ঢাকা, মঙ্গলবার 12 February 2019, ৩০ মাঘ ১৪২৫, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সুলতানি শিলালিপির রূপবৈচিত্র্য

মোহাম্মদ আবদুর রহীম:

মানুষের হৃদয়ে সৌন্দর্যবোধের যে তৃষ্ণা অনুভব হয়, তা শিল্পকলার প্রতি তাকে আগ্রহী করে তোলে, আর এ তৃষ্ণা মেটায় ক্যালিগ্রাফি বা লিপিকলা। সুস্থ, নির্মল, আনন্দদায়ক এবং জীবনকে যথার্থ নৈতিক মানে উন্নীত করতে ক্যালিগ্রাফির গুরুত্ব অপরিসীম। যুগে যুগে জ্ঞানের চলমান ধারা ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে সভ্যতার পরিচয়কে তুলে ধরেছে। বাংলা ভূখন্ডে ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকে চলে এসেছে। প্রাচীন যেসব হরফের ক্যালিগ্রাফি বাংলা ভূখন্ডে হয়েছে, তার বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। মধ্যযুগে বাংলায় মুসলিম ক্যালিগ্রাফির প্রভাব ও প্রাধান্য ছিল। শিলালিপি, মুদ্রা ও পাণ্ডুলিপি নমুনায় এর চমৎকার উপস্থাপন দেখা যায়। এক অর্থে মুসলিম ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্য ও গ্রহণযোগ্যতা অতুলনীয়। ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার ও হরফের পরিচয় আকর্ষণীয় নাসখ, সুলুস, দিওয়ানি লিপি শৈলীর গভীরতা যে কোন মানুষকে মোহিত করে।

ক্যালিগ্রাফিকে গবেষকগণ শুধুমাত্র লিপিকলা বা হস্তলিখনশিল্প বলছেন না, একে ‘ডেকোরেটিভ আর্ট’ বা ‘অলঙ্করণ শিল্পকলা’ নামেও অভিহিত করছেন তারা। ইংরেজি ক্যালিগ্রাফি শব্দটি মূলতঃ গ্রিক শব্দ ক্যালিগ্রাফিয়া থেকে এসেছে। গ্রিক শব্দ ক্যালোস অর্থ হচ্ছে সুন্দর, চমৎকার আর গ্রাফেইন শব্দের অর্থ লেখা। এ শব্দ দু’টোর মিলিত রূপ থেকেই ক্যালিগ্রাফি এসেছে। অর্থাৎ সুন্দর হস্তলিখনকে ক্যালিগ্রাফি বলা হয়েছে। শিল্পকলায় একে ‘লিখনশিল্প’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রয়োজনের তাগিদে মনের ভাবকে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে গিয়ে উদ্ভাবিত হয়েছে লেখার কলাকৌশল। সুমেরিয়ানদের (বর্তমান ইরাক) দ্বারা সর্বপ্রথম লিখন পদ্ধতির প্রচেষ্টা হয়েছিল বলে জানা যায়। এবং এর সময়কাল চিহ্নিত করা হয়েছে ৩০০০ বি.সি.। এই সময় হাড় বা নল খাগড়ার সাহায্যে খেয়ালের বশেই হয়ত কেউ ভেজা নরম মাটিতে একটি ছোট্ট আকৃতির জন্ম দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে গোঁজের আকৃতি বা চিহ্ন হিসেবে প্রচলিত হয়ে যায়। এই চিহ্নকে বলা হতো কিউনিফর্ম (Cuneiform)।

পরবর্তীকালে ২১০০ বি. সি.-তে কিউনিফর্ম মিসরে বিস্তার লাভ করে এবং সেখানে হাইয়ারগ্লিফিক-এর ১০০টি চিত্র-সাদৃশ্য প্রতীক গঠনের মাধ্যমে এর উন্নয়ন সাধন করা হয়। হাইয়ারগ্লিফিক হচ্ছে কিউনিফর্মের একটি জটিল রূপ। এই সমস্ত চিত্র-সাদৃশ্য প্রতীকগুলিকে মাটি, পেপিরাস এবং পাথরে বিভিন্ন উপায়ে লিপিবদ্ধ করা হয়। ফনিশিয়ানরা এই প্রতীকগুলি নকল করে গ্রিসে নিয়ে যায় এবং গ্রিকরা এগুলির সংখ্যা কমিয়ে কিছুটা সরল আকারে ভিন্ন আর এক সেট প্রতীক গঠন করে। পরবর্তীকালে ইটালির এট্রুসকানরা এই প্রতীক ব্যবহার করে এবং তারা বামের পরিবর্তে ডান দিক থেকে পড়বার পদ্ধতির প্রচলন করে।

ইসলামের অভ্যুদয়কালে আরবি লিপি কেবল হিজাযের সীমিত পরিসরে প্রচলিত ছিল। গুটিকতক সাহাবি ও অমুসলিমদের মধ্যে এ লিপির ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। মুসলিম সমাজে সুন্দর হস্তলিখনের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুমোদন ও অনুপ্রেরণা কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। মহানবীর (দ.) উপর অবতীর্ণ ওহী বা ঐশী বাণী সংরক্ষণের প্রয়োজনে লিখন শিল্পকে উৎসাহিত করা হয়েছে। লিখন বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর বাণীকে পূর্বে সংরক্ষণ করে রেখেছেন (সূরা ৮৫:২১-২২)। যেমনিভাবে মানুষের কর্মতৎপরতাকে লিপিবদ্ধ করার জন্যে তিনি ফেরেশতা নিয়োগ দিয়েছেন (সূরা ৫০:১৬, ৮২:১০)। মানুষ তার কর্মফল লিপিবদ্ধ আকারে তার হাতে পাবে (সূরা ১৭:৭৩)। আল্লাহ মানুষকে কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন (সূরা ৯৬:৩-৪)। ওহী অবতীর্ণের সাথে সাথে তা লিখে রাখার জন্য বিশেষভাবে কয়েকজন সাহাবি নিয়োজিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (দ.) সুন্দর হস্তলিখনের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, “তোমরা লেখনীর মাধ্যমে জ্ঞানকে ধারণ কর” (রাওয়াহু আল তিবরানী ফি আল কবীর ওয়া গয়রাহ)। “পিতা-মাতার কাছে সন্তানের (তিনটি) অধিকার রয়েছে, প্রথমত: সন্তানকে উত্তম লেখা শেখাবে, দ্বিতীয়ত: তার একটা সুন্দর নাম রাখবে এবং তৃতীয়ত: প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে বিবাহ দিবে”(রওয়াহু ইবনে নাজ্জার)। রাসূল (দ.) আরো বলেছেন, “উত্তম হাতের লেখা সত্যের উজ্জ্বলতাকে বাড়িয়ে দেয়”( রওয়াহু আল-দায়লামি ফি মুসনাদ আল-ফিরদাউস)।

 সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামের বিস্তৃতি যখন সাধিত হয়, উপরন্তু এর ব্যপ্তি আরব দেশ ছেড়ে ইরাক, পারস্য, সিরিয়া, মিসর ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর সাথে ঐসব অঞ্চলের মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের মাঝে আরবি ভাষা বিস্তার লাভ করতে থাকে। অতিদ্রুত পারস্য, তুরস্ক, ভারত ও আফ্রিকা তথা মুসলিম বিশ্বের প্রায় সকল ভাষায় এর আগমন ঘটে। মুসলিম সভ্যতার প্রসার এবং শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের ফলে ঐসব অঞ্চলের অধিকাংশ ভাষা আজো আরবি লিপির অনুকরণে লিপিবদ্ধ করা হয়।

এশিয়া মহাদেশে উর্দু, ফার্সি, তুর্কি, পশতু, কুর্দি, বালুচি, মুলতানি, কাশ্মিরি, মালে, জাভি ও সিন্ধি ভাষা এবং আফ্রিকা মহাদেশে বার্বারি, হাবসি, নূবি, হাওসি, সাহয়াহেলি, মালাগোচি, সোমালি ও ইরিত্রিয়ান ভাষা আরবি লিপিরীতি অবলম্বনে লিপিবদ্ধ করা হয়। এছাড়া বলকান অঞ্চলেও কতিপয় ইউরোপীয় জাতি আরবি লিপিরীতি ব্যবহার করত। প্রাচীন স্প্যানিশ, হল্যান্ড, স্লাভিয়া প্রভৃতি ইউরোপীয় ভাষাসমূহের মধ্যে আরবি রীতির অনুসরণ দেখা যায়।

ফিলিপাইনে মিন্দানাও সুলুর মুসলমানরা আজো তাদের ভাষা আরবি লিপিরীতি অনুসরণে লিখে আসছেন। সুদূর চীন দেশেও মুসলমানদের গমনের ফলে আরবি লিপিরীতির ব্যবহার তারা সাদরে গ্রহণ করে। বাংলায় আরবিয় মুসলমানদের আগমনের পর থেকেই আরবি ভাষার সঙ্গে আরবি লিপির ও আরবি নকশার চর্চা আরম্ভ হয়। মধ্যযুগে বাংলার মুসলিম শাসনামলে আরবি লিপির চর্চা বৃদ্ধি পায়। তখন বাংলার মুসলমানগণ বাংলা ভাষায় বাংলা লিপিরীতির পরিবর্তে আরবি লিপিরীতি অনুসরণের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। এ সময়ে আরবি লিপিতে পাণ্ডুলিপি রচনা ও শিলালিপি তৈরি বৃদ্ধি পায়। আরবি লিপি ও নকশায় উন্নতি হয়।

বাংলাদেশে মুসলিম ক্যালিগ্রাফির আগমন ১২ শতকে সালতানাত আমলে। মুসলিম শিল্পকলার প্রধান উপাদান ক্যালিগ্রাফির উন্নয়নে যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছিলেন সুলতানগণ। যে জন্য সে সময় (১১৯২-১৫২৬) নির্ভেজাল মুসলিম ক্যালিগ্রাফির একটি স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ধারা তুগরার প্রচলন দেখা যায়। বাংলায় এই তুগরার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আরবি হরফের প্রয়োগ চাতুর্যে একে পানিতে ভাসমান হাঁস, তীর-ধনুক, চালাঘর, পানিতে চলমান নৌকার আকৃতিতে দেখা যায়। এ সময়কার ক্যালিগ্রাফি নিয়ে গবেষণা করতে গেলে ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্যালিগ্রাফির সংগ্রহ যতটুকু আছে, তার মাধ্যমে গবেষণার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সুলতানি আমলের পর মুঘল আমলে (১৫২৬-১৮৫৬) আরবি ক্যালিগ্রাফির সাথে নাস্তালিক এবং শিকাস্তে নাস্তালিক ফার্সিধারা সংযুক্ত হয়। বাংলা অঞ্চলে অসংখ্য পুঁথি ও শিলালিপি আরবি ও অন্যান্য হরফে লেখা হয়েছে। বাংলা ভূখ-ে পাথর খোদাই শিল্পের প্রচলন সুলতানি শাসনামলের পূর্বেই বেশ জমজমাট ছিল। বিশেষ করে পাথরে মুর্তি খোদাই, অলংকরণ ও শিলালিপি উৎকীর্ণ শিল্প পাল ও সেন শাসনামলে বিদ্যমান ছিল। পাল যুগের মূর্তি খোদাই ভাষ্কর্য শিল্পের জৌলুস ও ঔজ্জ্বল্য শিল্প সমঝদারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সে যুগের শিলালিপিতে ক্যালিগ্রাফি বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না। প্রাক-মুসলিম শাসনামলে বাংলায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পাথর খোদাই শিল্পের লালন ও পৃষ্ঠপোষকতার কথা জানা যায়। বিশেষ করে পাল সম্রাট ধর্মপাল ও দেবপালের সময়ে বরেন্দ্রবাসী শিল্পী ধীমান এবং তার পুত্র বীতপাল পূর্বভারতীয় শিল্পরীতির প্রবর্তন করেন। তারা দু’জনই ভাস্কর্যে, ধাতুমুর্তি গড়নে ও চিত্রকর্মে বিশেষ নিপুণ ও পারদর্শী ছিলেন। ভাস্কর্যে আর ধাতুমুর্তি গড়নে বীতপালকে পূর্বদেশীয় রীতির এবং ধীমানকে মধ্যদেশীয় রীতির প্রবর্তক বলা হয়। তিব্বতীয় ইতিহাসবিদ লামা তারানাথ কর্তৃক ১৬০৮ ই. রচিত গ্রন্থে এ তথ্যের সমাবেশ রয়েছে (সরসীকুমার, কলকাতা, ১৯৭৮, পৃ-২৭-২৮)। সেন শাসনামলেও শিল্পকলার খোদাই ও ভাস্কর্য শিল্পীদের কদর সম্পর্কে জানা যায়। বিজয় সেনের দেওপাড়া শিলালিপিতে ‘রণক সুলাপানি’র নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে বরেন্দ্র অঞ্চলের শিল্পগোষ্ঠির “রত্নশিখর” উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। সে সময়ে শিল্পকলার নানান শাখার শিল্পীদের ভিন্ন ভিন্ন নাম ছিল। যেমন- কারু, শিল্পি, সুত্রধর, কর্মিকা, তাকসাকা, সুপাকার ও চিত্রকর (Vijai, New Dilhi, 1981, p-144)।  এসব তথ্যের আলোকে বলা যায় যে, পাল ও সেন আমলের শিলাখন্ডে বৌদ্ধ ও হিন্দুদের দেবদেবীর ভাস্কর্য ও তার আলঙ্কারিক উপস্থাপণ পাথর খোদাই শিল্পীর লভ্যতা ও শিল্প নৈপুণ্যের স্বাক্ষর বহন করে।১ পাল ও সেন শাসনামলের পাথরে উৎকীর্ণ লিপি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পালি ও সংস্কৃত ভাষায় তথ্য উপস্থাপনের জন্য খোদাই করা হয়েছে। ১০ম শতাব্দীতে মহিপালের শাসনামলে বাংলাদেশের নারায়ণপুর শিলালিপি (Jhunu, New Dilhi, 1993, plate-23) এবং ১১শতকের নয়াপালের শাসনামলে পশ্চিম বঙ্গের বঙ্গধ শিলালিপি (রনরফ., ঢ়ষধঃব-২৫) নাগরি লিপিতে উৎকীর্ণ করা হয়েছে। প্রায় বর্গাকার এই লিপিতে সমসাময়িক তথ্যের সমাবেশ থাকলেও তাতে লিপিকলার বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত।  লিপি হচ্ছে ভাষার মূর্তপ্রকাশ এবং ভাষা হচ্ছে চিন্তার প্রকাশ মাধ্যম। মানুষ নিজকে লেখনির মাধ্যমে প্রকাশ করতে চেষ্টা চালিয়েছে। প্রাচীনকালে, রাজারা তাদের কীর্তিগাঁথা, পারিবারিক ইতিহাস, রাজকীয় সাফল্যের তথ্য, যুদ্ধজয়, মন্দির নির্মাণ, সামাজিক উন্নয়ন প্রভৃতি লিপিবদ্ধ আকারে রেখে যেতে চেয়েছেন, এজন্য সবচেয়ে টেকসই মাধ্যম হিসেবে তাদের পছন্দ ছিল শিলালিপি (ibid., p-1)। বাংলার পাথরের ভাস্কর্য ও শিলালিপিতে সিংহভাগ কালো আগ্নেয়শিলা (ব্লাক ব্যাসল্ট) ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে একে ‘কষ্টি পাথর’ বলা হয়। এগুলো প্রধানত বিহারের পূর্বাঞ্চলীয় রাজমহলের পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া ধুসর রঙের বেলে মার্বেল পাথর বিহারের গয়া অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হত। খোদাই করা বা খোদাইবিহীন এসব পাথরখন্ড বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নদীপথে সহজে পাঠানো যেত। পাথর খোদাই শিল্পে বাংলার শিল্পীদের বিশেষ সুনাম ছিল। পাথরে সূক্ষ্ম কারুকাজ, ভারী অলংকরণ, খোদাইয়ের গভীরতা ও মসৃণ- পেলব উপস্থাপন বাংলার শিল্পীদের বিশেষ নৈপুণ্য ও দক্ষতাকে প্রকাশ করেছে (Susan, Leiden, 1984, p-2)। বাংলার শিলালিপি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক সম্পদ। প্রাক-মুসলিম শাসনামল ও সুলতানি শিলালিপির লিখনশৈলী, শৈল্পিক জাঁকজমক ও রকমারী সৃজনশীলতা একটি কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সেকালে এ অঞ্চল ভাস্কর্য ও পাথরে খোদাই শিল্পে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। তবে বাংলার সুলতানি শাসনের আগের ভাস্কর্য শিল্পের প্রতিভাকে লিখন শিল্পের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে যে খুব একটি কাজে লাগানো হয়েছিল, তা বলা যাবে না, কারণ পাল ও সেন শাসনামলের সংস্কৃত, পালি ও প্রাচীন বাংলায় উৎকীর্ণ শিলালিপিগুলো তথ্যে সমৃদ্ধ হলেও শৈল্পিক ও নান্দনিক দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে যেতে পারেনি (Mohammad, Dhaka, 2009, p-17)। বাংলায় সুলতানি শাসনের প্রতিষ্ঠার পরই শৈল্পিক আবহ ও পটভূমির আমূল পরিবর্তন হতে শুরু করে। নবাগত মুসলিম সুলতানদের উদার দৃষ্টিভঙ্গী ও স্থাপত্য অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলায় নতুন আঙ্গিকের ইমারত, দালান-কোঠা ও নির্মাণ প্রকল্প স্থাপন হতে লাগল। যেখানেই ইমারত বা নয়া স্থাপনা হল, সেখানে একটি করে শিলালিপি স্থাপনার সাথে জুড়ে দেয়া হল। সেটা শুধু তথ্য সংরক্ষণ, তা নয়, বরং তাতে অত্যাশ্চর্য শিল্প সৌকার্য ফুটিয়ে তোলা হত। এতে স্থাপনাটি ভিন্ন একটি রূপ পেল। অন্যদিকে ভাস্কর্য শিল্প বা মুর্তি নির্মাণে শিল্পীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। ধারণা করা হয় যে, মুর্তি শিল্পের গ্রাহক ব্যাপক সংখ্যক মাত্রায় হ্রাস পাওয়ায় এ শিল্পে ধস নেমেছিল। সুলতানি শিলালিপির (১২০৪-১৫৭৬ ই.) ব্যাপকতার প্রবল প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলা মুলুকে। দেশের আনাচে-কানাচে যেখানে কিছু নির্মাণ করা হত, তার সাথে একটি আরবি-ফারসি শিলালিপি দিয়ে শোভা বর্ধন করতে হবে, এমন রীতি গড়ে উঠল। এভাবে বাংলায় সুলতানি শিলালিপির একটি বিশাল ও সমৃদ্ধ ভা-ার তৈরি হল। এই ভা-ারের আরবি-ফারসি লিখনশৈলির বিচিত্র ও নয়নাভিরাম রীতিসমূহ গবেষক, দর্শক ও পাঠককে আকর্ষণ ও মুগ্ধ করেছে। অথচ এর শিল্প-সৌন্দর্য নিয়ে গবেষণা তেমন একটা দেখা যায় না। বাংলার আরবি-ফারসি শিলালিপির ইতিহাস গবেষণার ধারা সম্ভবত ১৮ শতকের শেষার্ধে বাংলার শিলালিপির পঠন-পাঠন ও ইতিহাস গবেষণা শুরু হয়। তৎকালীন বাংলার মুসলিম শিক্ষিত মহলে আলেম-উলামা, মৌলবী, মুন্সীদের অনেকেই আরবি ফারসিতে গভীর জ্ঞান রাখতেন। এদেরই একজন হচ্ছেন, সৈয়দ গোলাম হুসাইন সেলিম জায়েদপুরী (মৃ. ১৮১৭ ই.)। তিনি মালদহের ইংরেজ বাজারে বাস করতেন। তাঁর বাসস্থান থেকে বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়  খুব একটা দূরে ছিল না। তিনি গৌড় ও পা-ুয়ায় প্রচুর সংখ্যক আরবি-ফারসি শিলালিপি দেখে, তার মর্ম উদ্ধারে উৎসাহী হন। তিনি গভীর আগ্রহে শিলালিপি গবেষণায় নেমে পড়েন। বলা যায়, তিনিই সর্বপ্রথম সুলতানি শিলালিপির ঐতিহাসিক ব্যবহারকে কাজে লাগিয়ে ১৭৮৮ ই. ইতিহাস গ্রন্থ ‘রিয়াদ আল-সালাতিন’ রচনা করেন। এটি মুসলিম বাংলার ইতিহাসের একটি আকর গ্রন্থ বাংলার সুলতানি শিলালিপিতে উৎকীর্ণ তথ্য ব্যবহার করে তিনি বাংলা ভূখ-ের মুসলিম শাসনের একটি কালানুক্রমিক কাঠামো তৈরির প্রয়াস পেয়েছেন (গ্রন্থটি ১৮৯৩ ই. এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল প্রকাশ করে)। জায়েদপুরীর দেখানো পথ ধরে আরেক গবেষক সৈয়দ মুন্সি এলাহি বখশ আল-হুসাইনী আওরঙ্গজেবাদী (মৃ. ১৮৯২ ই.) গৌড়ের বহুসংখ্যক সুলতানি শিলালিপি আবিস্কার করেন এবং সেগুলোর পাঠ উদ্ধারে অধিকতর বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করেন। তিনি ৪২টি শিলালিপির প্রায় নিখুঁত পাঠোদ্ধার করেন, যেগুলোতে আগে কারো নজর পড়েনি। তিনি এই শিলালিপির তথ্য ব্যবহার করে ‘খুরশিদ-ই-জাহান নুমা’ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি গ্রন্থটি ১৮৫৫ ই. রচনা শুরু করে ১৮৬৩ ই. শেষ করেন বলে ধারণা করা হয়, কারণ তাঁর গ্রন্থে এর পরের তারিখের কোন ইতিহাস লিপিবদ্ধ নেই। ১৮৯৫ ই. ইংরেজ গবেষক হেনরি বেভারিজ এই গ্রন্থটির একটি ইংরেজি অনুবাদ এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের জার্নালে প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে ইতিহাসবিদ ও প্রতœগবেষক আবদুল করিম এ গ্রন্থ নিয়ে একটি মূল্যবান রচনা বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এলাহি বখশের সুযোগ্য ছাত্র মুহাম্মদ আবেদ আলী খান (১৮৭২-১৯২৬ ই.) গৌড় ও পাণ্ডুয়ার শিলালিপি নিয়ে একটি চমৎকার গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটির নাম- Short Notes on the Ancient Monuments of Gour and Pandua (মালদা, ১৯১৩ ই.)। ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ও লেখক স্যার হেনরি ক্রেইটন The Ruins of Gour (লন্ডন, ১৮১৭ ই.) নামে একটি বই লিখেন। তিনি ১৭৮৬ থেকে ১৮০৭ ই. পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর গৌড়ে অবস্থান করেছিলেন। তাঁর বইটিতে সুলতানি শিলালিপির চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। আরেক ইংরেজ প্রত্নসংগ্রাহক ফ্রাঙ্কলিন (তাঁর পূর্বসুরী ক্রেইটনের সংগৃহীত কয়েকটি শিলালিপিসহ) গৌড়-পাণ্ডুয়ার প্রচুর সংখ্যক শিলালিপি ইংল্যাণ্ডে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। ফ্রাঙ্কলিনের অনুরোধে তাঁর সেক্রেটারি ভারতীয় বংশোদ্ভুত মুন্সী শ্যামপ্রসাদ একটি রিপোর্ট তৈরি করেন। ‘আহওয়ালে গৌড় ওয়া পা-ুয়া’ নামে এই রিপোর্টের মাধ্যমে সুলতানি শিলালিপি সম্পর্কে চমৎকার ধারণা পাওয়া যায়। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে সুলতানি শিলালিপির ওপর প্রত্নতত্ত্ববিদ ওরমের লেখা একটি সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট সংরক্ষিত আছে। এছাড়া উনবিংশ শতকে ক্যাপ্টেন ডবিউ্ল এন লিজ, স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম, ড. জেমস ওয়াইজ, ই. ভে. সে. ওয়েস্টম্যাকট, হিলি অলটার এম. বুরক প্রমুখ গবেষক ও পণ্ডিতবর্গ সুলতানি শিলালিপির ওপর গবেষণা করেন। মুসলিম বাংলার শিলালিপির ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন স্বনামধন্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ আহমদ হাসান দানী। গ্রন্থটি হচ্ছে- Bibliography of Muslim Inscriptions of Bengal (ঢাকা, ১৯৫৭ ই.)। এছাড়া জিয়া উদ্দিন দেশাই শিলালিপি নিয়ে বহু সংখ্যক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ রচনা করেছেন।  মুসলিম বাংলার শিলিালিপি নিয়ে সর্বপ্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেন মৌলবী শামসুদ্দীন আহমদ। Inscriptions of Bengal নামে এ গ্রন্থটি রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম ১৯৬০ই. প্রকাশ করে। অনুরূপ আরেকটি মূল্যবান গ্রন্থ হচ্ছে-Corpus of the Arabic and Persian Inscriptions of Bengal (ঢাকা, ১৯৯২ ই.), প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ আবদুল করিম এ গ্রন্থটি রচনা করেন। এছাড়া ইতিহাসবিদ ও প্রত্ন গবেষক ড. এ কে এম ইয়াকুব আলী রচিত একটি মূল্যবান গ্রন্থ হচ্ছে- Select Arabic and Persian Epigraphs (ঢাকা, ১৯৮৮ ই.)। প্রত্নগবেষক আবু মুসা রচিত একটি গ্রন্থ হচ্ছে- History of Dhaka Through Inscription and Architecture, A portrait of the Sultanate Period  (ঢাকা, ২০০০ ই.)। প্রত্নগবেষক মুহাম্মাদ আবদুল কাদির ৪০ বছর ধরে শিলালিপি নিয়ে লেখালেখি করেছেন এবং কয়েকটি শিলালিপি আবিস্কার করেছেন (ঢাকার নিখোঁজ শিলালিপি, ঢাকা, ২০১৩, পৃ-৩৫)। মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক রচিত গ্রন্থটি হচ্ছে- Historical and Cultural Aspect of the Islamic Inscription of Bengal : A Reflective Study of Some New Epigraphic Discoveries (ঢাকা, ২০০৯ ই.)। বাংলার সুলতানি শিলালিপি গবেষণায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সহায়ক গ্রন্থ । এছাড়া এ বিষয়ে আরো গবেষণামূলক রচনা বিভিন্ন জার্নাল ও পত্রিকায় রয়েছে। অন্যদিকে শিলালিপির আলোকে সভ্যতা, সামাজিক, অথর্নৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিষয়ে বাংলা ভাষায় রচিত দু’টি গ্রন্থের কথা জানা যায়। এ. কে. এম. শাহনেওয়াজ রচিত গ্রন্থ ‘মুদ্রায় ও শিলালিপিতে মধ্যযুগের বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি (ঢাকা, ১৯৯৯ ই.)’ এবং মুর্তজা বশীর রচিত গ্রন্থ ‘মূদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ (ঢাকা, ২০০৪ ই.)’। দিনাজপুর জাদুঘরে রক্ষিত কয়েকটি শিলালিপি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন মেহরাব আলী, প্রবন্ধটির শিরোনাম-‘দিনাজপুর যাদুঘরে সংরক্ষিত কয়েকটি মুসলিম শিলালিপি (দ্বাদশ ইতিহাস সম্মেলন, ১৯৭৯)’। বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের মুখপত্র ‘ইতিহাস পত্রিকা’র বিভিন্ন সংখ্যায় শিলালিপি নিয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- এ কে এম ইয়াকুব আলী রচিত ‘নবগ্রাম শিলালিপি (১১শ বর্ষ, ১৩৮৪ বাং)’; ‘সুলতানি শিলালিপির বিষয়ভিত্তিক শ্রেণি বিভাজন (৪৩শ বর্ষ, ২০১০ ই.)’, সৈয়দ মুর্ত্তজা আলী রচিত ‘সিলেট জেলার আরবী-ফার্সী শিলালিপি (২য় বর্ষ, ১৩৭৫ বাং)’, মোঃ রেজাউল করিম রচিত ‘বাংলার লেখমালা : মুসলিম যুগ (৩৬শ বর্ষ, ১৪০৯ বাং)’, আ. ক. ম. যাকারিয়া রচিত ‘গোরকুই শিলালিপি (৫ম বর্ষ, ১৩৭৮ বাং)’, মোহাম্মদ আবু মুসা রচিত ‘মীর্জাপুর মসজিদের শিলালিপি (২৬শ বর্ষ, ১৩৯৯ বাং)’, মোঃ আবুল হাশেম মিয়া রচিত ‘উৎকীর্ণ লিপিযুক্ত আজিমনগর মসজিদ (২৬শ বর্ষ, ১৩৯৯ বাং)’, মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান রচিত ‘বাংলার প্রাক-মুঘল শিলালিপিতে কুরআনের ব্যবহার (৪৩শ বর্ষ, ২০১০ ই.)’, এ. কে. এম. শাহনেওয়াজ রচিত ‘শিলালিপির সাক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বরূপ অন্বেষণ : সুলতানি বাংলা (৩০শ বর্ষ, ১৪০৩ বাং)’। জার্নাল অব বেঙ্গল আর্টের বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত কয়েকটি প্রবন্ধ হচ্ছে- আবদুল করিম রচিত An Arabic Inscription from Murshidabad City  (ঢাকা, ১৯৯৬ ই.)’, প্রতিপ কুমার মিত্র রচিত Three Unnoticed Inscriptions of Sultans of Bengal (ঢাকা, ১৯৯৮ ই.), এ কে এম ইয়াকুব আলী রচিত 

“Calligraphy as an Ornamental Art on the Monuments of Bengal Sultanate (ঢাকা, ১৯৯৯ ই.)’, ‘Stone-carving Art in Mihrab Decoration of Kusumba Mosque (ঢাকা, ২০০২ ই.)’, ‘Siqayah in the Epigraphic Records of  Medieval Bengal (ঢাকা, ২০০৮-২০০৯ ই.)’, মুহাম্মদ আবদুল কাদির রচিত ‘Ornamentation in Muslim Inscription of Bengal (ঢাকা, ২০০০ ই.)’, চিত্ররেখা গুপ্ত রচিত ‘Bengal Art and Bengal Inscriptions : An Approach Towards Co-relation A Case Study with Punchra :A Village in the Vardhaman District, West Bengal  (ঢাকা, ২০০২ ই.)’, আবদুল কাদির রচিত ‘Categorisation of Mosques in Bengal into Mosques for Jumah Prayer (Al-Masjid Al-Jami) and Mosques for Panch Waqt Namaz (Masjid Lisalat Al-Khams) and Others (ঢাকা, ২০০৩ ই.)’, মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক রচিত ‘Ecology and Nature in Islamic Culture and its Reflection on Islamic Art with Specials Attention to Architectural Calligraphy in Bengal (ঢাকা, ২০১০ ই.)’, ‘Reflections on Some Rare Islamic Inscriptions of Bengal (ঢাকা, ২০১৪ ই.)’, ‘Islamic Titles in the Arabic and Persian Inscriptions of Bengal  (ঢাকা, ২০১৫ ই.)’, সৈয়দ ইজাজ হুসাইন রচিত ‘Discovery of Husain Shah’s New Inscriptions and Ruins of A Jami Mosque from Husainabad in Ballia District of Uttar Pradesh and Diffusion of the Bengal Art (ঢাকা, ২০১৩ ই.)’। 

শিলালিপির ক্যালিগ্রাফি নিয়ে মোহাম্মদ আবদুর রহীমের বিশেষ্লণমূলক একটি রচনা হচ্ছে-‘বাংলা ভূখণ্ডে ক্যালিগ্রাফির পদযাত্রায় শিলালিপির ভূমিকা (সংগ্রাম, ২০১৫ ই.)’।

সুলতানি শিলালিপির বিষয় ভিত্তিক প্রকারভেদ

বাংলা ভূখণ্ডে (১২০৫-১৭০৭ ই.) প্রাপ্ত শিলালিপির সংখ্যা প্রায় চারশত (Mohammad, op. cit., p-20)। এর মধ্যে সুলতানি শিলালিপির সংখ্যা প্রায় ২৮০টি। এসব শিলালিপি প্রধানত দু’ধরণের স্থাপত্যে ব্যবহার করা হয়েছে। এক. লৌকিক ও দুই. ধর্মীয় ইমারত।  

১২০৪ ই. ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর নেতৃত্বে লাখনাবতী বিজয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত ঘটে এবং সে সময় থেকে ১৫৭৬ ই. মুঘল স¤্রাট জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ আকবরের বাংলা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময়পর্বকে বাংলার ইতিহাসে সুলতানি শাসন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় (ইয়াকুব, ঢাকা, ২০১০, পৃ-৩৩)। 

বাংলার সুলতানগণ এবং তাদের নিয়োগকৃত বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসকগণ লৌকিক ও ধর্মীয় ইমারত সমূহ নির্মাণের সময় তাতে শিলালিপি সংযুক্ত করে নির্মাণকাজের প্রকৃতি ও সমকালীন বিষয়াবলী তুলে ধরেছেন। লৌকিক ইমারতের মধ্যে রয়েছে- প্রাসাদ, দুর্গ, সেতু, পুকুর-দিঘী, তোরণ, উদ্যান ও এজাতীয় স্থাপনা। অন্যদিকে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা, মকতব, মাকবারা প্রভৃতি ধর্মীয় স্থাপনার অন্তর্ভূক্ত। লৌকিক স্থাপনার শিলালিপিতে প্রথমাংশে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা ও পরের অংশে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। অন্যদিকে ধর্মীয় ইমারতের শিলালিপির প্রথমাংশে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আয়াত অথবা হাদীস এবং দ্বিতীয় অংশে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। প্রতিটি ছত্র আলাদাকরণ রেখা দিয়ে পৃথক করা হয়েছে এসব শিলালিপিতে। ধর্মীয় স্থাপনার মধ্যে মসজিদের শিলালিপির সংখ্যাই বেশি। এতে মসজিদ নির্মাণ সংক্রান্ত আয়াত কিংবা আল্লাহর গুণবাচক ও প্রশংসাসূচক আয়াত ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া আয়াতুল কুরসীও বহুসংখ্যক শিলালিপিতে লক্ষ্য করা যায়। কুরআনের আয়াতের সাথে কিংবা পৃথকভাবে মসজিদ নির্মাণ সংক্রান্ত হাদীস উৎকীর্ণ করতে দেখা যায়। এছাড়া কোন কোন শিলালিপিতে কুরআনের সুরা ৬-এর ১৬০ নং আয়াত “যে ব্যক্তি কোন সৎ কাজ করে তার জন্য প্রতিদান স্বরূপ দশগুণ পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়” উৎকীর্ণ করতে দেখা যায় (S. Ahmed, Rajshahi, 1960, pp-193-194)।  মসজিদ নির্মাণ একটি অতি মহৎ কাজ এবং সেটা আল্লাহ তায়ালার কাছে খুব পছন্দনীয়। শিলালিপির মূল অংশের সাথে (অর্থাৎ- ব্যক্তি কর্তৃক মসজিদ নির্মাণ) প্রারম্ভিক অংশে খোদাইকৃত পবিত্র কুরআনের এ আয়াতের সংযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। 

সুলতানি বাংলার শিলালিপিতে মসজিদ নির্মাণ সংক্রান্ত হাদীস “যে ব্যক্তি আল্লাহর রাজি-খুশির উদ্দেশে একটি মসজিদ তৈরি করবে, আল্লাহপাক তার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ করে দেবেন” (Karim, Dhaka, 1992, p-310)। কোন কোন শিলালিপিতে “জান্নাতে সত্তরটি গৃহ বা প্রাসাদ প্রদান করা হবে” প্রারম্ভিক অংশের সাথে মূল অংশের বিষয়ভিত্তিক চমৎকার মিল লক্ষ্য করা যায়।  “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম”সহ আল্লাহর বাণী সুরা ৯-এর ১৮ নং আয়াত “আল্লাহর মসজিদ নির্মাণ করবে তারা, যারা আল্লাহ তায়ালা ও পরকালের ওপর ঈমান আনে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না, আশা করা যায়, এরা হবে হেদায়েতপ্রাপ্ত মানুষের অন্তর্ভূক্ত।” উৎকীর্ণ শিলালিপিতে নির্মাণ সংক্রান্ত হাদীসও লেখা হয়েছে (ibid., p-312)। এ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মসজিদ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি আর অন্যদিকে, যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ব্যতীত মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তার জন্য পরকালে প্রতিদান আশা করা ঠিক হবে না। সুলতানি শিলালিপিতে ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে মাদ্রাসা নির্মাণ সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হুগলির ত্রিবেনীর একটি মাদ্রাসার শিলালিপিতে প্রারম্ভিক অংশে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে (Dani, Dhaka, 1957, p-6)। অনুরূপ আলাউদ্দীন হুসাইন শাহের সময়ে প্রতিষ্ঠিত একটি মাদ্রাসার শিলালিপিতে জ্ঞান অর্জনের জন্য চীনে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে (S. Ahmed, op. cit., pp-158-159)। রোকনউদ্দীন কায়কাউসের শাসনামলের একটি কবর ফলক থেকে জানা যায়, রাসূল স. বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রত্যহ আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের অন্তরায় মৃত্যু ছাড়া আর কিছু নয়।” এবং এর সাথে ফলকটিতে আয়াতুল কুরসি উৎকীর্ণ করা হয়েছে (ibid., pp-21-23)। খাবার পানির সংকট মেটাতে সুলতানি আমলে পুকুর-দিঘী খনন ও খাবার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এসব প্রকল্পে স্থাপিত শিলালিপি পাওয়া গেছে। আরবিতে একে ‘সিকায়া’ বা পানীয় জলের আধার বলে। সিকায়া সংক্রান্ত শিলালিপির প্রারম্ভিক অংশে “যে ব্যক্তি কোন সৎকাজ করবে, তার জন্য দশগুণ পারিশ্রমিক দেয়া হবে।” আয়াত উৎকীর্ণ করা হয়েছে (Mohammad, op. cit., p-90)।  সুলতানি শিলালিপিতে এরকম বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আয়াত ও হাদীস উৎকীর্ণ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। 

শিলালিপি উৎকীর্ণের কলাকৌশল ভারতীয় উপমাদেশে পাথর খোদাইয়ের ঐতিহ্য মৌর্যযুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ থেকে ২য় শতক) থেকে সুবিদিত (Nihar, New Delhi, 1975, p-1)। বিভিন্ন ধরণের বেলে মার্বেল থেকে মিহি দানার কালো রঙের ব্যাসল্ট মার্বেলে খোদাই করা হত। বাংলার মধ্যভাগের মূল ভূখণ্ডে কিংবা দক্ষিণভাগে কোন পাথরের পাহাড় না থাকায়, সেখানে পাথরের কোন উৎস ছিল না। মালদহ, মুশির্দাবাদ, বাংলাদেশের রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চলের এলাকাসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুরের মধ্যবর্তী অঞ্চল ও দক্ষিণ বাংলার খুলনা, বাগেরহাট, যশোর এলাকার শিলালিপির জন্য বিহারের রাজমহল ও তৎসন্নিহিত পাহাড়গুলো থেকে পাথর সংগ্রহ করা হত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পাথর প্রক্রিয়াজাত অথবা খোদাইবিহীন অবস্থায় নদীপথে প্রকল্পস্থানে আনা হত (ইউসুফ, ঢাকা, ২০১৩, পৃ-২৭১-২৭২)। পাহাড় থেকে সংগৃহীত পাথর লেখার উপযোগী করার পদ্ধতি ভারতের সবখানে প্রায় একই ধরণের ছিল। পাহাড় থেকে খোদাই উপযোগী পাথরখণ্ড সংগ্রহের পর তা চেরাইয়ের জন্য বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হত। পাথরের যে বরাবর চেরাই হবে সেখানে একটি সরল রেখা কোন ধাতব বস্তু দিয়ে দেয়া হত এবং যতটা সম্ভব রেখাটি গভীর করা হত। তারপর রেখার ভেতর কয়েক ইঞ্চি পর পর ছিদ্র করা হত এবং ছিদ্রগুলোতে শুকনা কাঠের খিল ঢুকিয়ে তাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দেয়া হত। এভাবে যতক্ষণ পাথরখ-টি দু’ভাগ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত পানি দিয়ে খিলগুলো ভেজানো হত। এটা একটা চমৎকার পদ্ধতি, কারণ পানিতে ভিজে কাঠের খিলগুলো জায়গা তৈরিতে চাপ বাড়াতে থাকতো এবং সমন্বিত চাপ প্রয়োগের ফলে রেখা বরাবর ফেটে পাথরখণ্ড টি দু’ভাগ হত, তবে সেটা এবড়ো-থেবড়ো অমসৃণ হত। এছাড়া পাথর খণ্ডের যে বরাবর চেরাই হবে সে বরাবর তিন থেকে ছয় ইঞ্চি গভীর ছিদ্র করে দু’টো লোহার খিলওয়ালা পাতসহ ছেনি ঢুকিয়ে দেয়া হত এবং ছেনিগুলোতে হাতুড়ি দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করা হত, এভাবে পাথর দু’ভাগ করার পদ্ধতিটি বেশ প্রসিদ্ধ। তারপর চেরাই পাথরটি লোহার ছেনি দিয়ে যতটা সম্ভব সমান করা হত এবং খণ্ড দু’টি পরস্পর ঘসে প্রায় মসৃণ করা হত। তারপর ছোট আকারের লৌহখনিজ জাতীয় পাথর দিয়ে চুড়ান্ত মসৃণ করা হত। লেখার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর তৈলাক্তভাবের মত মসৃণ করার জন্য একধরণের হলুদ রঙের পাথর ব্যবহার প্রচলিত ছিল। কোথাও মোম দিয়ে শেষ পলিশটি করা হত। শিলালিপি খোদাই শিল্পকে প্রাচীন ভারতীয় ভাষায় ‘সাংগ তারাশি’ বা ‘ফান্ন সাংগ তারাশি’ বলে। মধ্য এশিয়া ও ইরানের প্রাচীন মাশহাদ, কোম, খোরাশান শহরে এ শিল্পটি জমজমাট ছিল, একে ফারসিতে ‘হুনারে সাংগ তারাশি’ বলে। বাংলায় প্রাপ্ত প্রাচীন লিপি উৎকীর্ণের মাধ্যম হিসেবে তামা ধাতু খুব জনপ্রিয় ছিল। সুলতানি শাসনামলের আগে প্রাপ্ত অধিকাংশ লিপিফলক তামার তৈরি। শিলালিপির ব্যবহার খুব সীমিত ছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুর্তির চারপাশের সমতল জমিনে হরফ খোদাই করা হত। এছাড়া শুধুমাত্র শিলালিপির জন্য নির্দিষ্ট ফলকেও হরফ খোদাই করার রেওয়াজ ছিল। এসব শিলালিপি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এতে জমিন খোদাই করে হরফকে ভাসিয়ে তোলা বা উচুঁ রাখার নমুনা পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে সুলতানি শিলালিপিতে জমিন খোদাই করে হরফকে ফুটিয়ে তোলার রেওয়াজের প্রথম প্রয়োগ সুলতানদের সময় থেকেই প্রমাণিত হয়েছে। এ খোদাইয়ের ফলে হরফগুলোর অবয়ব সূক্ষ্ণভাবে ফুটে ওঠে এবং হরফগুলো পরস্পর মেলবন্ধন ও এর সৌন্দর্য একটি গতিময়তা ধারণ করে (প্রাগুক্ত, পৃ-২৭১)। তবে সীমিত সংখ্যক সুলতানি শিলালিপিতে হরফ খোদাই দেখা যায়। যারা সুলতানি শিলালিপি খোদাই কর্মে নিয়োজিত ছিলেন, তাদের নামের শেষে নিসবা (জন্মস্থান) বা উপাধির মাধ্যমে ধারণা করা যায়, তাদের অধিকাংশ সংখ্যক ব্যক্তি ইরান ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত। বাংলায় শিলালিপি খোদাইকর্ম প্রসারের মাধ্যমে স্থানীয় খোদাইকারদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সাধারণত শিলালিপি খোদাই কাজে কয়েকটি পর্যায় বা ধাপ রয়েছে। একজন ক্যালিগ্রাফার অথবা লিপি বিষয়ে অভিজ্ঞ আলেম পাথরে হরফ একে দিতেন। কখনও খোদাইকার নিজেও একজন ক্যালিগ্রাফি শিল্পী হিসেবে লেখা ও খোদাই কাজটি সম্পন্ন করতেন। কিভাবে খোদাই কাজ করা হত, এর একটি নমুনা, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত মান্দ্রা (মান্ডা) শিলালিপি থেকে ধারণা করা যায় (Catalogue, Dhaka, 1978, p-24)। এ শিলালিপিতে শেষ অংশের খোদাই কাজ সম্পন্ন করা হয় নাই। শিলালিপি খোদাই কাজটি প্রধানত দু’টি পর্যায়ে সম্পন্ন করা হত। প্রথমে একজন ক্যালিগ্রাফার পুরো লেখাটি (টেক্সট) পাথরের সমতল পৃষ্ঠে কালি বা সিসার কলম দিয়ে একে দিতেন। হরফ চিহ্নিতকরনের পর উস্তাদ খোদাইকার ছেনি  (খোদাই কাজে ব্যবহৃত লোহার ছোট বাটালি ধরণের যন্ত্র) দিয়ে হরফের আউট লাইন বের করে দিতেন, একে কাটাই বলে। দ্বিতীয় পর্যায়ে হরফের আউটলাইন ধরে জমিনকে ৫ থেকে ৮ মিলিমিটার পযর্šÍ খোদাই করেন একজন শাগরেদ বা নবিশ খোদাইকার। একে চটানো বলে। খোদাই কাজে ওস্তাদ খোদাইকারের ওপরই ক্যালিগ্রাফির সৌন্দর্যের মান রক্ষার দায়িত্ব বর্তায়। এটা দু’এক বছরে অর্জন করা সম্ভব নয়। সুলতানি শিলালিপির খোদাই দক্ষতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রাজধানী বা বড় শহরের শিলালিপির খোদাই (হরফ অঙ্কন ও খোদাই দক্ষতা) কর্ম প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিলালিপি থেকে উন্নতমানের ছিল (আবদুর রহীম, সংগ্রাম, ২০১৫)। শিলালিপি খোদাই কর্মে জমিন খোদাই ও হরফ খোদাই পদ্ধতি দর্শনগত ও সৌন্দর্যগত দিক বিবেচনায় ভিন্ন হয়ে থাকে। যদি শুধুমাত্র তথ্য উপস্থাপন ও সংরক্ষণ এবং যে উপলক্ষে শিলালিপি করা হচ্ছে সেটা মুখ্য হয়, সেক্ষেত্রে হরফ খোদাই হয়ে থাকে। ধর্মীয় দিক বিবেচনা বা প্রচলিত খোদাই ব্যবস্থায় যদি হরফ খোদাই চালু থাকে, তাহলে জমিন খোদাইয়ের মত জটিল প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয় না। অন্যদিকে শিলালিপির লিপিকলাকে প্রাধান্য দেয়া, বিশ্বাসগত এবং খোদাইকারের ও গ্রাহকের চাহিদায় জমিন খোদাই প্রাধান্য পায়, সেক্ষেত্রে হরফ খোদাইয়ের মত সহজ পদ্ধতি পরিহার করা হয়। সুলতানি শিলালিপির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর প্রায় সবগুলো জমিন খোদাই করা হয়েছে। এতে লিপিকলার সবিশেষ কলাকৌশল ও নান্দনিক দিকটি বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আরবি-ফারসি হরফের ক্যালিগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য শিলালিপিতে প্রয়োগ করা এবং সেটা জমিন খোদাইয়ের মত অত্যন্ত জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করা; দক্ষতা, নৈপুণ্য ও সামগ্রিকভাবে সৌন্দর্য বিষয়ক জ্ঞান অতি উঁচু পর্যায়ের হওয়া ব্যতীত সম্ভব নয়। এজন্য বাংলার শিলালিপি ইমারত নকশার মূল অংশের অন্তর্ভূক্ত না হয়েও, খোদাই বিবেচনায় প্রতিটি খণ্ড এক একটি মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য হয়েছে। শৈল্পিক বিশ্লেষণ সুলতানি শিলালিপির উৎকীর্ণ কলাকৌশল এবং এর ক্যালিগ্রাফিক উপস্থাপন বিশ্লেষনের প্রধান দিকটি হচ্ছে শিল্প সৌন্দর্য। উৎকীর্ণ কলাকৌশল এবং ব্যবহৃত পদ্ধতি পূর্ববর্তী পাল ও সেন শাসনামলের প্রস্তর কর্তন বা শিলাখ- খোদাই শিল্প এবং সেটার তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক পদ্ধতি থেকে একে আলাদা ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। উপরের অংশে উৎকীর্ণ কলাকৌশল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে সুলতানি শিলালিপির ক্যালিগ্রাফিক বা লিপিকলা বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস থাকবে। তের শতকে তুর্কিদের দ্বারা বাংলা বিজয়ের পর থেকে মধ্য এশিয়ার ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্য বাংলার সাংস্কৃতিকভাবে উর্বর দেশে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তাদের উৎকর্ষিত ক্যালিগ্রাফি এবং শিলালিপি শিল্পও এ সুযোগ ভালভাবে গ্রহণ করেছে। বাংলার শিলালিপির ক্যালিগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আঙ্গিকগত এবং প্রয়োগ চরিত্রে মিশরের মামলুক সুলতানদের সময়ে উৎকীর্ণ শিলালিপির সাথে আশ্চর্য মিল রয়েছে। ধারণা করা হয়, সে সময়ে বাংলার সুলতানদের সাথে মিশরের মামলুক সুলতানদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিল্পকলা আদান-প্রদানের কুটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। বাংলার স্বাধীন সুলতান জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহের (মৃ. ১৪৩৩ ই.) সাথে মিশরের মামলুক সুলতান আশরাফ সাইফুদ্দিন বার্সবে’র (১৪২২-১৪৩৮ ই.) সরাসরি কুটনৈতিক সম্পর্কের কথা জানা যায় (Perween, London, 2007, p-15)। এ থেকে সুলতানি শিলালিপির ক্যালিগ্রাফিক বৈশিষ্ট্যের আন্তর্জাতিকতা প্রমাণিত হয়। পাথরে উৎকীর্ণ লিপির ক্যালিগ্রাফি এক প্রকার সৌন্দর্যময় ছন্দ ও মাধুর্যের সৃষ্টি করে এবং এতে নানা রকম অলঙ্কারিক মটিফ শিল্প ইতিহাস গবেষকদের শিল্প চর্চার পরিসরকে বিস্তৃত করে দেয়। ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে- সুন্দর হস্তলিখন বা লেখার শৈল্পিক নাম। সাগরের ক্রমাগত তরঙ্গমালার মত সৌন্দর্যময় এই লিখনের নান্দনিকতা শিল্প সমঝদারদের নয়নপটে প্রশান্তি এনে দেয়। সেমেটিক ভাষাগুলোর অন্যতম আরবি একটি প্রাচীন বর্ণমালা। এ বর্ণমালাকে সমস্ত ইউরোপীয় বর্ণমালার জননী হিসেবে বিবেচনা করা হয় (Hitti, London, 1989, p-71)। লিপিশিল্পীগণ আরবি বর্ণমালার হরফের আকৃতি ও গঠনকে ঠিক রেখে এর উপস্থাপনকে মোহনীয় করতে প্রতিটি হরফে ও শব্দে বিশেষ অলঙ্করণ ও সৌন্দর্য প্রয়োগ করেছেন। ধর্মীয় বিধি-নিষেধের কারণে প্রাণীচিত্র অঙ্কন বা উৎকীর্ণ করা গুনাহের কাজ ও নিষিদ্ধ হওয়ায়, বিপরীত দিকে লিপিশিল্প বিশেষ সুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে মুসলিম শাসকদের কাছে। লিপিশিল্পীরা একে সওয়াবের কাজ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফলে এটা ধর্মীয় শিল্প হিসেবেও সমাজে আলাদা মর্যাদা ও আদর-কদর লাভ করেছে। লিপিশিল্প মুসলিম দুনিয়ায় পৃথক একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকলা হিসেবে গড়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলার শিলালিপি শিল্প সৌন্দর্যে একটি বিশেষ স্থান ও মর্যাদা লাভ করেছে।  শিলালিপির লিপির উপস্থাপন ও প্রয়োগ কৌশল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুলতানি শিলালিপিতে উৎকীর্ণ ক্যালিগ্রাফির প্রধান-অপ্রধান শৈলি হিসেবে নাশখ, থুলুথ, মুহাক্কাক, রায়হানী, তাওকী, রিকাহ, বাহরি/বিহারী, গুবার ও তুগরা ব্যবহার করা হয়েছে (Yaqub, Hyderabad, 1994, p70)। সুলতানি শাসনামলের প্রথম দিকের দু’টি শিলালিপির ভাষা ফারসি হলেও উৎকীর্ণ লিপির স্টাইল ছিল আরবি। রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে রক্ষিত সুলতানগঞ্জ সেতু শিলালিপি (Karim, op. cit., pp-319-320) অপ্রচলিত তাওকি সদৃশ (উপরের দিকে) এবং তাওকি, থুলুথ ও নাস্তালিক (সম্মুখ দিকে) শৈলির মিশ্রিত রূপ বলে উল্লেখ করেছেন ড. সিদ্দিক (Mohammad, op. cit., pp-99-100)। এছাড়া তিনি একে প্রাচীন ইরানি নাশখ বলেও উল্লেখ করেন (ibid., p-78)।   ড. ইয়াকুব আলী একে রিকা শৈলি বলে উল্লেখ করেছেন (Yaqub, Dhaka, 1988, p-38)। গবেষকদ্বয়ের মত আংশিক সঠিক, তবে অধিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শিলালিপিদ্বয়ের প্রথমটিতে (উপরের দিকে দু’টি লাইনের ঘর থাকলেও একটি ঘরে লিপি উৎকীর্ণ করা হয়েছে) আরবি ভাষায় উৎকীর্ণ লিপিতে ব্যবহৃত ‘আলিফ ও লাম’ হরফদ্বয়ের গঠন ‘বাহরি শৈলি’র বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যান্য হরফ মুহাক্কাক শৈলির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখা যায়। এই শিলালিপির সম্মুখ দিকে তিন লাইন উৎকীর্ণ লিপি অধিক গোলায়িত এবং এর ‘কাফ’ হরফটির উড়ানি দিওয়ানী শৈলির বলে প্রতীয়মান হয়। ড. সিদ্দিক একে ফারসী সিকাস্তে শৈলির কাফে’র উড়ানি বলেছেন। কিন্তু সিকাস্তে শৈলিতে অনুরূপ উড়ানি নেই। তবে নুন হরফের গঠন ফারসি নাস্তালিক শৈলির কাছাকাছি দেখা যায়। সার্বিকভাবে এই তিন লাইনের ক্যালিগ্রাফি দিওয়ানী শৈলির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পৃথক হরফগুলো মুহাক্কাক শৈলির মত। সুলতানি শিলালিপির ২য়টি বলাকা খান খলজির শাসনামলে নওহাটা উৎকীর্ণ লিপি। এটির শৈলিকে তাওকি বলে উল্লেখ করেন ড. সিদ্দিক (Mohammad, op. cit., p-104)। অথচ এটির লিপিতে উৎকীর্ণ হরফের লম্ব দন্ডগুলো ও হরফের গোলায়িত অংশের প্রান্ত ক্রমশ মোটা হওয়ায় তা বাহরি শৈলির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। ৩য় শিলালিপিটি হদরত পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদের পশ্চিম দিকের মিহরাবের উপরে স্থাপিত উৎকীর্ণ লিপি (Karim, op. cit., p-89)। ড. করিম একে নাশখ ও তুগরা লিপির মিশ্রিত রূপ বলে উল্লেখ করেছেন (ibid., p-89)। ড. সিদ্দিক একে থুলুথ শৈলি বলে উল্লেখ করেছেন (Mohammad, op. cit., p-108)। একে থুলুথ আদি শৈলি হিসেবে প্রতীয়মান হয়। যেহেতু ড. সিদ্দিক শুধু থুলুথ বলেছেন, আরবি ক্যালিগ্রাফির পরিভাষায়, থুলুথ জালি (পুষ্টু ও বলিষ্ঠ থুলুথ) শৈলির বিষয়টি উল্লেখ করতে হয়, কিন্তু থুলুথ আদি (বনেদি থুলুথ) শৈলিতে শুধু থুলুথ উল্লেখ করলে তা গন্য হয়। সুতরাং ড. সিদ্দিকের মতটিকে সঠিক বলে ধরা যেতে পারে। ইসলামী তাহজিব-তমুদ্দুনে ক্যালিগ্রাফিকে শৈল্পিক ও নান্দনিক এবং সাংস্কৃতিক বার্তা বহণের একটি শক্তিশালী দৃশ্যমান ফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কখনও এটি স্থাপত্য অলঙ্করণে মূল ভূমিকা রেখেছে। যেমন- নিম দরোজা শিলালিপি (ibid., p-150)। এ শিলালিপিটি এমনভাবে করা হয়েছে (পাশে অলংকরনসহ), যাতে এটা পুরো স্থাপত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। এর উৎকীর্ণ লিপি সম্পর্কে ড. সিদ্দিক বলেন, এটি রায়হানী লিপি এবং থুলুথ লিপির সদৃশ। কিন্তু অধিক পযর্বেক্ষণে দেখা যায়, এলিপির খাড়া দন্ডগুলো (আলিফ-লাম-কাফ) বাহরি লিপি সদৃশ এবং গোলায়িত অংশ ও রা-ওয়াও-ক্বফ হরফের নি¤œভাগ মুহাক্কাক লিপির সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে সাবির্কভাবে এর সাজানো (কম্পোজিশন) ‘তুগরা আল-বাঙ্গালিয়া’ বলে প্রতীয়মান হয়। শিলালিপিটিতে ষোলটি ঘর করে, একটি ঘরে তুগরা এবং পরবর্তী ঘরে সাধারণ কম্পোজিশন, আবার তুগরা এবং পরবর্তী ঘরে সাধারণ কম্পোজিশন করে আটটি তুগরা ও আটটি সাধারণ কম্পোজিশন করা হয়েছে। উৎকীর্ণ লিপির চারপাশে তুর্কি ফুল-লতা-পাতার মটিফ ব্যবহার করা হয়েছে। তুগরা গুলির ভেতর পানিতে ভাসমান নৌকা, হাঁস, মাছ, চোখের আদলে হরফ সাজানো হয়েছে। এতে খাড়া রেখাগুলো সম ফাক রেখে এবং একই আকৃতি ও গঠনের করে স্থাপন করায় নান্দনিক সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। এই ধরণের খাড়া রেখার উৎকীর্ণ লিপি তুর্কি ওসমানীয় সালতানাতের স্থাপত্য ও মিশরের মামলুক সুলতানদের স্থাপত্যে প্রচুর সংখ্যায় বিদ্যমান। তবে খাড়া রেখাসমূহের ভেতরে বিভিন্ন চিত্র আদলে তুগরা ক্যালিগ্রাফি শুধুমাত্র বাংলার উৎকীর্ণলিপিতে দেখা যায়। অঞ্চল ভিত্তিক ক্যালিগ্রাফির উন্নয়ন ও উৎকর্ষতায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলা ভূখ-ে অসাধারণ উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়। ক্যালিগ্রাফির এই ব্যাপক কর্মতৎপরতায় একটি ঐক্যবদ্ধ সংহতি ও প্রবাহমানতা বাংলায় অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে। বাংলায় তুর্ক-আফগান বংশোদ্ভূত সুলতানগণ ব্যাপক পরিসরে মসজিদ, মাদ্রাসা, প্রাসাদ, দূর্গ, কেল্লা প্রভৃতি স্থাপত্য প্রকল্প নির্মাণের সাথে শিলালিপি দিয়ে অলংকরণ ও শোভিত করেছেন। এসমস্ত শিলালিপিতে উৎকীর্ণ শৈলিগুলো সম্পর্কে ড. সিদ্দিক বলেন, ক্যালিগ্রাফারগণ শিলালিপিতে তুগরা, থুলুথ, নাশখ, রিকা, রুকা, তাওকি, রায়হানী, মুহাক্কাক, বিহারি এবং ইযাযা প্রভৃতি শৈলিসমূহ প্রয়োগ করেছেন (ibid., p78)। ওয়াজির বেলডাঙ্গা শিলালিপি সম্পর্কে ড. সিদ্দিক বলেন, কোষাগার বিষয়ক এই শিলালিপির শৈলিটির নাম- মুসালসাল। এ শৈলিতে প্রতিটি হরফের শেষপ্রান্ত পরবর্তী হরফের সাথে যুক্ত হয়, এত প্রতিটি লাইন শেকলের মত অবিচ্ছিন্ন দেখায় এবং হরফগুলো পরস্পর সেলাইয়ের রূপ ধারন করে (ibid., p-79)। তিনি এ শৈলিটির বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই শিলালিপি উল্লেখ করেন। ড. ইয়াকুব আলী একে বিহার এবং মাকালি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কুফি ও নাশখের মাঝামাঝি শৈলি বলেছেন। সন্দেহ এড়াতে একে বিহার শৈলি গণ্য করতে মত দিয়েছেন (Yaqub, op. cit., pp33-37)। তার এ মতকে সমর্থন দেয়া যায় এবং এই উৎকীর্ণ লিপিটি নোকতা বিহীন বলে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে এটি মুসালসাল শৈলি হিসেবে মত দেয়া যায় না, কারন গভীর পযর্বেক্ষণে দেখা যায়, এটা কিছুটা সেলাইয়ের মতো হলেও হরফগুলোর শেষ প্রান্ত পরবর্তী হরফে মুসালসাল (এদহাম, জর্ডান, ১৯৯৮, পৃ-১৭৬) রীতিতে যুক্ত নয়।  বাংলায় প্রাপ্ত কুফি শৈলির একমাত্র উদাহরণ আদিনা মসজিদ শিলালিপি (Mohammad, op. cit., pp-111-112)।  মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবের উপরে অলংকৃত মটিফের মাঝে উৎকীর্ণ শিলালিপিটিতে নিচের ভাগে থুলুথ শৈলির ক্যালিগ্রাফি এবং উপর ভাগে থুলুথ শৈলির খাড়া দ-গুলোর ভেতর কুফি ওয়ারাকি (Foliated) ও কুফি জাহরায়ি (Floriated) শৈলিতে চমৎকার ক্যালিগ্রাফি উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এধরণের দু’টি শৈলির ক্যালিগ্রাফি একই পরিসরে উৎকীর্ণের উদাহরণ তুরস্কসহ মুসলিম বিশ্বের অনেক স্থানে বিদ্যমান। 

এছাড়া একই স্থানে  কুফি ও নাশখ, থুলুথ ও কুফি ওয়ারাকি শৈলিতে দিল্লির কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদে (Shafiqullah, Dhaka, 2012, p-197) এবং আলাদা প্যানেলে কুফি ও নাশখের উদাহরণ দিল্লীর সুলতান ঘোরির (১২৩১ ই.) স্থাপত্যে বিদ্যমান (ibid., p-199)। বাংলার অধিকাংশ শিলালিপি যেগুলোর শৈলিকে ড. শামসুদ্দিন এবং ড. আবদুল করিম নাশখ বলে উল্লেখ করেছেন, তার সাথে ভিন্নমত পোষণ করে ড. সিদ্দিক সেগুলোর বেশ কয়েকটিকে থুলুথ বলে উল্লেখ করেছেন। বারি(বড়ি অর্থাৎ বৃহৎ) দরগা শিলালিপি, দরসবাড়ি মাদ্রাসা-মসজিদ শিলালিপি এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত একটি স্মারক শিলালিপি থুলুথ শৈলির একটি চমতকার উদাহরণ (Mohammad, op. cit., pp-86-87)। স্থাপত্যে ব্যবহৃত এই শৈলির পুষ্টু ও বলিষ্ঠ প্রয়োগকে জালি থুলুথ বলা হয়। এধরণের শৈলির ব্যবহার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিরল। মুহাক্কাক শৈলি মূলত মধ্যযুগের প্রথম দিকে পবিত্র কুরআন লেখার কাজে ব্যবহার করা হত। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত একটি কবরগাহের শিলালিপি চমতকার মুহাক্কাক শৈলিতে উৎকীর্ণ করা হয়েছে (ibid., p-87)। এছাড়া হাতিমখান শিলালিপি (S. Ahmed, op. cit., p115) ড. শামসুদ্দিনের মতে, সুন্দর নাশখ শৈলি এবং ড. সিদ্দিক একে মুহাক্কাক বলেছেন (Mohammad, op. cit., p-87)। গভীর পযর্বেক্ষণে এটি মুহাক্কাক শৈলি বলে প্রতীয়মান হয়। এছাড়া ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত হুসাইন শাহী আমলের একটি সিকায়া (পানীয় পানির আধার) শিলালিপি মুহাক্কাক শৈলির চমৎকার উদাহরণ (ibid., p-87)।  জালাল উদ্দীন মাহমুদ শাহের আমলের সুলতানগঞ্জ শিলালিপিকে ড. ইয়াকুব আলী রিকা শৈলি এবং রুকন উদ্দীন বারবাক শাহের আমলে দেওতলা শিলালিপির উৎকীর্ণ লিপিকে গুবার শৈলি বলে উল্লেখ করেছেন (Yaqub, op. cit., p-7)। সুলতানি শিলালিপিতে নাস্তালিক শৈলির নমুনা না পাওয়া গেলেও শিকাস্তে নাস্তালিকের একটি নমুনা রাজমহলের গাজি ইবরাহিমের কবরগাহের শিলালিপিতে পাওয়া যায় (Mohammad, op. cit., p-92)।

 এটি অত্যন্ত পেচানো ধাঁচের জটিল শৈলি বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলার শিলালিপিতে সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঙ্গিকগত শৈলি হচ্ছে- তুগরা আল-বাঙ্গালিয়া। আরশানগর শিলালিপির লিপিশৈলি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি থুলুথ শৈলি। কিন্তু ফর্মের দিক দিয়ে এটি তুগরা আল-বাঙ্গালিয়া। এর ফর্ম দেখতে হবহু বাংলার চালাঘর সদৃশ (Yaqub, op. cit., pp-71-72)। অনুরূপভাবে সুলতানগঞ্জ মসজিদ শিলালিপিতে পানিতে ভাসমান হাঁস, নৌকা, তীরধনুক এবং ঢাল সদৃশ তুগরা আল-বাঙ্গালিয়া পরিলক্ষিত হয় (Mohammad, op. cit., p-93)। মধ্য এশিয়ার সেলযুক শাসনামলে তুগরার উদ্ভব হওয়ার পর স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এগারো অথবা বারো শতকে দক্ষিণ এশিয়ায় ক্যালিগ্রাফির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এ রূপটির বিস্তার ঘটে। এটি ক্যালিগ্রাফির অতি নান্দনিক ও সৌন্দর্যময় ধাঁচ। ধারণা করা হয়, রাজনৈতিক দ্বন্দ-সংঘাতের ডামাডোলে জান বাঁচাতে ক্যালিগ্রাফির বহু শিল্পী পালিয়ে এসে ভারত ও বাংলায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাঁদের অধিকাংশই অত্যন্ত উচুঁমানের শিল্পী ছিলেন এবং বিশেষকরে বাংলায় তুগরার অত্যাশ্চর্য সব ক্যালিগ্রাফি তারা করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলায় প্রাপ্ত প্রায় সবগুলো তুগরা শিল্পকর্মের সাথে সমসাময়িক মিসরের ‘মামলুক তুগরা’র অন্তরঙ্গ মিল দেখা যায় (ibid., p-88)। বিশেষ করে আলিফ-লাম-কাফ হরফের খাড়া দন্ডগুলোর প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য এ দু’সালতানাতের তুগরায় একই রকম। বাংলায় তুগরার ব্যবহার শিলালিপিতেই সীমাবদ্ধ বলে প্রতীয়মান হয় এবং বিশেষ করে তা হুসাইন শাহী আমলে পাওয়া যায়। 

তুগরা আল-বাঙ্গালিয়ার অন্যতম চিত্র বৈশিষ্ট্য একে মুসলিম দুনিয়ার অন্য তুগরা থেকে পৃথক করেছে এবং সেটা স্থুল কোন প্রাণীচিত্র বা ফিগারেটিভ অবয়ব নয়, বরং হরফের লম্বদ- এবং আনুভূমিক গোলায়িত রেখার এমন শৈল্পিক প্রয়োগ, যা দেখে দর্শক বিভিন্ন ধরণের অনূভূতির স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন। বাবরগ্রাম শিলালিপি হচ্ছে এর একটি সুন্দর উদাহরণ। ড. শামসুদ্দিন একে নাশখ-ই-তুগরা বলেছেন (S. Ahmed, op. cit., pp-156-157; pl-38) এবং ড. ইয়াকুব আলী একে আর্মি ব্যারাক সদৃশ তুগরা বলেছেন (Yaqub, op. cit., p-7)। এছাড়া একে গভীর সমুদ্রে তরঙ্গমালা ও যুদ্ধযাত্রার নৌবহর বলে ধারণা করা যায়।  

আলাউদ্দিন হুসাইন শাহের আমলে চম্পাতলী শিলালিপি আর্মি মার্চপাস্ট সদৃশ তুগরা বলে উল্লেখ করেছেন ড. ইয়াকুব আলী (ibid., p-7; pl-10)। এ শিলালিপিতে হরফের লম্বদ-গুলোর সম ফাক ও কাফ হরফের অবস্থান সৈন্যদের অস্ত্র কাঁধে মার্চপাস্টের মত দেখায়। এছাড়া একে বাশের বেড়ার মতোও বলে ধারণা হয়। বাংলায় প্রাপ্ত সুলতানি শিলালিপিতে তুগরা আল-বাঙ্গালিয়া শৈলিটি অনন্য শিল্প-সৌন্দর্যের আকর। এটি নিজস্ব স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে সুখ্যাতি লাভ করে এবং বিশ্বক্যালিগ্রাফিতে উচ্চ মর্যাদা ও স্থান অর্জন করে।

সুলতানি শিলালিপির ক্যালিগ্রাফিক চরিত্র-বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর শৈলি ও উৎকীর্ণ দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের। বিশেষ করে আরবি শৈলিগুলো  সমসাময়িক মুসলিম দুনিয়ার সমসাময়িক প্রচলিত শৈলির সাথে মানের দিক দিয়ে প্রায় সমপর্যায়ের এবং কোন ক্ষেত্রে বাংলার শিলালিপি উচ্চ মানের বলে প্রতীয়মান হয়। মধ্যযুগের বিশ্ব শিল্পকলায় আরবি লিপিশৈলি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। 

বিশেষ করে বাংলার সুলতানি শিলালিপি এ অঞ্চলে স্থাপত্য শিল্পে অলঙ্করণে একটি রেনেসাঁর সূচনা করেছে। বাংলার শিলালিপির ক্যালিগ্রাফিক শিল্প-সৌন্দর্য এ অঞ্চলের শিল্পচর্চায় বিপুল উদ্দীপনা ও জৌলুস বয়ে এনেছে।

 শিল্প-সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ করেছে বাংলার সংস্কৃতি। কিন্তু সুলতানি আমলের অবসান ও পরবর্তী শাসকদের উদাসীনতা ও অনাগ্রহ এ শিল্পকে ক্রমে স্থিয়মান করেছে। ধীরে ধীরে এ শিল্প পথ হারিয়ে কালের অতলে হারিয়ে গেছে। তবু শিল্প-সৌন্দর্যের উজ্জ্বল স্মৃতি হিসেবে সুলতানি শিলালিপি চির অম্লান, শাশ্বত ও ভাস্বর হয়ে থাকবে। আজও এসব শিলালিপির সংরক্ষিত খণ্ডগুলি কালের সাক্ষী হয়ে আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ