ঢাকা, মঙ্গলবার 19 February 2019, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

তীব্র গ্যাস সংকট ভোগান্তি চরমে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : এমনিতেই রাজধানীর বেশীর ভাগ এলাকায় চলছে তীব্র গ্যাস সংকট। এর মধ্যে ঘোষণা আসে ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় আজ মঙ্গলবারও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ১২ ঘণ্টার জন্য গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজের জন্য গ্যাসের পাইপলাইন পুনঃস্থাপন করা হচ্ছে। এ কারণে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকবে গ্যাস সরবরাহ। তিতাতের পরিচালক (অপারেশন) মো. কামরুজ্জামান বলেন, মঙ্গলবার রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বনানি, যাত্রাবাড়ি এবং মিরপুরের কিছু অংশে গ্যাসের সরবরাহ সীমিত থাকবে। এছাড়া ঢাকার অন্য সব জায়গায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। যদিও গত শনি ও রোববারও দিনভর রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকাতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। এতে করে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। অনেকেই হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসে।
তিতাস সূত্র জানায়, মিরপুর, শ্যামলী, মণিপুরীপাড়া, আগারগাঁও, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, গণভবন, জাতীয় সংসদ ভবন, কলাবাগান, হাজারীবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, শাহবাগ গ্রিনরোড, পুরান ঢাকার সমস্ত এলাকা, বঙ্গভবন, গোপীবাগ, স্বামীবাগ, রামপুরা এলাকা, বনশ্রী, নন্দীপাড়া, মগবাজার, সিদ্ধেশ্বরী, সেগুনবাগিচা, মিন্টো রোড, তেজগাঁও, খিলগাঁও, বাসাবো, মতিঝিল, কমলাপুর এবং কাছাকাছি এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এসব এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও সিএনজি গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক এনামুল হক বলেন, কাজের জন্য সঞ্চালন লাইনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এতে যেসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহ থাকবে সেখানে কখনো কম চাপ বা কখনো বেশি চাপ থাকতে পারে।
আশুলিয়ায় সঞ্চালন লাইনে ত্রুটির কারণে গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত সাভার, আশুলিয়া এবং রাজধানীর বেশ কয়েকটি জায়গায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। রাজধানীর উত্তরা, গাবতলী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডিসহ আশপাশের এলাকায় ওই দিন সরবরাহ বন্ধ ছিল। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ে এসব এলাকার মানুষজন। গত রোববার লাইন মেরামতের কাজ কিছুটা শেষ হলে সরবরাহ শুরু হয়। তবে মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগের কয়েকটি এলাকায় রোববার সন্ধ্যা পর্যন্তও সরবরাহ ছিল না।
সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে মারাত্মক গ্যাস সংকট চলমান রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৭টা বাজতে না বাজতেই গ্যাস চলে যায়। লাইনে টিপ টিপ করে গ্যাস আসায় রান্না-বান্না বন্ধের উপক্রম হয়ে পড়ে রাজধানীর বহু এলাকায়। অনেক গৃহবধূ চুলায় হাড়ি চড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে গ্যাস আসার অপেক্ষা করতে করতে ত্যক্ত বিরক্ত। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলবে কবে সেই প্রশ্ন এখন ঢাকার হাজার হাজার গৃহিনীর। দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় অনেকেই সিলিন্ডার গ্যাস কিনছেন। বিকল্প পন্থা বেছে নিয়েছেন অনেকেই। তবে সিলিন্ডারে ব্যায় বেশী হওয়ায় অনেকেই হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসছেন।
রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় গ্যাস সংকট যেন নিত্যদিনের। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, আজিমপুর, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মগবাজার, যাত্রাবাড়ি  উল্লেখযোগ্য। ভুক্তভোগীরা অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছি না। মাসের অধিকাংশ সময়ই গ্যাস থাকে না। অথচ মাস শেষে ঠিকই বিল দিতে হচ্ছে।
তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (জরুরি, উত্তর) এনামুল হক বলেন, কাজের জন্য সঞ্চালন লাইনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এতে যেসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহ থাকবে সেখানে কখনো কম চাপ বা কখনো বেশি চাপ থাকতে পারে।
তিতাস গ্যাস কর্মকর্তারা বলছেন সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে গ্যাস সংকট চরমে। শীতের কারণেই এটা হচ্ছে বলে তারা জানান। এছাড়া আবাসিকে চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিষ্ট্রিবিউশন লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী এইচ এম আলী আশরাফ বলেন, রাজধানীতে গ্যাসের চাহিদা ও ব্যবহার শতকরা ২০ ভাগ বেড়েছে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী গরমকালেই অনেক সময় গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হয়। 
ভুক্তভোগীরা বলছেন, শুধু শীত এলেই যে রাজধানীতে প্রতিবছর গ্যাস সংকট দেখা দেয় সেটি ঠিক নয়। এটা যেনো এদেশের মওসুমি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের প্রায় অধিকাংশ সময়ই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস থাকে না। তবে শীত এলেই এর প্রভাব বেশি দেখা দেয়।  রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর, বসিলা, কাটাশুর, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, সোয়ারিঘাট, মিরপুর, গেন্ডারিয়া, মাদারটেকসহ আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা গেছে এই চিত্র। দিনে তো বটেই, রাতেও গ্যাসের দেখা মেলে না ঢাকার এসব এলাকায়। 
মোহাম্মদপুরের পিসি কালচার এলাকার বাসিন্দা শওকত জানান, উনার বাসা প্রোমিন্যান্ট হাউজিংয়ে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই আবাসিক এলাকাতে বসবাস করছেন। এই হাউজিংয়ে বছরজুড়েই গ্যাস সংকট থাকে। শীতকালে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। অবস্থা এমন যে, চায়ের পানি পর্যন্ত গরম করা যায়না।
এই এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের অভাবে আমাদের কেরোসিনের চুলায় রান্না করতে হয়। একদিকে গ্যাসের বিল আর আরেকদিকে চুলার খরচ। একই চিত্র দেখা যায় রাজধানীর বসিলাতেও। বসিলা এলাকার গৃহিণী জামেনা খাতুন বলেন, গ্যাসের ঝামেলা চলছেই। ভাত হতেই লাগে তিন ঘণ্টা, অন্য সব কিছুর কথা তো বাদই, এ অবস্থার সমাধান হবে কবে? মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, গত ১৩ বছর ধরে গ্যাসের ঝামেলা পোহাচ্ছি, এই সময় এলেই চুলায় আগুন জলে না, তাই ১২ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়লেও এলপিজি গ্যাস কিনে নিছি, খাইয়া বাঁচতে হবে তো। কিন্তু গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মধ্যে আছেন মোহাম্মদপুর এলাকার বস্তিবাসী, গ্যাসের অভাবে রাস্তার পাশে মাটির চুলায় রান্না করে খাচ্ছেন তারা। একই রকম চিত্র দেখা যায় রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায়।
মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডের বাসিন্দা রেহানা আক্তার বলেন, দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত খুব অল্প গ্যাস থাকে। তাতে কেবল ভাত রান্না করা যায়। আর রাতে ১০টার পর গ্যাস পাওয়া যায়। ফলে সময় মতো খাওয়া-দাওয়া করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর উত্তরায় থাকেন নাহার সুলতানা। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন তিনি। তবে গ্যাস সংকটের কারণে বেশিরভাগ দিন সকালেই নাস্তা না করে অফিসে ছুটতে হয়। গ্যাস সংকট নিয়ে তিনি বলেন, গ্যাস না থাকায় বেশিরভাগ সময় সকালের নাস্তা বানানোর সুযোগ পাই না। ফলে বাইরে নাস্তা করতে হয়। প্রতিদিন বাইরে নাস্তা করাটা বেশ ব্যয়বহুল ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত আর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। ফলে রাতের খাবার খেতেও অনেক দেরি হয়।
পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস কোম্পানি সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে রুটিনমাফিক সংস্কার কাজ শুরু করা হয়। তখন এতে কিছু কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। গত ৯ ডিসেম্বর ওই সংস্কার কাজ চলায় জাতীয় গ্রিডে অন্তত ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যায়নি। ওই ত্রুটি এখনও পুরোপুরি সারানো যায়নি। ফলে গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে দৈনিক প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম উৎপাদন হচ্ছে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের একটি কূপেও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
এদিকে গ্যাসের সংকটের কারণে বেড়েছে সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা। ঢাকার মধ্য বাড্ডা এলাকার সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রেতা কামাল হোসেন বললেন, সিলিন্ডার ব্যবসা যে এতটা জমজমাট হবে সেটি দুবছর আগেও ধারণা করতে পারিনি। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তার দোকানে সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে তিনগুণ। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিমাসে প্রায় চার-পাঁচ হাজার সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করেন। সে এলাকায় পাইপলাইনে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণেই মানুষ এলপিজি গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হয়েছে। দিনের অধিকাংশ সময় লাইনে গ্যাস থাকে না- কিংবা গ্যাস থাকলেও চাপ কম থাকে। ফলে টিম-টিম করে চুলা জ্বলে। যা দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ চলে না।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল) কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান জানান, চাহিদার চেয়ে এমনিতেই আমরা গ্যাসের জোগান পাই কম। তাই বিতরণেও ঘাটতি থাকে। শীতকালীন চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন সে অনুপাতে বাড়েনি। বরং সম্প্রতি বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে সঞ্চালন লাইনে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়ায় দৈনিক ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই বিতরণ পর্যায়েও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় খোড়াখুড়ির পাশাপাশি কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সংকট থাকেই। রাজধানীতে গ্যাস সংকটে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। তিতাস গ্যাসের জরুরি ফোন নম্বরে কল করে প্রতিদিনই গ্রাহকরা এ সংক্রান্ত অভিযোগ করছেন। কিন্তু এ সংকট সমাধানে তিতাসের কাছে নেই কোনো সহজ উত্তর। তারা বলছে, চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় সংকট হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ সংযোগের কারণে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহে বিঘœ ঘটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ