ঢাকা, বুধবার 20 February 2019, ৮ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনা

টঙ্গীর তুরাগতীরে তাবলিগ জামাতের ইজতেমার ২য় পর্যায়ের শেষে মুনাজাত করছেন ধর্মপ্রাণ মুসিল্লরা -সংগ্রাম

গাজীপুর থেকে মোঃ রেজাউল বারী বাবুল : টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি লাভের আশায় মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে দুই হাত তুলে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আমিন, আল্লাহুমা আমিন, ছুম্মা আমিন ধ্বনিতে মুখরিত তাবলিগ ইজতিমার ২য় পর্ব মুনাজাতের মধ্য দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। মুনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি, ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মুক্তি এবং দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার তৌফিক কামনা করা হয়। আগামীবছর (২০২০ সাল) ৩, ৪ ও ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে মাওলানা সা’দ পন্থীদের ইজতিমা।
এবারের ইজতেমার দ্বিতীয় পর্যায়ে তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি দিল্লীর হজরত মাওলানা সা’দ আহমেদের অনুসারীদের ব্যবস্থাপনায় মুনাজাত পরিচালনা করেন সা’দ অনুসারী দিল্লির মাওলানা শামীম। মুনাজাত মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিট থেকে শুরু হয় এবং তা চলে ১২টা ০২ মিনিট পর্যন্ত। তাৎপর্যপূর্ণ এই আখেরি মুনাজাতে জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তি, আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়।
মঙ্গলবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) মুনাজাতে শরীক হতে সূর্য উদোয়ের পূর্ব থেকেই শুরু হয় ইজতিমা মুখী ধনী-দরিদ্র, যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের ঢল। যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় গাড়ি না পেয়ে পায়ে হেঁটে মুসল্লিরা ধাবিত হয় ইজতিমা ময়দানে। মুনাজাতের আগেই ইজতেমা ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
এদিকে সোমবার মুনাজাতের পূর্বে ইজতিমা ময়দানের মিডিয়া সেন্টারে স্থানীয় সংসদ সদস্য যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল সাংবাদিকদের জানান, আগামী ইজতিমা দু'পক্ষকে নিয়ে একসঙ্গে একটানা অনুষ্ঠানের চেষ্টা চালানো হবে। দু'পক্ষ আন্তরিক হলে সব কিছুই সম্ভব। তিনি এবারের ইজতিমা সুষ্ঠু ভাবে সফল হওয়ায় জেলা ও পুলিশ প্রশাসনসহ সরকারী-বেসরকারি সকল সেবা সংস্থার প্রতি ধন্যবাদ জানান।              
সা’দ পন্থীদের ২০২০ সালের বিশ্ব ইজতিমা : মাওলানা সা’দ পন্থীদের আয়োজনে টঙ্গীর ইজতিমা ময়দানে আগামী বছরের (২০২০ সালের) ৩, ৪ ও ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব ইজতিমা। বিশ্ব ইজতিমার মূল নজমের জামাতের সদস্য মো. হারুন-অর-রশিদ প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য ওই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও চলতি বছরের ২২ হতে ২৬ নবেম্বর পর্যন্ত ৫দিন ব্যাপী মাওলানা সা’দ অনুসারীদের জোড় ইজতিমা অনুষ্ঠিত হবে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতিমা ময়দানে।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মুনাজাতের পর শনিবার মাইকে জোবায়ের পন্থীরা ২০২০সালের ইজতেমার তারিখ ঘোষনা করেন। সে অনুযায়ী তাদের আগামী ইজতেমার প্রথম দফা ২০২০ সালের ১০,১১ ও ১২ জানুয়ারী এবং ২য় দফা অনুষ্ঠিত হবে ১৭,১৮ ও ১৯ জানুয়ারি। আর তাদের পাঁচ দিনের জোড় ইজতেমা অনষ্ঠিত হবে ২০১৯সালের ২৯ ও ৩০ নভেম্বর এবং ১,২ ও ৩ ডিসেম্বর।  
শেষ দিনে বয়ানকারী : মঙ্গলবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বাদ ফজর উর্দুতে বয়ান করেন দিল্লির হাফেজ ইকবাল নায়ার। পরে বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা মুফতি ওসামা বিন ওয়াসিফ।
এরপর সকাল ১০টার দিকে শুরু হয় হেদায়েতি বয়ান। তাবলিগের গুরুত্ব তুলে ধরে আখেরি মুনাজাতের আগ পর্যন্ত উর্দু ভাষায় হিদায়েতি (দাওয়াতি কাজের পদ্ধতি) বয়ান করেন দিল্লির মাওলানা শামীম এবং বাংলায় তা তরজমা করেন মাওলানা আশরাফ আলী। পরে দিল্লির মাওলানা শামীম হেদায়েতির কিছু কথা বলে আখেরী মুনাজাত পরিচালনা করেন। এবারের বিশ্ব ইজতিমায় বিভিন্ন দেশ ছাড়াও ভারতের নিজামউদ্দিন মারকাজের শীর্ষ মুরুব্বী তাবলিগ জামাতের বিশ্ব আমির সা’দ কান্ধলভীর পক্ষে নেতৃত্ব দিতে টঙ্গী ৩২ সদস্যের একটি দল টঙ্গীর ইজতিমায় যোগ দেন। এতে জিম্মাদারের নেতৃত্ব দেন দিল্লীর মাওলানা শামীম।
বিদেশী মেহমান : মাওলানা সা’দ পন্থী মাওলানা মো. আশরাফ আলী জানান, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন,অস্ট্রেলিয়া,আমেরিকা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীনসহ প্রায় ৩৬টি ভিনদেশের তাবলিগ জামাতের সহস্রাধিক বিদেশি মেহমান এবারের ইজতিমায় অংশগ্রহণ করেন।
মুনাজাত শেষে যানজট : মুনাজাত শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়া মানুষ একযোগে নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার চেষ্টা করেন। এতে টঙ্গীর আশে-পাশের সড়ক-মহাসড়ক গুলোতে সৃষ্টি হয় জনজট ও যানজট। ফলে আবারো পায়ে হেটে রওনা দেয় মুসুল্লীরা। আর পাঁয়ে হাঁটা মুসুল্লীদের চাপে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মুসুল্লীদের যানবাহনের কারণে এদিন দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইজতিমা মাঠের আশে-পাশের এলাকায় যানজট থাকে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
ইজতিমার ইতিহাস : ইজতিমার আয়োজকসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯১০ সালে ভারতের মাওলানা ইলিয়াস (র.) তাবলিগ জামাতের প্রচলন শুরু করেন মাওয়াত এলাকা থেকে। একটানা ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি এই তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ১৯৪৬সালে প্রথম কাকরাইল মসজিদে ইজতিমার আয়োজন শুরু করা হয়। তারপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে ও ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতিমা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পাগাড়ে প্রথম বিশ্ব ইজতিমা অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে ইজতিমায় অংশগ্রহণকারী মুসুল্লীদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় ইজতিমা অনুষ্ঠিত হয় টঙ্গীর কহরদরিয়া বা তুরাগনদীর পূর্ব তীরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে। ১৯৬৭ সাল থেকে দীর্ঘ ৫২ বছর যাবৎ ইজতিমা একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পরে সরকারি ভাবে তুরাগ তীরের ১৬০একর জমি স্থায়ীভাবে ইজতিমার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ