ঢাকা, রোববার 10 February 2019, ২৮ মাঘ ১৪২৫, ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রাতে ভোট হওয়ার কথা স্বীকার করেছে জাসদ (আম্বিয়া) রিজার্ভ চুরির মামলায় লাভ হবে না -ওয়াশিংটন পোস্ট

এই লেখাটি শুরু করেছি বৃহস্পতিবার ৭ ফেব্রুয়ারি। লেখাটি ছাপা হবে ১০ ফেব্রুয়ারি রবিবার। ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েকটি মন্তব্য পাওয়া গেছে যা পাঠকদের মধ্যে বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি করেছে এবং জল্পনা কল্পনার জন্ম দিয়েছে। সামনে আছে আর শুক্র ও শনিবার। আমার ধারণা এই দুই দিনে এই বিষয়গুলো নিয়ে মন্তব্য এবং জল্পনা-কল্পনার আরও ডালপালা গজাতে পারে। যদিও আমি বৃহস্পতিবার লেখাটি শুরু করেছি তবুও এটি আমি শেষ করবো শনিবার ৯ই ফেব্রুয়ারি। প্রথমেই একটি মজার ঘটনা দিয়ে লেখাটি শুরু করছি।
৩০ ডিসেম্বর তখনও ভোট শেষ হয়নি। সারা বাংলাদেশে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে আগের রাতে অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর রাতেই ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে। অর্থাৎ সেই ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। এখন মোবাইলের যুগ। বাংলাদেশের ১৭ কোটি লোকের মধ্যে ১৪ কোটি লোকের মোবাইল আছে। এই ১৪ কোটির মধ্যে অবশ্য কয়েক লাখ লোকের ২,৩ বা ৪টি করে সিম রয়েছে। সুতরাং এখন আর দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে খবর ছড়িয়ে দেওয়া নস্যির ব্যাপার। ২৮ ডিসেম্বর  মফস্বলের ৯০ শতাংশ প্রার্থীর কাছে অত্যন্ত কনফার্মড এবং ডেফিনিট খবর আসে যে পরদিন অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর রাতেই নৌকা ও লাঙ্গলের ব্যালট বাক্সে সীল মারা হবে এবং তাদের বিজয় ২৯ তারিখ রাত্রেই সুনিশ্চিত করা হবে। এই বিজয় সুনিশ্চিত করার ব্যাপারে বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এবারই সর্বপ্রথম প্রশাসনকে সরাসরি জড়িত করানো হচ্ছে। ৩০ তারিখ প্রথম ২ ঘণ্টার জন্য নির্বাচনের নামে একটি নাটক করা হবে। তবে এই নাটকে পূর্ব নির্ধারিত নির্বাচনী ফলাফলের কোনো হেরফের হবে না। পরদিন ৩০ তারিখ সকাল ৮টা থেকেই হাজার হাজার কেন্দ্র থেকে খবর আসতে থাকে যে, দেশের প্রায় সবগুলি ভোট কেন্দ্র সরকার পক্ষ দখল করে নিয়েছেন। কেন্দ্রসমূহে হাজার হাজার মানুষ হতভম্ব হয়ে দেখতে পান যে, প্রশাসনের নাকের ডগার ওপর আওয়ামী কর্মী বাহিনী ব্যালট বাক্সে তাদের প্রার্থীর সব পক্ষে অবিরাম সীল মেরে যাচ্ছে।
এতদিন পর্যন্ত এই সব কথা বিরোধী দল বলে যাচ্ছিলো। অর্থাৎ বিএনপি, জামায়াত, গণফোরাম, জাসদ, নাগরিক ঐক্য এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এসব অভিযোগ করে যাচ্ছিলো। সুতরাং সরকার এসব অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছিলো। কিন্তু এবার ঐ একই অভিযোগ খোদ সরকারের মহল থেকেই এসেছে এবং মহলটি হলো ১৪ দলীয় জোট  তথা মহাজোটের অন্যতম অংশীদার শরিফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন জাসদ। নুরুল আম্বিয়ার জাসদ থেকেও একজন প্রার্থী এমপি হয়েছেন। তিনি হলেন মইনুদ্দিন খান বাদল। গতবারেও তিনি এমপি ছিলেন। বাদল সাহেব এমপি হিসাবে সর্বক্ষণ বিএনপি এবং জামায়াতকে বাঁশ দিয়েছেন। কথায় বলে, ‘ রাজা যাহা বলে/ পারিষদ দল বলে তার শতগুণ।’ আওয়ামী লীগ বিএনপি এবং জামায়াতের যতো টা না কঠোর সমালোচনা করতো মইনুদ্দিন খান বাদল তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি কঠোর সমালোচনা করতেন। সেই বাদলের দল জাসদ, যারা ১৪ দলের শরীক, তারা এবারের নির্বাচন সম্পর্কে কি বলেছেন দেখুন,
“শরিফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন জাসদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তিসহ নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। মহাজোটের শরীক বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এজন্য প্রশাসনে অতি উৎসাহী একটি অংশ দায়ী বলে মনে করছে। এ সম্পর্কিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ জাসদ তাদের সভার মূল্যায়ন তুলে বলে, দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণ উদ্দীপনা ও আশা নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচনের পরে বিষণœতায় আক্রান্ত হয়েছে গোটা জাতি। এর মূল কারণ হচ্ছে, প্রশাসনের এক শ্রেণির অতি উৎসাহী অংশ ভোটের পূর্ব রাত্রেই ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখাসহ নানা অনিয়ম সংঘটিত করেছে।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যে মহল বিশেষ এ অপকর্ম সংঘটিত করেছে, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থেই তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।”
আম্বিয়াদের জাসদ থেকে একজন এমপি হয়েছেন। তারপরেও সেই জাসদ রাতের ভোটের কথা উল্লেখ করেছেন। কথায় বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।
॥দুই॥
ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে। গত দুই তিন বছর থেকে বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি এবং জামায়াত একথা বলে যাচ্ছে। একাধিক সেমিনার  করে হিসাব দেখানো  হয়েছে যে এ পর্যন্ত কম করে হলেও ৩২ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। প্রজেক্টরে তথা পাওয়ার পয়েন্টে ঐ লুন্ঠিত ৩২ হাজার কোটি টাকার হিসাবও দেখানো হয়েছে। তারপরেও সরকার নির্বিকার। সরকার বরং বেগম জিয়ার ঐ দুই কোটি টাকার তথাকথিত আত্মসাৎ নিয়ে অষ্ট প্রহর মাথা ঘামিয়েছে, যদিও দেখা গেছে যে ঐ ২ কোটি টাকা বেড়ে ৬ কোটি টাকা হয়েছে এবং ঐ ৬ কোটি টাকা এখনও ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বেগম জিয়াকে এই দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১০ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঐ যে একটু আগেই বলেছি, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে, এই টাকা চুরির অভিযোগের কলও বাতাসে নড়েছে। এবার স্বয়ং মাননীয় হাইকোর্ট বলেছেন যে হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি হচ্ছে। এব্যাপারে গত ৭ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার মাননীয় হাইকোর্ট এই মন্তব্য করেছেন। এ সম্পর্কে গত বৃহস্পতিবার দেশের প্রতিষ্ঠিত দৈনিকগুলোর একাধিক অন লাইনে যে রিপোর্ট করা হয়েছে তা নিম্নরূপঃ
“ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রমে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেছেন, ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে আর তারা শিক্ষকদের নিয়ে ব্যস্ত। আজ কোচিং সেন্টার রিটের শুনানিতে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও রাজিক আল জলিল সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ কথা বলেন। আদালত বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বড় বড় রাঘব বোয়ালদের ধরে এনে ছেড়ে দিয়ে স্কুল শিক্ষকদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে দুদক। যেখানে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে, সেখানে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা স্কুলে যাচ্ছেন কি যাচ্ছেন না তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তারা। দুদক দুর্নীতিবাজ রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না উল্লেখ করে আদালত বলেন, ছোট দুর্নীতির আগে বড় বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। তবেই দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হবে।”
বিএনপি, জামায়াত ও ঐক্যফ্রন্টের মতে ভুয়া ভোটের মাধ্যমে গঠিত অবৈধ সরকার এবার খুব বড় বড় গাল ভরা বুলি আওড়াচ্ছে। এখন খোদ হাইকোর্ট যখন বলেছে যে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে তখন সরকার হাইকোর্টের এই অভিযোগের ব্যাপারে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেটি দেখার জন্য জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
॥তিন॥
অর্থ লুটের কথাই যখন উঠলো তখন অবধারিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক লুটের কথা এসে যায়। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকে সাইবার চুরির মাধ্যমে প্রায় ৯ শত কোটি টাকা লুন্ঠিত হয়। ৩ বছর হয়ে গেল এই চুরির কোনো কিনারা হয়নি। এই নিয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এবং সরকারের সংশ্লিষ্টরা শুধু বাগাড়ম্বরই করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে অঘটন ঘটলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে প্রথমে ধরা হয়। জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্টে ২ কোটি টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ সরকার করেছে সেখানে সর্বাগ্রে  প্রধান আসামী করা হয়েছে সাবেক প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এবং তিনি ১০ বছরের কারাদন্ডও ভোগ করছেন (যদিও এই কারাদন্ড নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে এবং অধিকাংশ মানুষ এটিকে রাজনৈতিক সাজা বলে মনে করেন)। যাই হোক, মূল কথা হলো, প্রতিষ্ঠান প্রধানকে এই ব্যাপারে প্রথমে ধরা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ব্যাংকের প্রধান অর্থাৎ গভর্ণরকে মোটেই স্পর্শ করা হয়নি। গভর্ণর আতিউরকে সেখান থেকে ট্রান্সফার করে আবার তার পূর্ব অবস্থান অর্থাৎ অধ্যাপনায় ফেরত আনা হয়েছে। এখানে এসেও তিনি দিব্যি চাকরি বাকরি করছেন এবং বিদেশ ভ্রমণও করছেন।
যাই হোক, দীর্ঘ ৩ বছর পর অবশেষে সরকার এই রিজার্ভ চুরির ব্যাপারে একটি মামলা করেছে। আমেরিকার ২য় শীর্ষ সংবাদ পত্র ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ এই মর্মে মন্তব্য করেছে যে, এই মামলা করে কোনো লাভ হবে না। বাংলাদেশ কোনো টাকা ফেরত পাবে না। পত্রিকাটির একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অভিযোগ আছে, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাক করেছে। কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভ ও বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এই টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ২০১৬ সালে চুরি হওয়া অর্থের বড় অংশই গেছে ফিলিপাইনে। দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) মাধ্যমে এই অর্থ দেশটির কয়েকটি ক্যাসিনোতে ঢুকে যায়। যার সিংহভাগ অর্থের হদিসই মিলছে না এখন। মার্কিন সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক আইনজীবী মার্কাস ক্রিশ্চিয়ান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘আপনি যদি প্রকৃত অর্থে হ্যাক হয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধার করতে চান, তাহলে আপনাকে প্রচুর অর্থের মালিক এমন একজন মানুষ খুঁজে বের করতে হবে। ওই মানুষ অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে দেখবে, আরও অনেকে এই দোষে দোষী।’ মার্কাস ক্রিশ্চিয়ান আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মতো ছোট অঙ্কের অর্থও সম্ভবত উদ্ধার করতে পারবে না। কারণ তাদের হাতে যেমন এই পরিমাণ অর্থ থাকে না, তেমনি তারা আন্তর্জাতিক আইনের আওতারও বাইরে; যাকে বলে বৈশ্বিক সমাজচ্যুত। ওয়াশিংটন পোস্টের এই মন্তব্য প্রতিবেদনের পর বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে জনগণের আই ওয়াশ করার জন্যই এই মামলাটি করা হয়েছে।
এই সরকার ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় আসার পর জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে। সেটি উদ্ধারের জন্য ইদানীং দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই সরকার খুব গলা ফাটাচ্ছে। কিন্তু এই সরকারের আমলেই আরও কতগুলো ক্ষেত্রে অর্থ লুটপাটের যেসব ঘটনা ঘটেছে সেসব ঘটনা বা কেসের প্রত্যেকটির অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ৯ শত কোটি টাকার বেশি। এসব ক্ষেত্রে হাজার হাজার কোটি টাকা জড়িত রয়েছে। সেদিকে এখন পর্যন্ত সরকার মোটেই নজর দেয়নি। তাই জনগণের মনে এখন প্রবল সন্দেহ যে লুন্ঠিত অর্থ পুনরুদ্ধার অথবা অর্থ লুন্ঠনকারীদের বিচারের ব্যাপারে সরকার মোটেও আন্তরিক নন। যদি সরকার এসব অর্থ লুন্ঠনের প্রকৃত কালপ্রিটদেরকে ধরতে যায় তাহলে  কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে।
asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ