ঢাকা, মঙ্গলবার 12 February 2019, ৩০ মাঘ ১৪২৫, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পত্র সাহিত্য

 

এম হেফজুর রহমান:

কবিতা,

বহু দিনের বহু আঁকাবাঁকা পথ ঘুরে অবশেষে একদিন দেখা হলো তোমার সঙ্গে। সেটা ছিল একটা সাহিত্য সভা। তুমি কবিতা পড়ে এসে বসেছিলে আমার পাশে। তোমার ঠোঁটে লেগেছিল একটা মিষ্টি হাসি ঠিক যেন নীলকাশের নতুন চাঁদের মত। আমি তোমাকে দেখছিলাম। তোমার শরীর জুড়ে পেচিয়ে ছিল একটা নীলাকাশ রঙের শাড়ি। হঠাৎ তোমার চোখের দৃষ্টি আমার চোখে দৃষ্টির স্রোতের সঙ্গে মিশে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ। আমার মুখ থেকে কিভাবে যেন শব্দের তরঙ্গ বেরিয়ে গেল, কবিতাটি বেশ রোমান্টিক এবং হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার মত। তুমি অস্ফুট হাসি হাসলে নিঃশব্দে।

এরপর থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হতো। কথা হতো তোমার চোখের মর্মভেদী দৃষ্টি। আমার সংবেদনশীল হৃদয়ের পর্দাকে কাঁপিয়ে দিত। মনে হতো যেন দখিনা হাওয়ার শীতল পরশ। যেমন পরশে কাঁপে কাশফুল। দুড়ায় আতাফুলের সৌরভ। সম্মোহিত হয় হৃদয় আমার।

একদিন অনুভব করলাম তোমার হৃদয়-কম্পন আমার হৃদয় রাডারে আটকে পড়েছে। একটা মিষ্টি ভালবাসার সৌরভ ভুর ভুর করে ঘুরছে আমার চার পাশে।

সেদিনের কথা আজও ভুলতে পারি না। সময়টা তখন না সকাল, না দুপুর। বসে আছি তোমার সাজানো-গোছানো বসার ঘরে। তুমি এলে, সোফায় বসলে, ঠোঁটে সেই মনলোভা হাসি। তুমি কথার পর কথার মালা গেঁথে যাচ্ছো, আমি শুনছি অবাক বিস্ময়ে। তোমার জ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করেছে। মনে হলো এতো দিনে একজন বন্ধু পেয়েছি, যার কথার স্পর্শে আমার জীবনে জ্বেলে দেবে এক নতুন আলোর রওশনী। সে আলোয় পথ চলতে চলতে আমি পৌঁছে যাব আমার ইপ্সিত লক্ষ্যে। কন্টকাকীর্ণ পথে চলতে চলতে জীবনটা যখন রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল, মনে হতো এই বুঝি থেমে যাবো হৃদস্পন্দন। ঠিক তখনই পেলাম তোমার দেখা যেন একগুচ্ছ ডুমুরের ফুল এলো হাতে আমার। মনে হলো এমন একজন বন্ধুই খুঁজছিলাম আমি এতোদিন ধরে।

জীবনের আঁকাবাঁকা পথে চলতে গিয়ে বন্ধু যে পাইনি তা বললে মিথ্যে বলা হবে। তারপরও বলতে হয় তোমার মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম এক অন্যরকম অচেনা ফুলের গন্ধ এবং সৌন্দর্য্য যা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তোমার মধ্যে লক্ষ্য করেছিলাম অন্যরকম স্বতন্ত্রতা। অন্যরকম আমেজ। যে আমেজ মনে করিয়ে দেয় হাসনাহেনা ফুলের সৌরভকে। মনে হয়, গোলাপ যেমন একটি বিশেষ জাতের ফুল, তোমার মতো বন্ধু তেমনি একটি বিশেষ জাতের মানুষ। আর এ ধরনের কথা কবিরাই বলতে পারে। ভাবতে পারে। তাই বলা। তুমি কিছু মনে করো না। ভাবাবেগের উচ্ছ্বাসে এতো কথা লিখতে পারলাম।

সময় তো কারো জন্য বসে থাকে না। সে চলতেই থাকে আপন নিয়মে। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়ও তাই আজ অনেক দিন হয়ে গেল। বন্ধুত্বের সেতুটাও হলো মজবুত। শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার মিশেল ¯্রােতে সে বন্ধুত্ব আজও এগিয়ে চলেছে খাল বিল নদী পেরিয়ে সাগর থেকে মহাসাগরের দিকে। কখনও কখনও আমাদের মধ্যে নানা আলোচনায় চায়ের কাপে ঝড় উঠেছে। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। রাগের বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। তোমার চোখ দিয়ে মুক্তদানার মত অশ্রু ঝরেছে। দুটি হৃদয় আকাশে শ্রাবণের মেঘ জমেছে। সূর্য্যরে আলোটা নিভে গিয়ে এক নিকশ কালো অন্ধকারে আমাদের চারিদিককার পরিবেশ ভরে গিয়েছে। ভাবনার দিগন্তে তখন শুধু হাহাকার। সে কি মানসিক যন্ত্রণা। তারপরও আমাদের বন্ধুত্বের কি কোন ঘাটতি হয়েছে। না হতে পারে? তুমি তো আমার ভাল বন্ধু। আজও আমি তা বিশ্বাস করি। এ বিশ্বাস আমার থাকবে আমৃত্যু।

সেই কৈশোর বেলায় কবি নজরুল ইসলামের একটি কবিতা পড়েছিলাম। ‘আপনারে কভু ভেবো না ক্ষুদ্র ভাবিও না দীন তুমি। তুমি নিতে পার জয় করিয়া, এ বিপুল বিশ্বভূমি। তুমি সর্বশক্তি লভিয়া পূর্ণ হইতে পার।/ আমি ছোট এই ভাবো নিশি দিন। তাই সব কাজে হার।’ আজও কবিতাটি আমাকে নাড়া দেয়। এখান থেকেই শিক্ষা নিয়ে আমি পথ চলতে শুরু করি। আজও সে চলা থামেনি। আমি চিরকাল মনে করে এসেছি, বিশ্বাস হচ্ছে আত্মার খাদ্য। বিশ্বাস থেকে চিন্তা এবং চিন্তা থেকে কাজের উৎপত্তি।

তুমি ভালো করেই জান, আমি অকাট মূর্খ্য না হলেও মূর্খ্য তো বটেই। যদিও জ্ঞান লাভ করতে প্রতিনিয়তই সচেষ্ট। তারপরও বলতে হয়, কতটুকু জ্ঞানইবা আমি লাভ করেছি। আমার জ্ঞানের পরিধি খুব সীমিত। এতো কিছুর পরও তোমার মত একজন সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সাঁকো গড়ে উঠেছে, এ আমার সৌভাগ্য। সৌভাগ্যের আরও অনেক কারণ আছে। জীবনে অনেক উপহার বা গিফট পেয়েছি। কিন্তু তোমার কাছ থেকে যে গিফট বা উপহার সামগ্রী পেয়েছি তা অন্যসব উপহারকে মলিন করে দিয়েছে। আ এসব উপহার সামগ্রী তখনই পাওয়া যায় যখন তার সঙ্গে মিশেল থাকে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা। আমার তো আজ মনে হয়, জীবনে অনেক কিছু পাওয়র ছিল, পাইনি। কিন্তু যেটুকু পেয়েছি তাওবা কম কিসের, অন্তত: আমার মত মূর্খ্যরে জন্য। তোমার পাঠানো উপহার সামগ্রীর মধ্যে অন্তত: দু’একটি আছে যা প্রমাণ করে তুমি আমার জীবনে একজন ভাল বন্ধু হিসাবে আবির্ভুত হয়েছ এবং আমি আজও বিশ্বাস করি তা আমৃত্যু অটুট থাকবে, তা সে যতই আসুক বৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব।

আমাকে কেউ কেউ অহংকারী মনে কর, এমন কি তুমিও। হেনরী ফোর্ডের কথাটা স্মরণ করছি, তিনি বলেছেন, ‘কথায় কথায় নিজের বড়ত্ব জাহির করার অর্থ অন্যের কাছে নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন করা।’ এমন মানুষ যে আমাদের সমাজে নেই তা আমি বলবো না। তবে আমি অন্তত: সে দলের নই, এটুকু তোমাকে বলতে পারি। কারণ অহংকার করার মতো কিছুই আমার নেই, মূর্খ্য হলেও এতটুকু অন্তত: বোঝার মতো জ্ঞান আমার আছে। আর তা ছাড়া হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.) বলেছেন, “অহংকারী ও উদ্ধ্যত ব্যক্তিগণ কখনও বেহেশতে যেতে পারবে না।’ আমি বেহেশতে যেতে পারবো কি না, জানি না।  তবে আশা করতে দোষ কোথায়? ইমারসনের একটি কথাও এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। তাহলো- “কোন মানুষ তার গুণ সম্বন্ধে যত কমভাবে বা জানে, আমরা তাকে তত বেশি পছন্দ করি।’ আমি তো জানি, একাধিক মানুষ আমাকে পছন্দ করে। আর তুমি যে কর তা তো বলাই বাহুল্য। একদিন তুমিই আমাকে বলেছিলে, ‘তুমি ভালবাসার কেন্দ্রবিন্দু, ভালবাসার জন্ম দিয়ে থাকো আর সেই ভালবাসায় ভাসে মানুষ।’ আবার অনেকে বলে, আমার নাকি খুব রাগ। কথায় কথায় রেগে যাই। তোমারও হয়তো তাই মনে হয়। আমি শুধু জনৈক মনীষীর কথা উদ্ধৃত করবো, ‘রাগ করি গো। করি নাই রাগ। আমার যে পোড়া প্রাণে ভরা অনুরাগ।

কবিতা, আজ আমার হৃদয় সেতারে করুণ সুর বেজে চলেছে। যা আমাকে প্রতিনিয়ত বিচলিত করে, যেন কাল কেউটে বিষক্ত ছোবল মেরে আমাকে অন্য কোন অচেনা গ্রহে নিয়ে যেতে চায়। তারপরও আমি আশাহত নই। আশা আমার, অচিরেই হৃদয়- সেতারে তোমার আঙ্গুলের ছোঁয়ায় বেজে উঠবে মন ভোলানো রাগ-রাগিনী। আমার হৃদয়ে জেগে উঠবে সুখের তরঙ্গ। উঠবেই উঠবে। তোমার নীরবতা অনবরত আমার চোখে আনে বৃষ্টি। আমার কান্না তখন বৃষ্টি হয়ে ঝরতে থাকে মুক্তোদানার মতা। আমার এ চোখের বৃষ্টি থামানোর ক্ষমতা একমাত্র তোমারই আছে এবং তুমি তা করবে এ আমার বিশ্বাস। আর আমি জানি, আমার বিশ্বাসে আজও চিড় ধরেনি। আমি জানি তোমার আমার মধ্যে প্রেম আছে রাগ আছে, আছ অভিমান, আর আছে শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু বিষয়গুলো প্রবাহিত হয় মহাসাগরের গভীর তলদেশ থেকে। যা শুধু আমিই জানি, হয়তো বা তুমিও।

বিশ্বের সব বড় মাপের কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর জীবনেই প্রেম-ভালবাসার বিচিত্র উপখ্যান লক্ষ্য করা যায়।

কেউ দয়িতাকে পেয়ে সৃষ্টি করেছেন ভালাবাসার মহাকাব্য। কেউ বা হারিয়ে লিখেছেন করুণ রাগের অমর উপাখ্যান। এদের জীবনের মহৎসব শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির প্রেরণার উৎসই হয়ে আছেন তাদের দয়িতারা। ক্যানব্রাউন ছিলেন কিটসের, এসিলিয়ার জন্য শেলীর আমৃত্যু প্রতীক্ষা। বিয়ে ত্রেয়ীচের জন্য দান্তের অপেক্ষা। কৌলরিচ আজীবন বিভোর ছিলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থের বোন সারাহর প্রেমে। কিন্তু কোন দিনই তার সে প্রণয় সাফল্যের মুখ দেখেনি। রায়রণকে সৎবোণের সঙ্গে প্রেম করার কারণে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। সেরাকে ঘিরে বেড়ে উঠেছিল পেত্রকের প্রেমিক জীবন। এছাড়া চন্ডীদাসের রজনিকী, মাইকেলের হেনরিয়েটা, রবীন্দ্রনাথের কাদম্বরী ওকাম্পা; নজরুলের নার্গিস প্রমীলা এবং ফজিলাতুন্নেসার জন্য অপরিসীম একাগ্রতা। রানু সোম, উমাইমত্রদের কণ্ঠদানের ভেতর আপন সত্তা বিকাশের এক দুর্বিনীত ঝড় আর জাহানারার ভক্তি আকুলতার কাছে আত্মসমর্পণ। এ সব তো ইতিহাসেরই অংশ। কিন্তু তাই বলে তোমার কাছে লেখা আমার এ পত্রকে আবার প্রেম উপখ্যান মনে করো না। কারণ প্রেম উপখ্যান লিখতে গেলে গভীর জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় অন্তরদৃষ্টিরও। তুমি তো জান, আমার এ দু’টির কিছুই নেই। আমি যা করেছি তাকে বড় জোর বলা যায় শব্দের পরে শব্দের মালা গাঁথা। সে মালা সুন্দর অথবা অসুন্দর যাই হোক। আমি শুধু এই শব্দের কথা-মালা দিয়ে তোমাকে কিছু বলতে চেয়েছি, যার সব কিছুই আমার হৃদয় থেকে উৎসরিত।

সম্প্রতি তোমার লেখা চিঠির কিছু কিছু শব্দ আমার মনের পর্দায় মৃদু কাপনি জাগিয়েছে। আমি উদ্বেলিত হয়েছি। আবার কোন কোন চিঠির শব্দ মালা আমার হৃদয় তীর ভেঁজা পাখির মতো ছটফট করেছে। মুখের উপর আছড়ে পড়েছে সাগরের ঢেউ। তবু আমার আশা, একদিন আমাদের বন্ধুত্বের সাঁকোর উপর থেকে অমাবস্যার অন্ধকার সরে গিয়ে সেখানে ঝলমলিয়ে উঠবে ভোরের আলোর স্নিগ্ধতা।

কবিতা, দুঃখ কষ্টের নির্যস মাখা পথেই আমার জীবনের আনা-গোনা। তাই অভিজ্ঞতাটাও একেবারে কম নয়। যা আমি শিখেছি জীবনের পাঠশালা থেকে। সেই অভিজ্ঞতার আলোয় এক মনীষীর একটি উক্তি আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। শুনাই তোমাকে, ‘আমাদের প্রকৃত আশীর্বাদগুলো প্রায়শই যন্ত্রণা, ক্ষতি ও নৈরাশ্যের আকারে দেখা দেয় কিন্তু আমরা যদি ধৈর্য্য ধারণ করি, তবে আমরা শীঘ্রই সেগুলোকে তাদের সঠিক রূপে দেখতে পাব।’ দেশের অর্ধহার-অনাহার মানুষের কথা চিন্তা করে মনটা আমার তীরবিদ্ধ পাখির মতো ‘ছটফট করে’। 

তুমি জান, আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন যারা সমালোচনায় ভয় পায়। আবার অনেকে আছেন যারা সমালোচনাকে ভীষণ পছন্দ করে। এটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন সত্য, সমাজ এবং দেশের কথায়ও সত্য। তোমাকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ব্রিটেন আর আমেরিকা বন্ধু দেশ। কিন্তু তাদের টেলিভিশন এবং পত্রিকায় প্রকাশিত মন্তব্য দেখলে বোঝা যায় তারা পরস্পর পরস্পরের বহু নীতি ও কর্মের সমালোচনা করছে। কিন্তু সে জন্য আপত্তি অথবা অসন্তোষ দেখা যায় না। আবার উইনস্টন চার্চিলের সমালোচনার উপর ব্রিটেনে কোন বিধি-নিষেধ নেই। তদরূপ আমেরিকায় ওয়াশিংটনসহ সব প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করে তুলাধুনা করা হয়। ভারতের মিডিয়ায়ও গান্ধী জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধীসহ সব রাজনৈতিক নেতার সমালোচনাও স্বাভাবিক ব্যাপার। অবশ্য আমাদের দেশের চিত্র, এ ব্যাপারে ভিন্ন। তোমার কি কোন ভিন্ন মত আছে?

কবিতা, এবার তোমাকে একটি কবিতার অংশ শুনাবো, যদি বলতে পার কবিতাটির নাম কি এবং কার লেখা তাহলে তোমাকে পুরস্কৃত করবো। কবিতাটি হল: ‘... রাতর সব তারাই আছে। দিনের আলোর গভীরে।’ 

কিছু কিছু পরিচয় আছে যার আমেজ থাকে সারাজীবন। সেই যে রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুর বলেছেন, ‘তবুও আমার সব গান তোমাকেই লক্ষ্য করে।’ আর তা ছাড়া তুমি তো জান বিরোধ নয়, ভালবাসাই পারে সুখের পায়রা উড়িয়ে দিতে, পারে শান্তির সৌরভ পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিতে। তাই তো কবি বলেছেন, ‘পৃথিবীতে কি আর আছে ভালবাসা ছাড়া।’ নিশ্চয়ই তুমিও আমার এ শব্দাবলীর ¯্রােতে মিশে যাবে। কারণ তুমি-আমি এবং আমাদের মতো সবাই তো চায়, এ পৃথিবীতে ভালবাসার বীজ বপন করে বাসযোগ্য করতে।

আর হ্যাঁ, এতো দিন তোমাকে সে কথাটি বলবো বলবো করে বলা হয়নি আজ সে কথাটি তোমাকে বলতে চাই। গত দু’শ বছরের বেশি সময় ধরে প্রচুর ব্যাপকরণ গ্রন্থ রচিত হয়েছে কিন্তু তার একটিও বাঙলা ভাষার গতি প্রকৃতি বৈশিষ্টমন্ডিত নয়। সবই সংস্কৃতানুসারী। বাংলা ভাষারই নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরির জন্য রামমোহন রায় ও রবীন্দ্রনাথ থেকে পরবর্তীকালে অনেক বিজ্ঞজন হাহুতাশ করেছেন। ব্যাকরণবিদরা নিজেরাও বলেছেন, ‘বাঙলা ভাষায় খাঁটি ব্যাকরণ একখানিও নেই।

রবীন্দ্রপূর্ব ও পরবর্তী যুগের ব্যাকরণবিদরা বাংলা ব্যাকরণের ভিত্তি সংস্কৃত ব্যাকরণের উপর স্থাপন করেছিলেন। বাংলা ভাষা যে সংস্কৃত ভাষা থেকে আলাদা সেটা জানা সত্ত্বেও ব্যাকরণবিদরা ঐ নির্ভরতা থেকে সরে আসেননি এবং আজও হয়নি।

ব্যাকরণ সংস্কৃতিমূলক হইবে কেন? প্রশ্ন রেখে রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞজনের কাছে জানতে চান, সংস্কৃত শব্দের বাহুল্য বাংলা বেশি বলিয়াই ভাষার গঠনাদিও সংস্কৃতি ব্যাকরণানুসারে করতে হবে কেন? রবীন্দ্রনাথ ব্যাখ্যা করলেন যে, বাংলা ভাষার প্রকৃতি কাঠামো সংস্কৃত থেকে পুরোপুরি আলাদা।... ভাষা কখনই ব্যাকরণকে অনুসরণ করে না বরং ব্যাকরণই ভাষার নিত্যদিনের গতিকে লক্ষ্য করে নীতি-নিয়ম খুঁজে নেয়। দুঃখজনক হলেও চরম সত্য, যুগযুগ ধরে সংস্কৃতের ছাঁচেই রয়ে গেছে বাংলা ব্যাকরণ। সংস্কৃত ব্যাকরণের রূপ রেখা ধরে ব্যাকরণাবিদরা যে ব্যাকরণ রচনা করেছেন তাতে বাংলা ভাষা মুক্তি পায়নি।

বিশ শতকের গোড়ায় রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বাংলা ব্যাকরণকে সহজসাধ্য করে সংস্কৃত অনুশাসন মুক্ত করার জন্য শুদ্ধ বাংলা ব্যাকরণ রচিত হোক, সচেষ্টও হয়েছিলেন সে নিয়ে। ১৮৮৫ সালেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ  একখানিও প্রকাশিত হয় নাই।” (যুগান্তর, ১১-০৩-১১)।

তুমি তো তো জান, ৩ শে সেপ্টেম্বর আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের মৃত্যু দিবস। তার স্মরণে তারই দু’টি বাণী এখানে উল্লেখ করছিÑ

এক. আলোক-আধারে এই সংসার। আমার সাহিত্যিক জীবনের অন্ধকার দিক আছে। মুসলমানের ঘরে জন্মিয়া দেব ভাষা (সংস্কৃত) পড়িতে গিয়াছিলাম বলিয়া কৈশোরে একদিন হিন্দু সতীর্থদিগের কত টিটকারী আমাকে সহ্য করিতে হইয়াছিল। আজ আবার মনে পড়িতেছে, মুসলমান হইয়া হিন্দুর পুঁথি দেখিতে গিয়াছিলাম বলিয়া কত হিন্দু ভ্রাতা তীব্র অবজ্ঞায় আমার প্রতি বঙ্কিম চাহনি নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। খোদাতায়ালাকে ধন্যবাদ, তাহাদের সেই ঘৃণা ও শ্লেষ দুষ্ট বক্র দৃষ্টিতে ব্যাহত না হইয়া আমার সাহিত্যানুরাগ বরং বাড়িয়াই চলিয়াছিল।’

দুই. সাহিত্যের প্রধান উপকরণ মানুষ। মানুষের অন্তরে যিনি প্রবেশ করিতে পারেন তিনিই সাহিত্যিক, তিনি স্রাষ্টা। মানুষের অন্তরে প্রবেশের একমাত্র রাজপথ হইতেছে প্রেমের পথ। ভালোবাসা ও প্রীতির পথ। তাই সাহিত্যিকের প্রথম ও প্রধান ধর্ম হইতেছে, মানুষের প্রতি দরদ, ভালোবাসা-প্রাণঢালা ভালোবাসা। (এনডি, ৩০-০৯-১১)।

আজ শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং সারা বিশ্বে যে নৈতিকতাহীন কর্ম চলছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আল্লাহর গজব থেকে আমরা কেউ রক্ষা পাব না। এসো বিবেকবান সব মানুষ এক হয়ে নৈতিকতাহীন এই কালকেউটের ফনা থেকে রক্ষা পেতে ঢাল হিসাবে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করি এবং ধর্মীয় শিক্ষার দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ করি। ‘ফুল যদি সুন্দর হয়, তুমি তবে আরও সুন্দর।’ আজ থাক এ পর্যন্তই।-সুহৃদ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ