ঢাকা, রোববার 17 February 2019, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মুনাজাতে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ঐক্য কামনা

গতকাল শনিবার টঙ্গী তুরাগ তীরে তাবলীগ জামায়াতের প্রথম পর্ব শেষে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মুনাজাত -সংগ্রাম

গাজীপুর ও টঙ্গী থেকে মোঃ রেজাউল বারী বাবুল/গাজী খলিলুর রহমান: মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি, দেশের কল্যাণ কামনা করে মোনাজাতের মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার শেষ হলো জোবায়ের গ্রুপের ৫৪তম তাবলীগ ইজতেমার প্রথম পর্ব। আজ রোববার শুরু হবে মাওলানা সাদ গ্রুপের ২দিন ব্যাপী বিশ্ব ইজতেমা এবং আগামীকাল সোমবার মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। গতকালের মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মুক্তি এবং দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার তৌফিক কামনা করা হয়। জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে অনুনয়-বিনয় করে পানাহ্ ভিক্ষা করছিলেন মুসুল্লীরা। ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন ভোর থেকেই। বহু মানুষের অংশগ্রহণে ইহলোকের মঙ্গল, পরলোকের ক্ষমা, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনা করা হয় তাবলিগ জামাতের ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের এই মোনাজাতে। এরআগে হেদায়েতী বয়ান করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরব্বি বাংলাদেশের কাকরাইল মসজিদের ইমাম হযরত মাওলানা মুহাম্মদ জোবায়ের। তিনি আরবি ও বাংলা ভাষায় মোনাজাত পরিচালনা করেন।
মাওলানা মুহাম্মদ জোবায়ের বেলা ১১টা ৪০ মিনিট থেকে মোনাজাত শুরু করেন এবং তা চলে ২৪মিনিট। মোনাজাত শুরু হতেই পুরো এলাকা জুড়ে নেমে আসে পিন পতন নীরবতা। খানিক পর পর শুধু ভেসে আসে আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন। অনুতপ্ত মানুষের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে অনুনয়-বিনয় করে পানাহ ভিক্ষা করছিলেন তাঁরা। ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন তাঁরা ভোর থেকেই। বহু মানুষের অংশগ্রহণে ইহলোকের মঙ্গল, পরলোকের ক্ষমা, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনার মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার জোবায়ের অনুসারীদের পর্ব শেষ হয়েছে।
আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণিবিতান, অফিসসহ সবকিছু ছিল বন্ধ।
রোববার বাদ ফজর থেকে মাওলানা সা’দ অনুসারিগণ ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করবেন। সোমবার আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা।
মোনাজাত পরিচালনাঃ
ইজতেমার মাওলানা জোবায়ের অনুসারিদের মোনাজাতের আগে শনিবার সকাল থেকে হেদায়েতী বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা ওবায়দুল্লাহ খোরশেদ। তার বক্তব্য বাংলায় তরজমা করছেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন। হেদায়েতী বয়ান শেষে বাংলাদেশের হাফেজ মাওলানা জোবায়ের প্রথম পক্ষের মোনাজাত পরিচালনা করেন।
এদিকে ইজতেমার মোনাজাতে শরিক হতে শনিবার সকালে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি পায়ে হেঁটেই টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা স্থলে পৌঁছেন। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলি-গলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে হাজার হাজার মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন।
ইজতেমা মাঠে আরো তিন মুসল্লির মৃত্যুঃ টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় আগত আরো দুই মুসল্লি ইন্তিকাল করেছেন। শনিবার ভোরে ঢাকার কদমতলা এলাকার মোঃ আবুল হোসেন (৫৫) ইজতেমা ময়দানে তার নিজ খিত্তায় ভোর ৫টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। ইজতেমা মোনাজাত শেষে বাড়ি ফেরার পথে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এক মুসল্লি মারা গেছেন। তার নাম আব্দুল আউয়াল (৫৬), তার বাড়ি রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি থানার রুলজানী গ্রামে। তিনি হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর আগে শুক্রবার দুপুরে আব্দুর রহমান (৫৫) নামে আরো এক মুসল্লি মারা যান। তিনি সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানার মৃত হাতেম আলীর ছেলে। ইজতেমা মাঠে জানাযা শেষে তাদের লাশ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ নিয়ে ইজতেমায় অংশগ্রহনকারী ৭জন মুসল্লি মারা গেলেন। ইজতেমা মাঠের লাশের জিম্মাদার আদম আলী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
২০২০ সালের তাবলীগ ইজতেমা জানুয়ারিতে দুই পর্বে হবেঃ ২০২০ সালের বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার মাওলানা জোবায়ের অনুসারিদের আখেরি মোনাজাতের পর মাইকে এ ঘোষণা দেয়া হয়।
ইজতেমার শীর্ষ মুরুব্বী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চত করে জানান, ২০২০ সালে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। এর প্রথম ধাপ হবে ১০, ১১ ও ১২ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপ অনুষ্ঠিত হবে ১৭, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি।
আরবী-বাংলায় মোনাজাত : জোবায়ের অনুসারিদের আখেরি মোনাজাতে গতবারের মত এবারও আরবীর ও বাংলায় আখেরি মোনাজাত করা হয়েছে। এবারও বাংলাদেশের মাওলানা জোবায়ের মোনাজাত পরিচালনা করেন।
মোনাজাতে অতিরিক্ত মাইকের ব্যবস্থাঃ বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদফতর ও গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। এর মধ্যে গণযোগাযোগ অধিদফতর ইজতেমা ময়দান থেকে আবদুল্লাহপুর ও বিমানবন্দর রোড পর্যন্ত এবং গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস ইজতেমা ময়দান থেকে চেরাগআলী, টঙ্গী রেলস্টেশন, স্টেশন রোড থেকে শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের অলিগলিতে পর্যাপ্ত মাইক সংযোগ দেয়া হয়।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মোনাজাতে অংশগ্রহণ : বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, হেফাজত ইসলামের আমীর আল্লামা আহমদ শফী, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট আজমত উল্লাহ খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
বিদেশী মেহমান ৬ শতাধিকঃ
এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ কমপক্ষে ৫২টি দেশের তাবলিগ জামাতের ছয় শতাধিক বিদেশী মেহমান এবারের ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেছেন। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এবছর বিদেশী মেহমানের সংখ্যা অনেক কম বলে জানান আয়োজকরা।
চিকিৎসা সেবা : এবারের বিশ্বইজতেমায় আগত মুসুল্লিদের স্বাস্থ্য সেবা দিতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কাজ করছে। এবার প্রায় ৫০টি স্বেচ্ছাসেবী, সরকারি ও বেসরকারী সংস্থা স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করেছে। বিশ্ব ইজতেমার ২ দিনে টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল এবং তাদের ইজতেমা মাঠে স্থাপিত চারটি মেডিক্যাল ক্যা¤েপ প্রায় ৫ হাজার জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
মোনাজাত শেষে জনজট ও যানজট : আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে আশা মানুষ নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। আগে যাওয়ার জন্য মুসল্লিরা তাড়াহুড়া করতে শুরু করে। এতে টঙ্গীর কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী- কালীগঞ্জ সড়কের আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক এবং সংযোগ সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট। রাত ১২টার মধ্যে ইজতেমা ময়দান ত্যাগ করতে হবে সে জন্য ময়দানের ভেতরে অবস্থানকারী মুসল্লিরাও বের হয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
ভ্রাম্যমান আদালতের জরিমানা : ইজতেমার আখেরি মোনাজাতের দিন ইজতেমা ময়দানের আশপাশের এলাকায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালত হয়। এতে দুটি খাবার হোটেল ও দুটি গাড়ির চালককে সংশ্লিষ্ট আইনে চারজনকে ২৫ হাজার ৭০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া টঙ্গী স্টেশন এলাকায় ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে দুইজনকে একমাস করে কারাদণ্ড এবং অপর একজনকে ৫০০টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত।
বাংলাদেশে ইজতেমার প্রচলন : ইজতেমার মুরুব্বীদের দেয়া তথ্যমতে, ১৯৪৬সালে প্রথম কাকরাইল মসজিদে ইজতেমার আয়োজন শুরু করা হয়। তারপর ১৯৪৮সালে চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে ও ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৬৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বর্তমানস্থলে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে সরকারি ভাবে তুরাগ তীরের ১৬০একর জমি স্থায়ীভাবে ইজতেমার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ