ঢাকা, সোমবার 11 February 2019, ২৯ মাঘ ১৪২৫, ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘ঠিলে ধুয়ে দে বৌ গাছ কাটতি যাবো ॥ সন্ধ্যে নঁস ঝাড়ে আইনে জাঁও নাইন্দে খাবো’

খেজুরের রস সংগ্রহ করছে গাছি

ঝিনাইদহ সংবাদদাতা : ‘ঠিলে ধুয়ে দে বৌ গাছ কাটতি যাবো, সন্ধে নঁস  ঝাড়ে আইনে  জাঁও নাইন্দে খাবো’ ঝিনাইদহ অঞ্চলের জনপ্রিয় এই আঞ্চলিক গান নিয়ে অনেক কেচ্ছা- কাহিনি আছে। তবে শীতের শুরু থেকেই গ্রাম পাড়া মহল্লা কিংবা শহরে সর্বত্রই পিঠাপুলি খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আর সেই পিঠাপুলি যদি তৈরী হয় খেজুরের গুড় দিয়ে তাহলে তো কথায় নেই। খেজুরের গুড়ের মুখরোচক পিঠাপুলির বাড়তিস্বাদ যেন আরো বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের যে সমস্ত অঞ্চলে খেজুরগাছের দেখা মেলে ঝিনাইদহ জেলা তার মধ্যে অন্যতম। এ জেলার বিভিন্ন হাট বাজারে খেজুরের গুড় পাটালি বিক্রি হলেও কালীগঞ্জ উপজেলার গুড়ের হাটের পরিচিতি ব্যাপক। মাঘ মাসের বিকালে গাছিরা মাটির ভাঁড় (ঠিলে) আর গাছি দা হাতে উঠে পড়েন খেঁজুর গাছে। সকালে রস সংগ্রহের পর বাড়ির গৃহিনীদের সহায়তায় তৈরী করা হয় গুড়-পাটালি। প্রতিদিন এসব গুড়-পাটালি গ্রাম থেকে পাইকার ব্যবসায়ীরা কিনেনিয়ে হাটে বাজারে বিক্রি করে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে এসব গুড় কিনে নিয়ে যায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কালিগঞ্জ খেজুর গুড়ের হাট এখন বেশ জমজমাট। স্থানীয় এলাকার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, খুলনা, চট্রগ্রাম, বরিশাল, কুমিল্লাসহ প্রায় ২০ জেলার পাইকারী ব্যবসায়ীরা আসে এই হাটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যাপারীদের পদচারণায় সপ্তাহের দুইদিন মুখর হয়ে ওঠে হাটচত্বর। ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে চলে দর কষাকষি। গুড় কেনার পর মাটির ভাঁড় সারি সারি ভাবে সাজিয়ে তোলা হয় ট্রাকে। আরএসব ট্রাকে খেঁজুরের গুড় চলে যায় দেশের বিভিন্ন পাইকারী বাজারে। হাঁেট গুড় কিনতে আসা পাইকারী ব্যবসায়ীরা জানান গত বছরের তুলনায় এবারের খেঁজুরের গুড়ের দাম একটু চড়া। তবে আমদানির তুলনায় চাহিদা একটু বেশি হলে সব জিনিষের দাম একটু বাড়ে। খেঁজুরের গুড়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শহরে নিমতলা বাসস্ট্যান্ডে গুড় পাটালির হাট শীত মৌসুমের সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ও সোমবারে বসে। হাটের দিনে প্রচুর খেজুরের গুড় পাটালি আমদানি হয় এই হাটে।
 আর বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে কালীগঞ্জ গুড়েরহাট নামেও ব্যাপক পরিচিত। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের মধ্যে এটি এখনো টিকে আছে। এই হাট এখানকার একটি ঐতিহ্য। দেশের অন্য গুড়ের হাট থেকে এই হাটে ভাল মানের গুড় ও পাটালি পাওয়া যায়। দাম তুলনামূলক কম থাকায় দেশের বিভিন্ন স্থানের গুড় ব্যবসায়ীরা এখানে আসে।
 উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে গাছিরা তাদের উৎপাদিত গুড় ও পাটালি বাজারে বিক্রির জন্য আনেন। সদর উপজেলার গান্না গ্রামের আব্দুল আলিম বলেন, ৩৫ বছর ধরে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। নিজের রয়েছে প্রায় ৮২টি খেজুর গাছ। এসব গাছ থেকে ৮-৯ কলস (মাটির তৈরি) রস পেলে মাটির এক কলস (৮-১০) কেজি ভাল গুড় হয়। এক কলস ভাল গুড় বর্তমানে ৬৫০ থেকে ৭শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ঝোল (তরল) গুড় বিক্রি হচ্ছে এক কলস ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকায়। রস থেকে তৈরিকৃত পাটালি বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে। বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষক রজব আলী বলেন, জেলায় উৎপাদিত খেজুরের গুড়ের ব্যাপক কদর রয়েছে। এ কারনে ব্যবসায়ীরা এখান থেকে গুড় কিনে নিয়ে অন্যএলাকায় বিক্রি করেন।
কালীগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা তোবারক আলী মন্ডল বলেন, বিভিন্ন স্থান থেকে হাটে আসা মোকামিদের তিনি গুড় কিনে দেন। বড় বড় মোকামীরা ঠিলে (মাটির হাড়ি) থেকে গুড় ঢেলে ড্রামে ভরে নিয়ে যান। রাজশাহীর গুড় ব্যবসায়ী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, এখানের গুড় ও পাটালিতে রসের গন্ধ যেন লেগে থাকে। তাই প্রতি হাটে রাজশাহী থেকে কালীগঞ্জে গুড় ও পাটালি কিনতে আসি। অন্য ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেন বলেন, কালীগঞ্জের খেজুরের গুড়ের বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ক্রেতারা কিনতে আগ্রহ বোধ করে। কালীগঞ্জ থেকে প্রতি সপ্তাহে ২/৩ ট্রাক গুড় সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠায়। ব্যবসায়ী মহির উদ্দীন বলেন, তিনি ৩৫ বছর ধরে গুড়ের ব্যবসা করছেন। কুমিল্লা থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল আলী জানান দিন দিন খেঁজুরের গুড়ের চাহিদা বাড়ছে। চলতি মৌসুমে তিনি তিন ট্রাক গুড় কিনেছেন। এখানকার গুড় ভাল হওয়ায় দাম একটু বেশি হলেও গুড় কিনে খুশি তিনি। স্থানীয় গুড় বিক্রেতাদের দাবী বাইরের জেলার পাইকারী গুড়ক্রেতারা এখানে এসে যেন কোন প্রকার হয়রানির শিকার না হয় সে দিকে প্রশাসন যদি একটু সুনজর রাখেন তা হলে ঐতিহ্যবাহী এই গুড়ের হাট আরো জমে উঠবে।
এদিকে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের মধ্যে সাতমাইল, বারবাজার, ডাকবাংলা ও কালীগঞ্জে খেজুর গুড়ের বড় হাট বসে। এখন কালীগঞ্জ ছাড়া অন্যান্য স্থানে তেমন গুড় উঠে না। কালীগঞ্জের মোকামটি এখনো বড়।
 উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম বলেন, জেলায় তিন লাখের মত খেজুরের গাছ রয়েছে। তবে ইটভাটার কারণে স্থানীয়ভাবে প্রতিদিনই খেজুরের গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। তারপরও কৃষি অফিস উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের খেঁজুর গাছ রোপনের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ