ঢাকা, রোববার 17 February 2019, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পর্নোগ্রাফির কারণসমূহ : ক্ষতি এবং তার প্রতিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় স্যাটেলাইট, মোবাইল প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, সাইবার ক্যাফে এবং পর্ণো সিডির মাধ্যমে অশ্লীল ভিডিও ও স্থিরচিত্র ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে নারী-পুরুষের পারিবারিক জীবন বিভিন্ন প্রকার জটিল সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে কঠোর আইন ও তার যথাযথ প্রয়োগ থাকলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ক আইনের অনুপস্থিতি পর্ণোগ্রাফীর ভয়াবহতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে নারীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ ২০১২ নামে আইন প্রণয়ন করে। নতুন আইনে পর্ণোগ্রাফী সংক্রান্ত বিষয়গুলোর সংজ্ঞায়ন, তদন্ত পদ্ধতি, শাস্তির মেয়াদ এবং আপিল সংক্রান্ত বিষয়ে বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে পর্ণোগ্রাফী সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রদত্ত বিবৃতিতে আইনটি প্রণয়নের প্রাসঙ্গিকতা ফুটে উঠেছে। আলোচ্য প্রবন্ধে পর্ণোগ্রাফী-এর সংজ্ঞা, বাংলাদেশে পর্ণোগ্রাফী পরিস্থিতি, পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ আইন, পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণে ইসলামী নৈতিকতা, তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা এবং সুপারিশমালা স্থান পেয়েছে। পর্ণোগ্রাফী বলতে প্রকাশ্যে যৌনতা উৎপাদন ও প্রদর্শন করাকে বুঝায়। পাশ্চাত্য জগত স্বতন্ত্র শিল্পের দাবী নিয়ে প্রাপ্ত বয়স্কদের চিত্তবিনোদনের জন্য আইনের স্বীকৃতিসহ আবির্ভূত প্রকাশ্যে যৌনদৃশ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাত ও বিপণন করে। এটা সত্য যে, আদিকাল থেকেই নারী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্কের উপস্থাপন নানাভাবে হয়েছে। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা ও স্থাপত্যে নানাভাবে শিল্পসম্মত উপায়ে যৌনতা উপস্থাপিত হয়েছে। যৌনতার শিল্পসম্মত উপস্থাপন শিল্প, সাহিত্য ও জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু টেলিভিশন, ভিডিও ও ইন্টারনেট আবিস্কারের পর ‘প্রাপ্ত বয়স্কদের চিত্তবিনোদন’ বা মনোরঞ্জনের কথা বলে পর্ণো ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে পর্ণোগ্রাফীর বিপুল চাহিদা সৃষ্টির পাশাপাশি পর্ণো বাণিজ্যের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে এর পিছনে অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক কার্যকারিতাকে যৌক্তিকরূপে দৃশ্যমান করে তোলা হচ্ছে। অথচ সমাজের ওপর তার ফলাফল মারাত্মক নেতিবাচক। পর্ণোশিল্প শিশু, নারী-পুরুষ ও সমাজে বিষাক্ত দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে। শিশু পর্ণোগ্রাফী কোমলমতি শিশুদের সুন্দর মনকে অজ্ঞাতসারে বিষিয়ে তুলছে। পর্ণোগ্রাফীর ক্ষতিকর প্রভাবে ধর্ষণ, যৌন অপরাধ এবং পুরুষ-নারীর বিপথগামী আচরণ বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও অনেক দিন ধরে অশ্লীল ছবি ও চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী চলছে এবং মুঠোফোনের মাধ্যমে পর্ণোগ্রাফী ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ বাংলাদেশের সংস্কৃতি, প্রচলিত মূল্যবোধ ও ধর্মীয় বিধি-নিষেধ পর্ণোগ্রাফি বা অশ্লীল ছবির উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও প্রদর্শনীকে অনুমোদন করে না। এখানকার জনসাধারণের অধিকাংশের ধর্ম ইসলামে পর্ণোগ্রাফিসহ সব ধরনের অশ্লীলতা নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশের পর্ণোগ্রাফী পরিস্থিতি : অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে পর্ণোগ্রাফী মহামারী আকার ধারণ করেছে। ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে পর্ণো ভিডিও ও স্থির ছবি আপলোড এবং ডাউনলোড, রাস্তার পাশে প্রকাশ্যে পর্ণো সিডি বিক্রি, পত্রিকার দোকানে পর্ণো ম্যাগাজিন বিক্রি এবং মোবাইলের মাধ্যমে সমাজের মধ্যে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় পর্ণোগ্রাফী এখন খুবই সহজলভ্য হয়ে গেছে। দেশের যুব সমাজের একটি বিশাল অংশ এ ঘৃণ্য কাজটিকে বিনোদন হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী ও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পর্ণোগ্রাফির চাহিদাও দিন দিন বেড়ে যেতে থাকে।
বাংলাদেশে পেশাদার পর্ণোগ্রাফি অভিনেত্রী বা তারকা অনুল্লেখ্য; বরং এসব পর্ণোগ্রাফীর চিত্রে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, নাট্য ও চিত্র অভিনেত্রী এবং গৃহবধুর সংখ্যাই বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেম-ভালোবাসা থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিবেশে মেয়েদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শারীরিক মেলামেশার ভিডিও এবং স্থিরচিত্র ধারণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঐ বখাটে তরুণরাই তরুণীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে। পরে তা তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়ে হয়রানি করে। বিভিন্ন অসাধু মহল ব্যবসায়িক লাভের জন্য কর্মরত নারীদের ভিডিও বা স্থিরচিত্র ধারণ করে। হয়রানির শিকার নারীকে এসব ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়ে কখনো কখনো আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখা যায়।
বাংলাদেশে পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক আইন : পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আইন রয়েছে। ব্রিটেনে ‘অবসিনিটি পাবলিকেশন্সক অ্যাক্ট ১৮৫৭’-এর মাধ্যমে পর্ণোগ্রাফী নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমানে আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনের একটি প্রধান মাধ্যম হলো পর্ণোগ্রাফী। তবে শিশু পর্ণোগ্রাফী, প্রপাশবিকতা ও নিষ্ঠুর যৌনতার প্রদর্শনীর ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ওসব দেশের পর্ণোগ্রাফি আইনের সারকথা হচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ স্বেচ্ছায় পর্ণো ফিল্মে অংশ নিতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ ওয়েবসাইট থেকে বা দোকান থেকে পর্ণোগ্রাফীর ভিডিও কিনে তা দেখতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকবার পর্ণোগ্রাফী উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিপণনে নিয়ন্ত্রণ করে প্রণীত আইনকে আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং যুক্তি পেশ করেছে যে, ওই আইনগুলো নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে মারাত্মক এক স্ববিরোধীতা রয়েছে। সেখানে একদিকে পতিতাবৃত্তি অবৈধ, অপরদিকে পর্ণোগ্রাফি বৈধ। এ স্ববিরোধীতা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলোতে শিশু পর্ণোগ্রাফী নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশ পশ্চিমা প্রভাবে প্রভাবিত অনেক এশিয়ান সমাজ থেকেও ভিন্ন। এখানে পর্ণোগ্রাফি উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও বিপণনকে রোধ করার জন্য সরাসরি কোনো আইন এতদিন ছিল না। দন্ডবিধি, ১৮৯৮, ‘’Penal Code, 1860 (Act XLV of 1860) সিনেমাটোগ্রাফীক অ্যাট, ১৯১৮, ‘’The Cinematogrph Act, 1918. (Act II of 1918), (As amended by the Cinematograph (Amendment) Ordinance, 1982), aviv-2 [Definitions-2. In this Act, unless there is anything repugnant in the subject or context,-(a) ‘’cassette’’ means a magazine or container of ferromagnetic recording tapes having the operating characteristic of being directly loaded into magnetic tape recording or re-producing machine; (b) ‘’cinematograph’’ means a composite equipment including a video-cassette recorder used for production, projection and exhibition of motion picture film; (c) ‘’film’’, in relation to a motion picture, means a thin flexible ribbon of transparent materrial having perforations along one or both edges and bearing a sensitized layer or other coating capable of producing photographic images; nad includes and processed film; (d) ‘’place’’ includes a house, building, tent or vessel; (e) ‘prescribed’’ means prescribed by rules made under this Act; and (f) ‘’video-cassette recorder’’ means an electromagnetic equipment for recording and reproducing motion picture and sound signals simultaneously on cassette tapes.] 3 [Cinematograph exhibition to be licensed 3. Save as otherwise provided in this Act, no person shall give an exhibition by means of a cinematograph elsewhere than in a place licensed under this Act. or otherwise than in compliance with any conditions and restrictions imposed by such license.] 5. (2) [5. (2) If any person is convicted of an offence punishable under this Act committed by him in resspect of any cinematograph, film or cassette the convicting Court may further direct that the cinematograph, film or cassette shall be forfeied to the Goverment.’’] সেন্সরশিপ অব ফিল্মস অ্যাক্ট, ১৯৬৩ (সংশোধিত-২০০৬), ‘’The Censorship of Fllms Act, No. XVIII of 1963 (As amended by President’s Order No. 41 of 1972, Ordinace No. LVIII of 1982 and Act No.1 of 2006) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬, ‘‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (২০০৬ সনের ৩৯ নং আইন) [৮ অক্টোবর ২০০৬ইং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আইনগত বৈধতা ও নিরাপত্তা প্রদান এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন।] ধারা-৫৭।  [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ