাত্র। যার পর্দার আড়ালে থাকে প্রশ্ন ফাঁস, ঘুষ, নকল, প্রক্সি এবং আরো সীমাহীন দুর্নীতি। শিক্ষা সেটি যেটি মানুষকে অন্যায় অত্যাচার পাপাচারের অন্ধকার থেকে টেনে সত্যের আলোর মুখোমুখি করে। যা মানুষকে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও সত্য প্রকাশে অকুণ্ঠচিত্ত নির্ভীক হিসেবে গড়ে তোলে সেটিইতো শিক্ষা। শিক্ষা ব্যবস্থা যখন শিক্ষার্থীদের মানবীয় মূল্যবোধ শিক্ষা না দেয় তখন সে শিক্ষাব্যবস্থা জাতি কে কোন মানুষ উপহার দিতে পারে না উপহার দেয় মানব আকৃতির লক্ষ লক্ষ অমানুষ।
২.ধর্মীয় অনুশাসনের চরম অভাব: পরিবার সমাজ প্রতিটি জায়গায় ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব এবং এর প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষা নৈতিকতার অবক্ষয়ের জন্য অনেক বেশি দায়ী। অনৈতিক কাজের প্রতি সামাজিক বিধি নিষেধ গুলো হালকা হয়ে যাওয়ায় খুব সহজেই অনৈতিকতা গুলো ছড়িয়ে পড়ে।
৩. পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন: টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীলতা, অনৈতিক সম্পর্ক, পরকীয়া পারিবারিক কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ প্রভৃতি কত অন্যায়ের যে জন্ম দিয়েছে তার হিসেব মেলানো কঠিন। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে প্রশ্নফাঁস ঘুষ গ্রহণ সহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ড ঘটছে। তাই ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অনৈতিকতার প্রসারে চরমভাবে দায়ী।
  এছাড়া  আইনের প্রয়োগে চরম অবহেলা, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন বিভাগের স্বাধীনতার অভাব, অন্যায়ের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক অনুশাসন এর অভাব ইন্টারনেট, মাদক ও বাথ কন্ট্রোল  সামগ্রীর অপ্রতুলতা অনৈতিকতার সয়লাব বয়ে দিচ্ছে শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র। আর এর শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম।
উত্তরণের উপায়:  দীর্ঘদিনের বেড়ে ওঠা বৃক্ষ কে এক ঝটকায় উপরে ফেলা সম্ভব নয়। সেজন্য প্রয়োজন  অনবরত কর্মপ্রচেষ্টা। বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ভূমিকা রাখবে।
১. আখেরাতমুখী জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে হবে:  দুনিয়ার জীবনই চূড়ান্ত নয়, প্রকৃত জীবন হলো আখিরাতের জীবন এবং আখিরাতে সফলতা চূড়ান্ত সফলতা। তাই মানুষকে আখেরাতমুখী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত করতে হবে। এজন্য ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার এবং এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
২. শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার : শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। একমুখী ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাই পারে সকল অনৈতিকতার মূলোৎপাটন করে নৈতিকতার সুবাতাস বইয়ে দিতে। পুঁজিবাদি ধ্যান ধারণা থেকে মুক্ত করে কল্যাণকর চিন্তার বিকাশ ঘটালেই অনেক অনৈতিকতা বন্ধ হয়ে যাবে। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন।
৩. অনুশাসন: পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন বৃদ্ধি করতে হবে। পিতা-মাতাকে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। বিবেচনাহীন ভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে সন্তানদের  হাতে ইন্টারনেট তুলে দেয়া যাবে না এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুসরণ করা যাবে না।
৪. আইনের শাসন : ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। কোন ধরনের ক্ষমতার কারণে কেউ যেন অন্যায় করে পার পেয়ে না যায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তেমনি গরীব কিংবা ক্ষমতাহীন বলে কেউ যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। অনৈতিকতায় উৎসাহিত বা সহায়তা করে এমন প্রতিটি জিনিসকে তা বস্তুগত হোক বা অবস্তুগত হোক আইন প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সর্বোপরি মানবিকতার উৎকর্ষ সাধনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক,সামাজিক, সরকারী, বেসরকারি বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। কল্যাণকামিতাকে ব্যক্তিস্বার্থের উপরে স্থান দিয়ে সৌহার্দ্যময় সমাজ গড়ার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারবে স্বাধীনতার চেতনায় নতুন এক বাংলাদেশের জন্ম দিতে। তাই চলুন নৈতিকতার উৎকর্ষের  প্রচেষ্টা নিজের থেকেই শুরু করি আর গড়ে তুলি নতুন সমাজের বুনিয়াদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ