ঢাকা, শুক্রবার 15 February 2019, ৩ ফাল্গুন ১৪২৫, ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

করুণ অবস্থায় প্রমত্তা নদী পদ্মা

 

মাত্র চার দশক আগেও বাংলাদেশের প্রধান নদী যে পদ্মার এক কূল থেকে আরেক কূল দেখা যেতো না, তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ভয়ে মানুষ যে নদীর ধারেকাছে যাওয়ার সাহস পেতো না, সে প্রমত্তা পদ্মার দশাই এখন অতি শীর্ণ হয়ে পড়েছে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নদীর উৎসের দিকেই ভারত ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে বলে পদ্মায় পানির উচ্চতা কমে গেছে ১৮ মিটার পর্যন্ত। সেই সাথে নদীর প্রশস্ততা কমেছে ১০ কিলোমিটার। বেশ কয়েক বছর ধরেই শুকনো মওসুমে পদ্মা সরু খালে পরিণত হচ্ছে। 

দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে পদ্মার সর্বশেষ অবস্থার যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে তা দেখে যে কোনো সচেতন বাংলাদেশিকেই ক্ষুব্ধ, স্তম্ভিত এবং মর্মাহত হতে হবে।  কারণ, ছবিটিতে আর পদ্মা নদীকে চেনার উপায় নেই। পদ্মা সবদিক থেকে মৃত নদীর রূপ নিয়েছে, পরিণত হয়েছে অতি সরু একটি খালে। মাঝেমধ্যে এর সামান্য কিছু এলাকায় শুধু খালের মতো পানি রয়েছে। একযোগে বিস্তার ঘটেছে অসংখ্য চরের। পদ্মার দুই তীরে তো বটেই, মাঝখানেও এখন শত শত চর তৈরি হয়েছে। পদ্মার বুকজুড়ে এখন ফসলের চাষাবাদ হচ্ছে। একযোগে চলছে চর দখলের প্রতিযোগিতা। বহু পরিবার ওইসব চরে গিয়ে বাসাবাড়ি বানিয়ে বসবাস করতেও শুরু করেছে। 

প্রমত্তা পদ্মার এমন করুণ অবস্থার কারণ, বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই বহু বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। পরিণতিতে পদ্মাই শুধু নয়, এর শাখা-প্রশাখাসহ ৩৬টি নদ-নদীও শুকিয়ে গেছে। এগুলোর কোনো কোনোটিকে এমনকি খালও আর বলার উপায় নেই। চাষাবাদ তো করা হচ্ছেই, এসবের ওপর দিয়ে ভারি যানবাহনও চলাচল করছে। 

বলা দরকার, সবকিছুর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রতারণা ও পানি আগ্রাসন। ফারাক্কার পাশাপাশি নানা নামের অসংখ্য বাঁধ বা ব্যারাজ এবং ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। ফারাক্কা পয়েন্টের প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি চলে যাচ্ছে হুগলি ও ভাগিরথি নদীতে। একযোগে ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের প্রায় চারশটি পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। এছাড়া ১৩ হাজার ছয়শ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে তিনটি বৃহদাকার ক্যানেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে দেশটি। এই ক্যানেল তিনটিতেও পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের আগে গঙ্গার তথা বাংলাদেশের পদ্মার ৯০ শতাংশ পানিই অবৈধভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। এভাবে চলতে থাকলে ন্যায্য হিস্যা দূরে থাকুক, বাংলাদেশ এক সময় পানিই পাবে না। পদ্মাও হারিয়ে যাবে ইতিহাসের অন্ধকারে। 

কিন্তু সবকিছু জানা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার ভারতের কাছে প্রতিবাদ যেমন জানাচ্ছে না তেমনি চাপ দিচ্ছে না পানির ন্যায্য হিস্যার জন্যও। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই ভারত চুক্তি লংঘন করে চলেছে এবং বাংলাদেশকে তার ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। সে কারণে পদ্মার পাশাপাশি দেশের অন্য ৫৪টি নদ-নদীও শুকিয়ে গেছে।

পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় মাওয়া থেকে ক্যাওড়াকান্দি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথে যাতায়াতের সময় কয়েকটি পর্যন্ত স্থানে প্রতিদিনই যাত্রী ও যানবাহনসহ ফেরি আটকে পড়ছে। কয়েক ঘণ্টা লাগছে ড্রেজিং করে ফেরিগুলোকে আবারও চালু করতে। এ অবস্থায় পড়তে হচ্ছে খুলনা, বাগেরহাট, ফরিদপুর, মাদারিপুর, কুষ্টিয়া এবং বরিশালসহ বহু এলাকার মানুষকে, যারা মাওয়া-ক্যাওড়াকান্দি এবং নগরবাড়ি-দৌলতদিয়া হয়ে যাতায়াত করেন। সেই সাথে রয়েছে শত শত পণ্যবাহী যানবাহনও। 

এভাবে সব মিলিয়েই প্রমত্তা পদ্মা ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হতে চলেছে। একটি নদীর জন্য এর চাইতে করুণ পরিণতির কথা কল্পনা করা যায় না। উল্লেখ্য, এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, সে চুক্তিই ভারতকে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার সুযোগ দিয়েছিল। ফারাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতায় আসার শর্ত লংঘন করে ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার শুরু করে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি হুগলি নদীতে নিয়ে যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে ফিডার ক্যানেল চালু করার পর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মায় পানি প্রবাহ যেখানে ছিল ৬৫ হাজার কিউসেক সেখানে ১৯৭৬ সালে তার পরিমাণ নেমে আসে মাত্র ২৩ হাজার ২০০ কিউসেকে। 

পরবর্তীকালেও ভারতের এই পানি আগ্রাসন আরো মারাত্মক হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আরেক আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করলেও ভারত চুক্তি কেবল লংঘনই করেছে। সর্বনিম্ন পরিমাণ পানি পাওয়ার রেকর্ডও স্থাপিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের মার্চে। সে বছরের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ পেয়েছিল মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক। এমন অবস্থার কারণ, ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ না রাখার পরিপূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল ভারত। একই চুক্তির আড়াল নিয়ে ভারত এখনো শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করে চলেছে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৬৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে কৃষিরও। 

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী পানির হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করা। ভারত সম্মত না হলে সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক আইনে ভাটির দেশকে পানিপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা অপরাধ। কিন্তু ভারত শুধু বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্তই করছে না, বাংলাদেশকে পানি-প্রতিবন্ধী রাষ্ট্র বানানোরও পদক্ষেপ নিয়েছেÑ যা আন্তর্জাতিক আইনে এক গুরুতর অপরাধ। এজন্যই মামলা দায়েরের মাধ্যমে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা দরকার, যাতে পদ্মা একেবারে হারিয়ে না যায়। একই কথা সত্য অন্য ৫৪টি নদ-নদী সম্পর্কেও। কারণ, এসব নদ-নদীও ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার হয়ে ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হতে চলেছে। 

আমরা আশা করতে চাই, সরকার অনতিবিলম্বে চুক্তির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য তৎপর হয়ে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ