ঢাকা, শনিবার 16 February 2019, ৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কাউকা নদীর আকস্মিক মৃত্যু

কাউকা এক প্রবহমান নদীর নাম। আন্দেজ পর্বতমালায় এর উৎপত্তি। এরপর কলম্বিয়ার উর্বর ভূমির মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে যায় ক্যারিবীয় সাগর অবধি। নদীটি প্রায় এক হাজার সাড়ে তিনশ' কিলোমিটার দীর্ঘ। এক পর্যায়ে এটি ম্যাগডালেন নামক নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। উল্লেখ্য, কাউকা নদীর দীর্ঘ যাত্রাপথে রয়েছে অনেক হাইড্রোইলেক্ট্রিক বাঁধ। সম্প্রতি কাউকার এক জায়গায় বিরাট এক বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এ বাঁধ নির্মাণের সময় বড় একটা ত্রুটি দেখা দেয়। এর ফলে ভাটিতে আকস্মিক সৃষ্টি হয় বন্যা। এতে ঐ এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দা বাড়িঘর ফেলে পালাতে বাধ্য হন। কিন্তু এরপর যা ঘটে তা বেশ নাটকীয়। বহমান দীর্ঘ কাউকা যেন হঠাৎই অদৃশ্য হয়ে যায়। গত ডিসেম্বর থেকে চলতি ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই কাউকা এতোটাই শুকিয়ে যায় যে, স্থানীয় হাইড্রোলজিস্টরা এর পানিও মাপতে অক্ষম হয়ে পড়েন। মাত্র সপ্তাহ খানেকের মধ্যে প্রমত্তা কাউকা শুকিয়ে পাথর-কাদায় ভরাট হবার খবরটি সম্প্রতি সম্প্রচার করেছে বিবিসি।
কাউকার পানি ভিন্নখাতে নিতে প্রথমে তিনটি টানেল তৈরি করা হয়। পরে টানেলের কাছে বিরাট খাদ তৈরি হলে সমস্যা দেখা দেয়। শুরু হয় ভূমিধস। এতে টানেলের মুখ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে পানির চাপ বাড়তেই থাকে এবং জলাধার পুরোপুরি ভরাট হয়ে পড়ে। পানির প্রবল চাপে টানেলের মুখ হঠাৎ খুলে যায়। এর ওপর প্রবল বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। পরবর্তীতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও পলিভরাট হয়ে নদীটির আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। এখন পুরো নদীর মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণিও ছটফট করতে করতে মারা যাচ্ছে। অর্থাৎ পুরো অঞ্চলজুড়ে দেখা দিয়েছে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। এক সময়ের প্রমত্তা কাউকা নদী এখন পাথর আর কাদায় ভরাট। সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়াররা হতাশ। শঙ্কিত। কাউকা আর কখনও নাব্য হবে না।
নদী হচ্ছে প্রকৃতির নাসারন্ধ্র অথবা ফুসফুস। মানবদেহের নাসারন্ধ্র কিংবা ফুসফুস মরে গেলে মানুষ যেমন বাঁচে না, তেমনই নদী শুকিয়ে গেলে প্রকৃতিও বিপন্ন হয়ে পড়ে। কাউকা নদীর তীরবর্তী মানুষও নিদারুণ সংকটে। নদীতে বাঁধ, গ্রোয়েন ইত্যাদি নির্মাণ করে স্বাভাবিক জলস্রোত আটকে কিংবা অন্য স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করলে যেকোনও সময় তার জলধারা বিকল্প পথে ধাবিত হয়ে ঘটাতে পারে মারাত্মক বিপর্যয়। ধ্বংস করতে পারে জনপদের পর জনপদ। এমনকি মানুষের অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপে শুকিয়ে যেতে পারে কাউকার মতো প্রবহমান প্রমত্তা নদীও।
উল্লেখ্য, আমাদের অভিন্ন নদীসমূহের প্রায় সবগুলোতেই প্রতিবেশী বন্ধুদেশটিও বাঁধ, গ্রোয়েন নির্মাণ করে উজানের পানি একতরফা প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে প্রায় পানিশূন্য করতে বসেছে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইতোমধ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। পদ্মা, তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনাসহ ছোটবড় সবনদী শুকনো মওসুমে থাকছে প্রায় পানিশূন্য। বর্ষার সময় অধিক বৃষ্টিপাত হলে সমগ্রদেশ যাচ্ছে ভেসে। ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে পরিবেশ। ফসল উৎপাদন হচ্ছে ব্যাহত। গরমকালে বাড়ছে অস্বাভাবিক উষ্ণতা। শীতে হিমাঙ্কের কাছে নেমে আসছে তাপমাত্রাও। তাই মানুষের অসুখবিসুখ যাচ্ছে বেড়ে। গবাদি পশুপাখির জীবন পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়ছে। কখন জানি কাউকা নদীর তীরবর্তী মানুষের প্রতি যে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এসেছে, সেরকম কোনও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয় আমাদেরও। প্রতিবেশী বন্ধুদেশটি কি আমাদের দুর্ভাবনার কথা কখনও বিবেচনায় নেবে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ