ঢাকা, সোমবার 18 February 2019, ৬ ফাল্গুন ১৪২৫, ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলাভাষা খোদার সেরা দান

স্টাফ রিপোর্টার : ভাষার অধিকার আদায়ে দ্রোহের স্মারক মাস ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ আজ সোমবার। আর মাত্র তিনদিন পরেই আসছে জাতির সেই কাক্সিক্ষত দিনটি। অমর একুশের প্রথম প্রহরেই প্রতিটি শহীদ মিনারের পাদদেশ ফুলে ফুলে ভরে যায়। শহীদ মিনার ভাষা শহীদের উদ্দেশে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সকলে জাগরুক শোক আর শ্রদ্ধার মিশেলে অনির্বচনীয় আবেগ নিয়ে জমায়েত হয়। শেষে নাঙা পায়ে প্রভাত ফেরি কর্মসূচি পালন করে। গলা মেলে ধরে সেই গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?’
একুশে ফেব্রুয়ারি বা অমর একুশে আমাদের মহান শহীদ দিবস বা ভাষা দিবস। একুশে ফেব্রুয়ারির আজ শুধু ভাষা দিবসই নয়, আমাদের অমর একুশে আজ সারাবিশ্বের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে এবং পরবর্তীয় আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, অহিউল্লাহ ও শফিক প্রমুখ। মায়ের ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রশ্নে গোটা বিশ্বে নজীরবিহীন আত্মদানের এই দিনটি আমাদের অস্থিমজ্জার সাথে মিশে আছে আর শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত শহীদ মিনার অহর্নিশি ভাষা পুত্রদের অপরিসীম ত্যাগ ও অদম্য সাহসের স্তব গাইছে।
বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয় ঊনিশশ’ বায়ান্ন সালের তেইশে ফেব্রুয়ারি। এর পরিকল্পনা, স্থান নির্বাচন ও নির্মাণসহ সবই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রদের উদ্যোগে সম্পন্ন হয়। বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পূর্ব-দক্ষিণ থেকে শহীদদের রক্তসিক্ত স্থানে সাড়ে ১০ ফুট উঁচু এবং ৬ ফুট চওড়া ভিত্তির ওপর ছোট স্থাপত্যটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে এর গায়ে ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ লেখা একটি ফলক লাগিয়ে দেয়া হয়। নির্মাণের পরপরই এটি নগরবাসীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতীকী মর্যাদা লাভ করে। এখানে দলে দলে মানুষ ভিড় জমায়। ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি সকালে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেন। ঐদিন বিকেলে পুলিশ এটি গুঁড়িয়ে দেয়। সারা দেশে বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুরূপ ছোট ছোট অসংখ্য শহীদ মিনার গড়ে ওঠে।
১৯৫৩ সাল থেকে ছাত্রসমাজ একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটিকে মহান শহীদ দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদ মিনারের শূন্য স্থানটিতে লাল কাগজে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের অবিকল প্রতিকৃতি স্থাপন করে তা কাপড়ে ঢেকে দেয়া হয়। সেই প্রতীকী শহীদ মিনার থেকেই সে বছর ছাত্রদের প্রথম প্রভাত ফেরির সূচনা হয়। পরের বছরও ছাত্ররা একইভাবে শহীদ দিবস পালন করে। ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে একুশ দফার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শহীদ মিনার তৈরি, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করে। কিন্তু ঐ বছর ৩০ মে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় তা আইনসিক্ত করা সম্ভব হয়নি। ঊনিশশ’ ছাপান্ন সালে একুশে ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পূর্ববঙ্গ সরকারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও ভাষা শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম। সে সময়ই ‘একুশে’ আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়।
এরপর ঊনিশশ’ সাতান্নতে শিল্পী হামিদুর রহমানের পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণের একাংশে শহীদ মিনার পুনঃনির্মাণের কাজ শুরু হয়। হামিদুর রহমানের সহকর্মী হিসেবে ছিলেন ভাস্কর নভেরা আহমদ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তার কাজও বন্ধ হয়ে যায়। এর পরে আরও তিনবার ভেঙ্গে ফেলা ও পুনঃনির্মাণের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সাল থেকে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি তার স্থাপত্য ভাস্কর্যগত অস্বচ্ছতা নিয়েই সংগ্রামের প্রতীক একুশের চেতনার প্রতীক রূপে দাঁড়িয়েছে।
অমর একুশে উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ সারাদেশের শহীদ মিনারগুলোর ধোয়ামোছা ও সংস্কার কাজ চলছে। একই সাথে প্রস্তুতি চলছে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি কুড়ি তারিখ দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটেই জাতি পরম শ্রদ্ধা ভরে ফুলেল ভালোবাসা অর্পণ করবে ভাষাপুত্র রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম প্রমুখ জাতীয় বীর সন্তানদের প্রতি। যারা রক্ত না দিলে হয়তো পেতাম না ‘অ আ ক খ’, পেতাম না জ্বলজ্বলে একুশে ফেব্রুয়ারি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ