ঢাকা, বুধবার 13 February 2019, ১ ফাল্গুন ১৪২৫, ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রসঙ্গ : আইনস্টাইন ও নিউটনের আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান ভারতীয় বিজ্ঞানীদের

আবু মহি মুসা : ০৮ জানুয়ারী, ২০১৯ তারিখ দৈনিক কালের ছবি পত্রিকায় ‘আইনস্টাইন ও নিউটন এর আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান ভারতীয় বিজ্ঞানীদের শিরোনামে আন্তর্জাতিক পাতায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় কয়েকজন বিজ্ঞানীদের দাবি, ওই দুইজন বিজ্ঞানী বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বার্ষিক বিজ্ঞান সম্মেলন উদ্বোধন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে ওই বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, হিন্দু ধর্মীয় মহাকাব্য রামায়ণে বর্ণিত রাজ্য রাবণের ২৪ রকম বিমান ছিল। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জি. নাগেশ্বর রাও দাবি করেন, ভারতে কয়েক হাজার বছর আগেই স্টেম সেলের গবেষণা ছিল। সম্মেলনে উপস্থিত থাকা তামিল নাড়ুর আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী দাবি করেন, আইজাক নিউটন ও আলবার্ট আইনস্টাইন উভয়েই ছিলেন ভুল। তিনি বলেন, প্রাভিটেশনাল ওয়েভের নাম হওয়া উচিত ‘নরেন্দ্র মোদি ওয়েভস’। নিউটন অভিকর্ষ শক্তি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। আইনস্টাইনের তত্ত্ব বিভ্রান্তিকর। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রাচীন ভারতের যেসব লেখনি পাওয়া গেছে তা এখনও পড়া হয় এবং তা থেকে আনন্দ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ইন্ডিয়ান সাইন্টিফিক কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক প্রেমেন্দু পি.শাথুর বলেন, আমরা তাদের বক্তব্যে সহমত নই। আমরা তাদের দাবি থেকে নিজেদের দূরে রাখছি।
গত বছর ভারতের শিক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সত্যপাল সিং ইঞ্জিনিয়ারিং পুরস্কার বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিমানের কথা প্রথম উল্লেখ করা হয়েছে হিন্দুদের প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণে। তিনি আরো দাবি করেন, রাইটব্রাদার্স আবিষ্কারের আট বছর আগেই প্রথম কার্যকর বিমান আবিষ্কার করেছিলেন একজন ভারতীয় নাগরিক। তার নাম শিবাকর বাবুজি তালপাড়ে।
২০১৪ সালে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসক ও মেডিকেল স্টাফদের এক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি সেখানে হিন্দুদের দেবতা গণেশের কাহিনী তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, গণেশের মাথা হলো হাতির। আর তা যুক্ত হয়ে আছে মানবীয় শরীরের সঙ্গে। এতে প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীন ভারতে কসমেটিক সার্জারির প্রচলন ছিল।
এখানে যে কজন বিজ্ঞানী নিউটন এবং আইনস্টাইনের তত্ত্বকে অস্বীকার করে বলেছেন যে নিউটন এবং আইনস্টাইন উভয়েই ছিল ভুল। আমি তাদের উদ্দেশ্যে এখানে একটি প্রশ্ন করতে চাই, যে কজন বিজ্ঞানী ওই দুজন বিজ্ঞানীকে ভুল প্রমাণিত করেছেন এবং নিজেদের বিজ্ঞানী হিসেবে দাবি করছেন, তারা কি জানেন বিজ্ঞান কাকে বলে? কে দার্শনিক, এটা যেমন দর্শনের সংজ্ঞা বলবে, তেমনি কে বিজ্ঞানী এটা বিজ্ঞানের সংজ্ঞা বলবে। কোথায় সে সংজ্ঞা? আমাদের সভ্যতার দর্শন শুরু হয়েছে খ্রীস্টপূর্ব ৬ শতকে। আজ দুহাজার সাল। অর্থাৎ ছাব্বিশ শত বছরেও আমরা জানতে পারিনি বিজ্ঞান কাকে বলে। শুধু তাই নয়, ভাবগত কোন বিষয়ে আমরা জানতে পেরেছি? দর্শনের সংজ্ঞা পেয়েছি? প্রেমের সংজ্ঞা, দেশপ্রেমের সংজ্ঞা জানতে পেরেছি? বিজ্ঞানের সংজ্ঞাই যদি না পাওয়া যায়, তাহলে তারা নিজেদের বিজ্ঞানী হিসেবে দাবি করে আইনস্টাইন এবং নিউটনের সূত্র ভুল বললেন কিভাবে? বিজ্ঞানকে বলা হয়েছে বিশেষ জ্ঞান। আমি দর্শনকে বিশেষ জ্ঞান বলতে পারি। বিজ্ঞানের যে সংজ্ঞাটি পড়ানো হয়, তা হচ্ছে,  ‘কোনো বিষয়ের সুসংঘবদ্ধ জ্ঞানই হচ্ছে বিজ্ঞান।’ এটাকে সংজ্ঞা বলা যাবে? ভারতের ওই বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রাচীন ভারতের যেসব লেখনি পাওয়া গেছে তা এখনও পড়ানো হয় এবং তা থেকে আনন্দ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের যে সংজ্ঞাটি পাওয়া গেছে এটা সম্পূর্ণ ভুল। তারা এতদিন বিজ্ঞানের ভুল ব্যাখ্যা পড়ে কি খুব আনন্দ পেয়েছেন?
কোনো ভাবগত বিষয়ের সংজ্ঞা দেয়ার আগে জানতে হবে সংজ্ঞার সংজ্ঞা কাকে বলে। সংজ্ঞার সংজ্ঞা হচ্ছে। কোনো বিষয়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। তারপর যে বিষয়ে সংজ্ঞা দেয়া হবে তার মধ্যে কি কি বিষয় রয়েছে এটা বের করা। যেমন, ভালোবাসা একটি শব্দ। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে ৭টি বিষয়। যেমন, মানসিক আকর্ষণ, কল্যাণ কামনা, স্বার্থজ্ঞান, আবেগ, ইচ্ছা, অনুভুতি (প্রেম-ভালোবাসাঃ সৃষ্টি থেকে ধ্বংস, পৃষ্ঠা-২৫৩)। বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দেয়ার আগে জানতে হবে কি কি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দুটো বিষয় নিয়ে বিজ্ঞান। একটি জ্ঞান, অন্যটি বস্তু। জ্ঞান ছাড়া যেমন বিজ্ঞান হবে না, তেমনি বস্তু ছাড়াও বিজ্ঞান হবে না। যদিও অতীন্দ্রিয় বিজ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। রাইটব্রাদার্স বিমান আবিষ্কার করেছেন। এটা বিজ্ঞানীদের ব্যাপার। বিমান আবিষ্কারের জ্ঞান তারা কোথায় পেয়েছেন? বিশ্বপ্রকৃতিতে। আকাশে পাখি উড়তে দেখে। এটাকে বলা হয় সাংকেতিক ভাষা। তারা কোনো কালেই যদি আকাশে পাখি উড়তে না দেখতেন, তাহলে তাদের পক্ষে বিমান আবিষ্কার করা সম্ভব ছিল না। বিমান নির্মাণের বা আবিস্কারের নক্সা পেয়েছেন পাখির কাছ থেকে। এখন বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দেয়া সহজ। যেমন, “যে জ্ঞান সরাসরি বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত অথবা যে জ্ঞান বস্তুর মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করে সেটাই হচ্ছে বিজ্ঞান।’ এখানে যেমন জ্ঞান আছে, তেমনি বস্তুও আছে। বিজ্ঞানের সংজ্ঞা এবং দর্শনের সংজ্ঞা অনুযায়ী আইনস্টাইন এবং নিউটনকে কি বিজ্ঞানী বলা যাবে, এ বিষয়টির সুরাহা হওয়া প্রয়ােজন আগে।
দর্শনের উৎপত্তির পর দর্শন দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যেমন, ভাববাদ এবং বস্তুবাদ। তৃতীয় স্তরে দর্শন বিভক্ত হয়ে পড়ে চার ভাগে। যেমন, বস্তুবাদী জ্ঞান, ভাববাদী জ্ঞান, ধর্মীয় জ্ঞান এবং দার্শনিক সাধারণ জ্ঞান। এই চারটি দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়কে বিচার করা যাবে। কিন্তু মতবাদ দেয়ার ক্ষেত্র হচ্ছে তিনটি বস্তুবাদী ক্ষেত্র, ভাববাদী ক্ষেত্র এবং ংুহঃযবঃরপ ঃবৎৎধরহ বা মিশ্র ক্ষেত্র। বস্তুবাদী এবং ভাববাদীদের মধ্যে কেননা বিরোধ নেই। তাদের দুজনের পথ এবং মত সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু মিশ্রক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা দেবেন প্রমাণ, দার্শনিকরা দেবেন যুক্তি। প্রমাণ এবং যুক্তি এক হতে হবে। মিশ্রক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা ৯০ ভাগ প্রমাণের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন বিবর্তনবাদ। ডারউইন বিবর্তনবাদে অনেক প্রমাণের কথা উল্লেখ করে বলেছেন মানুষের পূর্বপুরুষ ছিল প্রাইমেট। আর একদল বিজ্ঞানী বলেছেন মানুষের পূর্বপুরুষ ছিল শিম্পাঞ্জি। কতটা যুক্তি চান যে মানুষ মানুষ আকৃতিতে সৃষ্টি হয়েছে (মানুষ সৃষ্টি ঃ  সৃষ্টি থেকে ধ্বংস, পৃষ্ঠা-৬৭)। কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, মিশ্রক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা যতগুলো বিষয়ে মতবাদ দিয়েছেন, যেমন বিগ ব্যাং, ব্লাক হোল, বিশ্বের সম্প্রসারণ, পৃথিবী ধ্বংস, সময়, সবগুলো মতবাদ যুক্তিহীন ভিত্তিহীন।
মাধ্যাকর্ষণের আবিষ্কারের বিষয়টি কোন ক্ষেত্রের এটা ভারতের ওই বিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন? মাধ্যাকর্ষণের সূত্র এবং আপেক্ষিক তত্ত্ব, এগুলো হচ্ছে মিত্রক্ষেত্রের। মাধ্যাকর্ষণের সূত্র আবিষ্কারের সাংকেতিক ভাষা ছিল আপেল পড়া। আপেলটা নিচে না পড়ে উপরের দিকে গেল না কেন? ম্যাগনেটিক আকর্ষণের ফলেই আপেলটা নিচের দিকে পড়েছে। যেটাকে বলা হয়েছে ‘মাধ্যাকর্ষণ। এই মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে আপেলটা কখনোই নিচে পড়ত না। এটা কি ভুল? মিশ্রক্ষেত্রে দার্শনিকরা যখন মতবাদ দেবেন, তখন তাদের বিজ্ঞানী বলা যাবে না। তেমনি মিশ্রক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা যখন মতবাদ দেবেন তখন তাদেরকে দার্শনিক বলা যাবে না। নিউটন যদি জ্ঞান এবং বস্তুর দ্বারা কিছু সৃষ্টি বা আবিষ্কার করে থাকেন, তখনই তাকে বলতে হবে তিনি বিজ্ঞানী। কিন্তু মিশ্র ক্ষেত্রে যার মতবাদ সঠিক হবে. তার পূর্ব পরিচয়ে তিনি পরিচিত হবেন। ভারতের ওই বিজ্ঞানীরা কিভাবে বললেন, নিউটন এবং আইনস্টাইনের মতবাদ ভুল? কোন মতবাদকে তারা ভুল বলেছেন?
বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, হিন্দু ধর্মীয় মহাকাব্য রামায়ণে বর্ণিত রাজ্য রাবণের ২৪ রকম বিমান ছিল। যে সব বিজ্ঞানীরা আইনস্টাইন এবং নিউটনের তত্ত্বকে ভুল বলেছেন, ভারতের ওই বিজ্ঞানীরা যদি স্বপ্নযোগে দাবি করেন পৃথিবীকে তারা সৃষ্টি করেছেন, তাতে অবাক হবার কিছুই থাকবে না। আমি বললাম, আমার ঠাকুর দাদার ২৪ হাজার বিমান ছিল। এটা খুঁজে দেখবে কে?
অন্য দিকে ভারতের শিক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সত্যপাল সিং দাবি করেন, রাইটব্রাদার্সের আবিষ্কারের আট বছর আগেই প্রথম কার্যকর বিমান আবিষ্কার করেছিলেন একজন ভারতীয় নাগরিক। তার নাম শিবাকর বাবুজি তালপেড়ে। শিবাকর বাবুজি তালপেড়ে কি স্বপ্নে বিমান আবিষ্কার করেছিলেন? নাকি বাস্তবে বিমান আবিস্কার করেছিলেন? রাইটব্রাদার্সের আগে যদি বিমান আবিস্কার করে থাকেন, এ দাবি এত দিন পরে কেন? সে বিমানগুলো কোথায় রাখা হয়েছিল? কোন কোন দেশের সাথে বিমান যোগাযোগ ছিল? এমন প্রশ্ন আসতে পারে।
আইনস্টাইন একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এভাবে, ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে কিনা জানি না তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে ইট পাথর লাঠি সোটা দিয়ে। এর অর্থ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো বৈজ্ঞানিকের প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে না। সে সময়ে এরকম একটা ভবিষ্যদ্বাণী করা, বুঝতে হবে তাঁর কতটা দূরদর্শীতা ছিল। এ শতাব্দীতে একটি বৈজ্ঞানিক বিপর্যয় ঘটবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ বিজ্ঞানের কোনো শেষ নেই যতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞান দিয়ে বিজ্ঞান ধ্বংস করা হয়।বরং তারা যদি বলতেন, স্টিফেন হকিংয়ের ‘বিগ ব্যাং থিওরী’ বোগাস তাহলে এটা মেনে নেয়া যেত। এটা যেমন ভুল। তেমনি স্টিফেন হকিংকে বিজ্ঞানী বা দার্শনিক কোনোটাই বলা যাবে না। কেন বলা যাবেনা? তার চারটি যুক্তি রয়েছে। প্রথম যুক্তি হচ্ছে, তার কোন জ্ঞান বস্তুর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল না। দ্বিতীয় যুক্তির কথা আগেই বলা হয়েছে। তৃতীয় যুক্তি জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের মন্তব্য পড়লেই বুঝা যাবে।
কবি নজরুল তার একটি কবিতায় বলেছেন, ‘বিশ্বজগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’ অমনি কবি ভক্তরা অনেকে দাবি করে বসলেন, মোবাইল ফোন সৃষ্টির ধারণা প্রথম নজরুল দিয়েছেন। রবীন্দ্র ঠাকুর সোনার তরী কবিতায় বলেছেন, ‘রাশি রাশি ভারা ভারা, ধান কাটা হলো সারা।’ তিনি হয়তো কোনো কৃষককে ধান কাটতে দেখে এ কবিতাটি লিখেছেন। বিষয়টিকে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অনেকে এটাকে আধ্যাত্মিকতার মধ্যে টেনে নিয়ে আসছেন। তারা কবে যেন বলে বসেন মহাভারত, বেদ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। একবার যদি কোনো অসত্যকে সত্য বানিয়ে পুস্তক লিখে যেতে পারেন, পঞ্চাশ বছর পরে কোনো গবেষক তার রেফারেন্স দিয়ে বলবেন, মহাভারত এবং বেদ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক। এটাই কিন্তু অনেকে মেনে নেবে। যেমন, রামায়ণে বর্ণিত রাজ্য রাবণের ২৪ রকম বিমান ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে ছিল কি?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গণেশের মাথা হলো হাতির। আর তা যুক্ত হয়ে আছে মানবীয় শরীরের সঙ্গে। এতে প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীন ভারতে কসমেটিক সার্জারির প্রচলন ছিল। এর মূল রহস্য কি? দুর্গার ছেলে গনেশ। গনেশের জন্ম হওয়ার পর গনেশের মামাকে দুর্গা বলেছিল ছেলেটাকে দেখার জন্য। গনেশের মামা শনিদেব বলেছিলেন যে, আমি ওকে দেখলে ওর অমঙ্গল হবে। তবুও বার বার বলার পরে শনিদেব দেখতে আসেন। দেখার পরই গনেশের ধড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গনেশও ছিলেন দেবতা। গনেশ তখনও জীবিত। এভাবে জীবিত থাকা যায় না। কাছে ছিল একটা হাতি। হাতির মাথাটা কেটে গনেশের মাথায় লাগিয়ে দিয়েছিল। আর এ কারণেই গনেশকে এ ভাবে পাওয়া গেছে। এবং গনেশেরও পুজা করা হয়।
বাস্তবে কেউ পেরেছেন, হাতির মাথা কেটে এনে মানুষের মাথায় লাগাতে? সে সময় কি বিজ্ঞান এত উন্নত ছিল? মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরানের সূরা নূরের ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে এই গ্রন্থের কিছু আয়াত আছে সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন, অন্য গুলো রূপক। অর্থাৎ কাল্পনিক। পরের আয়াতে বলা হয়েছে, যারা ফ্যাতনা সৃষ্টিকারী, নাস্তিক তারা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করেন। হিন্দু ধর্মে ‘গনেশ’ নামক যে প্রাণীর কথা বলা হয়েছে এটা ছিল তেমনি রূপক। এ দিয়ে কি দাবি করা যায় প্রাচীন ভারতে কসমেটিক সার্জারির প্রচলন ছিল? সে সময় কি তারা এতই জ্ঞানী ছিলেন? হিন্দু ধর্মে সতিদাহ প্রথা, এ প্রথাটা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগরের সময়ে রহিত হয়েছে। কসমেটিক সার্জারির প্রচলন যদি প্রাচীন কালে হয়ে থাকে, এবং জ্ঞান বিজ্ঞানে তারা যদি এতটা অগ্রগামী হয়ে থাকেন, তাহলে সতিদাহ প্রথার মতো এরকম একটি জঘন্য বিষয় রহিত হতে এতদিন সময় লাগলো কেন? তারা কয়েক হাজার বছর আগে কসমেটিক সার্জারির চিন্তা করতে পেরেছেন? এই জঘন্য বিষয়টিকে সাথে সাথে রহিত করতে পারলেন না কেন? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে যে বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো ভুল। সে ভুলগুলো কি তারা আজ পর্যন্ত শুধরাতে পেরেছেন? দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, পথিবীর ৯৯.৯৯ ভাগ মানুষের জ্ঞান হচ্ছে হাঁস, মুরগী পশু, পাখির জ্ঞানের চেয়েও কম (জ্ঞানের গতি ও প্রকৃতি, পৃষ্ঠা- ৭৩-৮১)। প্রতিবেদনে জানা যায়নি যে সব বিজ্ঞানীরা আইনস্টাইন এবং নিউটনের তত্ত্বকে ভুল বলেছেন, তারা জ্ঞান এবং বস্তুর মাধ্যমে কোন জিনিসটি আবিষ্কারের কারণে বিজ্ঞানী শব্দটি ধারণ করেছেন? যুগে যুগে ঐ সকল তথাকথিত বিজ্ঞানীরা মাঝে মাঝে বোগাস কথা বলে পৃথিবীর সব মানুষকে বোকা বানিয়ে রেখেছেন। যেমন, বোকা বানিয়ে রেখেছেন বিগ ব্যাং থিওরীর প্রবক্তা স্টিফেন হকিং। কাজেই নিউটন এবং আইনস্টাইন যে বক্তব্য দিয়েছেন, দূরদর্শিতার জন্য তাদেরকে স্যালুট জানাতে হয়।
ইন্ডিয়ান সাইন্টিফিক কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন এর সাধারণ সম্পাদক প্রেমেন্দু পি.শাথুর বলেন, ‘আমরা তাদের বক্তব্যে সহমত নই। আমরা তাদের দাবি থেকে নিজেদের দূরে রাখছি।’ ভারতের ওই তথাকথিত বিজ্ঞানীরা শূন্য মাঠে গোল দিয়ে বাহবা কুড়িয়ে নিয়েছেন, তাদের ওই বক্তব্যে শাথুর একমত নন, তার প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এ জন্য তাদরকেও সাধুবাদ জানাতে হয়।
লেখক : দার্শনিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ