ঢাকা, সোমবার 18 February 2019, ৬ ফাল্গুন ১৪২৫, ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন হয়েছে -মিয়ানমারের সেনাপ্রধান 

১৭ ফেব্রুয়ারি,  আশাহি শিখবুন/রয়টার্স : প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সেনাপ্রধান স্বীকারোক্তি দিলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। জাপানি সংবাদমাধ্যম আশাহি শিমবুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ এই নিপীড়ন চালিয়ে থাকতে পারে। তবে ওই নিপীড়নে সেনা-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অতীতের ধারাবাহিকতায় আবারও নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ’ নেই। গত শুক্রবার আশাহি শিমবুনে প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারের বরাতে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এসব কথা জানিয়েছে।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন,ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যম রোহিঙ্গা নিপীড়নে সেনা সংশ্লিষ্টতার আলামত পেয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে ইন দিন গ্রামের এক গণহত্যায় সেনা-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হাজির করা হয়। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনেও রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা প্রবণতার আলামত মেলে। তা সত্ত্বেও নিপীড়নের কথা অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার।

শুরু থেকেই রোহিঙ্গা নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এবার প্রথমবারের মতো  আশাহি শিমবুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিন অং হ্লায়াং স্বীকার করেছেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সংখ্যক সদস্যের এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে’। তবে অতীতের ধারাবাহিকতায় সেনা-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেছেন, ‘কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা নিপীড়নে জড়িত। সুনির্দিষ্ট প্রমাণহীন সমালোচনা একটি জাতির মর্যাদা ক্ষুণ্ণের সামিল'। 

২০১৮ সালের আগস্টে রাখাইনের মানবাধিকার হরণের ওপর জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তাদের প্রতিবেদন হাজির করে। তদন্তের ফলাফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর পরিচালিত অভিযানকে 'গণহত্যার উদ্দেশ্যতাড়িত' আখ্যা দেওয়া হয়। গণহত্যায় জড়িত থাকার আলামত সাপেক্ষে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ ৬ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার বিচার দাবি করা হয় সেই তদন্ত প্রতিবেদনে। এরপর বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক মিয়ানমারের সেনাপ্রধানকে নিষিদ্ধ করে। রয়টার্স বলছে, মিন অং হ্লায়াং একসময় ফেসবুকে কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তার কথা বলার ঘটনা খুব বিরল। 

জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের ওই অনুসন্ধানে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের আলামত মিললেও গত বছর মিন অং হ্লায়াং এ সংক্রান্ত যাবতীয় অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘সেনাবাহিনী সবসময় নিয়মতান্ত্রিক। যারা আইন ভঙ্গ করে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিই আমরা।' মিন অং হ্লায়াং এর এসব দাবি জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের ভাষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডি জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেছেন, মিন অং হ্লায়াং এর ওই সাক্ষাৎকার তার নজরে আসেনি। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত বছর জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের সমঝোতা চুক্তিতে দেশটি স্বীকার করেছে যে সহিংসতা হচ্ছে, মানুষ পালাচ্ছে এবং তাদের প্রত্যাবাসিত হওয়ার অধিকার আছে। 

ধেয়ে আসা গুলি, সন্তানকে শূন্যে নিক্ষেপ, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মুখেই বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা। এখনও থামেনি সে জনস্রোত। ২০১৮ সালের মার্চে প্রকাশিত ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছিল, ঘর ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া রোহিঙ্গাদের রাখাইনে বৌদ্ধ মডেল গ্রাম গড়ে তুলছে মিয়ানমার। একই বছর ডিসেম্বরে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানী খবরে সেই খবরের অগ্রগতি জানা যায়। রাখাইনের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে তারা জানায়, একসময়ের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের গ্রামগুলোতে এরইমধ্যে নাটকীয় রূপান্তর ঘটেছে। আগুন আর বুলডোজারে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত নিশ্চিহ্ন করার পর সেখানে শত শত নতুন ঘর-বাড়ি গড়ে তুলছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। আর তাতে পুনর্বাসিত হচ্ছে বৌদ্ধরা। রোহিঙ্গা গ্রামগুলো রূপান্তরিত হচ্ছে বৌদ্ধ অধ্যুষিত গ্রামে। তা সত্ত্বেও মিয়ানমার ছেড়ে পালানো রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মিন অং হ্লায়াং। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আত্মীয়দের সঙ্গে থাকা কিংবা তৃতীয় কোনও দেশে পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্যে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, কারও শিখিয়ে দেওয়া কথাই তারা সবাই বলছে।’

আন্তজার্তিক অপরাধ আদালতের সনদ ও রোম স্ট্যাচুতে স্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়ায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাদের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারের এখতিয়ার নেই।আশাহি শিমবুনকে দেওয়া মিন অং হ্লায়াং সেই দাবি পুনচ্চারণ করে বলেন ‘মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী কোনও নির্দেশনা গ্রহণ করব না আমরা।’ উল্লেখ্য, মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আদালতের আওতাধীন না হওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গা নিপীড়নের একাংশ বাংলাদেশে সংঘটিত হওয়ার যুক্তিতে ওই আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচারের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়। তবে সেটি একটি ধীর প্রক্রিয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ