ঢাকা, রোববার 17 February 2019, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলাভাষা খোদার সেরা দান

স্টাফ রিপোর্টার : জাতিসংঘের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অধিসংস্থা ইউনেস্কো পরিচালিত ২০১০ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ‘বাংলা’ বিশ্বের সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা। এর পরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় মিষ্টি ভাষার মর্যাদা পায় যথাক্রমে ‘স্প্যানিশ’ ও ‘ডাচ’ ভাষা। এত বছর পরও সে সমীক্ষার ফলাফলের ব্যত্যয় ঘটেনি। সত্যিই বাংলা ভাষা মায়ের মতোই মধুর। এমন মধুর ভাষার জন্য কী চুল পরিমাণ ছাড় দেয়া যায়? তাইতো এ জনপদের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বুকের রক্ত ঢেলে দিতেও এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করেনি।
ভাষার মাসখ্যাত ফেব্রুয়ারির সপ্তদশ দিন আজ রোববার। ঊনিশশ’ বায়ান্ন সালের এই দিনে লাহোরে সরদার আব্দুর রব নিশতার এক সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বলিতেছি যে, পাকিস্তানে জাতীয় ভাষার মর্যাদা একমাত্র উর্দুই লাভ করিবে।’ একই সময়ে পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের গভর্ণর জাহিদ হোসেন স্টেট ব্যাংকে উর্দু চেক প্রচলনের প্রস্তাব করেন। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ডা. আহমদ রফিক তার ‘ভাষা-আন্দোলন, ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেন, ‘একদিকে প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গের প্রধান প্রধান শহরে-গঞ্জে ভাষার দাবিতে যখন পরিবেশ উত্তপ্ত তখনও মুসলিম লীগ নেতাদের কেউ কেউ উর্দু রাষ্ট্রভাষার পক্ষে বক্তৃতা-বিবৃতি দিতে দ্বিধা করেননি। হয়তো তাদের ধারণা ছিল এর ফলে পূর্ববঙ্গের ভাষা-উত্তাপ কিছুটা কমে আসবে।
“মোদের গরব মোদের আশা/আ-মরি বাংলা ভাষা”- আবেগমথিত পংক্তি কেবল নয়। এটিই চিরন্তন অভিব্যক্তি। বাংলা মায়ের উদরে জন্ম নিয়ে, এ জনপদের আলো-বাতাসে বড় হয়ে ভাব প্রকাশের মোক্ষম হাতিয়ার তো বাংলা ভাষাই হবে। কিন্তু শিক্ষার বাহন, অফিস-আদালতের ভাষা, তথা সর্বস্তরের সর্বজনীন ভাষা হিসেবে বাংলা এখনই যেন ‘কাজীর গরু’। সাধারণ মানুষ বাংলার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হলেও অভিজাত পরিমন্ডলে ভিন ভাষা বিশেষ করে ইংরেজিপ্রীতি দিন দিন সংক্রমিত হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি এলে বাংলা ভাষার আদর-কদর ও ব্যবহার বাড়লেও তা মাস শেষেই পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। হাজার বছরের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বাংলা পৃথিবীর সর্বাধিক জনব্যবহৃত অন্যতম শীর্ষ মাতৃভাষা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলা ভাষা চীনের ম্যান্ডারিন, ইংরেজি, স্প্যানিশ ও আরবীর পর বিশ্বে পঞ্চম স্থান করে নিয়েছে। হিন্দীর অবস্থান আগে পঞ্চম থাকলেও এখন তা বাংলার পর ষষ্ঠে।
উইকিপিডিয়ায় বর্ণিত হয়েছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ২৫০ মিলিয়নের বেশি লোক বাংলায় কথা বলে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বভাগের বঙ্গ বা বাংলা নামের অঞ্চলের লোকদের মাতৃভাষা। এ অঞ্চলটি বর্তমানে ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সমন্বয়ে গঠিত। বাংলাদেশের প্রায় ৯৮% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও পাশ্চাত্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাভাষী বাস করেন। বাংলা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র বাংলাদেশের একমাত্র স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা। এছাড়াও ভারতীয় সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা হল বাংলা এবং আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার তিন জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে স্বীকৃত সরকারি ভাষা হল বাংলা। এছাড়াও বাংলা ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান স্বীকৃত ভাষা। বিগত ২০১৪ সালে বাংলা ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ‘বাংলা ভাষার মর্যাদা এখনও প্রতিষ্ঠা হয়নি।’ জাতীয় লজ্জা হলেও স্বীকার করতে হচ্ছে, রক্তের দামে কেনা বাংলা ভাষার যথার্থ মূল্যায়ন আজও করা হচ্ছে না। এর জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যাবশ্যক হলেও কাজের কাজটি কেউ করছে না। সরকার আসে, সরকার যায় কিন্তু বাংলা ভাষার বারোটা বাজছে। সেদিকে কারো ভ্রূক্ষেপ নেই। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের নিমিত্তে সরকারের ১১টি নির্দেশনা জারি হলেও নানা ফাঁক-ফোকর থাকায় বাস্তবায়ন নেই। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সালে সর্বপ্রথম এ ধরনের নির্দেশনা জারি হয়। এরপর যথাক্রমে ১৯৭৫ সালে ৩টি, ’৭৮ সালে ২টি, ’৭৯ সালে ১টি, ’৮১ সালে ২টি ও ’৮৩ সালে ২টি নির্দেশনা জারি করা হয়। যেগুলো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৮১ সালের ৮ আগস্ট জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে নেয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক ‘বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন সেল’ আরও পরে ১৯৮৩ সালে সরকারের আমলে ‘বাংলা কমিটি’ গঠিত হয়। অজ্ঞাত কারণে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের সরকারি সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
এ অবস্থায় শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদদের ক্ষোভ যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক বটে। বাংলা একাডেমির সভাপতি এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, আমাদের ভাষার সংগ্রাম এখনও চলছে। আমরা এখনও দেশের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করতে পারিনি, পারিনি সব মানুষের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে। ভাষা-আন্দোলনের ছয় দশক পেরিয়ে তাই ইতিহাসের পর্যালোচনার পাশাপাশি আত্মমূল্যায়নও অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ