ঢাকা, মঙ্গলবার 12 February 2019, ৩০ মাঘ ১৪২৫, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শিরাজীর ‘পরিচয়’ কবিতা ও নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা এবং বাণীকুঞ্জের সাহিত্য মজলিশ

আবদুল হালীম খাঁ:

মহাকবি ইসমাইল হোসেন শিরাজীর (১৮৮০-১৯৩১) জন্মস্থান বাসস্থান এবং সাধনাক্ষেত্র ও সমাধিস্থল সিরাজগঞ্জের বাণীকুঞ্জ এক গৌরবময় ঐতিহ্যবাহী স্থান। এখানে অনেক ঘটনা ও অনেক ইতিহাস ঘুমিয়ে রয়েছে। আজো এখানে এসে কান পাতলে অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, গায়ক ও জ্ঞানী-গুণীদের বাণী ও পদধ্বনি শোনা যায়। এই সেই বাণীকুঞ্জ যেখানে বসে শিরাজী রচনা করেছেন অমর কাব্য ‘অনল প্রবাহ’ (১৯০০), সঙ্গীত সঞ্জীবনী (১৯১৬), প্রেমাঞ্জলি (১৯১৬), উপন্যাস তারাবাঈ (১৯০৮), আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপন্যাস রায়নন্দিনী (১৯১৮), নূরউদ্দীন (১৯১৩), ফিরোজা বেগম (১৯২৩), তুরস্ক ভ্রমণ (১৯১০) প্রভৃতি।

সেদিনের বাণীকুঞ্জ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির কবি সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদদের ছিল মিলন কেন্দ্র। শিরাজী ছিলেন সবার কেন্দ্রবিন্দু। তার আকর্ষণে উপমহাদেশের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে তার কাছে ছুটে এসেছেন। তারা আলোচনা করতেন দেশের স্বাধীনতার কথা, শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের কথা। সিরাজগঞ্জের বাণীকুঞ্জ ছিল তখন কর্ম প্রেরণার এক উৎসস্থল।

দেশের যে সকল নবীন ও প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকগণ বাণীকুঞ্জে আসতেন, শিরাজী তাদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক সাহিত্য চক্র। তার নাম করা হয়েছিল ‘শিরাজী সাহিত্য চক্র’। শিরাজী সাহিত্য চক্রে আলোচনা করা হতো বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিকসহ ফার্সি সাহিত্যের কবিকূল শ্রেষ্ঠ ফেরদৌসী, ওমর খৈয়াম, সাদী ও হাফিজের কাব্যকর্ম সম্পর্কে। দার্শনিক আবু সিনা, ইমাম গাজ্জালী, জার্মান দার্শনিক কান্ট, নিটশে ও  হেগেল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা হতো। সাহিত্যসভার উদ্যোক্তা ছিলেন গোলাম আম্বিয়া লোহানী। তিনি ছিলেন সাহিত্য পাগল। সাহিত্যসভা ডাকা, অতিথিদের আপ্যায়নে তাঁর জুড়ি ছিল না। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শেখ আবদুল গফুর জালালী, আবুল মনসুর এলাহি বকস, শিরাজী চরিত্র লেখক এম. সেরাজুল হক, ‘মানব জীবনের কর্তব্য’ লেখক আব্বাস আলী তালুকদার, ‘জাতিভেদ’ প্রণেতা দিপীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য এবং আরো অনেকে।

মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, শেখ জমির উদ্দীন বিদ্যাবিনোদ, রংপুর কাকিনার কবি শেখ ফজলুল করীম, স্বর্গোদ্যান গ্রন্থের লেখক মুহাম্মদ ইয়াসিন আলী, ‘নজিবুল্লা’ নাটক লেখক মুহাম্মদ ইদরিস আলী, সিরাজ উদ্দৌলা লেখক বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামপ্রসাদ গুপ্ত, চারণ কবি মুকন্দ দাস, সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর সম্পাদক নজির উদ্দীন আহমদ চৌধুরী, ডা. সাইফ উদ্দীন কিসলু, কবি ও সাধক শামসুল ওলাম খাজা হাসান নিজামী প্রমুখ সুধীবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয় উপলক্ষে বাণীকুঞ্জে আসতেন। শিরাজীর সহচার্য উপভোগ করে আনন্দ ও গর্ববোধ করতেন। বাণীকুঞ্জ তখন সব সময়ই জ্ঞানীগুণীদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে থাকত। বাণীকুঞ্জের সাহিত্য আবহাওয়াও শিরাজীর আদর্শে মুগ্ধ হয়ে এসেছিলেন তরুণ ইজাব উদ্দীন আহমদ। পরবর্তীকালে তিনি কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

ইসমাইল হোসেন শিরাজীর মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র কবি, সুসাহিত্যিক সুবক্তা, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক এবং প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী পিতার ন্যায় অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি ‘অনল প্রবাহ’ কাব্যের মত জাতীয় জাগরণমূলক ও প্রেরণাদায়ক ‘তুর্যনাদ’ কাব্য রচনা করে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এছাড়া তার সঙ্গীত গ্রন্থ ‘আমাদের সাধনা’ পাঠক সমাজে দারুণভাবে আদৃত হয়। তিনি ঢাকা থেকে ‘মাসিক দরবার’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি সুসাহিত্যিক আবদুল মওদূদ সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আসাদ শিরাজী সাহেব সাহিত্য সাধক, কবি, শক্তিশালী প্রাবন্ধিক, অসাধারণ বাগ্মী এবং প্রভাবশালী সংগঠক হিসাবে পিতার কৃতী সন্তান প্রতিভাবান স্বনামধন্য ব্যক্তি। তিনি মুসলিম সমাজের নেতা।’

‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ গ্রন্থের লেখক বিখ্যাত ও জনপ্রিয় গায়ক আব্বাস উদ্দীন আহমদ লিখেছেন, ‘সিরাজগঞ্জ যুবক সম্মেলন ১৯৩২ সালে। কাজীদা আর আমাকে সেই সভায় নিয়ে যাবার জন্য সৈয়দ শিরাজী সাহেব এলেন কলকাতায়। কাজীদা বললেন, আসাদ, তোমার এ আহ্বান কি আমি উপেক্ষা করতে পারি? জান আব্বাস, শিরাজী হবে বাংলার তরুণদের নকীব। তুমি আমি আর শিরাজী এই তিনজন বাংলাদেশ জয় করতে পারি।’

মুস্তাফা জামান আব্বাসী তার জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘বাকি জীবনের কথা’ একটি স্মৃতি চারণমূলক গ্রন্থ। এটি উৎসর্গ করেছেন কয়েকজনের নাম। এর প্রথমজন হচ্ছেন, ‘পিতৃবন্ধু ও অগ্রজ সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী, ১৯৩২ সালে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর দু’ দিনব্যাপী সিরাজগঞ্জ শহরে বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তরুণদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দান করেন। তার ভাষণটি ‘তরুণদের সাধনা’ নামে পুস্তাকারে প্রকাশিত হয়। উক্ত ঐতিহাসিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী। নজরুল ও আব্বাসউদ্দীন তাদের এক ডজন ভক্তসহ শিরাজীর বাণীকুঞ্জে তিন দিন অবস্থান করেন। তাঁর শত স্মৃতি ছড়িয়ে আছে বাণীকুঞ্জে। 

আসাদ শিরাজীর সময়ে বাণীকুঞ্জে এসেছেন অনেক প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং কবি সাহিত্যিক। তাদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মওলানা আকরম খাঁ, মন্ত্রী গিয়াস উদ্দীন আহমদ, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, ক্যাপ্টেন মনসুর উদ্দীন, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. আবদুল হাই, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি নজরুল ইসলাম, সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীন, কবি জসীম উদ্দীন, কবি খান মুহাম্মদ মঈনউদ্দীন, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, হাবিবুল্লাহ বাহার, এম. সেরাজুল হক, কবি শেখ ফজলুল করীম, শেখ মুজিবুর রহমান, ঔপন্যাসিক নজিবর রহমান, সুসাহিত্যিক বরকতুল্লাহ, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, কবি বন্দেআলী মিয়া, কবি আবদুস সাত্তার এবং আরো অনেকে। 

কবি বন্দে আলী মিয়া শিরাজী সম্পর্কে লিখেছেন,

‘বন্ধু আসাদউদ্দৌলা শিরাজীর সহিত সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে আমার মনে বিপর্যয় এনে দিয়েছে। এতকাল তাকে জেনেছি বন্ধুরূপে, তেজস্বী বাগ্মীরূপে, সুকবি ও সাহিত্যিক রূপে। কিন্তু এসব থেকে একেবারে একটি স্বতন্ত্র রূপলোকে যে তিনি স্থান লাভ করেছেন, এ সংবাদ আমার একান্ত অবিদিত ছিল। তার সঙ্গে ক্ষণকালের বাক্যালাপে বুঝতে পারলাম, পূর্বের আসাদউদ্দৌলা আজ আর তিনি নন। তিনি আজ গুরুর আসন অধিকার করেছেন, তিনি আজ মহিমাময় মুর্শিদ। আধ্যাত্মিক সাধনমার্গে তিনি এত ঊর্ধ্বে উন্নীত যে, তার সেই পুরাতন বন্ধু আমি তার তুলনায় কত দীন কত নগণ্য। তার কণামাত্র যদি আজ লাভ করতে পারি তবে জীবন স্বার্থক হবে, মানবজীবন ধন্য হবে। পরম করুণাময়ের বিশেষ অনুগ্রহে আমাদের এই সম্মেলন। আমি চিনেছি তাকে, তিনিও হয়তো দেখতে পেয়েছেন আমার মনের মালিন্যকে। তাকে অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করে বারে বারে আজ বলি: হে বন্ধু, তুমি পীর হয়ে আমায় দীক্ষা দাও, আল্লাহপাকের রাহে আমায় নিয়ে চলো, আমার মনের ক্ষুদ্রতা ও অহমিকাকে ধ্বংস করো, অন্যায় অসত্যের প্রলোভন থেকে আমায় মুক্ত করো। আমাদের নৈতিক জীবনের আজ বড় দুঃসময়। 

পবিত্র উদার ইসলামের শরাশরিতকে আমরা বিকৃত করেছি, অনুশাসনকে আমরা অগ্রাহ্য করেছি, ধ্বংসের পিচ্ছিল পথে অগ্রসর হচ্ছি। .. সমাজের খিদমতের জন্য চাই লোভমুক্ত মন। ইসলামের সেবক যিনি, তার হতে হবে বিষয় অনাসক্ত মোহমুক্ত চিত্ব। কিন্তু এই কর্ম ও ধর্মের একত্র সমাবেশ মহামানবের জীবন ব্যতীত দৃষ্ট হয় না।

আসাদউদ্দৌলার প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় আমি এর সন্ধান পেয়েছি। তার মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছি খোদাতায়ালার আত্মনির্ভরতা, পাপ ও অন্যায়ের প্রতি বর্জ্রকঠোরতা, দুর্বল অসহায় মানুষের প্রতি শিশুর কোমলতা। দেখেছি তার তেজস্বী মনের দৃঢ়তা, দেখেছি পর দুঃখকাতরতা, দেখেছি তার ক্ষমা ও দাক্ষিণ্য। এমন ¯েœহে প্রেমে, ধর্ম ও ঈমানে পরিপূর্ণ মহান মানব অতি বিরল। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে তাকে যখন আমাদের মধ্যে পেয়েছি তখন তার সান্নিধ্য থেকে আমাদের দূরে থাকলে চলবে না। তিমির রাত্রির শেষে হয়েছে নবীন সূর্যোদয়।

এই নবারুণের পবিত্র আলোক ধারায় মুছে যাক ক্লেদ ও পঙ্ক, নিশ্চিহ্ন হোক পাপের নিবিড় ছায়া, কর্ম ও ধর্ম জীবন হয়ে উঠুক সঞ্জীবিত।’

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কবি ফরিদা বাণীকুঞ্জে এসে স্মৃতিচারণমূলক আলোচনায় লিখেন:

‘ঘুমিয়ে পড়া জাতকে বাণীর চাবুক মেরে যিনি বাগিয়েছিলেন সেই সিংহ পুরুষ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের বাণীকুঞ্জের পাক মাজারের ধুলি মেখে ধন্য হলাম। দেখলাম বাণীকুঞ্জ, একেবারে তনু-মন-কায় জড়িয়ে গেল।

দেখলাম সিংহসন্তান সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী সাহেবকে। দেখবার মত মানুষ বটে। মনে হলো এ মানুষ বুঝি এই হিংসা বিদ্বেষ ঈর্ষাভরা জগতের নয়। এ যেন কাদার উপরের পদ্ম। ভাবগম্ভীর সুন্দর হোরা বেয়ে আনন্দ ঝরে পড়ছে। কথায় ঝরে পড়ছে মন মাতানো ছন্দে অপূর্ব ভাবের ঝরনা ধারা। মানুষের মন তৈরি করে দেবার জন্য কি বিপুল আগ্রহ!

হাজার দুঃখের ঝড় তুফানে যে মানুষ আপন জীবনকে দেশের সব মানুষের কল্যাণের জন্য সেবা কর্মে নিয়োজিত রেখেছেন, সেই বেদনার আগুনে পোড়া মানুষের সামনে এসে মন আপনা থেকেই নত হয়ে এসেছে, ত্যাগের মহিমার কাছে ভোগের সব চাকচিক্য একেবারে ম্লান হয়েছে, আপনার নিজের মধ্যেই একটা পরিবর্তনের সুর শুনতে পাচ্ছি।’

বাংলা একাডেমীর সাবেক ডিরেক্টর মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ লিখেছেন: দেশের আজাদী আন্দোলনের ভিত্তি রচনায় শিরাজীর দান অবিস্মরণীয়। মুসলমানদের কানে তিনিই দিয়েছেন জাগরণের অগ্নিমন্ত্র। সৈয়দ আসাদ শিরাজী তার পিতার অনুসারী আরেক অগ্নিপুরুষ...। 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাণীকুঞ্জ, শিরাজীর কাব্য গ্রন্থ অনলপ্রবাহ এবং তার বিপ্লবী জীবনের কর্মকা- সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য লিখেছেন তা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। এখানে তার কিছু অংশ তুলে দেয়া হলো:

‘মরহুম সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের এই ‘বাণীকুঞ্জ’ কেয়ারতগাহ। আমাদের তরুণ বয়সে তাহার ‘অনল প্রবাহ’ রক্তে রক্তে বিদ্যুতের সঞ্চার করেছিল। আমার মামু ডক্টর আবদুল্লাহ আল সোহরাওয়ার্দীর তিনি অন্তরঙ্গ সুহৃদ, সখা ও বন্ধু ছিলেন। বহুবার মির্জাপুর স্ট্রীটের বাড়িতে মরহুম শিরাজী সাহেবের সাক্ষাতের সুযোগ হইয়াছে। তাহার আলোচনা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী, উৎসাহব্যঞ্জক, পা-িত্য ও কা-জ্ঞান সম্পন্ন ছিল। তার ব্যক্তিগত ব্যবহারে যেমন উচ্চস্তরের শরাফতি ও মহৎ মনের পরিচয় বহন করত, তেমনই তার চেহারায় ও বাক্যে সৃষ্টিধর্মী প্রতিভার মহিমা উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশ পেত। একটি সুপ্ত জাতিকে কলঙ্কলিপ্ত করতে না দেয়া এবং ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে অতীত গৌরবের মহিমায় উদ্বুদ্ধ করার কঠিনতম পথে একাকী তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন।

এদেশের অভিজাত সম্প্রদায়, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হতে শুরু করে গায়ের মানুষ পর্যন্ত, মরহুম মওলানা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীর নামে অত্যন্ত শ্রদ্ধাবান রয়েছেন। দেশের ছাত্র যুবক ও তরুণরা তার নামে বিপুল প্রেরণা লাভ করে থাকে। তিনি ছিলেন এক বিস্ময়কর জীবনের অধিকারী। 

অল ইন্ডিয়া রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল মিশনের সদস্যরূপে বলকান যুদ্ধের সময় যখন তিনি তুরস্ক গমন করেন, তখন আমরা লন্ডনে ছাত্র ছিলাম। সেই সময়ে তুরস্কে নব্য তুর্কীকে সমর্থন করে যে সারগর্ভ বক্তৃতা করেছিলেন, তা নিয়ে লন্ডনের কাগজে আলোচনা হয়েছিল এবং কোনো কোনো কাগজে বৃটিশের পক্ষে বিপজ্জনক ব্যক্তি ইসমাইল হোসেন শিরাজীকে কেন ভারত হতে তুরস্কে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে’ বলে মন্তব্য করা হয়েছিল। আমরা এই সংবাদে লন্ডনপ্রবাসী ভারতীয় ছাত্ররা খুব উৎসাহ এবং গৌরববোধ করেছিলাম এবং তাকে লন্ডনে আন্তরিক সংবর্ধনা জানানোর জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।’

১৯২৪ খৃস্টাব্দে সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক কনফারেন্সের সঙ্গে প্রাদেশিক যুব সম্মেলনের ও অধিবেশন হয়, সে অধিবেশনে আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। আমি সিরাজগঞ্জে এসেই সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীর সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্য এই বাণীকুঞ্জে এসেছিলাম। ‘হিন্দু মুসলিম প্যাক্ট’ লইয়া পরলোকগত মি. সি. আর. দাশের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় শিরাজী সাহেব এই সময় সিরাজগঞ্জে ‘বঙ্গীয় মুসলমান মহাসভা’ আহ্বান করেন। সেই কনফারেন্সে সভাপতি হইয়াছিলেন জলপাইগুড়ির নওয়াব মশাররফ হোসেন। সেই কনফারেন্সের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি রূপে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেব মন্তব্য করেন যে, ‘ভারতবর্ষে মুসলমানকে মুসলমানরূপে বাঁচিয়া থাকিতে হইলে সম্পূর্ণ পৃথকরূপে রাজনৈতিক সংস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে।’ মি: সি.আর. দাশ এই অভিভাষণ পাঠ করিয়া মন্তব্য করিয়াছিলেন যে, ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পৃথক এবং যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয়মূলক।’

এই অভিভাষণের প্রভাব সুদূরপ্রসারিত হইয়াছিল। বিলাতে রাউন্ডটেবিল মানসিকতার পরিচয় দিতে গিয়া আলোচনা প্রসঙ্গে মওলানা মুহাম্মদ আলী এই অভিভাষণের উল্লেখ করিয়া অত্যন্ত দুঃখ ও আবেগের সহিত বলিয়াছিলেন যে, ইহার পরেও কি কেহ আশা করিতে পারে যে, মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগাইতে না পারিলে স্বাধীন ভারতে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিপন্ন হইবে না? ইসমাইল হোসেন শিরাজীর মত স্বাধীনতার একনিষ্ঠ সাধকও যখন প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের অধিকাংশের ব্যবহারে অতিষ্ঠ ও উদ্বিগ্ন হইয়া থাকেন, সেক্ষেত্রে অপরিণামদর্শিতার কথায় আমরা আশ্বস্ত হইতে পারি কি?’ দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে সর্বপ্রকার দুঃখ কষ্ট, কারানির্যাতন বরণ করিয়াছেন, হিন্দু মুসলমানের সম্প্রীতি ও একতার কথা তিনি শক্তিশালী কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছেন। অপর জাতির স্বার্থহানিকর কথা তিনি কখনও বলেন নাই। কিন্তু নিজের জাতির স্বার্থ গৌরব ও মহিমারহানি তিনি বিন্দুমাত্র বরদাশত করিতে পারেন নাই। ইসলামের মহাতত্বে তাহার অন্তর পরিপূর্ণ আর মুসলমানরূপে পরিচয় দিতে গর্ব ও গৌরবে তাহার শির উন্নত হইত, বক্ষ ফুলিয়া উঠিত। ‘আমি মুসলমান’ এই কথার গৌরবপূর্ণ প্রকাশ তাহার আচার আচরণে, বাক্য ও সম্ভাষণে, চলার পথে প্রতি পদক্ষেপে অপূর্ব মহিমায় প্রকাশ লাভ করিত। আত্মসম্মান জ্ঞানসম্পন্ন প্রবল আত্মিবিশ্বাসী সুমহান ব্যক্তিত্বের তিনি অধিকারী ছিলেন।’...

১৯৩৬ সালে ৭ নবেম্বর সিরাজগঞ্জ খাঁ সাহেবের মাঠে বিরাট জনসভায় শেরে বাংলা এ.কে. ফললুল হক বক্তৃতার প্রারম্ভে মহাকবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সম্পর্কে বলেন, ‘মহাকবি, অসাধারণ বাগ্মী, দেশ ও জাতির জন্য সর্বস্ব উৎসর্গকারী মওলানা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের মৃত্যুতে মুসলিম জাতি গৌরবের মশাল হারাইয়া ফেলিল। জীবনের প্রথম হইতেই তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য এবং জগতব্যাপী মুসলমান জাতির অভ্যুত্থানের জন্য জামাল উদ্দীন আফগানীর মতই প্রমত্ত হইয়াছিলেন। শিরাজী সাহেবের ‘অনল প্রবাহ’ বাজেয়াপ্ত হইবার পরে লোহার সিন্ধুকে আটকাইয়া রাখিয়া আবার রাত্রিতে বাহির করিয়া বারে বারে পাঠ করিয়াছি, অন্তরে ঐতিহাসিক প্রেরণা অনুভব করিয়াছি। আমাদের সময়ে ব্যক্তিগত, সদগুণ ও সুযশসম্পন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে মরহুম শিরাজী সাহেব ছিলেন অগ্রণী। মুসলমান জাতির স্বার্থ ও গৌরব রক্ষা ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন চিন্তাশীল ছিলেন।

বলকান যুদ্ধে যাত্রাকালীন তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন, আহত তুর্কীদের সেবার জন্য যাইতেছি বটে, কিন্তু নব্য তুর্কীর মনে আমি তৌহিদের আগুন জ্বালাইবার চেষ্টা করিব। দেশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও বালিকাদিগের শিক্ষার জন্য বেসরকারি ব্যক্তিদিগের মধ্যে মরহুম সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেব ছিলেন প্রথম সারির প্রথম মানুষ।

বিজাতীয় মুসলিম বিদ্বেষী লেখকদিগের সঙ্গে সংগ্রামে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেব ছিলেন কবি, লেখক ও সাহিত্যিকদের সেনাপতি। দেশের চাষী মজুর ও খাতকদিগের দুর্দশা মেটানোর জন্য মরহুম ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের কণ্ঠেই আকুল আহ্বান আমরা শুনিয়াছিলাম। তাহার সমস্ত জীবনের প্রত্যেক দিনের প্রতিটি মুহূর্ত দেশের সমাজের জাতির ও মানুষের কল্যাণ চিন্তায় কাটাইয়াছেন। আল্লাহর বিশেষ সাহায্য না পাইলে জাগতিক স্বার্থ সাধনের চিন্তা বিসর্জন দিয়া এমন করিয়া দরবেশী জীবন যাপন কেহ করিতে পারে না।...

হে আল্লাহ, জাতির এই মহান নেতার প্রদর্শিত পথে আমাদিগকে চলিবার শক্তি দাও।’

কবি গোলাম মোস্তফা বাণীকুঞ্জে এসে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীকে উদ্দেশ্য করে লিখেন:

শিরাজী, তোমারে দেখিয়াছি আমি সেই সে বেশে 

নতুন যুগের অগ্রপথিক, দাঁড়ালে এসে 

মৃত্যু কাতর জাতির দুয়ারে, আঘাত হানি 

জাগাইলে তারে, শুনাইলে নব জীবনবাণী 

খুদার জ্যোতিতে জালালে ‘অনল প্রবাহ’ তুমি 

পুড়ে গেল যত জঞ্জাল-পাক হ’ল এ ভূমি।

১৯৩২ সিরাজগঞ্জে ‘বঙ্গীয় মুসলমান তরুণ সম্মেলন’ অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসাবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তরুণদের উদ্দেশ্যে অভিভাষণে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সম্পর্কে বলেন:

‘আজ সিরাজগঞ্জ আসিয়া সর্ব প্রথম অভাব অনুভব করিতেছি আমাদের মহানুভব নেতা বাংলার তরুণ মুসলিমের সর্বপ্রথম অগ্রদূত তারুণ্যের নিশানবর্দার মাওলানা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের। সিরাজগঞ্জে শিরাজীর সাথে বাংলার সেরাজ, বাংলার প্রদীপ নিভিয়া গিয়াছে। যাহার অনলপ্রবাহ সম বাণীর গৈরিক নিঃ¯্রাব জ্বালাময়ী ধারা মেঘনিরন্ধ গগনে অপরিমান জ্যোতি সঞ্চার করিয়াছিল। নিদ্রাতুররা বঙ্গদেশ উন্মাদ আবেগে মাতিয়া উঠিয়াছিল। অনলপ্রবাহের সেই অমর কবির কণ্ঠ বাণীকুঞ্জে আর শুনিতে পাইব না। বেহেস্তের বুলবুলি বেহেস্তে উড়িয়া গিয়াছে। জাতির কওমে দেশের যে ক্ষতি হইয়াছে আমি শুধু তাহার কথাই বলিতেছি না, আমি বলিতেছি আমার একার বেদনার ক্ষতির কাহিনী। আমি তখন প্রথম কাব্য কাননে ভয়ে ভয়ে পা টিপিয়া টিপিয়া প্রবেশ করিয়াছি। ফিঙে বায়স বাজপাখির ভয়ে, ভীরু পাখির মত কণ্ঠ ছাড়িয়া গাহিবার ও দুঃসাহস সঞ্চয় করিতে পারি নাই, নখ ও চঞ্চুর আঘাত যে না খাইয়াছিলাম এমন নহে, এমনই ভীতির দুর্দিনে মানিঅর্ডারে আমার নামে দশটি টাকা আসিয়া হাজির। কুপনে শিরাজী সাহেবের হাতের লেখা. ‘তোমার লেখা পড়িয়া খুশি হইয়া দশটি টাকা পাঠাইলাম। ফিরিয়ে  দিও না, ব্যথা পাইব। আমার থাকিলে দশ হাজার টাকা পাঠাইতাম।’ চোখের জলে ¯েœহ সুধা ক্তি ঐ কয় পংক্তি লেখা বারে বারে পড়িলাম, দশটি টাকা লইয়া মাথায় ঠেকাইলাম। তখনও আমি তাকে দেখি নাই। কাঙাল ভক্তের মত দূর হইতেই তাহার লেখা পড়িয়াছি, শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছি। সেই প্রথম মানসনেত্রে কবির ¯েœহ উজ্জ্বল মূর্তি মনে মনে রচনা করিলাম, গলায় পায়ে ফুলের মালা পরাইলাম। তারপরে ফরিদপুরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কনফারেন্সে তাহার জ্যোতির্বিম-িত মূর্তি দেখিলাম। দুই হাতে পায়ের ধুলি কুঁড়াইয়া মাথায় মুখে মাখিলাম। তিনি একেবারে বুকের ভেতরে টানিয়া লইলেন। নিজ হাতে করিয়া মিষ্টি খাওয়া দিতে লাগিলেন। যেন বহুকাল পরে পিতা তাহার হারানো পুত্র ফিরিয়া পাইয়াছেন। আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া বাংলার সেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মনস্বী দেশপ্রেমিকের কথাই বার বার মনে হইতেছে। এ যেন হজ করিতে আসিয়া কা’বা শরীফ না দেখিয়াই ফিরিয়া যাওয়া। তাহার রূহ মোবারক হয়তো আজ  আমাদের ঘিরিয়া রহিয়াছে।তাঁহারই প্রেরণায় হয়তো আজ আমরা তরুণেরা এই যৌবনের আরাফাত ময়দানে আসিয়া মিলিত হইয়াছি। আজ তাঁহার উদ্দেশ্যে আমার অন্তরের অন্তরতম প্রদেশ হইতে শ্রদ্ধাতসলিম নিবেদন করিতেছি। তাহার দোওয়া ভিক্ষা করেতিছি।’....

পল্লী কবি জসীম উদ্দীন ‘শিরাজী স্মরণে’ স্মৃতিচারণমূলক এক রচনায় লিখেছেন:

‘শিরাজী সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় সিরাজগঞ্জের স্টীমারে। প্রথম শ্রেণির যাত্রীর আসনে তিনি বসিয়াছিলেন। হাতে একখানা ‘ভারতবর্ষ’ কিংবা ‘প্রবাসী’। আমার পাশের লোকজন বলাবলি করিতেছিল ‘ওই যে শিরাজী সাহেব।’

শিরাজীর নাম ইহার পূর্বে বহুবার শুনিয়াছি। তাহার রচিত ‘স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা’ পুস্তকের কঠিন কঠিন লাইন মুখস্থ করিয়া আমরা বিশুদ্ধ বাংলা আয়ত্ত করিতে শিখিতাম। লোকে বলিত, শিরাজীর বক্তৃতা অনল বর্ষণ করে।’ ইটালীর সঙ্গে তুরস্কের যুদ্ধ বাঁধিলে, এই সেই বীর বিক্রম শিরাজী সাহেব, যিনি বাংলাদেশ হইতে তুরস্কে সেখানকার মুসলিম ভাইদের হইয়া যুদ্ধ করিতে গিয়াছিলেন। আমার সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। আমি দুই নয়ন ভরিয়া সেই মহামহিমার প্রতিমূর্তি দর্শন করিতে লাগিলাম। মোঘল আমলের যেন কোন শাহানশাহ অতীত ইতিহাসের কক্ষ হইতে বিচ্যুত হইয়া পথ ভুলিয়া এখানে আসিয়া বসিয়া আছেন। তাহার সমস্ত অঙ্গ হইতে জ্যোতির্ময় রূপ টিকরিয়া পড়িতেছিল। নিকটে যাইয়া সালাম করিতে পারিলাম না। এখন কেই বা আমাকে চিনে। সামান্য কিছু কবিতা প্রকাশিত হইয়াছে। দূর হইতে মনে মনে তাহাকে আমার সালাম জানাইলাম।’...

আরো গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন মহাকবি কায়কোবাদ, সুসাহিত্যিক আবুল ফজল, কবি আবদুল কাদির, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, ড. মুহাম্মদ শহীদ উল্লাহ, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, কবি তালিম হোসেন, কবি মুফাখখারুল ইসলাম, কবি আবদুস সাত্তার এবং আরো অনেক ব্যক্তিবর্গ।

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীর মৃত্যুর পরবর্তীকালেও সাহিত্য আবহাওয়া বিরাজমান ছিল, কবি সাহিত্যিকও গুনীজনদের আগমন ঘটেছে এই বাণীকুঞ্জে এবং আসাদ শিরাজীর পরিচালনায় সাহিত্য মজলিশ গড়ে ওঠেছিল।

১৯৬২ সালের জুন মাসে সিরাজগঞ্জ থেকে ‘পাক্ষিক যমুনা’ নামে চমৎকার একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এক বৎসর পর পাক্ষিক যমুনা মাসিক যমুনায় রূপান্তরিত হয়। এ পত্রিকায় দেশের প্রবীণ লেখক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, ড. শহীদুল্লাহ, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, কবি সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী, কবি বন্দে আলী মিয়ার পাশাপাশি অসংখ্য নবীন লেখক-লেখিকাগণ লিখতেন। এর প্রায় প্রতি সংখ্যা থাকতো ১৫০/১৭৫ পৃষ্ঠা এবং তাতে সাহিত্য বিষয়সহ সারাদেশের সংক্ষিপ্ত খবরবার্তা ও আঞ্চলিক কর্মকা-ের খবর ছাপা হতো। এই মাসিক যমুনা পত্রিকার সম্পাদকম-লীর সভাপতি ছিলেন সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী। এই মাসিক যমুনা ১৯৬২ সালের জুন থেকে ১৯৭০ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এ সময় সিরাজগঞ্জের বাণীকুঞ্জ নতুন প্রাণে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ইসলাম প্রচারক ও ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ যেমন আসতেন তেমনি বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণ লেখকগণ আসাদ শিরাজীর কাছে আসতেন তাদের রচনা নিয়ে। তারা স্বরচিত লেখা শিরাজী সাহেবকে দেখাতেন এবং পড়ে শুনাতেন। তরুণ লেখকরা যেকোনো দিন সকালে ও বিকেলে আসতেন। তবে সপ্তাহে প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে অনেকে আসতেন এবং বড় রকমের জমায়েত

সিরাজী সাহেব সভার মধ্যমনি হিসাবে উপস্থিত থেকে সকালের লেখা দেখতেন, পাঠ শুনতেন এবং হাসিমুখে সবাইকে উৎসাহ দিতেন এবং দিকনির্দেশনা দিতেন। তিনি লেখকদের সামনে আলোচনা করতেন মুসলিম জাতির গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য, কাব্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা। 

কোন কবি কোন কবিতা বা গ্রন্থ লিখে খ্যাতি লাভ করেছেন ইত্যাদি বিষয় থাকতো আলোচনার মধ্যে। আমি (লেখক) মাঝে মাঝে এইসব সাহিত্যানুষ্ঠানে যোগদান করার সুযোগ পেয়েছিলাম। শিরাজী সাহেব আমাকে খুব আদর করতেন। আমি ‘কখনো কখনো ৪/৫ দিন বাণীকুঞ্জে থাকতাম।

এক বিকেলের বৈঠকে আলোচনা খুব জমে ওঠেছিল। সবাই হাসি-খুশি ও আনন্দে শিরাজীর উৎসাহব্যঞ্জক আলোচনায় মেতে ওঠেছিলেন। আমাদের আলোচনায় ওঠে এসেছিলেন কবি ফেরদৌসী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, রুমী, আল্লামা ইকবাল থেকে শুরু করে কবি ইসমাইল হোসেন শিরাজী, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীমউদদীন প্রমুখ। কবি নজরুলের কথা ওঠলেই শুরু হলো তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে আলোচনা। আলোচনার এক পর্যায়ে আসাদউদ্দৌলা শিরাজী সাহেব আমাদের প্রশ্ন করলেন, নজরুল বিদ্রোহী কবিতা লেখার প্রেরণা পেয়েছিলেন কোথায় জানো? আমরা কেহই বলতে পারলাম না। তখন তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন আব্বাজানের (ইসমাইল হোসেন শিরাজী) ‘পরিচয়’ কবিতাটি কি তোমরা পড়েছো?

 

আমরা সবাই বললাম, না পড়িনি। কেউ কেউ বললেন, কবিতাটির নামই আমরা শুনিনি। এবার তিনি বললেন, তাহলে আজকে পড়ে দ্যাখো। একথা বলেই তিনি কবি ছবদের আলী সাহেবকে বললেন, পাঠাগার থেকে সেই ‘মাসিক ছোলতান’ পত্রিকাটি নিয়ে আসেন তো। ছবদের আলী ছিলেন তার পারসোনাল সেক্রেটারি। তিনি মাসিক ছোলতান এনে শিরাজী সাহেবের হাতে দিলেন। শিরাজী সাহেব পত্রিকার পাতা উল্টিয়ে কবিতাটি বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘পান্না পড়ো তো।’ (পান্না আমার ডাকনাম)

আমি দাঁড়িয়ে কবিতাটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে সবাইকে শোনালাম। তখনকার দিনে লেখার উপরে লেখকের নাম ছাপা হতো না। নাম ছাপা হতো লেখার নিচে। পরিচয় কবিতাটির নিচে শুধু ‘শিরাজী’ ছাপা ছিল। কবিতাটি পনেরো প্যারাগ্রাফে লেখা এবং সর্বমোট লাইন সংখ্যা-১১২। প্রতিটি প্যারার উপরের দু’লাইন:

 

বল ধীর উদাত্তা কণ্ঠে

আমি বীর মোছলমান,

আল্লাহ ভিন্ন মানি না অন্য,

আমি চির নির্ভীক প্রাণ।

 

নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সবারই জানা আছে। শিরাজীর ‘পরিচয়’ অনেকেরই জানা নেই। আলোচনার সুবিধার জন্য ‘পরিচয়’ কবিতাটি সম্পূর্ণ সামনে রাখলে ভালো হতো। কিন্তু ২১২ লাইনের অত বিশাল কবিতাটি এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তাই প্রথমের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো:

 

বল ধীর উদাত্ত কণ্ঠে আমি বীর মোছলমান

আল্লাহ ভিন্ন মানিনা অন্য, আমি চির নির্ভীক প্রাণ।

আমি মৃত্যুর মাঝে চিরদিন খুঁজি নবজীবনের সন্ধান-

আমি আগুনের হালকা ঘূর্ণিত উল্কা খোদাই তেজে তেজীয়ান।

বজ্র আমার কণ্ঠধ্বনি, বিদ্যুৎ আমার কণ্ঠহার,

অন্ধকারে আলোক আমি সমর ক্ষেত্রে সংহার।

ঝঞ্ঝার মাঝে ছুটে আমি উড়ায়ে জয় নিশান

হিমাচল কবি জলধিমগ্ন বাজায়ে, প্রলয় বিষাণ।

আমি সত্যের সেবক চির হক- দাস্ত

ন্যায়ের মহাদ- মম করে ন্যস্ত।

সাধনা আমার অখিলের কল্যাণ

কামনা আমার বিশ্বের পরিত্রাণ। ...

 

কবিতাটির পরের অংশে আরো কিছু বাক্য উল্লেখ করার ‘মতো, যেমন: 

অত্যাচার-অবিচার নাশে আমি কৃপাণ, ‘পাবক শিখা সম সদা আমি তেজীয়ান’, চির মৃত্যুঞ্জয় আমি অমৃতের সন্তান’, ভীম কালানল আমি সিন্ধুর তর্জন, ভীম আমি, রুদ্র আমি, নিত্য সত্য প্রজ্ঞাবান’ ইত্যাদি। 

পরিচয় কবিতার সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’র অনেক শব্দ চয়ন, বাক্য ও বাক্যাংশের হুবহু মিল রয়েছে। এছাড়া ‘পরিচয়’ কবিতার সুর, মেজাজ ও গাম্ভীর্য এবং বীর রস অনেকটা একরকম।

 অবশ্য পার্থক্যও রয়েছে অনেক, বিদ্রোহীর ভাষায় যত তেজ ও বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর রয়েছে ‘পরিচয়’ কবিতায় ততটা নেই। বিদ্রোহীতে রূপায়িত হয়েছে উদ্দাম প্রাণশক্তি, অকুণ্ঠিত উচ্ছ্বাস। অমিল মুক্তক¤্রম্মাত্রিক মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।

 সৈয়দ আসাদ উদ্দৌলা শিরাজী বলেন, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ১৩২৮ সালের ২২ শে পৌষে প্রথম সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, তারপর মোসলেম ভারতে এবং তারও পরে অর্ধ সাপ্তাহিক ধুমকেতুতে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবাসী, মাসিক বসুমতী সাধনা প্রভৃতি বহু পত্রিকায় কবিতাটি সংকলিত হয়। ‘উদ্বোধন’, ইসলাম প্রভৃতি পত্রিকায় নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা হয়ে সারা দেশে সকল মহলে বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করে বিদ্রোহী আর ইসমাইল হোসেন শিরাজীর ‘পরিচয়’ কবিতাটি ১৩২৬ সালের মাঘ সংখ্যায় মাসিক ছোলতান পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের এক বছর নয় মাস পূর্বে। মাসিক ছোলতান প্রকাশিত হতো খুব সীমিত সংখ্যায় এবং ধর্মীয় বিষয়াদি সাধারণ ছাপা হতো, সাহিত্য মানের লেখা তেমন একটা ছাপা হতো না। এ জন্য সাহিত্যের লেখক পাঠকদের হাতে তেমন একটা পৌঁছতো না। তাই শিরাজীর ‘পরিচয়’ কবিতাটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয়নি, পাঠকদের চোখের আড়ালেই রয়ে যায় এবং এটি পাঠক মহলে সাড়া জাগাতে পারেনি। 

কাজী নজরুল ইসলাম সকল পত্র-পত্রিকাই পড়তেন খুব খুটে খুটে। শিরাজীর ‘পরিচয়’ কবিতাটি পড়ে তিনি উৎসাহ ও প্রেরণা পেয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই এবং পড়ামাত্রই তার প্রাণে যে চেতনা জাগ্রত হয় সেই উৎস থেকে তিনি অভিনব রূপে আরো বলিষ্ঠ ও তেজদীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করে বলবীর। চির উন্নত মম শির.. ‘বিদ্রোহী’ কবিতা।

কাজী নজরুল সমযদার ও সচেতন পাঠক পেয়েছিলেন, শিরাজী তা পাননি। কিন্তু নজরুল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গেছেন তার লেখায় ও ভাষণে : শিরাজী সাহেব ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। তাহার সমগ্র জীবনই ছিল অনলপ্রবাহ। আমার রচনায় সেই অগ্নি-স্ফূলিঙ্গের প্রকাশ।’

তথ্যসূত্র :

অনল প্রবাহের উৎসকেন্দ্রে- ইজাবউদ্দীন আহমদ

তরুণের সাধনা- কাজী নজরুল ইসলাম (ভাষণ)

তুর্যনাদ- সৈয়দ আসাদউদ্দৌলা শিরাজী

মাসিক যমুনা- ৫ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা/৬৭, ৭ম বর্ষ ১ম সংখ্যা-৬৯

মুক্তির বাণী- ময়েজউদ্দীন হামিদী

সাহিত্যের রূপকার- মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ।

শিরাজী রচনাবলী- আবদুল কাদির সম্পাদিত।

মাসিক ছোলতান, ১৩২৬ মাঘ সংখ্যা। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ