ঢাকা, সোমবার 11 February 2019, ২৯ মাঘ ১৪২৫, ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড’র তদন্ত রহস্যজালে বন্দী!

# সাত বছরে ৬৩ বার সময়ের আবেদন
# তদন্তে অগ্রগতি নেই
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে কতজনইতো কতো কথা, কতো আশ্বাস দিয়েছিলেন-তার কোনটারই দাম পাওয়া গেলো না বিগত সাত বছরেও। যেখানে মামলার তদন্তই ঘুরপাক খাচ্ছে নানা কারণে, সেখানে খুনের বিচার কবে হবে-সেটারও নিশ্চয়তা নেই। প্রতিবছরই তাদের হত্যার দিনটি সামনে এলেই সংশ্লিষ্টরা একটু আধটু নড়েচড়ে বসেন। নতুন করে স্বপ্ন দেখান-আশ্বাস দেন। তারপর আবার সেই আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া। এভাবেই বিগত সাতটি বছর কেটে যেতে যেতে আবারও ফিরে এসেছে সাগর-রুনিকে মনে করার দিন। আজ ১১ ফেব্রুয়ারি তাদের ‘রহস্যবৃত্ত হত্যাকাণ্ড’র দিনটি ফিরে এলেও কোন আইনী প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নেই। অগ্রগতি বলতে গত সাত বছরে যা হয়েছে, তা হলো পুলিশ ও র‌্যাবের ছয়জন কর্মকর্তার হাত ঘুরে ওই হত্যা মামলার তদন্তের জন্য ৬৩ বার সময়ের আবেদন পড়েছে আদালতের এজলাসে। বিচারকও তাতে সায় দিয়ে সময়ের আবেদন গ্রহণ করে তদন্ত সংস্থার ওপর পড়া ‘বার্ষিক চাপ’ থেকে নিস্তার দিচ্ছেন। সব কিছু মিলিয়ে বলা যায়, সাগর-রুনিকে ভুলতে বসেছে সবাই।
তদন্ত শেষে কবে নাগাদ অভিযোগপত্র দেয়া যাবে, সে বিষয়ে সুর্নিদিষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের এএসপি মো. শহিদার রহমান। তদন্তের প্রয়োজনে যে সব পরীক্ষা করা হয়েছে, তার সবগুলোর প্রতিবেদন পাওয়ার কথা জানালেও এতে কী মিলেছে, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাইছেন না তিনি। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় যে আটজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল, তার মধ্যে দুজন জামিনে বেরিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। সাত বছর শেষে এই অগ্রগতির তথ্য জানালো তদন্ত সংস্থা।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। দুজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ওই রাতে তারা ছাড়া ঘরে ছিল তাদের একমাত্র শিশুসন্তান।
হত্যাকাণ্ডের পর রুনির ভাই মো. নওশের আলম রোমানের করা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই জহুরুল ইসলাম। তার কাছ থেকে তদন্তের দায়িত্ব গিয়েছিল ডিবির পরিদর্শক রবিউল আলমের কাছে। ৬২ দিন পর ডিবি আদালতের কাছে ব্যর্থতা স্বীকার করলে ২০১২ সালের এপ্রিলে তদন্তের দায়িত্বে আসে র‌্যাব। এরপর র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার হাত ঘুরে তদন্তভার আসে এএসপি শহিদারের কাছে।
হত্যাকাণ্ডের সপ্তম বছর পূর্তির আগে তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষাসহ তদন্তের প্রয়োজনে যে সব পরীক্ষা করা হয়েছিল, সবগুলোর ফলাফল তারা পেয়েছেন। বিদেশে করা পরীক্ষার ফলাফলও তাদের হাতে এসেছে।
এ সব পরীক্ষায় কী ফলাফল পাওয়া গেছে- জানতে চাইলে ‘তদন্তের স্বার্থে’ এখন কিছু বলতে রাজি হননি এই র‌্যাব কর্মকর্তা।
অভিযোগপত্র কবে নাগাদ দিতে পারবেন- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। চার্জশিট দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ দেওয়ার সুযোগ নেই। সময় হলে চার্জশিট দেওয়া হবে।”
আদালতের নিয়মে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন রয়েছে। তবে এই পর্যন্ত আদালত থেকে ৬৩ বার সময় নিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। সময়ে সময়ে তারা দিয়ে যাচ্ছেন তদন্তের অগ্রগতির প্রতিবেদন।
২০১৭ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের ইনভেস্টিগেশন অ্যাণ্ড ফরেনসিক উইংয়ের সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহমেদ একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন আদালতে। তিনি বলেন, “গতানুগতিক তদন্তের বাইরে গিয়ে অত্যাধুনিক তদন্ত পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ প্রাপ্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দু’টি অত্যাধুনিক ল্যাবকে এ তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ল্যাব থেকে পাওয়া ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।” বিদেশে পাঠানো আলামতের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে দেশে চালানো বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
মামলাটিতে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন ওই বাড়ির নিরাপত্তা রক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু ওরফে মাসুম মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ ও আবু সাঈদ।
রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান ও বাড়ির দারোয়ান পলাশ রুদ্র পাল জামিনে বাইরে রয়েছেন।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের দিনটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। প্রতিবারই কর্মসূচিতে বিচার শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
যা এখনও কানে বাজে
সাগর-রুনির নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কয়েক বছর ধরে সর্বশেষ তদন্ত সংস্থা র‌্যাবও একই ‘অগ্রগতি’র গল্প শুনিয়ে আসছে।
হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু ২ হাজার ৫৫৫ দিনেও ঘাতক চক্রের কোনো সদস্য ধরা পড়েনি। মামলার তদন্ত কর্তৃপক্ষও এখন আর যোগাযোগ করে না সাগর-রুনির পরিবারের সঙ্গে।
২০১৪ সালে র‌্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান জানিয়েছিলেন, তদন্তে অগ্রগতি রয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। এর পর গত কয়েক বছর একই ‘অগ্রগতি’র কথা জানিয়ে আসছেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমাণ্ডার মুফতি মাহমুদ খান।
মেঘ কিছুটা বুঝতে শুরু করেছে
সাগর-রুনি দম্পতির একমাত্র ছেলে মাহীর সরওয়ার মেঘ রাজধানীর বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল স্কুলের স্ট্যাণ্ডার্ড সিক্সে পড়ছে। ছোট্ট মেঘ বড় হচ্ছে। বাবা-মায়ের হত্যাকা- নিয়ে কিছুটা বুঝতেও শুরু করেছে। এ নিয়ে মেঘ কথাও বলে তার মামা নওশের রোমানের সঙ্গে। ঘটনার পর থেকে মামার কাছেই থাকে মেঘ। বাবা-মায়ের আশ্রয় যেন এই মামাই। মা-বাবাকে হারানোর কোনো বিচার হচ্ছে না সেটি মেঘ বুঝতে পারে বলে জানালেন তার মামা নওশের নোমান।
ডিআরইউর কর্মসূচি
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে ডিআরইউ আজ সোমবার ১১ ফেব্রুয়ারি ডিআরইউ চত্বরে সকাল ১১টায় প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে। সমাবেশে সাগর-রুনী পরিবারের সদস্য, গণমাধ্যমের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের সাংবাদিকগণ অংশগ্রহণ করবেন বলে সংগঠনের পক্ষ হতে জানানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ