ঢাকা, বুধবার 06 February 2019, ২৪ মাঘ ১৪২৫, ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

২০৩০ সাল নাগাদ মঙ্গলে বসবাসের পরিকল্পনা!

জাফর ইকবাল : মঙ্গল নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। ১৯ সেপ্টেম্বর ঝড়ের কবলে পড়ে স্তব্ধ হয়ে যায় মঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো নাসার রোবট কিউরিওসিটি। তবে উৎসাহী মানুষের হাহুতাশ করার কারণ নেই। কারণ ২ মাসের মধ্যেই এসে হাজির হয়েছে ইনসাইট। চোখ এবার মঙ্গলের দিকে। মাত্র ৭টা মিনিট তখন মনে হচ্ছিল অনন্তকাল। ২২ কোটি কিলোমিটার দূরের লাল গ্রহতে কি হয়েছে সেটার সিগন্যাল পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে সময় নিবে ৭ মিনিট। গ্রিনিচ সময় ৭টা ৫৩ মিনিট, নাসার কন্ট্রোল রুমে এক উল্লাসের ঝড় বয়ে গেল। ৬ মাস আগে শুরু হওয়া বুক কাঁপুনিটার সমাপ্তি। মাটি স্পর্শ করেছে রোবট ইনসাইট। প্রতিবেশীকে নিয়ে জানার আগ্রহ মানবজাতির জন্মগত। কাছের প্রতিবেশী চাঁদের ঘরে বেরিয়ে আসা শেষ।
ইনসাইটের নির্মাণ শুরু হয় ৭ বছর আগে। এক প্রতিযোগিতায় ২৮টি অভিযান পরিকল্পনা থেকে নিজের দিকে দৃষ্টি কাড়ে ইনসাইট। বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা নাসার তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু করেন। ২০১৪ সালে রোবটটি মঙ্গলে অবতরণের জন্য ল্যান্ডার (ল্যান্ডার জাতীয় যানগুলো ধীর গতিতে কোন গ্রহের পৃষ্ঠে অবতরণ করে) নির্মাণ শুরু করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান লকহিড মারটিন। সব মিলে ৪২৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়। যদিও পরে মোট খরচ ৮৩০ মিলিয়নে এসে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে উৎক্ষেপণের কথা থাকলেও টেস্টে কিছু ভুল পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের নবেম্বরে আবার ল্যাবরেটরিতে কৃত্তিমভাবে মঙ্গলের পরিবেশ তৈরি করে পরীক্ষা করা হয় ইনসাইটকে।
৫ মে, ২০১৮। ভ্যান্ডারবার্গ বিমান ঘাঁটি থেকে অ্যাটলাস-৫ রকেটে চেপে লাল গ্রহের দিকে রওনা দেয় ইনসাইট। ৪৮৫ মিলিয়ন কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তারপর সফলভাবে মঙ্গল গ্রহের ইলিশিয়াম পানিশিয়া নামক স্থানে সফলভাবে অবতরণ করে। জায়গাটি আগের মঙ্গলযান কিউরিসিটির বর্তমান অবস্থান থেকে ৬০০ কিলোমিটার উত্তরে। এই স্থানে সূর্যের আলো বেশি পড়ে বলে ইনসাইটকে এখানে অবতরণ করানো হয়। ইনসাইটের শক্তির মূল উৎস সূর্যের আলো। ৭ ফুটের ব্যাসের দুটি পাখা দিয়ে সূর্যশক্তি সংগ্রহ করবে রোবটটি। ইনসাইটের ভাঁজ হয়ে থাকা সোলার প্যানেল ঠিক মতো খুলেছে কিনা গবেষকদের ভয় এখানেও ছিল। সোলার প্যানেল না খুললে পুরো অভিযানটিই মাটি হতো।
ইনসাইটের সঙ্গে মঙ্গলের কক্ষপথে মার্কো এ এবং মার্কো বি নামের দুটি স্যুটকেস আকারের ক্ষুদ্র স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয়েছে। এই স্যাটেলাইট স্থাপনও নাসার বিরাট এক কৃতিত্ব। কারণ এই প্রথম গভীর মহাকাশ থেকে প্রথম ছবি পাঠাল কোন কিউবস্যাট। ১৩ কেজি ওজনের এই দুটি স্যাটেলাইটের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে ইনসাইটের সঙ্গে। ৩৫৮ কেজির ইনসাইটের মূল উদ্দেশ্য মঙ্গলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে ধারণা দেয়া যার ফলে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের মঙ্গল অভিযানের পথ সুগম হয়। প্রাথমিক লক্ষ্য পাথুরে গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক গঠন কিভাবে গড়ে উঠলো সেটা নিয়ে গবেষণা করা। ভূস্তরের বিভিন্ন ধাপ ভেদ করা কি পরিমাণ তাপ কেন্দ্র থেকে উঠে আসে এবং মঙ্গলের কেন্দ্র কি রকম উত্তপ্ত সে খবরও জানাবে ইনসাইট।
ফ্রান্স এবং সুইসদের ডিজাইন করা Seismic Experiment for Interior Structure মঙ্গল গ্রহের ভূকম্পন এবং অভ্যন্তরীণ আচরণ বিশ্লেষণ করে তথ্য পাঠাবে। হাইড্রোজেন পরমাণুর ব্যাসের থেকেও ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যরে কম্পন শনাক্ত করতে পারবে এই যন্ত্রটি। অতিমাত্রায় সংবেদনশীল বলে একে শক্ত খোলস দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়েছে। ভূতরঙ্গের দিক এবং উৎস থেকে ইনসাইট বোঝার চেষ্টা করবে মঙ্গল গর্ভে কি খনিজ উপাদান আছে। ছাড়াও বায়ুম-ল নিয়েও গবেষণা করবে এই যন্ত্রটি।
ইনসাইটের সবচেয়ে চমকগ্রদ যন্ত্র হলো ১৬ ফুট একটি প্রোব। জার্মানদের বানানো এই যন্ত্রটি মঙ্গল পৃষ্ঠে ১৬ ফুট গর্ত খুঁড়তে পারবে এবং মাটির নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করতে পারবে। মাটিতে তেজষ্ক্রিয়তা, পানির অস্তিত্ব এবং কি কি মৌল আছে সেসব হয়তো জানাবে এই যন্ত্রটি। ১৬ ফুট প্রোবের শেষভাগে একটি তাপমাত্রা শনাক্তকরণ সেন্সর সংযুক্ত আছে যা ভূগর্ভের তাপমাত্রার খবর জানান দিবে। লাল পাথরের গভীরে এখনও পানিকে উষ্ণ করতে পারার মতো তাপমাত্রা আছে কিনা জানাবে ইনসাইট। তরল পানিই বসতি স্থাপনের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
মঙ্গল গ্রহ নিজ অক্ষে কিভাবে আবর্তিত হয় এবং সূর্যকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়ার সময় কতটা প্রকম্পিত হয় সেসব জানাতে জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বানানো যন্ত্রপাতি এঁটে দেয়া হয়েছে ইনসাইটের সঙ্গে। আরেক রোবট পাথফাইন্ডার এরকম পরীক্ষা পূর্বে করলেও এবার আগের চেয়ে নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে।
মঙ্গলের প্রতিদিনের আবহাওয়া বিশ্লেষণ করতে ইনসাইটের সঙ্গে আছে স্পেন থেকে বানিয়ে আনা সেন্সর। ২.৪ মিটার লম্বা রোবোটিক হাত ছোট পাথর খণ্ড বা মাটির নমুনা তুলে আনতে পারবে। এই হাতের সঙ্গেও জুড়ে দেয়া হয়েছে ছোট ক্যামেরার। ইনসাইটের মূল ক্যামেরা হিসেবে আছে নাসার ডিজাইন করা উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন আইডিসি ক্যামেরা। ১০২৪*১০২৪ রেজ্যুলেশনে ৪৫ ডিগ্রী দেখতে পায় এই ক্যামেরা। এছাড়াও ১২০ ডিগ্রী দেখতে পায় এমন একটি দ্বিতীয় ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ক্যামেরাটি প্যানোরোমা ছবি তোলার জন্য ব্যবহার হবে।
ইনসাইটের আরেকটি মজার দিক হলো এই রোবটটি ২টি চিপে ২.৪ মিলিয়ন মানুষের নাম নিয়ে মঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনলাইন মাধ্যমে যে কেউ তার নাম ইনসাইটে পাঠানোর জন্য জমা দিতে পারত। বিজ্ঞান নিয়ে মানুষকে আরও উৎসাহী করে তুলতেই নাসার এমন পরিকল্পনা। ২০৩০ সাল নাগাদ মানুষ মঙ্গলে গিয়ে বসবাস করার পরিকল্পনা করছে। সেই পরিকল্পনাকে এক দুই পা করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ইনসাইট। মানুষের হাতে থাকা বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে হয়তো মঙ্গলে বসবাস করাটা উচ্চাভিলাষ মনে হতে পারে। তবে উচ্চাভিলাষ থেকেই বিজ্ঞানের অগ্রগতি।
একটা লম্বা সময় অপেক্ষা করার পর অবশেষে সম্প্রতি স্পেসএক্স (Space X) এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক মেক্সিকো আন্তর্জাতিক এস্ট্রোনমিক্যাল কংগ্রেসে (IAC) মঙ্গলে মানুষের উপনিবেশ স্থাপনে তার যে পরিকল্পনা তা প্রকাশ করেন। আর ইলন মাস্কের এই প্রস্তাবকে আন্তঃগ্রহ পরিসেবা পদ্ধতি (ITS) নামে নামকরণ করা হয়। এই প্রকল্প একই সময়ে একসঙ্গে ১০০ জন মানুষ বহন করে লাল গ্রহটির পৃষ্ঠে পাঠাতে পারবে। একটি দৈত্যাকার রকেটের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে কাজটি। আর এরই সঙ্গে রকেটটি নাসার সবচেয়ে বড় রকেট Saturn V-র আকারকে পেছনে ফেলে ইতিহাস তৈরি করবে। ইলন মাস্ক তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, ‘আমি মঙ্গলে গমন সারা জীবনের জন্য সহজতর সম্ভব করতে চাই। যেন যে কেউ চাইলেই সেখানে যেতে পারে।’ নামহীন এই রকেটটি (বর্তমানে ‘মঙ্গল যান’ নামে ডাকা হচ্ছে) দেখতে অসাধারণ ও চিত্তাকর্ষক। সবার উপরে মহাকাশযানটিকে একইসঙ্গে মানুষ অথবা কার্গো বহন করার মতো করে বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। নিচের অংশে রকেটটিকে মহাকাশের কক্ষপথে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্পেসএক্সের নতুন ইঞ্জিন মিথেন জ্বালানি ব্যবহারযোগ্য রেপটর রাখা হয়েছে। যা রকেটিকে কক্ষপথে রেখে এসে পুনরায় উৎক্ষেপণ করার জন্য কেপ কেনাভেরাল, ফ্লোরিডার উৎক্ষেপণ স্থানে নিরাপদে ফিরে আসবে। মঙ্গলে প্রমোদ ভ্রমণের জন্য মানুষ নিয়ে একটি রকেট উৎক্ষেপণ করার পর আরেকটি রকেট জ্বালানি নিয়ে কক্ষপথের উদ্দেশে রওনা হবে। পরবর্তী যানটি পূর্বের যানের সঙ্গে মিলিত হয়ে মিথেনভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ করে দেবে এবং মঙ্গলের উদ্দেশ্যে যাত্রা পুনরায় শুরু করবে। ইলন মাস্ক বলেন, প্রথম যানটিকে ‘হার্ট অব গোল্ড’ নামে ডাকা হবে। এটা শুনতে অনেকটা কল্পকাহিনীর মতো হলেও, ইলন মাস্ক তার স্বভাবসুলভ চরিত্রের মাধ্যমেই আজ থেকে ১০ বছর পরের প্রথম যাত্রার অবতরণের জন্য এক অতিশয় আশাবাদী টাইমলাইন দিলেন। যা আনুমানিক ২০২৬ এর কাছাকাছি কিংবা তারও আগে ২০২৪ মধ্যে শুরু করা হবে। আরও রয়েছে। তিনি ইঙ্গিত করেন যে, সে মঙ্গলকে পরিবর্তন করে এতে মহাকাশ পোশাক ছাড়াই মানুষের বসবাস উপযোগী করতে চান। যদিও সে এই কাজ কিভাবে করবেন তার বিস্তারিত পরিকল্পনার ব্যাখ্যা প্রকাশ করেননি। উপরন্তু তিনি একজন শিল্পীর মতো করে মঙ্গল রূপান্তরের কাহিনী উপস্থাপন করে গেলেন। এই অগ্রগতির জন্য স্পেসএক্স ২০১৮ সালে থেকে পৃথিবী এবং মঙ্গল যখন অনুকূল দূরত্বে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করবে তখন থেকে মঙ্গল অভিযান শুরু করবে। এটা প্রতি ২৬ মাস পর পর পৃথিবী ও মঙ্গল একবার কাছাকাছি অবস্থানে আসে সুবিধাজনক উড্ডয়নের জন্য। এই মুহূর্তে স্পেসএক্সের মোট কর্মীর পাঁচ ভাগ এই ITS প্রকল্পে কাজ করে যাচ্ছেন। ৪০ থেকে ১০০ বছরের মাধ্যে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষকে আনুমানিক ১০ হাজার ট্রিপের মাধ্যমে মঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার আশা করছেন তিনি। ইলন মাস্ক জানান মঙ্গল যাত্রাকে (পাঁচ মাসের ভ্রমণ) আরামদায়ক ও মজাদার করতে মহাকাশযানটিতে জিরো জি গেম এবং রেস্টুরেন্টসহ অন্যান্য অনেক ব্যবস্থা রাখা হবে। মাস্ক বলেন, ‘এবং দিনশেষে মঙ্গল থেকে কেউ যদি ফিরে আসতে চায় সে দিক চিন্তা করে মঙ্গলযানটিকে ফিরে আসার মতো করেও ডিজাইন করা হয়েছে। মঙ্গল কোন ধোকাবাজির খেলা নয়।’ এটা অতিশয় আশাবাদী বলে মনে হতে পারে এবং এটা যে তা ই সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ইলন মাস্ক যে কাজটা সম্পন্ন করতে কতটা তৎপর তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। এই প্রকল্পে যতটা সম্ভম তিনি নিজের অর্থই বিনিয়োগ করছেন। তিনি বলেন, ‘সম্পদ জমানোর চেয়ে আমি বিভিন্ন গ্রহে বসবাসের জন্য বড় অবদান রাখার সুযোগটাকেই আমি বড় করে দেখি।’ আর এ্টাই একটা বড় প্রশ্নের আংশিক উত্তর হয়ে গিয়েছে। কেন একটা মৃত গ্রহকে নিয়ে এত উৎসাহ? সেখানে আমরা মহাকাশ পোশাক বা ইতিবাচক অবকাঠামো ছাড়া বসবাস করতে পারবো না। তাহলে কেন আমরা সেখানে যেতে চাচ্ছি?
উত্তরটা ইলন মাস্ক খুব সহজভাবেই দিলেন। মানুষ একপর্যায়ে রোজ কিয়ামতের মুখোমুখি হবে, গ্রহাণুর প্রভাব কিংবা অন্য কোন সভ্যতার শেষ দৃশ্য মঞ্চায়িত হবে। যদি আমরা অন্য কোন গ্রহে বা বিশ্বে বসবাস না করি তবে আমরা বেশ মাতাল রয়েছি।’ এসব বিষয় মাথায় রেখে ইলন মাস্ক মঙ্গল যাত্রা থামিয়ে রাখবেন না। তিনি ওঞঝ এর মাধ্যমে শনির চাঁদ ইনছেলাডাস, বৃহষ্পতির চাঁদ ইরোপাসহ অন্যান্য সব জায়গায় ভ্রমণের ব্যবস্থা সচল রাখতে পারবে। এটা কি অর্জনীয় কাজ, হ্যাঁ, এটা একটা লম্বা বিতর্কের বিষয়। রেপটর ইঞ্জিনের প্রদর্শনীর মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনে মাস্ক অনেকটা যায়গা দখল করে নিয়েছে। এই ইঞ্জিনগুলো অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে রকেটকে শক্তি প্রদান করা হবে এবং বিশাল বিশাল জ্বালানি ট্যাঙ্ক মহাকাশযানে নিজে নিজে ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। কিন্তু এজন্য অনেক বাধা পেরুতে হবে এ নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। মঙ্গলে কিভাবে উপনিবেশগুলো টিকে থাকবে? কে যাবে ঐ গ্রহে। বিকিরণের সঙ্গে কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবে (মাস্ক বলেন এটা কোন বড় সমস্যা হবে না), এই প্রশ্নগুলো আগামী কয়েকদিন, মাস কিংবা বছরব্যাপী সময় নিয়ে বিবেচনার কেন্দ্রে থাকবে। এখনকার জন্য মাস্কের উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারী ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে অনুপ্রাণিত করা যাতে তাঁরা তার পরিকল্পনার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেন। সে সহযোগিতা চাচ্ছেন, সাহায্য চাচ্ছেন। এটাকেই তার জন্য একটি অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রথম যাত্রাটি খুবই বিপজ্জনক হবে। মৃত্যুর ঝুঁকি প্রবল। আরোহীকে অবশ্যই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে।’ কিন্তু এসকল আলোচনার ভিড়ে মাস্কের এই পরিকল্পনা মিডিয়ার ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। স্পেসএক্স দেখিয়ে দিয়েছে ২০০২ সালে বলার মতো কিছু না নিয়ে শুরু করে আজকে বিশ্বের অন্যতম নেতৃস্থানীয় একটি উড্ডয়ন পরিচালক হিসেবে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে এটাকেই মাস্ক সবার সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি কি সত্যিই মঙ্গলে একটি শক্তিশালী উপনিবেশ শুরু করতে পারবেন? সেটা সময়ই বলে দেবে।
মঙ্গলে চালানো অভিযানগুলো: মঙ্গলের প্রথম ফ্লাই-বাই করতে সমর্থ হয় নাসার মেরিনার ৪। ১৯৬৪ সালে এই নভোযান উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। প্রথম মঙ্গলের ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করে দুটি সোভিয়েত সন্ধানী যান, মার্স ২ এবং মার্স ৩। ১৯৭১ সালে উৎক্ষেপিত এই দুটি যানই সোভিয়েত মার্স প্রোব প্রোগ্রামের অংশ ছিল। দুঃখের বিষয় হলো, অবতরণের মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাথায় দুটি নভোযানের সঙ্গেই পৃথিবীর মিশন কন্ট্রোলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ১৯৭৬ সালে শুরু হয় নাসার বিখ্যাত ভাইকিং প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামে দুটি অরবিটার এবং প্রতিটি অরবিটারের সঙ্গে একটি করে ল্যান্ডার ছিল। দুটি ল্যান্ডারই ১৯৭৬ সালে মঙ্গলের ভূমিতে অবতরণ করে। ভাইকিং ১ ৬ বছর এবং ভাইকিং ২ ৩ বছর কর্মক্ষম ছিল এবং তাদের সঙ্গে এই সময়ে পৃথিবীর যোগাযোগও ছিল। ভাইকিং ল্যান্ডারগুলোই প্রথম মঙ্গলের রঙিন ছবি রিলে করে পৃথিবীতে পাঠিয়ে ছিল। এগুলো মঙ্গলপৃষ্ঠের এত সুন্দর মানচিত্র প্রস্তুত করেছিল যে এখনও তার কোন কোনটি ব্যবহৃত হয়। সোভিয়েত সন্ধানী যান ফোবোস ১ এবং ফোবোস ২ ১৯৮৮ সালে মঙ্গল এবং তার দুটি উপগ্রহ-ফোবোস ও ডিমোস পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। দুঃখজনকভাবে ফোবোস ১ এর সঙ্গে যাত্রাপথেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফোবোস ২ মঙ্গল এবং ফোবোসের ছবি তোলার পর ফোবোসে অবতরণের উদ্দেশ্যে দুটি ল্যান্ডার নামাতে যাওয়ান ঠিক আগে অকেজো হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এর সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯৯২ সালে মার্স অবজারভার অরবিটার ব্যর্থ হওয়ার পর নাসা ১৯৯৬ সালে মার্স গ্লোবাল সারভেয়ার প্রেরণ করে। শেষের অভিযানটি ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। ২০০১ সালে এর প্রাথমিক মঙ্গল মানচিত্রায়ন কাজ সম্পন্ন হয়। ২০০৬ সালের নবেম্বরে তৃতীয় বিস্তৃত প্রোগ্রামের সময় এর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। মহাকাশে প্রায় ১০ বছর কর্মক্ষম ছিল এই সারভেয়ার। সারভেয়ার প্রেরণের মাত্র এক মাস পরই নাসা মঙ্গলের উদ্দেশে মার্স পাথফাইন্ডার পাঠায় যার মধ্যে সোজার্নার নামক একটি রোবোটিক যান ছিল। সোজার্নার মঙ্গলের এরিস উপত্যকায় অবতরণ করে। এই অভিযান ছিল নাসার আরেকটি বড় ধরনের সাফল্য। এই অভিযানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। মঙ্গলের চমৎকার সব ছবি পাঠানোর জন্য জনমনে এ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ