ঢাকা, মঙ্গলবার 12 February 2019, ৩০ মাঘ ১৪২৫, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলাভাষা খোদার সেরা দান

স্টাফ রিপোর্টার : ভাষা আন্দোলন মানে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, বাংলা ভাষা অর্জনের আন্দোলন। মায়ের ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল তা দুনিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তুলনারহিত ঘটনা। বিশ্বময় তোলপাড় করা এ আন্দোলন আমাদের জাতিসত্তার প্রথম ও অন্তরতম স্ফুরণ। এর নিহিত শক্তি তাই আজো নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্দোলিত করছে। নেপথ্যে শক্তি সঞ্চারী পরিচালিত করছে এই জাতিকে সঙ্কটে, বিজয়ে এবং জাতীয় বিবর্তনে। ১৯৫২ সালের সেই আগুনঝরা দিনগুলোতে দেশের প্রাচীনতম সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসসহ বাংলার দাবিতে সেদিনকার আন্দোলনে অভ্যস্ত দূরদর্শিতার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আজ মঙ্গলবার ১২ ফেব্রুয়ারি। কোনো কোনো ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ধারাবাহিক আন্দোলনে বায়ান্নর এদিন এবং পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালন করা হয়। এতে বিপুল সাড়া পাওয়া যায় এবং রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মনের ভাব প্রকাশ থেকে শুরু করে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে রাষ্ট্রভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাতৃভাষা আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে তো অবশ্যই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুকে  প্রতিষ্ঠার অসম্ভব চেষ্টা চালানো হচ্ছিল প্রশাসনে উর্দুভাষি আমলাদের প্রাধান্য থাকার সুবাদে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার ফল কখানো শুভ হয় না- এ কথা পাকিস্তান সরকার ভুলেই গিয়েছিল। এ অঞ্চলের মানুষ সেদিন সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার তাগিদে পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘ষড়যন্ত্রকে’ বানচাল করে দিয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনের উপযোগিতা প্রমাণে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন, “সাতচল্লিশের আগেও আন্দোলন ছিল স্বাধীনতার জন্যই। সাতচল্লিশে বলা হলো, স্বাধীন হয়েছে দেশ। তার আগে রক্তপাত হয়েছে প্রচুর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হতাহত হয়েছে বহু মানুষ। অসংখ্য পরিবার বাস্তুহারা হয়েছে এপার এবং ওপারের। কিন্তু সেই রক্তাক্ত স্বাধীনতা দেখা গেলো প্রতিশ্রুত স্বপ্নকে মোটেই সার্থক করছে না। হ্যাঁ, স্বাধীনতা এসেছিল, তবে খুব অল্প সময়ের জন্য। বাকি সবাই বঞ্চিত হয়েছে। আর সেই বঞ্চনার সত্যটা অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠলো যখন ‘জাতির জনকে’র নিজের মুখ থেকে ঘোষণা এলো ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।
ভাষার ওপর পাকিস্তানের শাসকদের হামলার ঘটনা নানাভাবে ঘটেছে। শব্দ তাড়ানো, বর্ণমালা সংস্কার, সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে খণ্ডিতকরণ, নতুন শব্দ চাপিয়ে দেয়া, উর্দু শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এসব চেষ্টার কোনো অবধি ছিল না। কিন্তু সব নষ্টামির চূড়ান্তটি হলো রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার উদ্যোগ। শিক্ষিত বাঙালি সেদিন আতঙ্কিত হয়েছে। দেখে তার ভাষা কেড়ে নেয়া হচ্ছে। তাকে বোবা করে দেবার অন্ধিফন্দি পাকাপোক্ত করে দেয়া হচ্ছে। কিসের স্বাধীনতা? কোথায় মুক্তি? ভাষা হারানোর সেই আতঙ্ক থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশ।” এই প্রবন্ধটি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা একাডেমিতে পাঠ করেছিলেন এবং তা একাডেমির ‘অমর একুশে বক্তৃতা ১৯৮৫-৯৪’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ঊনিশশ’ সাতচল্লিশ-আটচল্লিশ ও বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নির্দেশ করে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট বদরুদ্দীন উমর ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (দ্বিতীয় খন্ড : প্রথম প্রকাশ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫)’ শীর্ষক গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছেন, “১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন যে সীমিত এলাকায় ঘটেছিল এবং আন্দোলন তখন ছাত্র-শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মধ্যে যেভাবে সীমাবদ্ধ ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সেভাবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দ্বিতীয় পর্যায়ের ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে তা শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তের এক ব্যাপক গণপ্রতিরোধ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়ে সমগ্র পূর্ববাংলার এক অদৃষ্টপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।” তিনি আরো লিখেছেন, “১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন মুষ্টিমেয় ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীর আন্দোলন ছিল না, তা শুধু শিক্ষাগত অথবা সাংস্কৃতিক আন্দোলনও ছিল না। বস্তুতপক্ষে তা ছিল পূর্ববাংলার ওপর সা¤্রাজ্যবাদের তাঁবেদার, পাকিস্তানী শাসক, শোষক শ্রেণীর জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক বিরাট ও ব্যাপক গণআন্দোলন।”
ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট ডা. আহমদ রফিক তার ‘ভাষা-আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, “এরই মধ্যে সংবাদপত্র মহলের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ‘পাকিস্তান অবজারভার’-এর ১২ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে লেখা সম্পাদকীয় নিবন্ধ ‘ছম ফ্যাসিজম’ এবং সে সুবাদে অবজারভার-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি। মওলানা দীন মোহাম্মদ থেকে মওলানা আকরম খাঁ পর্যন্ত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব সবাই এ সুযোগে তৎপর হয়ে ওঠেন, একের পর এক বিবৃতি দিতে থাকেন। অভিযোগ, ধর্মের ওপর আঘাত। তারা এ উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে এক জনসভা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। শাহ আজিজুর রহমানও অবজারভার এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। সুযোগ বুঝে পত্রিকার মালিক ও সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়, পরে অবশ্য তারা জামিনে মুক্তি পান।”
আহমদ রফিক আরো লিখেন, “এ সময়ের আরো একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার মধ্যে রয়েছে করাচীর জনৈক অধ্যাপকের ঢাকা আগমন সম্পর্কে ১২ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আজাদ’ পরিবেশিত বার্তা। তাতে বলা হয় যে তার আসার উদ্দেশ্য ‘পূর্ববঙ্গে এছলামী শিক্ষার বিস্তার’। অনুরূপ আরেকটি খবর ‘মার্চের মাঝামাঝি তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ইসলামী সংস্কৃতি সম্মেলন অনুষ্ঠানে সিদ্ধান্ত’ এবং সেখানে খ্যাতনামা পশ্চিম পাকিস্তানী ‘সাংবাদিক সুলেরিকে আমন্ত্রণ”।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ