ঢাকা, বৃহস্পতিবার 14 February 2019, ২ ফাল্গুন ১৪২৫, ৮ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নির্বাচনে কতটা পাল্টাবে দেশের হকি?

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : হকি যেন রীতিমতো ধুকছে? মাঠ ও মাঠের বাইরে কোথাও কোন সুখবর নেই। বর্তমানে প্রথম বিভাগ হকি লিগ মাঠে চললেও জাতীয় দলের সামনে কোন খেলা নেই। নির্বাচন নিয়ে দুটি পক্ষের যে অবস্থান ছিল তা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার পর থেকে আর আগের সেই ধারায় ফিরতে পারছেনা খেলাটি। এখন এডহক কমিটির এক বছর পার না হতেই দেশের হকি আবার নির্বাচনমুখী। আগামী মাসেই হতে পারে হকির নির্বাচন। ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাউন্সিলর তালিকা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে পাঠিয়ে নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চাইছে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন (বাহফে)। বর্তমানে হকি চলছে এডহক কমিটি দিয়ে। সাবেক তারকা আব্দুস সাদেককে সাধারণ সম্পাদক করে গত বছর জানুয়ারিতে এডহক কমিটি গঠন করে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এক বছর চলার পর তারা নির্বাচনমুখী। ফেডারেশন সম্পাদক আব্দুস সাদেক মনে করেন, ‘এডহক কমিটি দিয়ে সত্যিকার অর্থে সবকাজ করা যায়না। তবুও আমি চেষ্টা করে গেছি খেলাটির উন্নতিতে অবদান রাখতে। এ দেশের হকি সম্ভাবনাময় জায়গায় আছে। এটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যই নির্বাচনটা দরকার, যারা হকির জন্য ইতিবাচক তাদের খুব দরকার। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, নির্বাচনমুখী হওয়ার পর থেকেই কাউন্সিলরদের হুমকি-ধমকি শুরু হয়ে গেছে।’ এখনো কাউন্সিলর তালিকা পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। ফেডারেশন জেলা ও ক্লাবগুলোর কাছ থেকে কাউন্সিলর তালিকা চেয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৮৫ জনের একটি তালিকা ক্রীড়া পরিষদে জমা দিতে পারে হকি ফেডারেশন। নির্বাচনে সমমনাদের নিয়ে একটা প্যানেল এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। তার নেতৃত্বে আছেন আবাহনীর সংগঠক আব্দুস সাদেক, তাঁকে সাধারণ সম্পাদক করেই হকির উন্নয়নে একটি প্যানেল তৈরির চেষ্টা চলছে।
আর তাদের দিকেই ক্লাব এবং জেলার সমর্থন আছে বলে দাবি করেছেন আবাহনীর হকি কমিটির এক কর্মকর্তা, ‘আব্দুস সাদেক বর্ষীয়ান সংগঠক। সে কারণেই তার অভিজ্ঞতার উপর ভরসা রেখে ২৪টি ক্লাব এবং ৯০ শতাংশ জেলা আমাদের পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। তাদের নিয়েই আমরা হকির জন্য সুন্দর একটি কমিটি গঠন করতে চাই।’ হকিতে ক্লাব কাউন্সিলর থাকে ৩১ জন আর জেলার কাউন্সিলর ৪১। এ ছাড়া বিকেএসপি ও সংস্থার সাতজন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পাঁচজন, একজন আম্পায়ার বোর্ডের। এর মধ্যে আবাহনী সমর্থিত প্যানেলই শক্তিশালী, তাদের সঙ্গে মোহামেডানও থাকবে বলে শোনা যাচ্ছে। এই নির্বাচন নিয়ে গত জানুয়ারিতে আবাহনীতে অনুষ্ঠিত দুটি সভায় মোহামেডানের সমর্থন নিশ্চিত করেছে তারা।
তবে এই দলে নেই মেরিনার্স ও প্রথম বিভাগে নেমে যাওয়া ঊষা ক্রীড়াচক্র। তাই মেরিনার্সের হকি কমিটির চেয়ারম্যান এবং ফেডারেশনের বর্তমান সহ সভাপতি মোমিনুল হক সাঈদ আলাদাভাবে নির্বাচন করতে চাইছেন। চেষ্টা করছেন নতুন করে জোট গঠনের। সেই জোট কতখানি কী করতে পারবে বলা মুশকিল। কারণ আবাহনী সমর্থিত প্যানেল অনেক শক্তিশালী, তাদের পেছনে আছে ক্রীড়াঙ্গনের প্রভাবশালী সংগঠকরা। এই বিরুদ্ধ ¯্রােতে গিয়ে ২০১৭ সালে সাধারণ সম্পাদক হতে চেয়েছিলেন হকির আরেক সংগঠক আব্দুর রশিদ শিকদার। নির্বাচনের আগে এমন শোডাউন আর খাওয়াদাওয়ার মহোৎসব বসিয়েছিলেন, যা সবার চোখে পড়েছিল বিশেষভাবে। কিন্তু দেশব্যাপী বন্যার কারণে ২৭ আগস্টের সেই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে গিয়েছিল।
এরপর হয়েছে এশিয়া কাপ এবং এই টুর্নামেন্ট সফলভাবে শেষ করার পেছনে যার বড় ভূমিকা সেই নিবেদিত সংগঠক খাজা রহমতউল্লাহার দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হকির আকাশকে আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেয়। তাই নির্বাচন বাদ দিয়ে ২০১৭ সালে হকিতে হয়েছিল এডহক কমিটি। এক বছর বাদে তারা আবার নির্বাচন চাইছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য খুব শিগগিরই নির্বাচনী প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। সাধারণ সম্পাদক পদে এখন পর্যন্ত তিন জন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এরা হলেন- বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাদেক, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সভাপতি ও মেরিনার ইয়াংসের হকি কমিটির চেয়ারম্যান মমিনুল হক সাঈদ এবং উষা ক্রীড়া চক্রের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ শিকদার। আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সভাপতি মমিনুল হক সাঈদ জানিয়েছেন ‘হকিতে সৃষ্ট অচলাবস্তা নিরসনে আমি কাজ করতে চাই। এটি একটি সম্ভাবনাময় খেলা যেখানে দেশের মান জড়িত রয়েছে। আর সে কারণেই ক্লাব ও জেলার কাউন্সিলরদের সঙ্গে আলোচনা করে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ঠিক করবো আমরা।’ সর্বশেষ নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন আর এবারো প্রার্থী হওয়ার অপেক্ষায় থাকা আবদুর রশিদ শিকদার বলেন, ‘গতবার নির্বাচনের একটা পরিবশে ছিল আর এখন কি অবস্থায় আছে সেটি বলতে পারছিনা। আগে একটি কাউন্সিলর তালিকা ছিল। বর্তমান কাউন্সিলর তালিকা কতটুকু সঠিক হয় সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।’ হকিতে মূলত ক্লাব রাজনীতির বৃত্তে আবদ্ধ। আবাহনী ক্লাব তাদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায় হকিতে। এজন্য শোনা যাচ্ছে আবদুস সাদেককে পুনরায় সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী করার। প্রায় সত্তোর্ধ্ব বয়সে শারীরিক সমস্যা নিয়েও এই ক্লাবের চাপে তাকে দায়িত্বে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে মোহামেডান, মেরিনার্স ও উষা ক্রীড়া চক্র সমঝোতা করে সাঈদ কিংবা রশিদ শিকদারকে প্রার্থী করতে পারে বলে জানা গেছে। ২০১৭ সালে এশিয়া কাপের পর হকি ফেডারেশনের নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র গ্রহণ করলেও জমা দেয়ার পূর্বেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নির্বাচন স্থগিত করে।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন জাহিদ আহসান রাসেল। ক্রীড়াঙ্গনে গণতন্ত্রের চর্চার জন্য তিনি অ্যাডহক কমিটির পরিবর্তে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরুর ব্যবস্থা নিতে বলেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে। এরই প্রেক্ষিতে হকি ফেডারেশনের জন্য নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। হকি ফেডারশেনের অধীভুক্ত জেলা ক্রীড়া সংস্থা, ক্লাবকে কাউন্সিলরদের নাম পাঠাতে বলেছে ফেডারেশন। বাহফে আসন্ন নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে যাচ্ছেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক, বাহফে’র বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সহ-সভাপতি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলহাজ্ব এ, কে, এম মমিনুল হক সাঈদ। নতুন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর যেন সু-বাতাস বইতে শুরু করেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে গেল ৬ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রী পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পরের দিন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই রাসেল অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটি নিয়ে। ঘোষণা দেন অচিরেই ফেডারেশনগুলোর দায়িত্ব নেবে নির্বাচিত কমিটি। প্রতিমন্ত্রীর এ ঘোষণায় যেন নড়েচড়ে বসে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। এরই রেশ ধরে তারা গত ৮ জানুয়ারি ঘোষণা করে বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশন নির্বাচনের তফসিল। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় টেবিল টেনিস ফেডারেশনের নির্বাচন। তবে এটি নির্বাচন না বলে সমঝোতার কমিটি বললেও ভুল বলা হবেনা।
নির্বাচনে কি হকি পাল্টাবে নাকি আবারো গর্তে পড়বে সেটি এখনো বলা যাচ্ছেনা। খেলা থাকলে হকি যতটা আলোচনায় আসে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আলোচনা হয় নির্বাচন আসলে। হকিতে নির্বাচনই যেন সব। অথচ দেশের তৃতীয় বৃহত্তম এ ফেডারেশনে নির্বাচিত কমিটি নেই এক বছর ধরে। সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩০শে জুলাই। তার প্রায় ছয় মাস পর গত বছর ১১ জানুয়ারি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মেয়াদ শেষ হওয়া কমিটি বিলুপ্ত করে গঠন করে অ্যাডহক কমিটি। ১৩ মাস পরেই সেই হকিতে বইছে নির্বাচনী বাতাস। যেখানে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হচ্ছেন আবাহনীর কর্মকর্তা ও বর্তমান হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাদেক ও মোহামেডান বলয়ের মুমিনুল হক সাঈদ।
বাংলাদেশের হকি কীভাবে চলছে তা বোঝার জন্য একটা উদাহরণই যথেষ্ট। সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিগের খেলা, চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দল ঘোষণা এবং তাদের পুরস্কার দিতে লেগে গেছে ৮ মাস। সেই অনুষ্ঠান আবার বয়কট করেছে চ্যাম্পিয়ন মোহামেডানসহ বেশ কয়েকটি ক্লাব। আগের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন কমিটির দুই সহসভাপতি খাজা রহমতউল্লাহ ও আবদুর রশিদ শিকদার। রশিদ শিকদারের পাল্লা ভারী ছিল বলেই নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছিল বলে হকি অঙ্গনের অনেকের অভিযোগ। এর মধ্যে এশিয়া কাপের পর হঠাৎ মারা যান খাজা রহমতউল্লাহ। এবারের নির্বাচনে অবশ্য রশিদ শিকদার সাধারণ সম্পাদক পদে লড়বেন না বলেই শোনা যাচ্ছে। হকি ফেডারেশনের ভোটের রাজনীতিতে আবাহনীর জোট বেশ শক্তিশালী। বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাদেককে এ পদে রেখেই ভোটের লড়াইয়ে নামতে পারে আবাহনী জোট। আবদুস সাদেক নির্বাচন করলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি মোমিনুল হক সাঈদ। তিনি আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সভাপতি ও মেরিনার ইয়ার্স ক্লাবের হকি কর্মকর্তা। তাকে সমর্থন জোগাচ্ছেন আব্দুর রশীদ শিকদার। সে হিসেবে নির্বাচনের লড়াইটা যে বেশ জমজমাট হবে সেটা বলাই যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ