ঢাকা, বুধবার 20 February 2019, ৮ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়লার স্তূপে ৩১টি মানব ভ্রুণ পাওয়ার ঘটনায় তোলপাড়

স্টাফ রিপোর্টার: বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়লার স্তূপ থেকে ৩১টি মানব ভ্রুণ পাওয়ার পর তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এটিকে অমানবিক ঘটনা বললেও প্রশ্ন উঠেছে চিকিৎসা গবেষণার কাজে ব্যবহার শেষে এসব মানব ভ্রুণ ডাস্টবিনে ফেলা হলো কেন? আর কীভাবে এরকম মানব ভ্রুণগুলো দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে অপসারণ করা হয়? চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, মায়ের গর্ভে যেসব বাচ্চা মারা যায় তাদেরকে অনেক সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য ফরমালিন দিয়ে সংরক্ষণ করে থাকে। এসব অপরিণত ভ্রুণ অনেক সময় পরিবারগুলো নিয়ে যায় না। সেসব ফিটাস বা ভ্রুণ থেকে শিক্ষার্থীরা যাতে মানবদেহ সম্পর্কে আরো জানতে পারে সেটাই থাকে উদ্দেশ্যে। এসব ভ্রুণের অনেক সময় ১০ থেকে ২০ বছর ধরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
হাসপাতালটির পরিচালক ড. বাকির হোসেন বলেন, এই সব ভ্রুণগুলো ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। এগুলোর উপযোগিতা শেষ হয়ে যাওয়াতে ভ্রুণগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে যে প্রক্রিয়ায় সেটা করা হয়েছে সেটা একেবারেই উচিত হয়নি বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়ায় ডিসপোজাল (অপসারণ) করার কথা ছিল, সেই প্রক্রিয়াই ডিসপোজাল হয়নি। যার ফলে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এ ঘটনা কোনভাবেই কাক্সিক্ষত না। তিনি আরো বলেন, যদি তারা জীবিত থাকতো তাহলে আজ তারা বড় হত। সেই মানব ভ্রুণের প্রতি যে সম্মানটা দেয়া দরকার ছিল সেটা আমরা দিতে পারিনি। সেটা আমাদের ব্যর্থতা। তবে যেহেতু এইসবগুলো মানব ভ্রুণ, তাই মর্যাদার সাথে সেগুলো কাপড়ে মড়ে দাফন করা হয় বলে জানান বাকির হোসেন।
ড. বাকির হোসেন বলেন, আমাদের দেশ যেহেতু মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। আমরা লোক সমাগমের মধ্যে করি না। লোকচক্ষুর অন্তরালে করি। আমরা সাদা কাপড়ে মড়িয়ে দাফণ করে দেই। এটা বাংলাদেশের সব জায়গায় করা হয়।
বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন: এদিকে হাসপাতালটির পরিচালক বলেছেন, ঘটনাটি  হয়েছে হাসপাতালের গাইনি বিভাগ থেকে। তাই এই ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে হাসপাতালের গাইনি বিভাগের দুইজনকে বরখাস্ত করার চিঠি দেয়া হয়েছে। একই সাথে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষ। এছাড়া হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. খুরশীদ জাহান বেগম ও ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ জোৎস্না আক্তারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বরখাস্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মোঃ সৈয়দ মাকসুমুল হক। তিনি জানান, অপরিণত শিশুর (ফিটাস) লাশ যা শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেগুলো একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাধিত করার কথা ছিলো। কিন্তু তা করা না হওয়ায় বিষয়টি ভিন্ন রকম পরিস্থিতিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এ ঘটনার তদন্তে সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. জহিরুল হক মানিককে প্রধান করে তিন সদস্যদের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। যাদের আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির বাকী ২ জন হলেন- প্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফাইজুল বাশার ও ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ইমতিয়াজ উদ্দিন। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গাইনি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. খুরশীদ জাহান বেগম এবং ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ জোৎস্না আক্তারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং এর সুপারিশনামা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোঃ বাকির হোসেন জানান, সকালে তার কার্যালয়ে কলেজ অধ্যক্ষসহ হাসপাতাল ও কলেজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভা করেন। এরপরপরই তদন্ত কমিটি ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পদক্ষেপ নিতে তিনি (হাসপাতাল পরিচালক) কলেজ অধ্যক্ষকে অফিসিয়ালি চিঠি দিয়েছেন। চিঠি অনুযায়ী তিনি ব্যবস্থাও নিয়েছেন। এছাড়াও ফিটাসগুলোর ময়নাতদন্তের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যা শেষে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাধিত করা হবে।
এ বিষয়ে বরখাস্তকৃত গাইনি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. খুরশীদ জাহান বেগম জানান, পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্স চালুর জন্য গাইনি বিভাগের একটি কক্ষ পরিষ্কার করে লাইব্রেরি বানানোর কথা। সে অনুযায়ী স্টোর হিসেবে পরিচিত কক্ষটি পরিষ্কার করা হচ্ছিলো। কিন্তু পরিষ্কারের আগে পরিদর্শনের সময় এগুলো দেখা যায়নি। কারণ তখন এগুলো বস্তাবন্দি অবস্থায় অকেজো মালামালের মধ্যে ছিলো। তিনি জানান, ঘটনার আগে তিনি এগুলো পরিষ্কার করার জন্য নার্সিং ইনচার্জ জোৎস্না আক্তারকে বলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর তিনি জানতে পারেন যে কিছু অরগান পাওয়া গেছে। এগুলো কোনো নবজাতকের লাশ নয়। এগুলো অপরিণত ও জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশুর (ফিটাস) ভ্রƒণ। আবার এরমধ্যে টিউমারসহ মানবদেহের আরো কিছু অরগান রয়েছে।
নির্ধারিত নিয়মে সমাধিত করা উচিত ছিলো বলে জানিয়ে তিনি বলেন, গত ৬ মাস আগে আমি গাইনি ওয়ার্ডের দায়িত্ব নেই। কিন্তু এগুলোর বিষয়ে আদৌ আমরা কেউ জানতাম না, আর এখন মেডিক্যালের বর্তমান শিক্ষা কারিকুলামে এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। এখন আমরা ছবিতেই সবকিছু করে থাকি। তবে একসময় এভাবে বিভিন্ন অরগান ফরমালিন দিয়ে সংরক্ষরণ করা হতো, তখন আমরাই ছাত্র ছিলাম।
যেভাবে ভ্রƒণের ভ্রসন্ধান মিলল: এর আগে সোমবার রাতে হাসপাতালের আবর্জনা স্তূপ থেকে ৩১টি ভ্রƒণ প্রথম দেখতে পায় বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের একজন পরিচ্ছন্নতা-কর্মী মোঃ মিরাজ। তিনি বলছিলেন, প্রতিদিনকার মত সন্ধ্যা সাতটা দিকে তিনি হাসপাতালের পূর্ব পাশের ডাস্টবিনে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে যান। সেখানে ময়লার মধ্যে দেখতে পান এই ভ্রƒণগুলো। মিরাজ বলেন, আমার সাথে আরেকটা ছেলে ছিল, সে দেখে ভয়ে পালিয়ে যায়। আমি ময়লা সরিয়ে দেখি ৩১ টা বাচ্চার ভ্রƒণ। এরপর হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টারকে খবর দিলে তারা ভ্রƒণগুলো নিয়ে যায়।
ব্যাপক তোলপাড়: এদিকে এতগুলো মানব ভ্রƒণ এভাবে ময়লার স্তূপের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখে বরিশাল শহরে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। স্থানীয় সাংবাদিক শাহিনা আজমিন বলেন, খবরটা ছড়িয়ে পড়লে অনেক মানুষ, দেখতে ভিড় করেন এবং ঘটনা অত্যন্ত অমানবিক বলে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করছেন। তিনি বলেন, এটা ল্যাবে ব্যবহৃত  হয়েছে মেডিকেলের স্টুডেন্টদের জন্য। খবরটা শোনার পর থেকে সবাই বলছে এটা একবারেই উচিত হয়নি। একেবারে অমানবিক কাজ হয়েছে এটা। অনেকে বলছেন নখ কাটার পরেও এভাবে ফেলে দিতে হয় না। সেক্ষেত্রে যারা এতদিন এসব জিনিস ব্যবহার করেছেন তাদের শিক্ষার জন্য, তারা কেন এভাবে ময়লা-আবর্জনা বা ড্রেনে ফেলে দেবে? সেটা তো তারা মাটিতে পুতে রাখতে পারতো, এমনটাই জানাচ্ছেন ওই সাংবাদিক। অনেকে আবার বলছেন, এটা তারা (হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ) অপরাধমূলক কাজ না করলেও এক ধরণের অমানবিক কাজকে তারা সমর্থন করেছে।
মামলা দায়ের: বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাস্টবিন থেকে ৩৩ নবজাতকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার রাতে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. মিজান বাদী হয়ে কোতয়ালী মডেল থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন। কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলার তদন্তভার দেয়া হয়েছে এসআই মো.সাইদুলকে। দ্রুত তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ৩১ নবজাতকের মরদেহের সুরতহাল করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে। ৩৩টি মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা আছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে সোমবার রাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক এ ঘটনা জানতে পেরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। পরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এসএম বাকির হোসেনকে ফোনে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ