ঢাকা, শনিবার 16 February 2019, ৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গোমূত্র একশ্রেণির স্বাস্থ্যকর পানীয়!

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ‘পঞ্চগব্য’ নামে একটি পুজো-উপাচারের নাম হয়তো অনেকেই জানেন। মুসলিমরা সবাই না জানলেও হিন্দুরাতো জানেনই। তবে যেসকল হিন্দু পুজোপার্বণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, তাঁদের জানা নাও থাকতে পারে। কেন না, সবহিন্দু ব্রাহ্মণ নন। আর ব্রাহ্মণ ব্যতীত অন্যদের পুজোপার্বণের অধিকারই নেই। তাছাড়া সবব্রাহ্মণও পুজো করতে পারেন না। তার কারণ হচ্ছে, নানা আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই পুজোর উপযুক্ত ব্রাহ্মণ হয়ে উঠতে হয়। এ ছাড়া ব্রাহ্মণের জায়া-কন্যারাও ব্রাহ্মণ্যত্ব লাভ করতে পারেন না।
হ্যাঁ, পঞ্চগব্য হচ্ছে: গোমূত্র, গোময়, দুগ্ধ, দই ও ঘৃতের মিশ্রণ। পঞ্চগব্য ব্যতীত কোনও পুজোর অনুষ্ঠান যেমন হয় না; তেমনই পবিত্রতাও সম্পন্ন করা যায় না। তাই পঞ্চগব্য হিন্দুদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র।
পঞ্চগব্যের দুধ, দধি ও ঘৃত নিশ্চয়ই স্বাস্থ্যকর ও উপাদেয়। এসবের সমন্বে প্রস্তুত প্রসাদগ্রহণে কোনও সমস্যা থাকবার কথা নয় ভক্তদের। কিন্তু প্রসাদে অনিবার্যভাবে গোমূত্র এবং গোময় বা গোবরের যদি সামান্য অংশও থাকে তাহলে কোনও রুচিবোধসম্পন্ন এবং বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের কাছে কি তা গ্রহণীয় হতে পারে? তবে বিষয়টি গোপন রাখা হয়। প্রসাদ প্রস্তুতকারক ব্যতীত ভক্তদের সকলের জানবার তেমন সুযোগই থাকে না। ঠাকুর যা দেন তা ভক্তিভরে গ্রহণেরই নিয়ম।
কলকাতার প্রাচীন বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা সম্প্রতি খবর দিয়েছে, কলকাতাসহ ভারতে দুধের চেয়ে গোমূত্রের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরুর দুধ প্রতি লিটার সর্বোচ্চ ৫০ রুপিতে বিক্রি হলেও গোমূত্র বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ রুপি করে। তাও ক্রাইসিস দেখা দেয়। এখন আরও বেশি দাম দিয়ে মধ্যপ্রদেশের নাগপুর থেকে গোমূত্র কলকাতায় আমদানি করতে হচ্ছে। ডিস্টিল্ড ও মেডিকেটেড গোমূত্রের দাম প্রতি লিটার ২০০-২৫০ থেকে ৩০০-৩৫০ রুপি পর্যন্ত ওঠানামা করে। পশ্চিম বঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে অনেক গোখামার গড়ে উঠছে মূত্রের চাহিদা পূরণের জন্য।
গোমূত্রের দাম বৃদ্ধির আরেকটা কারণ হচ্ছে, মূত্র ধরে রাখতে রাত অবধি রাখালকে জেগে থাকতে হয়। গরু কখন মূত্র ত্যাগ করবে তা বলা যায় না। আর খামারের গাভি দিনে ১০ থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত দুধ দিলেও মূত্র পাওয়া যায় ৫ থেকে ৭ লিটার। এ জন্য গরুর দুধের চেয়ে মূত্রের উৎপাদন খরচ বেশি। তাই মূত্রের মূল্যও অধিক পড়ছে। অন্যদিকে ভারতীয়দের মধ্যে গোমূত্র সেবনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এর ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে বলে প্রকাশ। খবরটি ঢাকার ইত্তেফাকেও ছাপা হয়েছে।
ব্যায়ামবিদ রামদেব একটি সফটড্রিংক বাজারজাত করেছেন। নাম 'গঙ্গাজল'। এটি কী জানেন? এর প্রধান উপাদান হচ্ছে গোমূত্র। এ গঙ্গাজল এখন ভারতের জনপ্রিয় পানীয়। প্রায় সব হোটেল-রেস্টুরেন্টে এ পানীয় পাওয়া যায়। আমরা যেমন পেপসি কোলা, সেভেন আপ, ফান্টা, মিরিন্ডা ইত্যাদি পান করি; ঠিক তেমনই গঙ্গাজল ভারতের সর্বত্র জনপ্রিয়। ভারত ভ্রমণকারী বাংলাদেশিরাও গঙ্গাজল গিলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন বলে জানা যায়। তবে পানীয়টি যে 'গোমূত্রজাত' তা অনেক বাংলাদেশিই জানেন না।
গোমূত্রের ব্যবসায়ী ও এর সেবকরা এর যতোই গুণকীর্তন করুন না কেন, বিজ্ঞানীরা এর ঘোরবিরোধী। উল্লেখ্য, একশ্রেণির ভারতীয় বিজ্ঞানী নাকি গোমূত্রের উপকারিতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু করে দিয়েছেন। তবে এখনও তা প্রমাণ করতে পারেননি। কিন্তু হুজুগপ্রিয় ভারতীয়রা গোমূত্র গিলতে গিলতে বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাই হু হু করে বাড়ছে ভারতব্যাপী গোমূত্রের মূল্য। অনেকে প্রচার করছেন এতে স্বর্ণ রয়েছে। তাই গোমূত্রের রঙ সোনালি। অবশ্য মানুষের মলও প্রায় স্বর্ণালি। তাই বলে এও কি আগামিতে কোনও ভারতীয় গ্রহণ শুরু করবেন?
বিশ্ব হিন্দুপরিষদ এবং আরএসএস এর পক্ষ থেকে গোমূত্র সামান্য পরিমাণ সেবনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ দুই সংগঠনের নেতাদের মতে গাভির টাটকা মূত্র সকালে খালিপেটে পান করলে ক্যানসারসহ দেড় শতাধিক রোগ থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে। কিন্তু এর পক্ষে কোনও বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ আছে বলে কেউ দাবি করতে পারেননি। তাঁরা আরও জানান, গোবরের সঙ্গে জল মেশালে তা উৎকৃষ্ট জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করবে। তাঁরা মোজাইকের মেঝে গোবর-জলের মিশ্রণ দিয়ে মোছার পরামর্শ দিয়েছেন।
আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দুপরিষদের পরামর্শ দেখে আমার মা-নানি এবং হিন্দু আত্মীয়াদের মাটির মেঝে এবং বারান্দা গোবর-জল-মাটির মিশ্রণ দিয়ে মোছার দৃশ্য মনে পড়ে গেল। এমন দৃশ্য আমি ছোটবেলা বহু প্রত্যক্ষ করেছি। এখন দেখছি ভারতের হিন্দু সংগঠনগুলো গোবর-জলের মিশ্রণ দিয়ে মোজাইক করা ফ্লোরও মোছার পরামর্শ দিচ্ছেন। --সূত্র: যুগান্তর, গুগল।
যাই হোক, গরু ভারতীয় হিন্দুদের কাছে দেবতা। দেবতার মল বা গোবর এবং মূত্রও দেবতুল্য। তাই গোবর ও গোমূত্র ওদের কাছে বর্জ্য বলে গণ্য হবে কেন? বরং গোবর্জ্য স্বাস্থ্যকর এবং উপাদেয় বস্তু। তাই তাঁরা তা ঔষধি গুণসম্পন্ন মনে করতেই পারেন। তবে গোবর এবং গোমূত্র  মুসলিমদের কাছে অপবিত্র। হারাম। এর সামান্য অংশ পরিধেয়তে লেগে থাকলে তা পরিধান করে সালাত আদায় করা যাবে না। তবে গরুর গোশত খেতে এবং দুগ্ধ পানে মুসলিমদের বাধা নেই।
তাঁদের কাছে দুধ ও বিফ স্বাস্থ্যপ্রদ ও উপাদেয় খাদ্য। অবশ্য শাস্ত্রমতে হিন্দুদেরও গোমাংস ভক্ষণে কোনও বাধা নেই। গরুর গোশত ভক্ষণের অপরাধে ভারতের অনেক মুসলিমকে কট্টরপন্থিরা হত্যা করলেও গোমাংস কিন্তু অনেক হিন্দু এমনকি ব্রাহ্মণরাও ভক্ষণ করেন। শুধু তাই নয়, ব্রাহ্মণদের অনেকে বিফ অর্থাৎ গরুর গোশত বিদেশে রফতানিও করেন।
ভারতীয়দের একটি বিরাট অংশ যদি গোমূত্র পানে পরিতৃপ্ত হন এবং সর্বরোগ থেকে মুক্তি পান, তাহলে এতো বড় বড় এবং ব্যয়বহুল হাসপাতালের প্রয়োজন কেন? এতো মেডিকেল কলেজ ও ভার্সিটিরইবা দরকার কী? গোবর  ও গোমূত্রবিশারদ আরএসএস এবং বিশ্ব হিন্দুপরিষদ নেতারা থাকতে এতো আয়োজন আসলেই দরকার নেই। গোবর-গোমূত্রে সামান্য শ্লোক পড়ে ফু-ফাঁ দিলেইতো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবার কথা।
যাহোক, ভারতীয় গোমূত্রের টান পড়লে আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দুপরিষদ নেতৃবৃন্দ আমাদের দেশ থেকে তা আমদানি করতে পারেন। এতে কিছুটা হলেও তাঁদের চাহিদা পূরণ হতে পারে। আর ওদের দুধ, দধি, ঘি সারপ্লাস হলে আমাদের দিতে পারেন। তবে তা অবশ্যই দূষণমুক্ত ও পবিত্রতার সঙ্গে প্রসেসকৃত হতে হবে। অবশ্য দুধ এমনই তরল বস্তু যে তাতে বিন্দুমাত্র গোবর বা গোমূত্রের ছিটা পড়লেও তা ফেটে বা বিনষ্ট হয়ে যায়। তাই আমরা দুধ আমদানি করলে দূষণমুক্তকরণসহ যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা করেই নেবো। কারণ মুসলিমরা শতভাগ হালাল ও পাকপবিত্র ছাড়া কোনও বস্তু গ্রহণ করতে পারেন না। বিশেষত খাদ্যবস্তুর ব্যাপারে অতি সতর্কতা অবলম্বন খুব জরুরি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ