ঢাকা, রোববার 17 February 2019, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শুক্রবারে মৃত্যুর ইচ্ছা পূরণ!

* যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার-স্মৃতির মেঘলাভোরে কবিতা থেকে
মুহাম্মদ নূরে আলম : কবি আল মাহমুদ চেয়েছিলেন শুক্রবার দিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে। অবশেষে তার ইচ্ছই পূর্ণ হলো। গত শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে এই পৃথিবী ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান কবি। ‘স্মৃতির মেঘলাভোরে’ নামক একটি কবিতায় তার ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন কবি। ওই কবিতায় তিনি লিখেছিলেন- কোনো এক শুক্রবারের ভোরবেলা মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে ডাক দিলে তিনি খুশি মনেই তার ডাকে সারা দেবেন। আনন্দের সঙ্গেই তিনি এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন।
কবি আল মাহমুদের লেখা কবিতাটি তুলে ধরা হলো :
‘স্মৃতির মেঘলাভোরে’
 -আল মাহমুদ
কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।
ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন
নিরুপায় কিছু নাম, কিছু স্মৃতি কিংবা কিছু নয়;
অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন
কার হাত ভাঙে চুড়ি? কে ফোঁপায়? পৃথিবী নিশ্চয়।
স্মৃতির মেঘলাভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক
অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায়?
কেন দোলে হৃদপি-, আমার কি ভয়ের অসুখ?
নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়!
আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার
যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ আর নেই। গত শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
উল্লেখ্য যে, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে যিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি কবি আল মাহমুদ। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিও তিনি। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তাঁর গ্রামের লোকজন তাকে আদর করে পিয়ারু মিয়া বলে ডাকতো। তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক তিনি। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই প্রবল বর্ষণের এক রাতে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার মোড়াইল গ্রামের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সোনালী কাবিনের এই কবি। তাঁর পিতার নাম মীর আবদুর রব এবং মাতার নাম রওশন আরা মীর। বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড হাই স্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য অনন্য অপার বিরল সৃষ্টি কালজয়ী কাব্য ‘সোনালী কাবিনে’র স্রষ্টা বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভাবান ও শক্তিমান কবি এবং এক প্রবাদতুল্য অনিবার্য কিংবদন্তি হিসাবে আল মাহমুদই পরিচিত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগম আর তাদের ৫ পুত্র ও ৩ কন্যা নিয়েই সংসার।
মাত্র ১৮ বছর বয়স ১৯৫৪ সালে সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন। তখন থেকেই তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। ঢাকা আসেন এবং পত্রিকায় কাজ নেন, তখনিই সাহিত্যে পুরোদমে মনযোগী হন। আজীবন আত্মপ্রত্যয়ী কবি ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা করে একের পর এক সাফল্য লাভ করেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৬৩ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস, সোনালি কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে উঠো, কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ নামক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এই পত্রিকায় সামসুদ্দিন পেয়ারা, মরহুম আসফউদ দৌলা, ফজলুল বারী প্রমুখ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করেন। মুলত: এই সময় তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এক বছরের জন্য একবার জেল খাটেন। পরে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তিনি কবিতায় অবলম্বন করেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর কবিতায় বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস উৎকীর্ণ হতে থাকে; এর জন্য তিনি প্রগতিশীলদের সমালোচনার মুখোমুখি হন। তবে ঈশ্বরানুগত্যের কারণে তার কবিতার কাব্যগুণ আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি একটুও। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।
সমকালীন বাংলা সাহিত্যাকাশে আল মাহমুদের সমতুল্য মেলা ভার। বিগত কয়েক দশক বাংলা কবিতা তাঁর হাত ধরে আজ চরম উৎকৃষ্ট ও উন্নত শিখরে অবস্থান করছে। তিনি কবিতার সোনার চামচ মুখে নিয়ে এই বাংলায় জন্মেছেন। কবিতার সঙ্গেই গড়ে তুলেছেন একান্তে ঘর-সংসার। তিনি বলেছেন- ‘কবিতা আমার জীবন। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক, সমালোচক শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, “বাংলা কবিতায় নতুন সম্ভাবনা এনেছেন আল মাহমুদ, পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেনি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন।”
অবশ্য কবি আল মাহমুদ শুধুমাত্র কবি হিসেবেই নয়, তিনি একাধারে একজন শক্তিমান গাল্পিক,ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। সাহিত্যের অনেক শাখাতেই তার অবাধ বিচরণ। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’। তার সৃষ্টির পরিধি সাহিত্যের বিশাল এলাকা জুড়ে। কিন্তু এত কিছু ছাড়িয়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন কবি এবং শুধুই কবি। একজন সাধারণ পাঠক হিসাবে  বলতেই পারি, বাংলা কবিতা মানেই আল মাহমুদ, আর আল মাহমুদ মানেই বাংলা কবিতা।
বাংলা কবিতা যাঁদের হাত ধরে আধুনিকতায় পৌঁছেছে, কবি আল মাহমুদ তাঁদের অগ্রগণ্য। যেন ঐশ্বরিক ক্ষমতা রয়েছে তাঁর কলমের কালিতে। আল মাহমুদের কলম বাংলা সাহিত্যকে করেছে আরো উর্বর। সাহিত্যের সকল শাখাতেই তাঁর সমান পদচারণা। তাঁর লেখনীর ব্যতিক্রম স্বাদের জন্য তিনি বারবার আলোচিত হয়েছেন। হয়েছেন অসংখ্যবার পুরস্কৃত। মাত্র দু’টি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে  তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার মাঝে ছিলো সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম ‘সোনালি কাবিন’।
কবি আল মাহমুদের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। কবিতা, গল্প,উপন্যাস সহ শ’খানেকের মতো গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে তাঁর। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- কবিতা : লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতর নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, বারুদগন্ধী মানুষের দেশ, তুমি তৃষ্ণা তুমিই পিপাসার জল, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না, ইত্যাদি। পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, ময়ূরীর মুখ, নীল নাকফুল, কলংকিনী জ্যোতির্বলয়, গন্ধ বণিক, সৌরভের কাছে পরাজিত, আল মাহমুদের গালগল্প, ইত্যাদি ছোট গল্পগ্রন্থ। উপন্যাস : কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, চেহারার চতুরঙ্গ, নিশিন্দা নারী, ইত্যাদি। শিশুতোষ : পাখির কাছে ফুলের। কাছে প্রবন্ধ : কবির আত্মবিশ্বাস, কবির সৃজন বেদন, আল মাহমুদের প্রবন্ধ। সমগ্রভ্রমণ : কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাত সমুদ্র। আত্মজীবনী- যেভাবে বেড়ে উঠি। আল মাহমুদ পুরো একটি জীবন কবিতার পথে কাটিয়ে এখন প্রায় গোধূলিলগ্নে। কবিজীবনের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে আছে বাংলাদেশের বাঁক-বদলের ইতিহাস। স্বদেশের শক্তি বুকে নিয়ে, চোখে জাতির স্বপ্ন দিয়ে এখনো তিনি লিখে চলছেন সমান তালে। কবি হয়েও পাঠকের কাছে চমৎকার ভাষায় পৌঁছে দিয়েছেন গল্প, উপন্যাস। তাঁর গল্প থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে কলকাতায়।
বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলাকাব্যে অনবদ্য বহুমাত্রিকতার সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কবি আল মাহমুদ দেশের জাতীয় পদকসহ বেশ কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। সেগুলো হলো- বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, জয়বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার,ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার, সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, সমান্তরাল (ভারত) কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক, লেখিকা সংঘ পুরস্কার, হরফ সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার ইত্যাদি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ