ঢাকা, মঙ্গলবার 12 February 2019, ৩০ মাঘ ১৪২৫, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মনুষ্যত্ববোধ

শেখ দরবার আলম:

এক 

কেবল খুব ভালোভাবে জীবন ধারনের জন্য নয়, কোনো রকমে জীবন ধারনের জন্যও মানুষের অনেক কিছুই প্রয়োজন হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রয়োজনটা কী?

এই প্রশ্নটার জবাব পাওয়ার আগে বা এই প্রশ্নটার জবাব খোঁজার আগে স্মরণ রাখতে হবে যে, মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ একাকী জীবন যাপন করা তো অনেক দূরের কথা, জীবন ধারণ করতেও পারে না। ঘরে-বাইরে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে তাকে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রেখে চলতে হয়। সে প্রয়োজন একজন মহৎ মানুষের যেমন থাকে, তেমনি থাকে একজন দুর্বৃত্তেরও। তবে সব মানুষেরই যদি মানুষের মতো বাঁচতে হয় তা হলে দরকার হয় মনুষ্যত্ববোধের। মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনটা হলো মনুষ্যত্ববোধের প্রয়োজন।

দুই 

কিন্তু মনুষ্যত্ববোধটা কী? এ প্রশ্নের জবাব কে দিতে পারবেন? স্কুলে পড়া, কলেজে পড়া না বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কেউ?

স্কুলে পড়লে, কলেজে পড়লে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই যদি মানুষ মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন হয়ে উঠতেন তা হলে তো সমাজে, দেশে এবং বিশ্বে তো কোনো সমস্যাই থাকতো না। মানুষেক মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন হতে হলে চিন্তা করে দেখার, ভেবে দেখার মানসিকতা থাকতে হয়। মানবিক অনুভূতি থাকতে হয়। ঔচিত্যবোধ থাকতে হয়। বিবেক থাকতে হয়। যুক্তিবোধ থাকতে হয়। ন্যায়পরায়ণতা এবং সততা থাকতে হয়। ত্যাগের মনোভাব থাকতে হয়। সুস্থ জীবনবোধ থাকতে হয়। দূরদর্শীতাও থাকতে হয়।

আমার শৈশবে, বাল্যে এবং কৈশোরে মনুষ্যত্ববোধের শিক্ষা আমার আব্বা আমাকে খুব সহজ-সরলভাবেই দিয়েছিলেন। তিনি এত কিছু আমাকে বলেননি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “তুমি কাউকে সে রকম কোনো কথা বলো না যে রকম কথা তুমি নিজে শুনতে চাও না। তুমি কারো সঙ্গে সে রকম ব্যবহার করো না, যে রকম ব্যবহার তুমি নিজে পেতে চাও না।”

শৈশবে, বাল্যে এবং কৈশোরে এভাবে মানুষকে চিন্তা করতে শেখালে এভাবে মানুষের মানসিক গঠনের কাজটা হয়ে যায়। এভাবে চিন্তা করার, অনুভব করার এবং দেখার অভ্যাসটা তারমধ্যে গড়ে ওঠে। এভাবে চিন্তা করতে শেখালে মানুষ ঔচিত্যবোধের, ন্যায়পরায়ণতার, মনুষ্যত্ববোধের শিক্ষা পায়।

কিন্তু এভাবে অনুভব করার, চিন্তা করার এবং উপলব্ধি করার শিক্ষা কি আমাদের সব পরিবারে, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেয়া হয়? এভাবে শিক্ষা দেয়ার মানসিকতাটা কি সবার আছে? শিক্ষকদেরও সবারই কি আছে?

তিন 

আমাদের শৈশবে, বাল্যকালে এবং কৈশোরে আব্বা আমাদেরকে শিখিয়েছেন কোনোভাবে কারো মনে কষ্ট দিয়ে ফেললে কাউকে কোনোভাবে আঘাত দিয়ে ফেললে, কোনোভাবে কারো ক্ষতি করে ফেললে তার কাছে মাফ  চেয়ে নিতে হয়। আব্বা নিজেও আমাদের প্রতি কোনো অবিচার করে ফেললে কোনো ভুল করে ফেললে, আমাদেরকে কোনো কষ্ট দিয়ে ফেললে আমাদের কাছে মাফ চেয়ে নিতেন। এভাবে কারো মনে কষ্ট দিয়ে ফেললে, কারো কোন ক্ষতি করে ফেললে, কোনো ভুল করে ফেললে মাফ চেয়ে নেয়ার শিক্ষা আমি আমার শৈশবে, বাল্যে এবং কৈশোরে পেয়েছি। এসব শিক্ষা আমার সুস্থ জীবনবোধ নিয়ে চলার পক্ষে সহায়ক হয়েছে। আমি আমার স্কুলেও আমাদের আরবী শিক্ষক কাজী মোহাম্মদ মোস্তফা সাহেবের কাছ থেকে এবং আরো কোনো কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে এ রকম শিক্ষাই পেয়েছি। এরকম শিক্ষা আমাদের সাম্য ও সহাবস্থানের কবি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা থেকেও পেয়েছি। ভারতীয় উপমহাদেশের আমাদের প্রতিবেশী বড় সমাজের কারো কারো লেখা থেকেও পেয়েছি।

এইসব শিক্ষার কথা স্কুলে পড়া ছেলেমেয়েদের কাউকে কাউকে যখন বলেছি তখন লক্ষ্য করেছি যে, এসব কথায় তারা খুবই উৎসাহিত বোধ করে, অনুপ্রাণিত হয় এবং এ বিষয়ে আরো অনেক কিছু জানতে চায়। মানুষের মনে ভালো কিছু জাগার এবং শেখার কৌতূহল বা আগ্রহ এভাবে সৃষ্টি করে শেখাতে হয়। শেখানোর পদ্ধতির হলো এটাই।

এভাবে শিশু, বালক-বালিকা এবং কিশোর-কিশোরীদের শেখানোর দায়িত্ব পরিবারের লোকেদের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের, আত্মীয়-পরিজনদের এবং এলাকার মানুষদের কেবল নয়, সব মানুষেরই।

সন্তানকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হলে সন্তানের অভিভাবককেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন হতে হয়। তেমনি শিক্ষার্থীকেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন, ঔচিত্যবোধসম্পন্ন এবং সৎভাবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষকদেরকেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন, ঔচিত্যবোধসম্পন্ন, সৎ ও সংবেদনশীল মনের হতে হয়। আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে, বুনে আমড়া গাছে হিমসাগর আম হয় না।

চার 

গত ২রা ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ রবিবার ঢাকার ভিকারুন্নিসা নুন স্কুলের প্রধান শাখার ইংলিশ ভার্সনের দিবা বিভাগের নবম শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী যখন ১২৮ নম্বর রুমে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে বার্ষিক পরীক্ষা দিচ্ছিল, পরীক্ষা চলাকালে সে সময়ে দুই পরিদর্শক অরিত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। মোবাইল ফোন পাওয়ার পর উত্তরপত্রের সঙ্গে মোবাইলে ধারণ করা পাঠ্য বইয়ের সিলেবাসের অংশটুকুর মিল আছে কিনা সে বিষয়ে আদৌ নিশ্চিত না হয়েই তারা ভিত্তিহীন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে, অরিত্রী নকল করছিল। মোবাইল ফোন ও উত্তরপত্র কেড়ে নিয়ে তারা অরিত্রীকে পরীক্ষার হল হতে বের হয়ে যেতে বলেন এবং পরের দিন প্রভাতী শাখাপ্রধান জিনাত আখতার এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ 

নাজনীন ফেরদৌসের সঙ্গে দেখা করতে বলেন।

অরিত্রী কিন্তু ইতোপূর্বে কখনোই তার বিরুদ্ধে এরকম কোনো ভিত্তিহীন অভিযোগ আনারও সুযোগ দেয়নি।

এ বিষয়ে প্রথম কথা হলো, কোনো শিক্ষক যদি যথার্থই উপযুক্ত শিক্ষক হন তা হলে তিনি ক্লাসেই বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে সুস্পষ্ট ধারণা পোষণ করার সুযোগ করে দিতে পারেন। পড়াবার নিয়মই হলো বিষয়টি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে কৌতূহল বা জানার আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে এবং এরপর তাদের জানার বা বোঝার প্রয়োজন মেটানোর বন্দোবস্ত করতে হবে। তাহলে জানার এবং শেখার ব্যাপারটা তাদের কাছে আনন্দদায়ক হবে। এরপর কেউ নকল করবে এরকম কোনো সন্দেহ পোষণ করার কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। ক্লাসে ভালোভাবে পড়ালে নকল করার চিন্তা কোনো শিক্ষার্থীর মাথায় আসার কথা নয়।

বিশেষ করে যারা শিশুদের, বালক-বালিকাদের এবং কিশোর-কিশোরীদের পড়াবার দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের অবশ্যই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ও সংবেদনশীল মনের হওয়া দরকার। গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সবদিক খতিয়ে দেখার মানসিকতাও শিক্ষকদের থাকা দরকার। শিক্ষার্থীর বয়স যাই হোক, সে বয়স তো তার নিজেরও এক সময় ছিল। নিজেদেরকে অরিত্রীর জায়গায় রেখে তারা কী রকম কথাবার্তা এবং ব্যবহার প্রত্যাশা করতেন সেটা তাদের চিন্তা করে দেখার দরকার ছিল। এসব জানার প্রয়োজন আছে বলে যারা শিক্ষক প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য বি.এড (ব্যাচিলর অব এডুকেশন) পড়েন তাদেরকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে চাইল্ড সাইকোলজিং পড়তে হয়। বাংলা ও ইংরেজী উভয় মিডিয়ামের স্কুলে আমি শিক্ষকতা করেছি, কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার কলেজে আমি এক সময় বি.এড.ও পড়েছি এবং কলকাতার সেন্ট অগাস্টাইনসকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আমি এক সময় শিক্ষকতা করেছি। ছেলে-মেয়েদের পড়ানোর সময় আমি আমার নিজের শৈশব, বাল্য এবং কৈশোরের কথা স্মরণ রাখতাম, তাই আমি হলে এক্ষেত্রে কী করতাম সেটা বলতে পারি।

আমি হলে অরিত্রীর পরীক্ষার খাতা কেড়ে নিয়ে পরীক্ষার হল থেকে বের কের দেয়া তো অনেক দূরের কথা, তার মোবাইল ফোনটাও কেড়ে নিতাম না। আমি তাকে বলতাম, “পরীক্ষা দেয়া শেষ হলে আমার সঙ্গে দেখা করো। আমি এই বিষয়টি নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করবো।”

এরপর আলোচনাকালে তাকে নিয়ম-শৃঙ্খলার কথা বলতাম এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নেয়া ভালো সে বিষয়ে পরামর্শ দিতাম। কথাগুলো আন্তরিকতা ও সহানুভূতির সাথে তাকে পরামর্শ দেয়ার মানসিকতায় বলতাম। কীসে কী সমস্যা হয় সেটাও জানাতাম।

পাঁচ 

পরীক্ষার সময় একজন শিক্ষার্থীর মোবাইল কেড়ে নিলে পরীক্ষার খাতা কেড়ে নিলে এবং পরদিন অভিভাবদের স্কুলে এসে দেখা করতে বললে সে খুবই অপমানিত, উদ্বিগ্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। মানসিক দিক দিয়ে তাকে এভাবে কষ্ট দেয়া এবং চিন্তায় ফেলাটা কোনো উপযুক্ত শিক্ষকের কাজ নয়। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আন্তরিকতা ও সহানুভূতির সাথে শিক্ষক পরীক্ষার পর শিক্ষার্থী তার সঙ্গে দেখা করলে আর কেউ দেখতে বা শুনতে না পান এমনভাবে আলাদা বলতে পারতেন।

“দেখো, আমি এ রকম অনেক কিছুই করতে পারতাম। তাতে তুমি মানসিক দিক দিয়ে আঘাত পেতে, কষ্ট পেতে। এভাবে তোমার ক্ষতি হতো। আমি তোমাদের ¯েœহ করি, আদার করি, মায়া করি। তোমরা আঘাত পাও, কষ্ট পাও, ক্ষতিগ্রস্ত হও, এটা আমি শিক্ষক হিসাবে এবং মানুষ হিসাবে চাই না। যাতে সমস্যায় পড়তে না হয় সে দিকে লক্ষ্য রেখে সব রকমের অনিয়ম এড়িয়ে চলো।”

এইটুকু বলাই যথেষ্ট! এজন্য পরদিন অভিভাবকদের আসতে বলার আদৌ কোনো দরকার ছিল না। অভিভাবকদের ডাকা মানেও তো একজন শিক্ষার্থীকে মানসিক দিক দিয়ে আঘাত করা বা কষ্ট দেয়া, তাকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলা, অপমান করা। একজন শিক্ষক সেটা করতে যাবেন কেন? শিক্ষক যদি একজন শিক্ষার্থীর যথার্থ ফ্রেন্ড, ফিলোসফার এবং গাইড বলে অভিহিত হয়ে থাকেন তাহলে তিনি নিজেকে শিক্ষার্থীর জায়গায় রেখে চিন্তা করবেন যে, তিনি তার নিজের ভালোর জন্য কী রকম উপদেশ, পরামর্শ এবং দিকনির্দেশনা পছন্দ করতেন। মনে রাখতে হবে যে, একজন শিক্ষার্থী যত কম বয়সেরই হোক না কেন, তার একটা মান-সম্মান বোধ থাকে। শৈশবে, বাল্যে এবং কৈশোরে আমাদের সবারও মানসম্মান বোধ ছিল। সে জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, সংবেদনশীল মন এবং সবদিক ভেবে দেখার মানসিকতা না থাকলে উপযুক্ত শিক্ষক হওয়া যায় না। শিক্ষকদের মনুষ্যত্ববোধহীন হলে, অনুভূতিহীন হলে চলে না। মনুষ্যত্ববোধহীন হওয়া, অনুভূতিহীন হওয়া কোনো মানুষেরই কাজ নয়। কোনো মানুষেরই এটা মানায় না।

ছয়

অরিত্রীর মোবাইল ফোন এবং পরীক্ষার খাতা কেড়ে নিয়ে যেদিন তাকে পরীক্ষার হল থেকে বের করে দেয়া হলো, তার পরদিন ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ সোমবার সকাল ১০টার দিকে অরিত্রী অধিকারী তার বাবা দিলীপ অধিকারী এবং মা বিউটি রাণীকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে গেলে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এবং ভীতির পরিবেশে কিভাবে অপমানিত হন সে বিবরণ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ বুধবারের দৈনিক ‘যুগান্তর’-এ ‘বাবা টাকা বেশি খরচ করো না/আমি বিদেশে পড়তে যাব’ শিরোনামে প্রতিবেদনে অরিত্রীর বাবার উক্তিতে এভাবে আছে:

শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর বাবা দিলীপ অধিকারী বলেন যে, ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ সোমবার স্কুলে গেলে ‘আমাদেরকে পদে পদে অপমান করা হয়। স্কুলে ঢুকতেই ঘাম ছুটে যায়। স্কুলে গিয়ে প্রথমে ভাইস প্রিন্সিপালের রুমে যাই। ভাইস প্রিন্সিপালের রুমে থাকা চেয়ারে বসতে গেলে তিনি বলেন এগুলো শিক্ষকদের চেয়ার। পাশে বেঞ্চ আছে সেখানে বসেন। বেঞ্চে ময়লা থাকা সত্ত্বেও আমরা সেখানে বসি। এরপর অরিত্রীর কথা বলতে তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন, কেমন মেয়ে মানুষ করেছেন, পরীক্ষায় নকল করে। আমরা ওর ব্যাপারে গভর্নিং বডির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি; পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। এ সময় আমরা মেয়ের হয়ে ক্ষমা চাই। কিন্তু তিনি কোনো কিছু শুনতে রাজি হননি। তার কিছুই করার নেই জানিয়ে প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করতে বলেন।

‘এরপর অরিত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রিন্সিপালের রুমে যাই। সেখানে যাওয়া মাত্র প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বলেন, ‘ও আপনিই অরিত্রীর বাবা! ওর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাকে পরীক্ষা দিতে দেয়া হবে না। কেস ফাইল করা হয়েছে। কালকে এসে টি.সি নিয়ে যাবেন। আমি তখন ম্যাডামের কাছে মেয়ের হয়ে ক্ষমা চাই। এর মধ্যে অরিত্রী ম্যাডামের পা ধরে কেঁদে ক্ষমা চায়। কিন্তু তিনি কিছুতেই ক্ষমা করতে রাজি হননি। পরীক্ষায় অংশ নিতে দেননি। অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী আরও বলেন, ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ ‘সোমবার সাড়ে ১২টা থেকে অরিত্রীর আরও একটা পরীক্ষা ছিল। ওই পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য খুব চেষ্টা করেছিল মেয়ে আমার। ম্যাডামের কাছে আমরা বারবার অনুরোধ করেছি সন্তান ভুল করেছে। এবারের মত ক্ষমা করে দেন। কিন্তু তিনি কোনো মতেই রাজি হননি।’

“এর মধ্যে অরিত্রী ম্যাডামের রুম থেকে কখন বেরিয়ে গেছে সেটা আমরা খেয়াল করিনি।..”

পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ না পেয়ে এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে নির্দয় ব্যবহার পেয়ে ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী ওইদিনই দুপুরে অর্থাৎ ৩ ডিসেম্বর তারিখ সোমবার দুপুরে ঢাকার শান্তিনগরে পীরের গলির “শান্তি নিবাস” নামের ফ্ল্যাট বাড়ীর অষ্টম তলার ফ্ল্যাট তার নিজের রুমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস লাগিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে।

ওই হৃদয়বিদারক ঘটনাটা ঘটত না যদি শিক্ষকরা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন এবং সংবেদনশীল মনের হতেন।

 শিক্ষকরা যদি নিজেদেরকে অরিত্রীর জায়গায় রেখে গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টির মীমাংসা, মমত্ববোধ, আন্তরিকতা ও সহানভূতির সাথে করতেন তাহলে অরিত্রীর এবং অরিত্রীর অভিভাবকদের সঙ্গে তাঁদের কথাবার্তা এবং ব্যবহার পুরোপুরিই অন্য রকম হতো, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত হতো। শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার্থীর বাবা-মাকে মানসিক দিক দিয়ে কোনো রকম আঘাত না দিয়ে বিষয়টির মীমাংসা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সহানুভূতির সাথে খুব সহজেই করা যেত।

মেয়ের হয়ে তার বাপ-মা মাফ চাইলেন। ‘অরিত্রীর ম্যাডামের পা ধরে কেঁদে ক্ষমা’ চাইলো। এরপরও তাকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়া গেল না? টি.সি তাকে নিতেই হবে? কেন? ব্যবস্থাটা এতটাই যান্ত্রিক?

দেখা গেল মানবিক এবং সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার করার শিক্ষাটা শিক্ষকদেরও কারো কারো কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। এই ধরনের শিক্ষকদের কাছ থেকে এ রকম যান্ত্রিক হওয়ার, নিষ্ঠুর হওয়ার, অনুভূতিহীন হওয়ার শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে বিভিন্ন আঙ্গিনায় তাদের কর্মজীবনে তো এ রকমই যান্ত্রিকতার এবং নিষ্ঠুরতারই দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও কি আমরা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন সংবেদনশীল মনের মানুষ তৈরির চেষ্টা করবো না?

সাত 

“বিক্ষোভে উত্তাল স্কুল/ তোপের মুখে নাহিদ”, এই শিরোনামে ৫ই ডিসেম্বর বুধবারের দৈনিক “যুগান্তর”-এর প্রতিবেদনে দেখছি, শিক্ষার্থী নূসরাতের মা জাহানারা বলেছেন, “শিক্ষার্থী পা ধরে ক্ষমাও চেয়েছে। তারা তাকে মাফ না করে বরং তার বাবা-মাকে অপমান করেছে। তাকে টি.সি (ছাড়পত্র) দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ... কর্তৃপক্ষের যে আচরণ ... এটাকে হত্যা বলতে চাই। জড়িতদের বিচার চাই।” 

নাসরিন নামের এক অভিভাবক বলেন, “কিছু শিক্ষক খারাপ। তাদের ব্যবহারও অত্যন্ত খারাপ। তারা তুচ্ছ ঘটনায় অভিভাবকদের ডেকে নেয়।” সুষ্ঠু তদন্তের দাবী জানিয়ে তিনি বলেন, “এত বড় একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অথচ এখানে শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং-এর কোনো ব্যবস্থা নেই।”

অভিভাবক দিলরুবা জাহান বলেন, “একজন শিক্ষার্থীর কাছে মোবাইল পাওয়া গেলে তার সঙ্গে কী আচরণ করতে হবে তা শিক্ষকেরা জানেননা।”

অভিভাবক আমিনুল ইসলাম বলেন, “স্কুলটি দুর্নীতিতে ভরা। রয়েছে নানা অনিয়ম। এসব দূর হওয়া দরকার।” অভিভাবক সুদীপ ভট্টাচার্য বলেন, “প্রতিষ্ঠানটিতে কোটি কোটি টাকার ভর্তি বাণিজ্য হয়। ... অরিত্রীর টি.সিটাও লাখ টাকায় বিক্রি হবে।” তিনি মানবিক শিক্ষার দাবী জানিয়ে বলেন, “শিক্ষার্থীরা ভুল করবে। তবে তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ হবে তা শিক্ষকদের জানা উচিত।”

শিক্ষার্থী নিশিতা বন্যা বলে, “আমরা কোনোভাবেই অরিত্রীর চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না। আত্মহত্যার প্ররোচনায় যারা যারা জড়িত তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

৬ই ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ বৃহস্পতিবারের দৈনিক ‘প্রথম আলো’য় “আন্দোলনের মুখে কড়া ব্যবস্থা” শীষর্ক প্রতিবেদনে দেখছি, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফকে প্রধান করে করা তদন্ত কমিটি ৫ই ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ বুধবার তাদের যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে যে, উত্তরপত্রের সঙ্গে মোবাইলে থাকা বিষয়ের মিল নেই। মোবাইল ফোন থেকে নকলের যে অভিযোগ আনা হয়েছিল তদন্তে এর সত্যতা মেলেনি।

“টি.সির বিষয়ে বিদ্যমান ১৯৬১ সালের আইনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, আইনে তাৎক্ষণিকভাবে এ ধরনের শাস্তি দেয়ার সুযোগ নেই।”

তদন্ত কমিটি বলেছেন, “এই অবস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও শাখা প্রধান (শিফ্ট ইনচার্জ) অভিভাবকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চানা না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সদাচরণ করেন না।”

সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “এখানে বহুদিন ধরে অধ্যক্ষ নেই। একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বারবার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও তারা নিয়ম অনুসরণ করে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেননি।” শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “তিনি যখন প্রথম শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন ১০ লাখ টাকাও লাগত ভর্তি করতে।”

আট 

ঢাকার আর একটা নামী স্কুলের কথা জানি যেখানে টাকা নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় এবং শিক্ষক নিয়োগও টাকা নিয়ে করা হয়। এ রকম অবস্থায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে একটা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির, একটা যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাচ্ছে। এই পরিবেশ-পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির এবং সংবেদনশীল মনের পরিচয় পাচ্ছে না। যান্ত্রিক, হৃদয়হীন এবং নিষ্ঠুর ব্যবহারও পাচ্ছে। তারা এ রকমই হতে শিখছে।

সাদামাটা, সহজ-সরল এবং সাদাসিধা জীবন যাপনের এবং উচ্চ চিন্তার অর্থাৎ মহৎ চিন্তার শিক্ষা, মনুষ্যত্ববোধের শিক্ষা গৃহ পরিবেশে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি কেউ তার শৈশবে, বাল্যে এবং কৈশোরে না পান তা হলে তার মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ, মানবিক অনুভূতি এবং মনের সংবেদনশীলতা থাকবে না। প্লেইন লিভিং এবং হাই থিংকিংয়ের শিক্ষা, মনুষ্যত্ববোধের শিক্ষা, মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখার শিক্ষা, নিজে যে রকম ব্যবহার প্রত্যাশা করি ঠিক সে রকম ব্যবহারই অন্যের সঙ্গে করার শিক্ষা যদি কারো না থাকে সে রকম কাউকে অন্তত প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা উচিত নয়। শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যাটা কিন্তু আমাদেরকে সেই শিক্ষাটাই দেয়।

আমরা একটু চিন্তা করলেই উপলব্ধি করতে পারবো যে, আমরা অনেকেই নিজের জন্য একটা মানদন্ড ব্যবহার করি এবং অন্যের জন্য আর একটা। আমরা অন্য মানুষদের কাছ থেকে, আর সবার কাছ থেকে ভালো কথাবার্তা এবং ভালো ব্যবহার প্রত্যাশা করি। কিন্তু মনে করি যে, অন্য কারো সাথে, বিশেষত যারা দুর্বল এবং অসহায় তাদের সাথে অমানবিক, অযৌক্তিক, এমন কী হৃদয়হীন এবং নিষ্ঠুর ব্যবহার করার অধিকার আমাদের আছে। অরিত্রীর যে বয়স সে বয়স শিক্ষকদের সবারই এক সময় ছিল। সেই বয়সে তারা যে রকম কথাবার্তা এবং ব্যবহার শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করতেন সে রকম কথাবার্তা তারা অরিত্রীর সঙ্গে বলেননি, সে রকম ব্যবহার তারা অরিত্রীর সঙ্গে করেননি।

নয়

আমরা যারা মুসলমান ঘরের সন্তান, আমাদের পূর্ব পুরুষদের সিংহভাগ, প্রায় সবাই ১৭৫৭-র ২৩ শে জুন থেকে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত, এই একশ’ নব্বই বছর যাবৎ সা¤্রাজ্যবাদী ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসনামলে সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছেন। অন্তত সাড়ে সাত প্রজন্ম ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা বিশেষ করে বাঙলা, বিহার, উড়িষ্যা এলাকার মুসলমানরা হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, অসচেতন, অসংগঠিত, লক্ষ্যভ্রষ্ট ও লক্ষ্যহীন, অদূরদর্শী ও অপরিনামদর্শী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছেন। একশ’ নব্বই বছর যাবৎ আমাদের পূর্ব পুরুষরা শরীরের প্রয়োজন মেটানোর চিন্তায় দিন কাটিয়েছেন। মনের প্রয়োজন মেটানোর দিকে দৃষ্টি দিতে পারেননি। কিন্তু মানুষ সাইকো ফিজিক্যাল অর্গানিজম, শরীর ও মনের সংগঠন। সমস্ত ক্ষেত্রেই আমাদের দৃষ্টি এখনও শরীরের চাহিদা মেটানোর দিকে। মনের দিকে এখনও আমরা যথেষ্ট নজর দিতে পারিনি। মনুষ্যত্ববোধের, সংবেদনশীল মনের, সততার এবং ঔচিত্তবোধের, বিবেকের ও যুক্তিবোধের যথেষ্ট গুরুত্ব এখনও আমরা দিতে শিখিনি। সব কিছু ভেবে দেখে কথা বলার এবং কাজ করার মানসিকতা এখনও আমরা অনেকেই অর্জন করতে পারিনি। আমরা বড় বড় সমস্যা সমাধান করতে চাই শ্লোগান মেরে, দুমদাম করে কথাবার্তা বলে। মানুষ হওয়ার এবং মানুষ তৈরি করার পরিবেশ আমরা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। এই পরিবেশ-পরিস্থিতিরই শিকার হয়েছে অরিত্রী। কেন অরিত্রী নয়, এ রকম পরিবেশ-পরিস্থিতির শিকার গৃহ পরিবেশে এবং স্কুলে-কলেজে আরো অনেক ছেলে-মেয়ে হচ্ছে। পরিবেশটা এভাবে রাখলে সমাজে এবং দেশে আমরা মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ পাবো না।

দশ 

এখনও কোনো কোনো মুসলিম পরিবারে দেখেছি, মেরে, বকে এবং তিরস্কার করে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে শিক্ষা নিয়ে এত যে গবেষণা হয়েছে, এসব ক্ষেত্রেও মনোবিজ্ঞান জানার, বিশেষ করে চাইল্ড সাইকোলজি বা শিশু মনস্তত্ত্ব জানার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তার কথা যেভাবে স্বীকার করা হয়েছে, এসব জানা প্রয়োজন কেবল শিক্ষকদের নয়, অভিভাবকদেরও। যেসব শিক্ষক বি.এড পাশ করে শিক্ষকতা করেন তাদের তো এসব জানার কথা। এই প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের সবারই থাকা দরকার। তদুপরি তাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংবেদনশীল মনও থাকা দরকার কেবল শারীরিক আঘাত নয়, কোনো রকম মানসিক আঘাতও ছেলে মেয়েদের এবং অন্য কাউকে দেয়াটা যে ক্ষতিকর এবং অন্যায়, এই জিনিসটা শিক্ষক, অভিভাবক এবং আর সবারই থাকা দরকার। শিক্ষকদের, অভিভাবকদের এবং আর সবারই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন এবং সংবেদনশীল মনের হওয়া দরকার। মনে রাখা দরকার যে, শিক্ষকদের অমানবিক এবং অনুভূতিহীন যান্ত্রিক ব্যবহারের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে অরিত্রী অধিকারী।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ