ঢাকা, বৃহস্পতিবার 07 February 2019, ২৫ মাঘ ১৪২৫, ১ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

অনলাইনে হয়রানি ও উৎপীড়ন

বাংলাদেশে ফেসবুকসহ ইন্টারনেটের নানা নামের যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতারণা ও হয়রানি বেড়ে চলেছে। এসবের শিকার হচ্ছে বিশেষ করে শিশু-কিশোররা। ‘নিরাপদ ইন্টারনেট দিবস’ উপলক্ষে মঙ্গলবার ঢাকায় প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ১০ থেকে ১৭ পর্যন্ত বয়সের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৩২ শতাংশই সহিংসতা, ভয়-ভীতি প্রদর্শন এবং ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হচ্ছে অথবা শিকার হওয়ার মুখে রয়েছে। 
পাঁচ সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশসহ ১৬০টিরও বেশি দেশে প্রায় ১০ লাখ শিশু-কিশোর তথা তরুণ জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রণীত  ইউনিসেফের এই রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ১৬ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত বয়সীরাই অন্যদের তুলনায় উসকানিমূলক হয়রানির শিকার বেশি হচ্ছে। ইউনিসেফের সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ইন্টারনেট বা ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করতে শুরু করে। তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ৬৩ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারের স্থান হিসেবে প্রাথমিকভাবে বাসাবাড়িতে নিজের কক্ষকে ব্যবহার করে। পরবর্তীকালে এই গন্ডি ক্রমাগত বাড়তে থাকে। তারা বাইরের বিভিন্নস্থানেও ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত ও পারদর্শী হয়ে ওঠে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা এগিয়ে রয়েছে। ছেলেদের মধ্যে যেখানে ৬৩ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে সেখানে ব্যবহারকারী মেয়েদের সংখ্যার হার ৪৮ শতাংশ। ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে করা হয় অনলাইন চ্যাটিং বা মেসেজ আদান-প্রদান। এজন্য ব্যয় করা হচ্ছে ৩৩ শতাংশ সময়। এর পর রয়েছে ইন্টারনেটে ভিডিও দেখা। এজন্য ৩০ শতাংশ সময় ব্যয় করা হচ্ছে।
সমীক্ষায় কিছু বিচিত্র বা অস্বাভাবিক তথ্যও উঠে এসেছে। এরকম একটি তথ্য হলো, ছেলেদের ৭০ শতাংশ এবং মেয়েদের ৪৪ শতাংশ অনলাইনে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের পাঠানো বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে থাকে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ স্বীকার করেছে, তারা শুধু বন্ধুত্বের অনুরোধই গ্রহণ করে না, তাদের অনেকে এসব সদ্য পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতও করতে যায়। জানা গেছে, এভাবেই উসকানি ও যৌন হয়রানি থেকে সহিংসতা পর্যন্ত প্রায় সবকিছুরই শুরু হয়ে থাকে। একযোগে শুরু হয় মাদক এবং যৌন সামগ্রীর লেনদেনও। অনেকেই মাদকাসক্ত ও যৌনকর্মে অভ্যস্ত হতে থাকে।
বন্ধুত্বের আড়ালে ছেলেমেয়েরা অসামাজিক বিভিন্ন কর্মকান্ডেও জড়িয়ে পড়ে। যারা সম্মত হয় না কিংবা অনলাইন বন্ধুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভয়ভীতি দেখানো এবং হুমকি দেয়া হয়। বন্ধু নামের অনেকে এমনকি প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি অশ্লীল বিভিন্ন ছবিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেগুলো ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়। তখন শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ভয়ংকর কার্যক্রম। আর এ ব্যাপারে বেশি আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেয়েরা। এমন বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা মোকাবেলা ও প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে ইউনিসেফ বলেছে, এ উদ্দেশ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমরা ইউনিসেফের জরিপের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা তথ্য-পরিসংখ্যানগুলোকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আশংকাজনক মনে করি। এটাই স্বাভাবিক যে, তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশের এই যুগে ছেলেমেয়েরা কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করবে। ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার, টুইটার ও হোয়টসঅ্যাপসহ নানা যোগাযোগ মাধ্যমে তারা শুধু অন্যদের সঙ্গে পরিচিত হবে না, বন্ধুত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে শিখবেও অনেক কিছু। ইন্টারনেটের এমন ব্যবহারই বিশ্বের দেশে দেশে হয়ে আসছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে ঘটছে সম্পূর্ণ উল্টো রকম। এখানে শিক্ষার চাইতে অশ্লীল বিনোদনের ব্যাপারেই সুচিন্তিতভাবে বেশি আগ্রহ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ছেলেমেয়েরাও নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। এভাবে ছেলেমেয়েদের মধ্যে অশ্লীলতা যেমন ছড়িয়ে পড়ছে তেমনি এর সুযোগ নিচ্ছে অনলাইনে তৎপর দুর্বৃত্তরা। বন্ধুত্বের ছদ্মাবরণে তারা মাদকের ব্যবসা থেকে যৌন হয়রানি পর্যন্ত নানা অপরাধে জড়িয়ে ফেলছে ছেলেমেয়েদের।
এজন্যই ইউনিসেফ তার রিপোর্টে যৌনতা ও মাদকাসক্তিসহ সহিংসতার ঘটনা মোকাবেলা ও প্রতিরোধ করার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানিয়েছে। আমরাও মনে করি, এ ব্যাপারে শুরু করতে হবে পরিবারের ভেতর থেকে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের জন্য শিশু-কিশোরদের দাবি ও আবদার পূরণ করার পাশাপাশি তাদের প্রতি নজরদারিও বাড়াতে হবে। প্রত্যেকের কার্যক্রমের প্রতি গভীর দৃষ্টি রাখতে হবে, তারা যাতে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে না পড়তে পারে। সময়ে সময়ে ইন্টারনেটের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে তাদের যুক্তি দিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে বোঝাতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তিদের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করার ব্যাপারে যেমন নিরুৎসাহিত করতে হবে তেমনি বুঝিয়ে বলতে হবে, তারা যেন অনলাইন চ্যাটিংয়ের আড়ালে কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না যায়। যাতে মাদক এবং যৌন সামগ্রীর বিষয়ে সতর্ক থাকে এবং অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে না পড়ে।
এ ব্যাপারে প্রাথমিক দায়িত্ব পরিবারের হলেও সমন্বিত পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে বলে আমরা মনে করি। সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে অনলাইনের হয়রানি ও উৎপীড়ন বন্ধ করার জন্য অবিলম্বে তৎপর হয়ে ওঠা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ