ঢাকা, বুধবার 06 February 2019, ২৪ মাঘ ১৪২৫, ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

একুশের চেতনা স্বাধীনতার সূচনা

-আবু মালিহা
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনা ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। আজ আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ দেশের অগণিত মানুষের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ধারাবাহিকতায় ১৬ ডিসেম্বর’৭১ সালে।
প্রসংগ ২১ ফ্রেব্রুয়ারি, ভাষা দিবস নিয়ে। বাংলা ভাষা আজ সমৃদ্ধ। উচ্চকিত হয়েছে বর্ণিল শোভাযাত্রায় নানা রকমের বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে। নীরবে নিভৃতে, সরবে, মুখরে এবং সর্বস্তরে ভাষাচর্চার ব্যাপকতায় মুক্ত উদ্যান রচিত হয়েছে ভাষার জাগরণী কোলাহলে। ভাব, ভাষা, ছন্দ এবং গবেষণায় মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় বর্ণিল কোলাহলে স্বপ্নময় বিলাসে ভাষার ঝর্ণাধারা দুটি চলেছে নব উদ্যমে নব উচ্ছ্বাসে। তাই আজ আমরা মুখের ভাষায় অতীন্দ্রীয় চেতনায় পুলক ছড়াতে পারছি মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় পতপত করে মুখের নীলান্তে। জাগরণী বাণী পৌঁছে দিতে পারছি বাংলার প্রতিটি পরতে পরতে।
হাটে ঘাটে মাঠে শব্দ কলগুঞ্জন। চাষির মাঠে রাখালের গোয়ালে, ধানের ক্ষেতে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের মখমল চত্বরে। অভিনবত্ব জাগিয়ে তুলছে কবি-সাহিত্যিকদের কথা-কলিতে। নব প্রেরণায় উদ্দীপনার শব্দ ঝংকারে কাল থেকে কালান্তরে নগর থেকে নগরান্তরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে একী অপরূপ ভোর-বিহানের নন্দন-পুলক ছড়ায়ে একাকার হচ্ছে শব্দ-বাক্যের  সৌরভে। হিমেল বায় রজনীগন্ধার সৌরভ ছড়ায়ে চিত্তবিনোদনে ভাষার অলংকারিক নিক্কনে অভূতপূর্ব সুরেলা ঝংকারে মন্দ্রিত করে আমাদের মাতৃভাষার হাজারো কলরবে। এই সেই মহান ভাষা, আমাদের মাতৃভাষা-বাংলা ভাষা। তাই একুশ আমার অহংকার। একুশ আমার প্রেরণা। ভাষাপ্রেম আমার জন্মগত অধিকার। এ অধিকার কেড়ে নেয়ার শক্তি নেই কারোর। আর পারেওনি কেউ। সামরিক জান্তা থেকে শুরু করে কেউ। আমরা আমাদের অধিকার রক্ষায় বাহান্নতে প্রাণ দিয়েছি, ঊনসত্তরে রক্ত দিয়েছি, ‘৭১’ এ শহীদ হয়েছি। তবুও কেউ পারেনি আমাদের দমাতে। তাই তো ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভবনে আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘কেউ তোমাদের দমাতে পারবে না’। সত্যিই কেউ আমাদের দমাতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানীরাও আমাদের দমাতে পারেনি। ভাষার আন্দোলনে আমরা বিজয়ী হয়েছি।
প্রকৃত অর্থে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ‘৪৭’ এর দেশ ভাগের পর। এ আন্দোলনের গোড়া পত্তন করেছিল তমদ্দুন মজলিস নামের সংগঠন। যার স্থপতি ছিলেন অধ্যাপক এম এ কাশেম এবং সংগঠনে আরো যারা ছিলেন, তারা হলেন, ভাষা সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম, ডাঃ এ এস এম নূরুল হক ভূইয়া (ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক) ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতান, ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আব্দুল গফুর, ভাষা সৈনিক আব্দুর রহমান চৌধুরী, ভাষা সৈনিক বদরুদ্দীন আহমদসহ বুদ্ধিজীবীগণ।
“সত্যিকারভাবে যেদিন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা এবং গবর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ২১ মার্চ রমনা রেসকোর্সে বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করেন, উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’’ (It ell you and Urdu alone is going to be the state language of Pakistan)। তবে জিন্নাহর এই একপেশে নীতির কারণে এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেওয়াটা যে ভুল ছিল, পরে তা উপলব্ধি করেছিলেন- উল্লেখিত জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা নীতি ভুল ছিল। তা তিনি নিজেই জীবদ্দশায় ব্যক্ত করে গেছেন এবং ঘোষণার অপরাধে অনুতপ্ত হয়েছেন ও অনুশোচনা করে গেছেন (সূত্র: আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল পৃ: ১৮) ইতিহাস অনেক দূর এগিয়েছে। আজ আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশে বসবাস করছি। ৯ মাসের রক্তঝরা যুদ্ধ করে পাকিস্তাীদের হাত থেকে মুক্ত করে স্বাধীনতার মুক্ত হাওয়ায় নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে এগিয়ে চলেছি। ভাষা এবং সংস্কৃতিকে লালন করে বিশ্বের বুকে অনন্য সৃষ্টি ও কর্মের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন বৃথা যায়নি। আজ জাতিসংঘে আমার মায়ের ভাষা বাংলা ভাষার প্রচলন হতে চলেছে। এমনকি বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ভাষা ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠার দিবস হিসেবে অনন্য মর্যাদায় স্থান পেয়েছে। তা এই বাংলার দামাল ছেলেদের আত্মদানের ফসল।
তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরো অনেক। আজকে আমরা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাচ্ছি, তাদের মহান আত্মত্যাগ না থাকলে আজকে আমরা হয়তোবা মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারতাম না। তাই তাদের কৃতজ্ঞতায় আমরা চিরদিন শ্রদ্ধা নিবেদন করব এবং তাদের পরকালীন জীবন শান্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া চাইব। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য- আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষা সর্বস্তরে প্রচলিত হয় নাই। কি কারণে বা কিসের চাপে অদ্যাবধি উচ্চপ্রশাসন থেকে নিম্ন প্রশাসনের সর্বত্র এখন পর্যন্ত বাংলাকে প্রচলন করা যায়নি। এই দুর্বলতা কোন কারণে বা দৈন্যতা কীসে-  সে ভাবনা সাধারণ জনগণ পর্যন্ত গড়িয়েছে!
যেখানে দাবি করা হচ্ছে, জাতিসংঘ পর্যন্ত দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা চালু হবে, সেখানে নিজ দেশে মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না তা অবাক করার বিষয়! এ ব্যাপারে বর্তমান সরকারের জনগণের পক্ষ থেকে তাগিদ জানানো হচ্ছে। আশা করছি সরকার এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিবে।
সাধারণ জনগণের এও প্রত্যাশা-অফিস আদালতসহ রাস্তাঘাট, ব্যবসা বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে সর্বত্র প্রথমে বাংলায় এবং পরে ইংরেজিতে বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড এবং ব্যানার টাঙানো। এতে করে সর্বস্তরের শিক্ষিত ও অর্ধ-শিক্ষিত জনগণ সেগুলো ভালভাবে পড়তে এবং বুঝতে পারবে। কারণ এখনও বিদেশী ভবন, গুরুত্বপূর্ণ অফিস-আদালত ও কূটনৈতিক পাড়ায় ইংরেজিতে রয়ে গেছে সব ধরনের লেখা। আর এ ভাবেই আমরা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারব বলে আমাদের বিশ্বাস। তাইতো কবি কিংবদন্তীতূল্য ভাষার মর্যাদাকে উচ্চকিত করার জন্য গানটি রচনা করেছিলেনÑ
‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো
একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।’...
এটা শুধু আমাদের দেশে গাওয়া হয় না। সিয়েরা লিওনসহ অনেক দেশেই এই গানটি ভাষা দিবসে গাওয়া হয়। কতো বড় মর্যাদার কথা। গৌরবের উজ্জ¦ল দৃষ্টান্ত।
সত্যি বলতে কী এখনো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। হালে বিদেশী সংস্কৃতির স্রোতে বিশেষ করে আকাশ সংস্কৃতির আক্রমণে হিন্দী ভাষার প্রভাব কথায় কাজে গানে ও চলচিত্রে ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ ঘটছে যা আমাদের জন্য চরম হতাশাজনক। ভাষা বিকৃতি বা চর্চাহীনতার এ কুফল বয়ে আনছে। আমাদের জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির বিকাশে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যা অদূর ভবিষ্যতে আগামী প্রজন্মকে এ থেকে রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়বে। এতে মানসিক বিকলাঙ্গত্ব দেখা দিবে এবং স্বদেশী সংস্কৃতির উপর বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়বে যা থেকে জাতিকে উত্তরণে হিমশিম খেতে হবে। অতএব এখনই বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাব থেকে আমাদের শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে হবে এবং যুব সমাজকে ভাষার দেওলিয়ত্ব থেকে হেফাজত করতে হবে। কোন দেশের ভাষা বিকৃত এবং চর্চার ক্ষেত্রে অনীহার অর্থই হবে সে ভাষার অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয়া। এমন নজির বিশ্বে অনেক আছে। তাই আসুন, ভাষার মর্যাদা রক্ষা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমিসহ সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসহ বাংলা ভাষার মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষায় শুদ্ধি অভিযানসহ সাংস্কৃতিক আন্দোলন জাগাতে হবে। নইলে বাংলাকে তার সঠিক মর্যাদায় উন্নীত করা যাবে না। নব প্রজন্ম এবং আগামী প্রজন্মকে এ ব্যাপারে প্রলুব্ধ করতে হবে। দেশের বুদ্ধিজীবী, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি ও লেখকদের যুগপৎ প্রচার, প্রসার, গবেষণা ও জাগৃতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। তাই বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ-আপনার দৃঢ় সিদ্ধান্তই পারে সর্বস্তরে বাংলাকে চালু করতে। এ ব্যাপারে ভাষাবিদ, কবি, সাহিত্যিকসহ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে এবং ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশাকে আর অবহেলা নয়, বাস্তবেই যেন বাংলা ভাষা  সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেন।
তাই আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে আমাদের দেশকে ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে আরো অনেক দূর নিয়ে যাই। আমাদের ভাষা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক-দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণীর সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে এদেশকে আরো সুন্দর করি। অনুপম সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল সৃষ্টি করে শান্তি ও সম্প্রীতির সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাই এবং বৈষম্য ও ভেদাভেদ ভুলে সম্প্রীতির মালঞ্চ রচনায় একযোগে কাজ করি। এ দেশ আমার গর্বের দেশ, এ দেশ আমার অহংকারের দেশ। জারি সারি ও ভাটিয়ালীর সুরে এ দেশ চিরজাগরুক থাকুক, এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের। ভাষা দিবসের কোন এক বক্তৃতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলার অধ্যাপক আবুল ফজল বলেছিলেন ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। পরবর্তীতে তা একটি মূল্যবান ঐহিহাসিক গ্রন্থ আকারে বের হয়েছে। সত্যিই বইটিতে মহান ভাষা দিবসের চমকপ্রদ ঘটনাবহুল সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা ভাষা দিবসে আমরা যেন আমাদের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় গবেষণায় এবং চর্চায় নিবিষ্ট হই এবং অমর একুশে মহান শহীদদের আত্মত্যাগকে যেন ভূলুন্ঠিত হতে না দেই। তাই কবির ভাষায় আমরা আবার বলি, ‘একুশ আমার অহংকার’, একুশের চেতনা দিয়েই পরবর্তীতে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশ্ব সভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ