ঢাকা, মঙ্গলবার 12 February 2019, ৩০ মাঘ ১৪২৫, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পত্রিকার সাহিত্যপাতা ও নানাবিধ ভাবনা

তাজ ইসলাম:

একজন লেখক লিখেন মনের তাগিদে। লিখতে লিখতে এক সময় প্রকাশের ভাবনা পেয়ে বসে। বস্তুত আমরা মনে করি প্রকাশের জন্যই লিখা। প্রকাশের প্রথম স্তরটাই লেখা। লেখাটা থাকে মনে -মগজে, আবেগে- ভাবনায়। ভাবনাকে তিনি শব্দে পরিণত করেন। তারপর এটিকে প্রথমত তিনি লিখে প্রকাশ্য রূপ দেন। এই লেখাকে রূপ দিতে গিয়ে কেউ কেউ ডুব দেন ছড়া কবিতায়, কেউ মজে থাকেন গল্পের গভীরে, কেউ পারদর্শী হয়ে ওঠেন নাটক উপন্যাসে। আবার অনেকেই সব্যসাচী হয়ে যান লিখতে লিখতে। আবার একজনই হন বহুমাত্রিক। লেখালেখির এই সবই  প্রকাশের একেকটি আঙ্গিক। পরের স্তরটিকে বলব প্রকাশের ব্যাপ্তি ও বিস্তার। লেখক তার লেখাকে ছড়িয়ে দিতে নানা মাধ্যমের আশ্রয় নেন। বই তার একক সত্ত্বার প্রচার মাধ্যম। পত্রপত্রিকা বহুজনের সম্মিলিত মাধ্যম। বর্তমানে একজন লেখককে পাঠকের দরবারে হাজির করে দিতে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতার ভূমিকা অপরিসীম। দৈনিকের সাহিত্য পাতায় একজন লেখকের একটি লেখা প্রকাশের  মুহূর্তেই পাঠক পরিচিত হন একজন লেখক ও তার লেখার সাথে। কাজেই শিল্প ও শিল্পীর সহজতম প্রচার মাধ্যম হিসেবে সমাদৃত দৈনিকের সাহিত্য পাতা। সপ্তাহ শেষে লেখক, সাহিত্য রসিক পাঠক আগ্রহভরে অপেক্ষা করে এই পাতাটির জন্য। বাংলাদেশে অধিকাংশ পত্রিকাই শুক্রবারে তাদের সাহিত্যপাতা প্রকাশ করে। অনেকে একই দিন শিশু সাহিত্যের আয়োজনও করে থাকে। কোন কোন পত্রিকা আলাদা দিবসে দুটো পাতা বের করে। শিল্প সাহিত্যের জন্য ইহা একটি অতিব কল্যাণকর ধারা। এতে প্রবীণ, প্রথিতযশা লেখকদের পাশাপাশি অনেক নবীন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে। লেখকগণ উৎসাহিত হন। তবে শুধু দৈনিক নয় কোথাও লেখা ছাপা, এমনকি বই প্রকাশই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নহে। শ্রেষ্ঠত্ব যাচাই হবে লেখকের লেখার শিল্পগুণের বাছবিচারে। শিল্পগুণ নির্ণয়ের শর্ত হিসেবে থাকতে পারে সৃজনের অভিনবত্ব, চিন্তার উৎকর্ষতা, ভাবের গভীরতা, শব্দের বুনন নৈপুণ্য, উপমা উৎপ্রেক্ষার কারুকার্যময় উপস্থিতি। এসব দিক বিবেচনায় রেখে যদি একজন সম্পাদক তার সম্পাদিত পত্রিকায় কোন লেখকের লেখাকে স্থান দেন তাহলে একাধারে সম্পাদক পাবেন যোগ্যতমের অভিধা, পাঠক পাবেন একজন উত্তম শিল্পীর উত্তম একটি লেখার স্বাদ। আর তার সম্পাদিত কাগজটি ক্রমেই হয়ে ওঠবে একটি অনন্য কাগজের যোগ্যতম দৃষ্টান্ত। বস্তুত একজন সাহিত্য সেবকের ভূমিকা পালন করাই কাম্য একজন দায়িত্বশীলকে।

একটি দৈনিক পত্রিকার একজন সাহিত্য সম্পাদক লেখক তৈরী করা, লেখা আদায় করে নেয়া, তরুণ লেখককে উৎসাহিত করতে ভূমিকা রাখতে পারেন বিশেষভাবে। যদি তিনি আন্তরিক হন। গড়ে উঠতে পারে তাকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক টিম। অবশ্য লেখক কেউ কাউকে তৈরী করে দিতে পারেন না। নিজেই নিজেকে গড়ে নিতে হয়। সম্পাদকের আন্তরিকতা ভাল ফসলের পরিচর্চাকারীর দায়িত্ব পালন করে থাকে মাত্র। লেখক লেখা সম্পন্ন করার পর প্রকাশের জায়গা খোঁজেন, প্রকাশের মাধ্যম খোঁজেন। প্রকাশিত লেখা লেখকের অন্তরকে উদ্বেলিত করে, উৎসাহিত করে, কাজে গতি সঞ্চার করে। নব উদ্যমে তিনি লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন। এমতাবস্থায় সাহিত্য সম্পাদকের একটি তাগাদা সৃষ্টির উল্লাসকে বেগবান করে অবশ্যই।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। হাতেগোনা দুয়েকজন বাদে অনেকের বিরুদ্ধেই খাড়া হয়ে আছে অভিযোগের আঙুল। যে কারণে একটি লিটলম্যাগ যেভাবে সাহিত্য আন্দোলনের মাত্রা পায় দৈনিকের বেলায় তা খুব বিরল। অথচ দৈনিকের সুযোগ লিটলম্যাগের থেকে আমরা মনে করি অনেক বেশী।

বর্তমান সময়ে খোদ রাজধানী থেকে বিপুল সংখ্যক দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। অধিকাংশের সাহিত্যমান হতাশাজনক। একজন সাহিত্য সম্পাদক যদি শিল্প সাহিত্যের স্বার্থে ব্যক্তি পরিচয়কে প্রাধান্য না দিয়ে, দল বা মতের দিকে নজর না দিয়ে, রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে নির্মোহভাবে লেখকের লেখাটিকেই বিবেচনায় রাখেন, এবং মানসম্মত একটি লেখা তার সম্পাদনায় প্রকাশ পায় তাহলেই শিল্পসাহিত্যের প্রতি হবে সুবিচার। আস্থার প্রতীকে পরিণত হবে তার বিভাগ। পাঠক পাবে একটি ভাল লেখা পাঠের সুযোগ। লেখক নিজেও হবেন তুষ্ট। এভাবে সাহিত্য সম্পাদক করতে পারেন খেদমত শিল্পীর ও সৃষ্টির। অথচ অনেকের বেলায় দেখা যায় মুখ চিনা নীতিতে তিনি হাঁটছেন। আমরা এখানে কারো নাম উল্লেখ করে হাটে হাঁড়ি ভাঙতে ইচ্ছুক নই।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজনের প্রচ্ছন্ন কালো ছায়া দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতাতে ও পড়েছে মোটা দাগে। দেখা যায় একজন লেখকের লেখা একটি পত্রিকাতে প্রকাশিত হতে থাকলে ভিন্নমতের অন্য পত্রিকার সাহিত্য পাতায় তাকে অঘোষিতভাবে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়। এ ক্ষেত্রে লেখকের লেখার মানের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়নি। বিবেচনায় নেয়া হয় তার নাম। কখনো কখনো সাহিত্য সম্পাদক মালিক পক্ষের আরোপিত নীতির শিকলে বন্দী থাকেন, কখনো সাহিত্য সম্পাদক নিজের গরজেও এ অন্যায় কাজটি করেন। দৈনিক পত্রিকার অনেক সাহিত্য সম্পাদকের তেল নীতির কথা ঢাকার সাহিত্য সভাগুলোতে লেখক সমাজের মাঝে চলে কানাঘুষা। কেউ কেউ এমনো আছেন তিনি একই বৃক্ষের ছায়াতলে বেড়ে ওঠা সতীর্থদের লেখাও তার সম্পাদিত পাতায় স্থান দেন না কেবল তেল না মারার কারণে। তিনি সব কিছুকে উপেক্ষা করে কেবল যাদের দ্বারা নিজের কোন লাভ্যাংশের সম্ভাবনা আছে মনে করেন তাদের লেখাই ছাপেন। একজন শিক্ষাবিদ, কবি গবেষক তিনি। বহুগ্রন্থ প্রণেতা। তার লেখা দেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপে। স্বভাবজাতভাবে তিনি রাজধানী থেকে প্রকাশিত অন্য একটি পত্রিকায় লেখা পাঠালেন। সাহিত্য সম্পাদক ইচ্ছা করলে ছাপবেন, অথবা ছাপবেন না। এখানে দোষ খোঁজা সঙ্গত নয়।

কিন্তু সেই সম্পাদক যদি মেসেঞ্জারে লেখককে লিখেন আপনি বড় লেখক, আপনার লেখা সব পত্রিকায় ছাপে আমাদের মত ছোট কাগজে আপনার মত বড় লেখকের লেখা পাঠানোর কি দরকার? অথবা বলেন আমরা এই এই পত্রিকায় যারা লিখে তাদের লিখা ছাপি না! এই কথাগুলো পাঠক দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারেন। তবে কথাগুলো ভোক্তভূগী লেখকের স্বীকারুক্তির সারসংক্ষেপও বটে। এখানে নাম উল্লেখ করলে সম্পাদকের যেমন হীন মানসিকতা নগ্ন হয়ে যাবে লেখকের গোপনীয়তাও প্রকাশ হয়ে যায়। তাই কারো নাম উল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম সচেতনভাবেই।

একজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে যখন লেখক সমাজের বিশাল একটা অংশের অভিযোগ অব্যাহত থাকে তখন তার সততা প্রশ্নবিদ্ধ মনে করাই স্বাভাবিক। বিশাল এই লেখক গোষ্ঠির সকলের লেখাই তার সম্পাদিত পাতায় ছাপার অযোগ্য এটি ভাবাও সহজ নয়। স্বভাবতই সামনে চলে আসে সুবিধাবাদ, স্বজনপ্রীতি, স্বার্থসিদ্ধি, রাজনীতির কালো ছায়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে। সম্পাদকের এহেন কার্যকলাপে ক্রমান্বয়ে সাহিত্যিক সমাজে পাতাটি মর্যাদাচ্যুত হয়। আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন কোন লেখক তখন অভিমানে ঐ পত্রিকার সাহিত্যপাতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়।

এতসব কথার শেষে একজন পাঠক বা শিল্পসমজদারের প্রত্যাশা লেখা প্রকাশের একমাত্র মাপকাটি হওয়া চাই শিল্পগুণ। মুখ চিনা নীতি, রাজনৈতিক পরিচয়, দলবাজি, লবিং, আদর্শ বা চেতনার দোহাই, বা আরো যত অনিয়মের অলিগলি আছে তা পরিহার করে কেবল লেখাকে মূল্যায়ন করা হোক শিল্পের নিক্তিতে, এবং প্রকাশ হোক একটি উত্তম লেখা। তবেই হবে সাহিত্যের প্রতি সুবিচার। একথা স্পষ্ট, জোর করে যেমন লেখক বানানো যায় না; ছাই দিয়ে তেমনই আগুনও ঢেকে রাখা যায় না। কোন পত্রিকায় কোন লেখকের লেখা ছাপা হোক বা না হোক তার ভিতরে সৃষ্টির আগুন থাকলে কোন না কোনভাবে সে চতুর্দিকে ছড়াবেই।

নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে বলতে হয় সমগ্র বাংলাদেশে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অসংখ্য পত্রপত্রিকার জোয়ারে শিল্প সাহিত্যের বাজারে লেখকের সয়লাব হয়েছে বটে। কাংক্সিক্ষত মানের  লেখার সমৃদ্ধি ঘটেনি আশানুরূপ। গুটিকয়েক পত্রিকা মানের প্রশ্নে আপোষহীন। তারা প্রশংসনীয়ভাবে শিল্পের মান ধরে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের বিচার্য লেখার মান, দল বা গোষ্ঠি নয়। একটি ভাল লেখা অকৃপণভাবে ছেপে দেন তাদের পাতায়। দলমত নির্বিশেষে সবার লেখাই ছাপেন। তারা কেবল মূল্যায়ন করেন লেখকের লেখার, অন্য পরিচয় তাদের কাছে গৌণ। এটিই হওয়া উচিৎ বলে মনে করি আমরা। এটিই সাহিত্যের জন্য কল্যাণকর। প্রতিটি দৈনিকের সাহিত্যপাতা হোক লেখক মহলের আস্থার, প্রেরণার, প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। সাহিত্য সম্পাদক হোন অভিভাবক তুল্য এই কামনা অন্তত তারুণ্যের দাবী। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ