ঢাকা, মঙ্গলবার 12 February 2019, ৩০ মাঘ ১৪২৫, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন নিয়ে কথা

আবুল আসাদ:

সত্য যেমন একটাই হয়, তেমনি ইতিহাসও একটাই হবার কথা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষি, বিষয়টা কেতাবে আছে কিন্তু‘ বাস্তবে নেই। বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে ইতিহাসের প্রতি অবিচার সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ভারতের সসস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সুভাস বসুর ওপর একটা বাংলা সিরিয়াল চলছে কলকাতা থেকে। এ সিরিয়ালের একটা পর্বে সেদিন দেখলাম, বাংলার হিন্দুদের বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনকে বলা হলো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ। এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। সে সময় বঙ্গভঙ্গ রদে বাংলার হিন্দু জমিদার ও পুজিপতিরা যে আন্দোলন করেছিল, সেটা ছিল নিছকই বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন বাংলাবিভাগ রদ আন্দেলনের ফলও সেই কথাই বলে। একটা ইতিহাসকে সেখানকার একটা মহল ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চাচ্ছে। তারা সত্যকে আড়াল করে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বার্থবিরোধী হিংসাত্মক হিন্দবাদী আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রাম সাজাতে চাচ্ছে। এই সাথে বঙ্গভঙ্গ সমর্থনকারী পূর্ববঙ্গের মানুষ এবং তাদের নেতাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বিরোধী সাজিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরি করতে চাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গভঙ্গ এবং বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন সম্পর্কে ইতিহাসের কিছু কথা সামনে আনা প্রয়োজন

বঙ্গভঙ্গ বা বাংলা প্রদেশ বিভাগের কথা আনষ্ঠানিকভাবে প্রথম ঘোষিত হয় ১৯০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর। সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনে ঘোষিত এ পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট এলাকাসহ সম্বলপুর, গাঞ্জাম ও ভিজাগাপত্তম এজেন্সী বাংলা প্রদেশের সাথে, অন্যদিকে বাংলার চট্টগ্রাম বিভাগ, পার্বত্য ত্রিপুরা, ঢাকা ও ময়মনসিংহ জিলাকে বাংলা-আসাম প্রদেশের সাথে এবং ছোট নাগপুরকে মধ্য প্রদেশের সাথে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। 

প্রদেশ বিভাগের এই পরিকল্পনা পরে আরও সংশোধিত ও পরিবর্তিত হয়। ১৯০৪ সালের এপ্রিলে লর্ড কার্জন যখন লন্ডন যান, তখনই তিনি বিষয়টির পুর্নবিবেচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলে যান। কার্জন লন্ডন গেলে গভর্ণর জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন অ্যাম্পটহিল। তার সময়েই বঙ্গবিভাগ পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯০৪ সালের ৬ই ডিসেম্বর বঙ্গ বিভাগের নতুন পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত করা হয়।

 এই ডিসেম্বরেই কার্জন ফিরে এলেন লন্ডন থেকে। তিনি নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন এবং ১৯০৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তা চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ভারত সচিবের কাছে প্রেরন করলেন। ইংল্যান্ডে একটি বিশেষ কমিটি প্রস্তাবটি পরীক্ষা করে দেখার পর ১৯০৫ সালের ৯ই জুন বাংলা বিভাগকে অনুমোদন দান করা হলো । অনুমোদিত এ পরিকল্পনা অনুসারে বাংলার রাজশাহী বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ, ঢাকা বিভাগ, পার্বত্য ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং মালদহকে চীফ কমিশনার শাসিত আসামের সাথে যুক্ত করে নতুন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলো। আর বাংলার অবশিষ্ট এলাকার সাথে সম্বলপুর ও উড়িষ্যার পাঁচটি এলাকা যুক্ত করে গঠিত হলো বাংলা প্রদেশ। হিন্দী ভাষা-ভাষী পাঁচটি এলাকা বাংলা প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুক্ত হলো গিয়ে মধ্যপ্রদেশের সাথে। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে নতুন প্রদেশ বিভাগকে কার্যকরী করা হলো। এই বঙ্গ বিভাগের তীব্র বিরোধীতা এল কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু এলিটদের পক্ষ থেকে ।

বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার মাধ্যমে হিন্দু মনোভাব এক যুগান্তকরী রূপ নিয়ে আবির্ভূত হলো। বাংলাদেশের হিন্দু উত্থান রোধের লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবিভাগ হয়নি এটা ঐতিহাসিক সত্য, কিন্তু হিন্দুরা তাদের শোষণ ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ হারানো, পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ ও সমৃদ্ধির সম্ভাবনা, কোলকাতার পশ্চাৎভূমি থেকে পূর্ববঙ্গের খসে পড়া এবং রাজধানী ঢাকা ও বন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের বিকাশ লাভকে বরদাশত করতে তারা পারেনি। পারেনি বলেই হিন্দুরা একবাক্যে বঙ্গ-ভঙ্গের বিরোধিতায় নেমে এলো!

বলা যায় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের একটা উপসর্গ হিসেবে ‘১৯০৫ এর আগস্ট মাসে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে বাংলার মরা গাঙ্গে যেন নতুন ভাব, আবেগ ও কর্মের জোয়ার এলো। এই জোয়ারে তরী ভাসালেন রবীন্দ্রনাথও। রবিকন্ঠ থেকে বের হলো ‘জয় মা বলে ভাসা তরী’ “স্বদেশী আধুনিক বাংলার ইতিহাসের প্রথম ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলন যা বাঙলার সমাজ কাঠামোকে দীর্ণ করেছিল বিপুল ঘটনা বিস্তার ও পরবর্তীকালের সব রাজনৈতিক আন্দোলনের পূর্বসূরী ও পথিকৃত ছিল স্বাদেশী। বাংগালী জাতির ভবিষ্যতও নির্ধারণ করেছিল বহুজাত স্বদেশী আনোদলন। এ যুগে কুমার দত্ত, অরবিন্দ ঘোষ ও বিখ্যাত চিত্তরঞ্জন দাস। গুপ্ত সমিতি, রাজনৈতিক হত্যা ও সন্ত্রাসবাদ, ব্যক্তিগত বীরত্ব প্রদর্শন ও আত্মোয়সর্গ,সহযোগ, সত্যাগ্রহ, ধর্মঘট বন্ধ কর , পিকেটিং অনশন প্রভেতি রাজনৈতিক কলা কৌশল স্বদেশী যোগেরই অবদান। স্বদেশীর প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বাংলায়ে জন্ম হয়েছিল মুসলিম স্বাতন্ত্রবাদ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা।’ (‘স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার দান বা ‘শ্রী অরবিন্দ ও বাংলায় বিপ্লববাদ’, পৃষ্ঠা ৫৫. ৫৬। আর দ্রষ্টব্য: ‘The Swadeshi Movement of Bengal 1903-1904, Sumit Sarker Ges `Elite Conflict in plural society’ – J. H. Broomfield. 

এছাড়া ‘স্বদেশী আন্দোলনের পরবর্তী বাংলায় সমাজতন্ত্র’, Chapter, VII) স্বদেশী আন্দোলনের এ ঢেউ সেদিন আরও অনেকেরই মুখোশ খুলে দিয়েছিল। ‘মহান জাতীয় নেতা’ বলে কথিত সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর আচরণেও ‘স্বদেশী’র হিন্দু চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। 

 ১৯০৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কলিঘাটের বিখ্যাত কারিমন্দিরে পুজা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বদেশীরা আন্দোলনের শপথ গ্রহণ করে। অনুরূপভাবে বৈদ্যবাটির কালিমন্দিরেও স্বদেশীরা শপথ নেয়। মন্দিরে এই শপথ নেয়ার উদ্যোক্তা ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখছেন, “আমি কথা বলছিলাম যখন, আমার চোখ মন্দির এবং প্রতিমার প্রতি নিবদ্ধ ছিল। পারিপার্শ্বিকতা আমার হৃদয়কে আবেগে পূর্ণ করে তুলেছিল। হঠাৎ আমি আবেদন জানালাম জনতার প্রতি, আপনারা উঠুন, চলুন, আমরা আমাদের পূন্য দেবতার কাছে শপথ গ্রহণ করি। মন্দিরে শপথ বাক্য আমিই পাঠ করিয়েছিলাম। আমি শপথ বাক্য বলছিলাম, আর জনতা দাঁড়িয়ে আমার কথার পুনরাবৃত্তি করছিল।” (‘Surendranath Banerjee’, পৃষ্ঠা ২২৮-২২৯ দ্রষ্টব্য ‘বঙ্গভঙ্গ’, মুনতাসির মামুন, পৃষ্ঠা ৫৯)।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দুদের উৎকট ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তার প্রকাশ ঘটেছিল। স্বদেশ-জাতীয়তাকে আরাধ্য দেবীতে পরিণত করা হয়েছিল এবং এই আরাধ্য দেবীর জন্য প্রাণ, অর্থ, বিদ্যা, মন, সংসার সমর্পন করা হয়েছিল। যুগান্তর পত্রিকায় বলা হলো, “ হে বাঙ্গালী, তুমি কি নর-কীট হতে জন্মেছিলে?——যখন বাঙ্গালাদেশ দু’ভাগ হল দেখে সাত কোটি বাঙ্গালী মর্মাহত হয়ে পড়লো, সেদিনকার কথা আজ একবার ভাব। সেদিন স্বদেশের জন্য কোটি কোটি হৃদয়ের ব্যাথ্যা যেমনি এক হলো, অমনি মাতৃরূপিনী স্বদেশ শক্তি পলকের মধ্যে বাঙ্গালা দেশের সর্বত্র আপনাকে প্রকাশ করিলেন, বাঙ্গালীও সর্বত্র আচম্বিত ‘বন্দেমাতরম’ বলিয়া উচ্চঃস্বরে মাকে আহবান করিল। —— সেদিন যেন এক নিমিষের জন্যে বাঙ্গালীর কাছে মা আমার প্রকাশিত হয়েছিলেন, সেদিন যে বাঙ্গালী বড়ই ব্যাথ্যা পেয়েছিল, ভেবিছিল মা বুঝি দ্বিখন্ড হয়েছে, তাই মা আত্মপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি দ্বিখন্ড হই নাই, তোদের একত্র রেখে সহজেই শক্তিদান কর্তুম, আজ সেই বাঁধা ঘর শত্রুরা ভেঙ্গে দিলে মাত্র; যেদিন আমার জন্যে স্বার্থ ও সংসারকে তুচ্ছ জ্ঞান করে প্রাণ দিতে অগ্রসর হবি, সেদিন আবার সেই শক্তি তরংগ মাঝে আমার দেখা পাবি, আমি মরি নাই। —— এস বাঙ্গালী আজ মার সন্ধানে বেরুতে হবে। সে বার মা আপনি এসে দেখা দিয়েছিলেন, এবার মার জন্য লক্ষ রুধিরাক্ত হৃদয়ের মহাপীঠ প্রস্তুত করে রেখে মাকে খুঁজে খুঁজে কারামুক্ত করে নিয়ে আসব। ....... একবার সকলে বুকে হাত দিয়ে হৃদয়কে জিজ্ঞাসা ক দেখি, প্রাণ, অর্থ, বিদ্যা, মন, সংসার, সমস্ত পণ করে আজ মার সন্ধানে বেরুতে পারবে কিনা? ——- বাঙ্গালীকে ‘বন্দেমাতরম’ মাতৃমন্ত্র শিখাইতে হইবে।.......সর্বাগ্রে মাকে সাক্ষাৎ বন্দনা কর, মাকে তাঁর উপযুক্ত আসনে অধিষ্ঠিত করিলে বিদ্যা, অর্ত মোক্ষ, ইত্যাদি সবই ক্রমশ আসিয়া পড়িবে।” (‘স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার দান বা ‘শ্রী অরবিন্দ ও বাংলায় বিপ্লববাদ’, পৃষ্ঠা ১৪২, ১৪৬ (যুগান্তর পত্রিকার ‘যোগ ক্ষ্যাপার চিঠি’ নামক এই নিবদ্ধের রচয়িতা ছিলেন, দেবব্রত বসু, ঐ পৃষ্ঠা ১৬)।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী দুটি সভায় কবীগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতিত্ব করেন এবং বঙ্গ-ভঙ্গ বাস্তবায়নের দিন কে ‘রাখি বন্ধন’ দিবস ঘোষণা করেন ।‘রাখি বন্ধন’ এর দিন সকালে গঙ্গা স্নানের মিছিলের নেতৃত্ব দিলেন রবিন্দ্রনাথ। এই গঙ্গা স্নান অনুষ্ঠানে রবিন্দ্রনাথ একটা পার্থনা সংগীত গাইলেন । সে পার্থনা সংগীতে তিনি বললেন

 বাংলার মাটি বাংলার জল 

বাংলার হাওয়া বাংলার ফল 

পূর্ণ হউক পূণ্য হউক।

 পূর্ণ হউক হে ভগবান।

বাংলার ঘর বাংলার হাট

বাংলার বন বাংলার মাঠ

পূণ্য হউক পূণ্য হউক 

পূণ্য হউক হে ভগবান।

বাংগালীর পণ বাংগালীর আশা 

বাংগালীর কাজ বাংগালীর ভাষা

সত্য হউক সত্য হউক

সত্য হউক হে ভগবান ।

বাংগালীর প্রান বাংগালীর মন 

বাংগালীর ঘরে যত ভাইবোন 

এক হউক এক হউক 

এক হউক হে ভগবান । 

এ সংগীত শেষে বীডন উদ্যানে ও অন্যান্য জায়গায় রাখিবন্ধন অনুষ্ঠিত হয় । বিকালে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর পাশী বাগান মাঠে অখন্ড বাংলার বঙ্গভঙ্গ স্থাপনের উদ্দেশ্যে প্রাথমিক ভাবে ফেডারেশন হলের’ ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেন । এখানে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি অভিভাষণ পাঠ করেন। বজ্রদিপ্ত কণ্ঠে উল্লেখ করেন , যেহেতু বাঙ্গালী জাতির সার্বজনীন প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করিয়া পার্লামেন্ট বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদ করিয়াছেন সেহেতু আমরা প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদের কুফলনাশ করিতে এবং বাঙ্গালী জাতির একতা সংরক্ষণ করিতে আমরা সমস্ত বাঙ্গালী আমাদের শক্তিতে যাহা কিছু সম্ভব তাহার সকলই প্রয়োগ করিব।” (অখন্ড বাংলার স্বপ্ন ’,আহসানুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৮২-৮৩)

১৯০৫ সালের আগষ্টে মূখ্যত বঙ্গভঙ্গ রদের জন্যে যে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলো, তার দুইটি রূপ। একটি প্রকাশ্য, অন্যটি গোপন। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে চলল স্বদেশী নামের রাজনৈতিক আন্দোলন। অন্যদিকে গুপ্ত সমিতি অনুশীলন সমিতির মাধ্যমে চলল সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন। বালগঙ্গার তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল, লাল লাজপাত রায়, চিত্তরঞ্জন দাস, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, মদনমোহন মালব্য, প্রমুখ কংগ্রেস নেতারা রাজনৈতিক প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের অভীভাবকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। 

১৯০৭ সালের শেষের দিক থেকে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা জোরদার হয়ে উঠল। বাংলার বড়লাট অ্যান্ডু ফ্রেজারের বিশেষ রেলগাড়ির উপর কয়েকবার হামলা হলো। চন্দননগরের কাছে পরপর দু’বার এবং নারায়ণ গড়ে আরেকবার। হামলার কাজে ডিনামাইট ব্যবহার করা হয়েছিল। সময়টা ছিল ১৯০৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর। বারিন ঘোষের দল এই তৎপরতা চালায়। টার্গেটদের হত্যার জন্যে পার্সেল বোমাও ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের একটা বোমা বুক-পার্সেল আকারে পাঠানো হয়েছিল কিংসফোর্ডের কাছে। ১৯০৮ সালের এপ্রিল মাসে চন্দননগরের মেয়রের উপর বোমাহামলা চালানো হলো। ঠিক এই সময়েই বোমা হামলার শিকার হলো কিংসফোর্ডের গাড়ী। কিন্তু বোমাটি কিংসফোর্ডের গাড়ীতে না লেগে আঘাত করল অন্য একটি গাড়ীকে। এ গাড়ীতে আরোহী ছিলেন দু’জন শ্বেতাংগ মহিলা। দু’জনেই নিহত হলো। ঘটনাটা ঘটেছিল মোজাফফপুর নামক স্থানে। প্রফুল্ল চাকিও ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন এই হামলার নায়ক। ক্ষুদিরাম বসু ধরা পড়লেন, কিন্তু প্রফল্ল চাকি ধরা পড়ার আগেই নিজের গুলীতে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিলেন। বিচার হলো ক্ষুদিরামের। বিচারে তার ফাঁসি হলো।

 মোজাফফপুরের ঘটনা ইংরেজ সরকারকে দারুণভাবে বিচলিত করেছিল। গুপ্ত আন্দোলনের লোকদের ধরার জন্যে সরকারের পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ হন্যে হয়ে উঠল। ঘটনার ২দিন পরেই (২রা মে ১৯০৮) সুপরিকল্পিতভাবে পুলিশের আটটি দল গুপ্ত সমিতির আটটি ঘাটিতে হানা দিল। ধরা পড়ল গুপ্ত সমিতির সদস্যদের ২৫ জন। (ধৃত ব্যক্তিরা: বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, শিশির কুমার ঘোষ, বিভূতিভূষন সরকার, নলিনীকান্ত গুপ্ত, বিজয় কুমার নাগ, উল্লাসকর দত্ত, ইন্দুভূষন রায়, পরেশচন্দ্র মল্লিক, শচীন্দ্র কুমার সেন, কুঞ্জলাল সাহা, উপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, পূর্ণ চন্দ্রসেন, নরেন্দ্রনাথ বঙ্গী, হেমেন্দ্র কুমার ঘোষ, নগেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, ধরনী নাথ গুপ্ত, অশোক চন্দ্র নন্দী, বিজয় রতœ সেনগুপ্ত, মতিলাল বসু, অরবিন্দু ঘোষ, অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য, শৈলেন্দ্রনাথ বসু, হেমচন্দ্র দাস, কানাইলাল দত্ত এবং নিরাপদ রায়। এ ছাড়া নরেন্দ নাথ গোঁসাই, ঋষিকেশ কাঞ্জিলালসহ আরও ৯ জন ধরা পড়ল পরে। ‘স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার দান’, পৃষ্ঠা ৩৫)। এদের সাথে অরবিন্দ ঘোষও ধরা পড়লেন। সর্বমোট ৩৬ জনের বিরুদ্ধে আলীপুর কোর্টে মামলা দায়েল হলো। ১২৬ দিন শুনানির পর ১৯০৯ সালের ১৪ই এপ্রিল রায় হলো। ফাঁসির আদেশ হলো বারীন ঘোষ ও উল্লাসকর দত্তের। (পরে হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসির আদেশ বাতিল হয়)। কয়েক জনের হলো যাবজ্জীবন কারাদন্ড। অবশিষ্টরা বেরিয়ে এলেন দোষ প্রমাণ না হওয়ায়। ইংরেজ সরকার যাকে ধরা ও শাস্তি দেয়ার জন্য সবচেয়ে উদগ্রীব ছিল, সেই অরবিন্দ ঘোষও এদের মধ্যে শামিল ছিল। শ্রী অরবিন্দের পক্ষে চিত্তরঞ্জনদাস যে আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে মামলা পরিচালনা করেছিলেন, তা ছিল এক অনন্য ঘটনা। অরবিন্দ সম্পর্কে বিচারক ক্রফটকে সি, আর, দাস অত্যন্ত আবেগ ভরা কন্ঠে বিেছলেন, “যখন সমস্ত তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটবে, যখন উত্তেজনা ও আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যাবে এবং যখন তিনি আর এই মাটির পৃথিবীতে বেঁচে থাকবেন না, তারও বহু পরে মানুষ বলবে তিনি ছিলেন স্বদেশ প্রেমের কবি, জাতীয়তাবাদের কবি এবং মানবতার পূজারী। তার দেহাবসানের বহু পরে শুধু ভারতবর্ষেই নয়, সুদূর সাগর পারের নানা দেশেও তার বাণী ধ্বণিত ও প্রতিধ্বনিত হবে।” শিবাজীর চিন্তা, চেতনা ও সংগ্রামের উত্তরসূরী শ্রী অরবিন্দ ঘোষ সম্পর্কে চিত্তরঞ্জন দাসের এই ধারণা ও মন্তব্য লক্ষ্য করবার মতো। গুপ্ত সমিতির ঐ বিপ্লবীরা ধরা পড়ার পর সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ঝিমিয়ে পড়ল।

এই তৎপরতা কি ব্যর্থ হয়েছিল? না ব্যর্থ হয়নি। এই আন্দোলনের ফলে ইংরেজ সরকার হিন্দুদের মনোভাব টের পেয়েছিল। ইংরেজ সরকার ভীতও হয়েছিল। ইংরেজ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদের যে সিদ্ধান্ত নেয়, তার পিছনে এর ব্যাপক প্রভাব ছিল। (একদিকে সন্ত্রাসবাদীদের তৎপরতা এবং অপরদিকে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, বিপিন চন্দ্র, আশ্বীনীকুমার দত্ত প্রভৃতির নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনের ফলে বঙ্গভঙ্গ রদ সংগ্রাম এক উচ্চতর রাজনৈতিক পর্যায়ে উপনীত হয়। (‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন’, বদরুদ্দীন উমর, পৃষ্ঠা ৯৫) 

বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন কংগ্রেস নেতারাও এগিয়ে গেলেন। এ সময় হিন্দু স্বার্থ সংরক্ষণের বিশেষ উদ্দেশ্য গঠিত হলো হিন্দু মহাসভা। ‘অনেক কংগ্রেস নেতাও হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠা সমর্থন করেন। কংগেসের উচ্চ নেতৃস্থানে অবস্থান করেও যারা হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন এই সমর্থন তারাই জ্ঞাপন করেন। এদের মধ্যে, মদনমোহন মালব্য, লালা রাজপতরায়, বালগঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল, প্রমুখ। (‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন,’ বদরুদ্দীন উমর, পৃষ্ঠা ৮৯।) দুইটি বিষয় এই হিন্দু মহাসভা গঠনের কাজকে ত্বরান্বিত করেছিল। একটি ১৯০৯ সালের মার্লি মিন্টো সংস্কারে মুসলমানদেরকে পৃথক নির্বাচনে ও স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্বের সুবিধা প্রদান । দ্বিতীয়টি হলো গুপ্ত সন্ত্রসী আন্দোলন স্থিমিত হয়ে পড়া । হিন্দু ও কংগ্রেস নেতাগণ চেয়েছিলেন হিন্দু মহা সভার মত উগ্র ও সোচ্চার হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংস্থা গঠনের মাধ্যমে গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি, অনুশীলন সমিতি অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের অনুপস্থিত জনিত শূন্যতা পূরণ করা এবং মার্লি মিন্টোর সংস্কারকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিরোধী আন্দোলন জোরদার করা যা কংগ্রেস কে সাহায্য করবে ।

কংগ্রেস এ সাহায্য পেয়েছিলো । স্বদেশীদের সাহায্য পূষ্ট হয়ে হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস ইংরেজ সরকারের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। এই চাপ ইংরেজ সরকারকে বাধ্য করলো বঙ্গভঙ্গ রদের সিদ্ধান্তগ্রহন করতে । স্বয়ং বৃটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের বক্তব্যই এর নিশ্চিত প্রমান মিলে । সম্রাট পঞ্চম জর্জ ভারতের ভাইসর, লর্ড হার্ডিঞ্জকে লিখেন ,আমি আশা করি আপনি ভারতের বিজ্ঞ ব্যাক্তিদের সাথে পরামর্শ করে সম্রাটের প্রথম ভারত সফরকে কি ভাবে অবিস্মরনীয় করে রাখা যায় সে সর্বাত্মক কর্মসূচি প্রণয়ন ও যথাযত ব্যবস্থা গ্রহণে যন্তবান হবেন । বাঙ্গালীদের (বাংগালী হিন্দু) সন্তুষ্ট করার জন্য বোম্বাই এবং মাদ্রাস প্রেসিডেন্সীর মত উভয় বাংলাকে একত্র করা যায় কি না সে বিষয়ে ও বিচার বিবেচনা করবেন । ——-বাংলায় বিরাজমান অসন্তোস , রাষ্ট্র বিরোধী সন্ত্রাবাদী কার্যকলাপ উপশম এবং দেশের ক্রমবর্ধমান ব্যায় ভার লাঘবে এই পদক্ষেপ একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। (ভাইসরয়ের প্রতি সম্রাট, ডিসেম্বর ১৬ HP১০৪ ( বঙ্গভঙ্গ মুনতাসির মামুন পৃষ্ঠা ৭৮-৭৮)

 হিন্দুদের চাপই অবশেষে কায্যকরী হয়েছিল । সম্রাট যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তার ভাইসবয়-এর কাছে , তা-ই তিনি কার্যকরী করেছিলেন ১৯১১ সালে ১২ই ডিসেম্বর তার দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দানের মাধ্যমে । বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষেক্রে হিন্দুদের চাপ ও অসন্তোষের কথা বিবেচনা করা হলো, কিন্তু মুসলমানদের হৃদয় যে ভেংগে গেল তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হলো না । এইভাবে হিন্দুদের হিংসারই জয় হলো । কিন্তু এই হিংসা দুই জাতিকে দুই প্রান্তে ঠেলে দিলো । ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুধু বাংলায় নয় সারা ভারতবর্ষে উস্কেদিল দুটি জাতীয়তাবাদ-একটি হিন্দু, অপরটি মুসলমান। শুধু তাই নয় ‘ডঃ আম্বেদকরের’ মতে যারা বাংলা বিভাগের বিরোধিতা করে এবং সেই সঙ্গে স্বরাজলাভের দাবি করেন তারা ( হিন্দুরা) একদিন মুসলমানদের পূর্ব ও পশ্চিম উত্তর ভারতের শাসক করে তুলবেন। ডঃ আম্বাদকরের এই উক্তিটা সত্যে পরিণত হয়েছে আংশিক হলেও ।আসল কথা হলো , বঙ্গভঙ্গ বিভাগ ছিলো এখানকার বৃটিশ শাসকদের দীর্ঘ দিনের প্রশাসনিক চিন্তা ভাবনার ফল। যা কার্যত শুরু ১৯৫৪ সালে । এবছর বাংলায় গভর্ণরের (লেফটেন্যান্ট গভর্ণর ) পদ সৃষ্টি করার সময় এ আশা পোষণ করা হয় যে, এর ফলে বাংলার প্রশাসন আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে । ১৮৬৭ সালে উড়িষ্যা- 

দুর্ভিক্ষের পর প্রণীত তদন্ত রিপোটে। বাংলার আয়তন-জনিত প্রশাসনিক দূর্বলতাকে দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় । বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্ণর স্যার উইলিয়াম গ্রে লরেন্সর নিকট লিখিত এক পত্রে বলেন , বর্তমান বাংলা সরকারের মত এমন অস্বাভাবিক ব্যবস্থা ভারতে আর আছে বলে আমি জানি না । ভারতের আয়তনের দিক থেকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আর গুরুত্বের দিক থেকে সর্বপ্রধান হওয়া সত্বে ও বাংলা সরকারেরর্ কর্মক্ষমতা বোম্বাই ও মাদ্রাজ সরকার অপেক্ষা অনেক কম ও শ্লথ। Grey to lawrence july, 1867, no 1, para and 12 (বঙ্গভঙ্গ মুনতাসির মামুন পৃষ্ঠা ১৪-১৫ )

্ এই ভাবেই বঙ্গবিভাগের সুস্পষ্ট চিন্তা দানা বেধে উঠতে থাকে । উল্লেখ্য , এ সময় হিন্দুদের জাতীয়তাবাদী উত্থানের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্র শুরু হয়নি । লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার গ্রে যখন এক চিঠি লেখেন , তারও নয় বছর পর ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী , প্রমুখ  হিন্দু নেতারা ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং এরও নয় বছর পর ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দুদের জাতীয় কংগ্রেস । সুতরাং হিন্দুদের উত্থান প্রতিরোধ করার জন্য বঙ্গবিভাগ চিন্তার উদ্ভব হয়নি । এছাড়া লর্ড কার্জন গভর্ণর জেনারেল হয়ে আসার দুইবছর আগে ১৮৯৬ 

সালে বঙ্গবিভাগের সুস্পষ্ট প্রস্তাব প্রণীত হয়। চট্রগ্রাম বিভাগের কমিশনার ওল্ডহ্যাম ১৮৯৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সুপারিশ করলেন যে , আসামসহ চট্রগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের অংশবিশেষ নিয়ে পূর্ববাংলা নামে নতুন প্রদেশ গঠিত হওয়া দরকার । চট্রগ্রাম অথবা ঢাকাকে তিনি এ নতুন নামে নতুন প্রদেশের রাজধানী করার কথা বলেন । এ বছর নভেম্বর মাসে আসামের চিফ কমিশনার স্যার উইলিয়াম  ওয়ার্ড আসামের সাথে চট্টগ্রাম বিভাগ , ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলার সংযুক্তি করণের প্র¯াÍব দিলেন । উল্লেখ্য এর আগে ১৮৯২ খৃষ্টাব্দ লুসাই অধিবেশনের সুপারিশ ক্রমে চট্টগ্রাম জেলাসহ লুসাই অঞ্চলকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় , যা অবশ্য তখন কর্যকর হয়নি । সুতরাং ইতিহাসের সাক্ষ্য বলে গভর্ণর জেনারেল হিসেবে লর্ড কার্জন আসার আগেই বঙ্গ বিভাগ সম্পর্কে চিন্তা- ভাবনা চুড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। লর্ড কার্জন এই চিন্তা , প্রস্তাবকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন মাত্র । অতএব লর্ড কার্জনের বঙ্গ বিভাগ তার রাজনৈতিক পরিকল্পনা থেকে উদ্ভুত একথা কোন দিক দিয়েই ধোপে টেকে না 

একটা প্রশ্ন উঠতে পারে , অবহেলিত পূর্ববংগের স্বার্থ সামনে রেখে প্রশাসনিক প্রয়োজনেই যদি বঙ্গভঙ্গ হয়ে থাকে, তাহলে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানরাও এর প্রতিবাদ করেছিলেন কেন , এ প্রশ্ন তোলার অবকাশ অবশ্যই আছে । বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ঘোষিত হওয়ার পর পূর্ব বাংলা থেকে প্রতিবাদ উঠেছিল। কিন্ত লক্ষ করলে দেখা যাবে পূর্ববঙ্গ থেকে উত্থিত মুসলিম নামীয় প্রতিবাদগুলোর সব ক’টিই খসড়া বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ঘোষণা (১৯০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ) থেকে চুড়ান্ত বঙ্গ বিভাগ ঘোষণার (১৯০৫ সালের ১৬ ই অক্টোবর ) মধ্যবর্তী সময়ে । চুড়ান্ত বঙ্গবিভাগ ঘোষণার পর এর বিরুদ্ধে কার্যত কোন মুসলিম প্রতিবাদ আমরা দেখি না । লক্ষ করার বিষয় , ১৯০৩ সালের বঙ্গবিভাগ পরিকল্পনা এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগএক জিনিস ছিল না । ১৯০৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর পরিকল্পনার মধ্যে মুসলিম আপত্তির কিছু কারণ ছিল । এ আপত্তি পরে দূর হয়ে যায় ।

সবচেয়ে বড় কথা হলো বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে পূর্ব বঙ্গ থেকে যে প্রতিবাদ উত্থিত হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার উদ্যোক্তা মুসলমানারা ছিলনা । পূর্ববঙ্গের প্রধান হিন্দু জমিদার ও ভদ্র লোক নেতারাই প্রতিবাদ সভাগুলির আয়োজন করেছিলেন এবং কৌশলগত কারণে অনেক ক্ষেত্রে মুসলমানদের সভাপতি করেছেন । বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ঢাকায় প্রথম যে সভা অনুষ্ঠিত হয় , তার সভা পতি ছিলেন ধানকোরার জমিদার হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী । এ সভায় বক্তৃতা করেন কালী প্রসন্ন ঘোষ বাহাদুর এবং উকিল আনন্দ চন্দ্র ।পরে ঢাকার বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রাখার লক্ষ্যে গঠিত হয় জনসাধারণের সভা, এ জনসাধারণ সভা , গঠনের পেরণা ছিল শিবনাথ শাস্ত্রীর ভারত সভা । প্রধানত হিন্দু উকিলরা ছিলেন এর উদ্যোক্তা । বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের প্রতিক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে উৎসাহী ভ’মিকা পালন করে ঢাকার সংবাদ পত্র ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকাটি তিল কে তাল করে প্রচার করত । প্রত্রিকা টি ছিল হিন্দু মালীকানাধীন এবং হিন্দু উত্থানবাদীদের আড্ডা । ১৯০৩ সালে বঙ্গ বিভাগ পরিকল্পনা ঘোষনার পরপর ঢাকা প্রকাশ লিখল , ‘ভাইবঙ্গবাসী , এই বিষম বিপ্লবকর প্রস্তাব কার্যে পরিণত হইলে , বাংগালী জাতির কি সর্বনাশ সংঘটিত হইবে একবার তাহা নিবিষ্ট চিত্তে চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ কি ——-অতএব স্বদেশের জন্য, স্বদেশীদের জন্য যে কোন বঙ্গ সন্তানের শ্রদ্ধা আছে তাহাদের প্রত্যেকের এই প্রলংকর প্রতাবের তীব্র প্রতিবাদ করিয়া জাতীয় অসন্তোষ ভারত গভারমেন্টর নিকট স্থাপন করুন। ঢাকা প্রকাশ ডিসেম্বর ২০,১৯০৩ এক সপ্তাহ পরের আবার পত্রিকাটি আবার লিখল , রাজ পুরুষের কুটিল কটাক্ষ দেখিয়া ভীত হইওনা । পুরুষ পরস্পরাগত পৈত্রিক সম্পত্তি ‘বাঙ্গালী’ আখ্যা রক্ষার নিমিত্ত যদি আত্মোৎর্গে বিমুখ হও , তবে ধরা পৃষ্ঠা হইতে যত শীঘ্র তোমাদের অস্তিত¦ বিলুপ্ত হইয়া যায়, ততই মঙ্গল। (ঢাকা প্রকাশ ডিসেম্বর .২৭, ১৯০৩ দ্রষ্টব্য বঙ্গভঙ্গ, পৃষষ্ঠা ৬৩) ঢাকা প্রকাশ এর এই কণ্ঠ ঢাকার নয় , পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের কণ্ঠ তো নয়ই । ঢাকা প্রকাশ– এর কণ্ঠে ঢাকার কণ্ঠ নয় , কলকাতার কণ্ঠ শ্রুত হযেছে , শ্রুত হয়েছে সুরেন্দ্রনাথ, অরবিন্দ, প্রমুখের কণ্ঠ । সতরাং ঢাকা প্রকাশ ও তার মত বঙ্গভঙ্গ বিরোধী কণ্ঠ রাজনৈতিক , সামাজিক , সাংস্কৃতিক কোন দিক দিয়েই পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত হওয়ার উপযুক্ত নয় । 

প্রদেশ পূর্ণগঠনের পর পূর্ব বংগ ও আসাম প্রদেশের  রজধানী হলো ঢাকা। এই নতুন আসাম ও বাংলা প্রদেশের লোক সংখ্যা দাঁড়াল ৩ কোটি ১০ লাখ । এর মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ , হিন্দুদের সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ । অন্য দিকে বাংলা প্রদেশের লোক সংখ্যা দাঁড়ালো ৫ কোটি ৮০ লাখ। এর মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়াল মাত্র ৯০ লাখে। আর হিন্দদের সংখ্যা হলো ৪ কোটি ২০ লাখ। কোলকাতা হলো বাংলা প্রদেশের রাজধাসী । এই প্রদেশ বিভাগের ফলে জাতি হিসেবে মুসলমানরা লাভবান হলো । এক দিকে তারা ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে পেল। 

(১৩-এর পাতায় দেখুন)

(১০-এর পাতার পর)

অন্যেিদকে ১৮৬৫৪০ বর্গমাইল বিশিষ্ট বিশাল প্রদেশে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল ।

 সবথেকে বড় কথা হলো মুরশিদকুলিখান ঢাকা থেকে রাজধানী মুরশিদাবাদে সরিয়ে নেওয়ার পর পূর্ব বাংলার প্রতি যে অবহেলা শুরু হয়েছিল এবং বৃটিশ আমলে কোলকাতা কেন্দ্রিক শাসনে পূর্ব বাংলার উপর যে দুর্দিন চেপে বসেছিল তার প্রতিকারের একটা পথ হয় নতুন প্রদেশ গঠনের ফলে। সচেতন সবার কাছেই পরিস্কার ছিল, রাজধানী থেকে বহুদূরের পূর্ব - বাংলার প্রশাসন ব্যবস্থা ছিল দূর্বল অদক্ষ এবং স্বাভাবিক ভাবেই কার্যকর ও সক্রিয় ছিল না । কল্যান ও অগ্রগতির জন্য যে অর্থ এ এলাকায় ব্যয় করা হতো তা ছিল বাস্তব প্রয়োজন অপেক্ষা নিতান্তই অপ্রতুল। এমন কি অঞ্চলের প্রধান প্রধান সমস্যাকে ও উপেক্ষা করা হতো। শিক্ষা ছিলো অবহেলিত , যোগাযোগও উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত । কৃষকরা সাধারণত কোলকাতায় বসবাস কারী জমিদারের এজেন্ট ও কর্মচারীদের হাতে অত্যাচারিত হতো। 

ব্যবসায় জাণিজ্যের দিক থেকে এ অঞ্চল দারুণ ভাবে পশ্চাৎপদ হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের কোন উন্নতি না হওয়ার ফলে পূর্ব বাংলার বড় বড় নদী অঞ্চলকে ব্যবসা বাণিজ্য প্রসারের জন্য যথাযত ব্যবহার করা হয়নি । বঙ্গ বিভাগের মূলে পূর্ব বাংলার এ দুর্দশা দূরীকরণ চিন্তা যতটাই থাক , মূলত প্রাশাসনিক সুবিধার জন্য নতুন প্রদেশগঠন করা হয়েছিল । লর্ড কার্জন এক চিঠিতে  বলেছিলেন , ‘যে কোন ব্যক্তির (প্রশাসকের) পক্ষে বাংলার প্রশাসন পরিচালনা এক অসম্ভব ব্যাপার। এ অবস্থায় প্রশাসন যে অত্যান্ত দূরুহ ব্যাপার তা অনুধাবনের জন্য শুধু তাকে জেলায় যেতে হবে। ‘সন্দেহ নেই , প্রশাসনিক সুবিধার দিকটা সামনে রেখেই সব বিরোধীতা তিনি উপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এর দ্বারা পূর্ব বাংলার অবহেলিত, গরীব শোষীত, কৃষক মুসলমারা লাভবান হয়েছিল। এই সুবিধায় বাগড়া দেবার জন্যেই কোলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু স্বার্থের উত্থান ঘটেছিল। এটা কোন স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল না, ছিল ‘অখ- বাংলার’ তাদের একটা মতলবী শ্লোগান । তাদের শোষণ স্বার্থ গোপন করার ছিল তাদের লক্ষ্য । এর সবচেয়ে বড় প্রমান ১৯০৫ সালে কোলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু   যে রাজনীতি অখ- বাংলার বিরোধীতা করছিল এবং অখন্ড বাংলা’র সেই আন্দোলনকারীরা ১৯৪৭ সালে‘বাংলা ভাগ করেই ছেড়েছিল । 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ