ঢাকা, সোমবার 11 February 2019, ২৯ মাঘ ১৪২৫, ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলাভাষা খোদার সেরা দান

স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় চেতনা বিকাশের মাস ফেব্রুয়ারির একাদশ দিবস আজ সোমবার । ১৯৫২ সালের এই দিনেও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম, অধ্যাপক ড. এ এস এম নূরুল হক ভূঁইয়াসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রসহ কিছু অগ্রণী চিন্তার মানুষ। যদিও একপর্যায়ে সর্বস্তরের মানুষ ভাষার সংগ্রামে নিজেদের সম্পৃক্ত করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এদিন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষার জন্য লড়াকু ছাত্ররা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা পতাকা বিক্রির মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে পতাকা দিবস পালন করে বলে ঐতিহাসিক দলিলাদির কোথাও কোথাও বর্ণিত হয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল মাতৃভাষার মাধ্যমে এ অঞ্চলের জনগণের আত্মপরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিকভাবে বাইরের প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়াও ছিল এ চেতনার অন্যতম রসদ। ভাষা আল্লাহ শানে জালালুহুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। পৃথিবীতে অস্তিত্বমান তাবৎ মাখলুকাতের প্রত্যেকের ভাষা ভিন্ন ভিন্ন এমনকি একই ভাষাভাষী মানুষেরও ভাষা ও উচ্চারণ আলাদা আলাদা। আবার একই ভাষা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রূপ লাভ করেছে। এটি মহান প্রভুর অসীম কুদরতেরই অনন্য নিদর্শন। মাতৃভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সা¤্রাজ্যবাদী মনোভাবের কারণে এ অঞ্চলের বাংলাভাষী মানুষ সে অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চলেছিল। এই অধিকার পরিণত হয় দাবিতে। বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবীরাও রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি আদায়ে বজ্রশপথ নিয়ে রাজপথে নামেন।
১৯৪৭ সালের দিকে কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বিষয় তালিকায় উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি, ল্যাটিন, সংস্কৃতসহ ৯টি ভাষা অন্তর্ভুক্ত হলেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাংলাকে বাদ দেয়া হয়। অথচ এ দেশের দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী ছিল বাংলাভাষী। এ অবিচার তাই কেউ কেউ মেনে নিতে পারেনি। তবে আমাদের ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা সফল হলে চিরদিনের জন্য হতে হতো পরাশ্রয়ী, করুণার জাতি। ভাষাসৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর মনে করেন, এতে বাঙালি মুসলমানদের সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হতো। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতো এবং বাংলাভাষার ওপর বাঙালি মুসলমানের স্বাভাবিক দাবি দুর্বল হয়ে পড়তো।
 লেখক মোস্তফা কামাল তার ‘ভাষা আন্দোলন : ’৪৭ থেকে ’৫২’ শীর্ষক গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেন, ‘ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য চেতনাদীপ্ত অধ্যায়। এ আন্দোলন জাতির সত্তা অন্বেষার এক বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। জাতির এগিয়ে চলার জন্য এ আন্দোলন প্রতিবাদী চেতনার এমন এক সুবিস্তৃত পথ রচনা করেছে, যা জাতিকে যে কোনো সঙ্কটকালে পথের দিশা দেবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার, অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রেরণা দেবে এ আন্দোলন। এ আন্দোলনের উত্তাপ আজো জাতিকে উজ্জীবিত করে। তাই ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে ভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদী চেতনার পথ দিয়ে আজো চলছে জাতির দৃপ্ত পদচারণা।
ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী কর্মসূচি পালনের আহ্বান ছাড়াও ১০-১২ ফেব্রুয়ারি অর্থ সংগ্রহের জন্য পতাকা দিবস ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে আতাউর রহমান খানের মতে, ১১ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি এই তিনদিন পতাকা দিবস পালন করা হয়।
সরকারি কাজেই নিশ্চিত হয়নি বাংলার ব্যবহার: ফেব্রুয়ারি এলে সবাই একটু বাংলাভাষার প্রতি দরদী হয়ে উঠলেও ভাষার প্রতি সঠিক বিচার বিবেচনা কতটুকু করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারি কাজেই এখনো বাংলা ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। এখনো সরকারি দফতর থেকে পাঠানো বাংলা চিঠিগুলোতে ব্যাকরণ ও বানানসহ বাক্যগঠনে অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
সরকারি কাজে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেছেন, সর্বস্তরে বাংলাভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করলেই হবে না বাংলার ব্যবহার সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা সেটি জরুরি। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার প্রথম সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর এটা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলেন, বাংলাভাষার ব্যবহার সর্বস্তরে চালু করতে সরকারি উদ্যোগ জরুরি। এখানে সরকারকেই প্রথমত আইনের প্রতি অবিচল থাকতে হবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে নানা আদেশ ও নির্দেশনা জারি হয়েছে বাংলাদেশে। তারপরও সেসব আইন বা নির্দেশনা তোয়াক্কা না করে দেশের সকল স্থানে নামফলক, সাইনবোর্ড, বক্তৃতা, উচ্চশিক্ষাসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজই চলছে অরাষ্ট্র ভাষায়। এমনকি আদেশদানকারী আদালতেও নেই বাংলার ব্যবহার।
ভাষা  সৈনিক আহমদ রফিক বলেন, উদাসীনতা ও অবহেলার কারণেই সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার আজও নিশ্চিত করা যায়নি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আদালতের নির্দেশসহ এতসব উদ্যোগ থাকার পরও বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন অবনতি শুধুমাত্র আমাদের সদিচ্ছার অভাবে। সরকারি কাজে বাংলার সঠিক ব্যবহার প্রয়োজন। বিচার বিভাগকে সালাম জানাতেই হয়। কারণ প্রত্যক্ষ কাজ না হলেও বিচারকরা বাংলাভাষার ব্যবহার নিয়ে ভেবেছেন, এটা কার্যকর করার নির্দেশও দিয়েছেন তারা।
অনেক ঘটনার পর ১৯৯৬ সালের ২৮ মে সচিব কমিটির সভার সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক দলিলাদির ক্ষেত্রে অফিস-আদালতে সর্বত্র সাধু ভাষা ব্যবহার করা ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে এর বাধ্যবাধকতা থাকবে না বলে জানানো হয়। ১৯৯৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বাংলায় একটি মামলার রায় দেয়। ২০১৩ সালে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে বাংলার প্রচলন, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার গাড়ির নম্বর প্লেট, বিভিন্ন দফতরের নামফলক, গণমাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এরপর একই বছরের ১৪ মে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে সাইনবোর্ড ও নামফলক বাংলায় লেখা নিশ্চিত করতে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতের রায় এবং ডজনখানেকেরও বেশি সরকারি আদেশ, পরিপত্র বা বিধিতে বাংলা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবুও সরকারি কাজের সবক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায়নি রাষ্ট্রভাষা বাংলার ব্যবহার।
প্রযুক্তিতে অবহেলিত বাংলা ভাষা: বিজ্ঞানের কল্যাণে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে প্রযুক্তির আশীর্বাদ। ঘরে, বাইরে, হাতের মুঠোয়, কোথায় নেই প্রযুক্তির ব্যবহার। তবে প্রযুক্তিতে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার যেমন জনপ্রিয়, ঠিক তেমনই অবহেলিত বাংলা ভাষা। তরুণরা বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ্য হলেও প্রবীণরা মনে করেন প্রযুক্তিতে বাংলার প্রচলন আরো ব্যাপকভাবে হলে এর সুফল ভোগ করবে সাধারণ মানুষ। এর জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ