ঢাকা, মঙ্গলবার 12 February 2019, ৩০ মাঘ ১৪২৫, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

যে খবর হয়নি লেখা

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান:

কলম পেশা মজুর হিসেবে যৌবনের সাঁইত্রিশটা বসন্ত অতিক্রম করেছি নানা রকম বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্ভার নিয়ে। এ সময়ে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের শিহরিত-আলোড়িত অনেক খবর আমার কলমের আঁচড়ে লেখা হয়েছে  দৈনিক সংগ্রামের পাতায় পাতায়। তবে সে সব খবরের পেছনেও অনেক না লেখা কথা, অনেক স্মৃতি আলেখ্য আর অম্ল-মধুর কাহিনী অব্যক্ত রয়ে গেছে। স্মৃতির পেছন পাতায় সন্ধানী হাতছানি দিয়ে কিছু মুক্তোঝরা শব্দমালার অব্যক্ত সেই কথার ঝুড়ি প্রিয় পাঠকদের দৃষ্টিগোচরে নেয়ার প্রয়াসে বর্ণমালার আজকের এই ক্ষুদ্র পরিবেশন।

 মন্ত্রী দখল 

ঈশান কোনের আকাশ ফুরে তীব্র গর্জন করে বিমান বাহিনীর বিশাল আকারের হেলিকপ্টারটি যখন লালমনিরহাট বিমান বন্দরের দিকে এগিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাহেব আমাদের সাথে এতক্ষণের মধুর বির্তকের রণে ভঙ্গ দিয়ে হেলিকপ্টারের ল্যান্ডিং পয়েন্টের দিকে জোর কদমে অগ্রসর হলেন। এই শুভক্ষণের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে আমরাও চার সাংবাদিক সেপথেই অনুসরণ করলাম। বিমান বন্দরের নিরাপত্তা রক্ষীরা দীর্ঘক্ষণ ধরে জেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে আমাদের ঐ অম্ল-মধুর মধুচন্দ্রিমার অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছে বলে তারা ধরেই নিয়েছে আমরা কেউ অনিরাপদ নই। ফলে আমাদের কাংক্ষিত মন্ত্রী দখলের মিশন যাত্রায় কোন বাধার সৃষ্টি হলোনা। মন্ত্রী বহনকারী বিশাল হেলিকপ্টার লালমনিরহাট বিমান বন্দরের মাটি ছোঁয়ার মুহূর্তে প্রোপেলারের তীব্র ঘূর্ণেয়মান বাতাসে চারিদিকে ধুলায় ধূসর হয়ে উঠলো। সে সময় কার দিকে কে তাকায় ধূলায় অন্ধকার। কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এলে হেলিকপ্টারের দরজা খুলে একে একে বেরিয়ে এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব:) মাহমুদুল হাসান, স্বরাষ্ট্র সচিব কাজী আজাহার আলী সহ বিডিআর এর মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরির্দশক, লালমনিরহাট এর জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার সাহেব। এই মুহূর্তে আমরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হেলিকপ্টারের সিঁড়ির গোড়ায় চার সাংবাদিক দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। স্বরাষ্ট্র সচিব কাজী আজাহার আলী সাহেব হেলিকপ্টারের সিঁড়ির দরজায় পা দিয়েই রংপুরের দুই প্রবীণ সাংবাদিক মোজাম্মেল হক এবং নওয়াজেশ হোসেন খোকা ভাইকে দেখেই মুখ ভরা হাসি দিয়ে বল্লেন খোকা-মোজাম্মেল তোমরা কেমন আছো? ইতোমধ্যে মন্ত্রীসহ সচিব মহোদয় তাঁর সফর সঙ্গীদের নিয়ে মাটিতে পা রাখলেন। আমরা পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র সচিবকে মাঝখানে রেখে অবস্থান নিলাম। একদিকে মোজাম্মেল ভাই এবং খোকা ভাই। আর অপরদিকে চারণ সাংবাদিক মোনাজাত ভাইসহ আমি নিজে অবস্থান নিলাম। স্থানীয় প্রশাসনকে কিছু বুঝতে দেয়ার আগেই আমরা তাঁদের সাথে পা মিলিয়ে হাটতে হাটতেই কথা বলা শুরু করলাম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব:) মাহমুদুল  হাসান এবং স্বরাষ্ট্র সচিব কাজী আজাহার আলী  সাহেব সামনে আমাদের পাশাপাশি এবং বিডিআর এর মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরির্দশক, লালমনিরহাট এর জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারসহ অন্যরা পিছে পিছে চলছেন। অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ ঐতিহাসিক দহগ্রাম-আঙ্গোরপেতা ছিটমহল সাত সকালে পরিদর্শন করে এসে লালমনিরহাট বিমান ঘাঁটিতে অবতরন করেই আমাদের মুখোমুখি হলেন তাঁরা। এমতাবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন এবং মন্ত্রী মহোদয় অপ্রস্তুত হলেও সচিব মহোদয় ছিলেন বেশ প্রাণবন্ত। তাই দহগ্রাম-আঙ্গোরপেতা ছিটমহল নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় দু’চারটি কথা বলার পরই স্বরাষ্ট্র সচিব মন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে নিজেই আমাদের ছিটমহলের সর্বশেষ পরিস্থিতি ব্রিফিং দিচ্ছিলেন। স্বরাষ্ট্র সচিব কাজী আজাহার আলী  সাহেব তাঁর মাঠ পর্যায়ের চাকুরীর সুবাদে এক সময় অবিভক্ত বৃহত্তর জেলা রংপুরের জেলা প্রশাসক ছিলেন। সেই সুবাদে তৎকালীন মহকুমা গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী এবং লালমনিরহাট অঞ্চলের জেলা প্রশাসক হিসেবে এসব এলাকা যেমন তাঁর নখ দর্পণে রয়েছে। পাশাপাশি দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা ছিটমহল সর্ম্পেকেও ওনার রয়েেেছ বিশদ অভিজ্ঞতা। তেমনি রংপুর সহ এই অঞ্চলের প্রবীণ সাংবাদিকদের সাথেও তাঁর ছিল বিশেষ সখ্য। ফলে স্বরাষ্ট্র সচিব মহোদয়ের সাথের পূর্বাপর সর্ম্পকটা আজকের প্রেক্ষাপটে আমাদের বেশ সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখলো। হেলিকপ্টারের ল্যান্ডিং পয়েন্ট থেকে আমরা একই কায়দায় কয়েক’শ মিটার পথ পায়ে হেঁটে বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা লালমনিরহাট বিমান বন্দরের গেস্ট হাউজে গিয়ে পৌঁছলাম। এই হাঁটা পথেই আমার পেশাগত জীবনের কঠিন একটা মুহূর্ত অতিক্রম করছিলাম। তা হলো দ্রুততার সাথে দীর্ঘপথে হাঁটতে হাঁটতেই মন্ত্রী এবং সচিব মহোদয়ের দহগ্রাম-আঙ্গোরপেতা ছিটমহল সফরের গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো নোট করতে হচ্ছিল। কেননা এই কথাগুলো তাঁরা আর দ্বিতীয়বার বলবেন কি না এর নিশ্চয়তা নেই। যা ছিল ঐ সময়ের  প্রেক্ষাপটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ। তবে সে সব কথা ধারন করাও ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। আমি সর্টকাট শব্দমালায় তাঁদের কথাগুলো নোট করে সেই দূরহ কাজটি সেরে ফেললাম। এরপর গেস্ট হাউজে বসে পেশাগত প্রয়োজনের আরও কিছু কথা হলো মন্ত্রী এবং সচিব মহোদয়ের সাথে। শান্তস্বভাবের বন্ধুবৎসল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অবঃ) মাহমুদুল হাসান  অত্যান্ত আন্তরিকতার সাথে আমাদের কথাগুলো মনযোগ সহকারে শুনলেন এবং তাঁর দরদ ভরা আন্তরিকতা সহকারে সফর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে সে সবের জবাব দিলেন। এতক্ষনে দ্বিপ্রহরের তির্যক সূর্যটা মাথার উপর দাঁড়িয়ে গেছে।  

স্থানীয় জেলা প্রশাসন অভ্যাগত অতিথিদের জন্য মধ্যহ্নভোজের আয়োজন করেছে বিমান বাহিনীর 

 

এই রেস্ট হাউজেই। এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় তাঁদের সাথে মধ্যহ্নভোজে অংশ নেয়ার জন্য আমাদের চারজন সাংবাদিককে খুবই আন্তরিকতার সাথে আমন্ত্রন জানালেন। খাবার টেবিলে খেতে খেতে আরও কিছু কথা হলো।

সময়টা ছিল ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসের প্রথমার্ধের এক সোনালী দিনের। এর আগের দিন সন্ধ্যায় আমার সাংবাদিকতার দিক্ষাগুরু মোজাম্মেল ভাই ডেকে বল্লেন- জামান, আগামীকাল ভোর বেলা আমাদের লালমনিরহাট যেতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র সচিব দহগ্রাম-আঙ্গোরপেতা ছিটমহল সফরে আসছেন। ওনারা হেলিকপ্টারে দহগ্রাম-আঙ্গোরপেতা ছিটমহল পরিদর্শন করে এসে লালমনিরহাট বিমান ঘাঁটিতে  যাত্রা বিরতি করবেন। বিষয়টা স্থানীয় প্রশাসন খুব গোপনীয়তার সাথে রেখেছেন। তবে সাংবাদিকদের গোপন র্সোসের মাধ্যমে বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হয়েছি। রাতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খুব সকালে লোকাল রুটের বাসে আমি মোজাম্মেল ভাই এবং খোকা ভাই সহ লালমনিরহাট এসে পৌঁছলাম। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে আমরা জানতে পারলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় বিমান বন্দরে এসে নামবেন এবং সেখান থেকেই মধ্যহ্নভোজ শেষে ঢাকায় ফিরে যাবেন। মজার বিষয় হচ্ছে-এত বড় সংবাদ লালমনিরহাটের কোন সাংবাদিক জানেন না। তবে রংপুর থেকে আমরা কিভাবে জানলাম প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে এটা ছিল বিস্ময়ের ব্যাপার। এবার আমরা লালমনিরহাট বিমান বন্দরে চলে গেলাম। আমরা  বিমান বন্দরের পৌঁছে দেখি সেখানে মোনাজাত ভাই আগে থেকেই অবস্থান করছেন। কিন্তু জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা তাঁকে এ বিষয়টি নিয়ে তেমন পাত্তা দিচ্ছিলনা। মোনাজাত ভাই আমাদের দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। ওনার কথা সব শুনে আমরাও চেষ্টা করলাম। কিন্তু তাঁরা আমাদেরও তেমন পাত্তা দিলেননা। প্রটোকলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সাথে দফায় দফায় কথা হলেও তিনি মন্ত্রী কিংবা সচিবের সাথে কোন ভাবেই আমাদের কথা বলার সুযোগ দেবেননা। এটা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ। এবার মোজাম্মেল ভাই, খোকা ভাই, মোনাজাত ভাই এবং আমি বিষয়টি নিয়ে শলাপরার্মশে বসলাম। এক পর্যায়ে আমি বল্লাম, আপনাদের দুই প্রবীণ সাংবাদিকের সাথে স্বরাষ্ট্র সচিব কাজী আজাহার আলী  সাহেবের যেহেতু ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। এই সুযোগটা আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আমি পরার্মশ দিলাম- ওনারা আসার সময় পর্যন্ত আমরা প্রটোকলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সাথে সখ্য বজায় রেখে চলবো। এরপর হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার সময় সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে যে কোন মূল্যে আমরা মন্ত্রী এবং সচিবের সম্মুখিন হবো। কাজী আজাহার আলী সাহেব বহুদিন পর আপনাদের দেখলেই সব প্রটোকল ভেস্তে যাবে।  হেলিকপ্টার থেকে অবতরণের সময়টাকেই এই সুবর্ণ সময় হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। আমার পরার্মশ সিনিয়রদের মনে লাগলো। এরপর আমাদের পরামর্শ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্বাপর অভিযাত্রার সাফল্য হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র সচিব মহোদয়কে দখলে নিয়ে তাঁদের দহগ্রাম-আঙ্গোরপেতা ছিটমহলে গোপন সফরের  দূলর্ভ তথ্য সংগ্রহ করে চার সাংবাদিক বিজয়ের বেশে রংপুর ফিরে এসে ঢাকায় সেসব রির্পোট পাঠিয়ে দিলাম। আমাদের সকল কর্মকান্ড লালমনিরহাটের জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা কেবল বিস্ময়ের সাথে নিরবে অবলোকন করলেন।    

 তিস্তার তলদেশে 

ল্যন্ডক্রুজার জীপ গাড়ীটা আমাদের বহন করে যখন বালিয়াড়ীর নিম্নগামী  দূগর্ম পথ অতিক্রম করে এক বিশাল নির্মাণ কর্মযজ্ঞের গভীর তলদেশের পাশে এসে দাঁড়ালো। তখন আমাদের প্রটোকলের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুজ্জামান সাহেব অধিক বিস্ময়ের সাথে বার্তা জানিয়ে ঘোষণা দিলেন আমরা এখন প্রমত্তা তিস্তা নদীর পানির উপরি ভাগের স্তর থেকে ৬৬ ফুট গভীর তলদেশে অবস্থান করছি। এখানে চলছে তখন  ”তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের” বেজমেন্ট ঢালাই এর প্রস্ততি মূলক কাজ। এই বিশাল নির্মাণ কর্মযজ্ঞ প্রকল্প এলাকা নিরাপদ রাখার জন্য এর চারিদিকে বিশাল উঁচু করে কপার ড্যাম নির্মান করা হয়েছে। ড্যামের ভিতরের জোয়ারে আসা সঞ্চিত পানি নিস্কাশনের জন্য ৭২ টি গভীর নলকূপ নিরবিচ্ছন্ন ভাবে সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়েছে। তিনি জানালেন-একটি গভীর নলকূপ বন্ধ হলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে ”তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের” বেজমেন্ট নির্মাণ এলাকায় পানি সয়লাব হয়ে যাবে। এর ফলে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বিপুল সংখ্যক  কর্মদক্ষ মানুষের ভাগ্যে জুটতে পারে সলিল সমাধি। ফলে এসব যান্ত্রিক বহর তত্ত্বাবধানের জন্য সার্বক্ষণিকভাবে একদল দক্ষ এবং চৌকস প্রকৌশলী নিয়োজিত রাখা হয়েছে। পেশাদারিত্ব এবং দক্ষ শিক্ষকের ন্যায় অত্যন্ত  নিষ্ঠার সাথে নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুজ্জামান সাহেব প্রকল্পের সকল কার্যক্রম ঘুরে ঘুরে আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।  

উত্তর জনপদ তথা দেশের সর্ববৃহত সেচপ্রকল্প ”তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের” নির্মাণ কর্মযজ্ঞ সরেজমিন পরির্দশনের জন্য রংপুর শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরবর্তী তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেটি ছিল ১৯৮৪ সালের কথা। পানি উন্নয়ন র্বোডের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী দেশ গড়ার এক সজ্জন কারিগর সিরাজুল ইসলাম সাহেবের ব্যবস্থাপনায় আমাদের এই সফর। আমাদের এই দলের মধ্যে ছিলন রংপুরের প্রবীণ সাংবাদিক মোজাম্মেল হক, নওয়াজেশ হোসেন খোকা, আব্দুস সাহেদ মন্টু ও আলী আশরাফ, সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ (ডি জি এফ আই)-এর  রংপুর অফিস প্রধান কর্নেল সিরাজুল ইসলাম এবং নবীন সাংবাদ কর্মী হিসেবে আমি। 

আগের দিন রাতেই রংপুর প্রেসক্লাবের তৃতীয় তলায় (বর্তমানে এটি পায়রা চত্বর)  বসে মোজাম্মেল ভাই আমাকে জানালেন, জামান অগামীকাল  সকাল ৭ টার মধ্যে প্রেসক্লাবে আসবা। কোথায় যাবো পরে জানতে পারবা। সে কথার মাঝে ছিল একটু অর্থবহ ইঙ্গিত। আমি বেশ উৎসাহিত হয়ে নবীন চেতনায় পেশাদারিত্বের কৌতুহল নিয়ে যথা সময়ে হাজির। প্রস্তত ছিল “তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের” দু’টি অত্যাধুনিক ল্যন্ডক্রুজার জিপ গাড়ী। আমরা সবাই গাড়ীতে উঠে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা দিলাম। সে সময় রংপুরের পাগলাপীর থেকে” তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প” এলাকা ডালিয়ার র্দীঘ পথটি ছিল দূর্গম-বন্ধুর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। অজানা এক শিহরিত চেতনায় আমরা দূর্গম-বন্ধুর পথ অতিক্রম করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া গেস্ট হাউজে উপস্থিত হলাম। সেখানে আপ্যায়ন পর্ব শেষে পুনরায় যাত্রা শুরু। 

কিছুক্ষণ পরই তিস্তা নদীর সে সময়ের গতি ধারায় প্রবাহিত নদীর ডান তীরে আমরা হাজির। এখানে পুর্ব থেকেই প্রস্তত ছিল পাউবোর স্পিডর্বোড। এর সাহায্যে নদী পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম উত্তর-পুর্ব প্রান্তের লালমনিরহাট জেলার দো’আনী অংশে “তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের বিশাল প্রান্তর জুড়ে গড়ে ওঠা মূল কর্মযজ্ঞ” এলাকায়। এরপর কয়েক ঘন্টা ধরে সেই বিশাল কর্মযজ্ঞ সরেজমিন ঘুরেফিরে দেখে দো’আনী অংশের  পাউবো গেস্ট হাউসে  “তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের বিশাল কর্মযজ্ঞের” উপর নাতী দীর্ঘ ব্রিফিং দেয়া হ’লো। সেখানেই সম্পন্ন হলো কর্তপক্ষের দেয়া রাজকীয় মধ্যাহ্নভোজন। দিনভর কর্মব্যস্ততার মাঝে আলতা মাখা চিবুক নিয়ে দিবাকর কখন যে পশ্চিমের দিকপ্রান্তে গোধূলীর কোল জুড়ে হেলে পড়েছে আমরা তা বুঝতেই পারিনি। অবশেষে ফেরার পালা। সাঁঝের আলো আঁধারীর চাদর ভেদ করে আমরা সবাই নীড়ে ফিরে আসলাম।    

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ