ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 February 2019, ২ ফাল্গুন ১৪২৫, ৮ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কঠিন নিউজিল্যান্ড সফরে বাংলাদেশ

অরণ্য আলভী তন্ময় : বিশ্বকাপ শুরুর আগে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলার সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ। এবার সেই সুযোগটাকে কতটা কাজে লাগাতে পারবে সেটা নিয়েই এখন চলছে আলোচনা। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) খেলা শেষ হওয়ার আগেই নিউজিল্যান্ডগামী বিমানে চেপে বসতে হয় মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মমিনুল হক সৌরভ, সাব্বির আহমেদ রুম্মান, মোস্তাফিজুর রহমান, মেহেদি হাসান মিরাজসহ আট জনকে। বাকিরা ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-রংপুরের ফাইনালের পরদিন ৯ ফেব্রুয়ারি ত্যাগ করেছেন প্রিয় মাতৃভূমি। অনেক বছর পর একটি পূর্ণাঙ্গ সফরে কিউইদের দেশে গেছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের আগে এর চেয়ে বড় সিরিজ আর খেলার সুযোগ পাবেনা বাংলাদেশ। সে কারণে কোচ ষ্টিভ রোডস বলেছেন, এই সিরিজটা হবে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মান যাচাই করার জন্য। টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজের জন্য এরইমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে বাংলাদেশ দল। যেখানে সুযোগ পেয়েও হঠাৎ পড়া ইনজুরির কারণে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তাসকিন আহমেদকে। বিপিএলে ১২ ম্যাচে ২২ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোটা ছড়িয়েছেন জাতীয় দলের বাইরে থাকা এই পেস বোলার। তার জায়গায় সুযোগ পেয়েছেন শফিউল ইসলাম ও এবাদত হোসেন। এছাড়া যার দলে থাকা নিয়ে জন্ম হয়েছে বিতর্কের সেই সাব্বির রহমান এবার সুযোগকে কাজে লাগাতে মরিয়া বলে জানিয়েছেন। এদিকে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও চিটাগাং ভাইকিংসের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের বিশ্বাস, নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়ানডেতে সাফল্য পাবে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা খুব খারাপ। আগের সফরগুলোতে হার মেনেছিল প্রতিটি ম্যাচে। তবে এবার ওয়ানডেতে সাফল্য পেতে আশাবাদী মুশফিক।
২০০১ সালে প্রথম নিউজিল্যান্ড সফরে দুটি টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। সেবার ওয়ানডে ছিল না। ছয় বছর পর দ্বিতীয় সফরেও সাফল্য ধরা দেয়নি, দুই টেস্টে বিধ্বস্ত হওয়ার পর হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে। ২০১০ আর ২০১৬ সালে পরের দুই সফরেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। অতীতের ব্যর্থতা ভুলে এবার সাফল্যের প্রত্যাশা এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের। বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে নিউজিল্যান্ড সফর কাজে আসবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদেশের মাটিতে ভাল খেলার যে কথা অনেকদিন থেকে বলা হচ্ছে এবার সেটা প্রমাণের পালা বাংলাদেশের। এশিয়ার দলগুলোর জন্য নিউজিল্যান্ডের মাটি যেন সাক্ষাৎ জম। কারণ এখানকার বাউন্সি উইকেটে স্বাভাবিক খেলাটা খেলাই কষ্টসাধ্য হয়ে দাড়ায়। তবে সর্বশেষ দল হিসেবে ভারত বহু বছর পর ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে। এর আগে যদিও শ্রীলংকা পুরো সিরিজেই পরিচয় দিয়েছে ব্যর্থতার। সে হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সিরিজটা যে কঠিন হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে বাংলাদেশ ২১ ম্যাচ খেললেও জয় পায়নি একটিতেও। দেশের বাইরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স বরাবরের মতোই তলানিতে। ১৯৮৬ থেকে শুরু করে ২০১৮ পর্যন্ত বাংলাদেশ দেশের বাইরে ১৯৩ ম্যাচ খেলেছে। মাত্র ৪০ জয়ের বিপরীতে ১৪৬ ম্যাচে হেরেছে বাংলাদেশ। পরিসংখ্যানের বিচারে এ পারফরম্যান্স অনেক বেশি হতাশার। তবে আশার কথা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বিদেশের মাটিতে জিতছে দাপটের সঙ্গে। ম্যাচ জয়ের পাশাপাশি সিরিজ জয়ের রেকর্ডও আছে। গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে এবং টোয়েন্টি-২০ সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। এশিয়া কাপেও খেলেছিল দুর্দান্ত।
নিউজিল্যান্ড সফর দিয়ে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে শেষ নিউজিল্যান্ড সফর বাজে কেটেছিল বাংলাদেশের। টেস্ট, ওয়ানডে এবং টোয়েন্টি-২০ তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশ হয়েছিল হোয়াইটওয়াশ। এবার ইতিহাস বদলাতে চায় বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে জিততে চায় ওয়ানডে এবং টেস্ট ম্যাচ। টেস্টে জয় পাওয়া হবে চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু ওয়ানডেতে কোনোভাবেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না বাংলাদেশ। তবে কোচ স্টিভ রোডসের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। বাংলাদেশ কোথায় অবস্থান করছে নিউজিল্যান্ড সফর দিয়েই তা জানা যাবে বলে মনে করছেন কোচ রোডস। এই কোচের কাছে তাই এই সিরিজটার গুরুত্ব অনেক বেশি, ‘বলতে দ্বিধা নেই এশিয়ার দলগুলোর জন্য নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সাফল্য পাওয়া বেশ কঠিন একটি কাজ। সে কারণেই আমি বিশ্বাস করি এই সিরিজের ফল স্পষ্ট করবে আমরা বিশ্ব ক্রিকেটের কোথায় আছি। আশা করছি আমরা ওখানে কিছু ম্যাচ জিতব। খুবই খুশি হব যদি ওখানে কিছু ম্যাচ জিততে পারি। কাজটা খুব সহজ না। কিন্তু বিদেশে শেষ সফরে আমরা পেরেছিলাম। আমরা আমাদের খেলোয়াড় নিয়ে খুশি। সম্প্রতি তারা যে পারফরম্যান্স করেছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট। ওয়ানডেতে আমাদের পারফরম্যান্স সব থেকে ভালো। এটা নিয়ে আমরা গর্বিত। আশা করছি ওয়ানডেতে আমাদের সেরা পারফরম্যান্স বেরিয়ে আসবে। টেস্ট কঠিন হবে, কিন্তু অসম্ভব কিছু না। যেহেতু দেশের বাইরে খেলব আমাদেরকে ভারসাম্য আনতে হবে’। দেশের মাটিতে আট বছর আগে নিউজিল্যান্ডকে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাওয়াশ করার রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু বিদেশের মাটিতে এই রেকর্ড তো নয়ই উল্টো হতাশ হওয়ার মতো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে লাল সবুজ প্রতিনিধিরা।
সে কারণেই এবারের সিরিজে একটি জয়ের খোজ করছে মাশরাফি, সাকিবের দল। সফরকারী দলগুলোর জন্য নিউজিল্যান্ড কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। সেখানকার বিরূপ কন্ডিশনে বাংলাদেশ দলের চ্যালেঞ্জটা যেন আরও বেশি। পরিসংখ্যান অন্তত তেমনই বলে। সব ফরম্যাট মিলে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে এ পর্যন্ত ২১টি ম্যাচ খেলেছে টাইগাররা, যার মধ্যে জয় নেই একটিও। কোনো ম্যাচ ড্রও করতে পারেনি তারা, উল্টো হেরেছে প্রতিটিতেই। এবার হারের সেই ইতিহাস বদলানোর স্বপ্ন নিয়েই নিউজিল্যান্ডের পথে পা বাড়িয়েছে টাইগাররা। নিউজিল্যান্ডে ভালো খেলতে হলে আগে সেখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। কিন্তু বিপিএলের ব্যস্ততায় মানিয়ে নেয়ার সেই সময়টা পায়নি টাইগাররা। ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। বিষয়টা মাথায় রেখেই বিপিএল থেকে বাদ পড়া দলে জাতীয় দলের যারা ছিলেন, তাদের একটু আগেভাগেই পাঠিয়ে দেয়া হয় নিউজিল্যান্ডে। বিপিএলের কারণে দুভাগে উড়াল দেয়া ক্রিকেটারদের মধ্যে প্রথম ধাপে গেলেন মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সৌম্য সরকার, মুস্তাফিজুর রহমান, মেহেদী হাসান মিরাজ, সাব্বির রহমান, লিটন কুমার দাস আর নাঈম হাসান। তাদের সঙ্গে গেছেন প্রধান কোচ স্টিভ রোডস আর দলের নতুন ম্যানেজার খালেদ মাসুদ পাইলট। স্কোয়াডের বাকি সাত ক্রিকেটার- অধিনায়ক মাশরাফি বিন মতুর্জা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মোহাম্মদ মিঠুন, মোহাম্মদ সাইফউদিন, শফিউল ইসলাম আর রুবেল হোসেন নিউজিল্যান্ড রওনা হয়েছেন বিপিএল ফাইনালের একদিন পর। কোচের কাছে যেমন চ্যালেঞ্জ ঠিক তেমনি খেলোয়াড়দের কাছেও। ম্যানেজার খালেদ মাসুদ পাইলট এবার নজর দিয়েছেন প্রথম জয়ের দিকে। তবে এবারের সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়ে গেছে সাকিব আল হাসানের না থাকা। এর আগে ইনজুরিতে ছিটকে পড়েন তাসকিন আহমেদ।
ওয়ানডে স্কোয়াড : মাশরাফি বিন মর্তুজা (অধিনায়ক), সাকিব আল হাসান (সহ-অধিনায়ক), তামিম ইকবাল, লিটন দাস, সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহীম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মেহেদী হাসান মিরাজ, মোস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন, সাইফউদ্দিন, মোহাম্মদ মিঠুন, নাঈম হাসান, সাব্বির রহমান রুম্মন ও শফিউল ইসলাম।
টেস্ট স্কোয়াড : সাকিব আল হাসান (অধিনায়ক), মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (সহ-অধিনায়ক), তামিম ইকবাল, সাদমান ইসলাম, মুমিনুল হক, মোহাম্মদ মিঠুন, মুশফিকুর রহীম, লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, আবু জায়েদ রাহী, সৈয়দ খালেদ আহমেদ, নাঈম হাসান এবং এবাদত হোসেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ