ঢাকা, বুধবার 20 February 2019, ৮ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সমাধিসৌধ স্থাপত্য

বিবি মরিয়মের সমাধিসৌধ

কবরের উপর নির্মিত এক ধরনের ইমারত। সংখ্যায় কম হলেও বাংলার সমাধি স্থাপত্যসমূহ প্রচলিত ইসলামি রীতি ও আঞ্চলিক ধারার মিশ্রণে বৈচিত্র্যপূর্ণ অবয়ব লাভ করেছে। তাসবিয়াতুল কুবুর অর্থাৎ কবরকে পাশ্ববর্তী ভূমির উচ্চতায় নির্মাণ করার নির্দেশ হাদিসে থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য দেশের মতো বাংলায়ও কবরগুলিকে পাশ্ববর্তী ভূমি থেকে উঁচু করা হয় এবং তা নির্মাণে ব্যবহার করা হয় ইট বা পাথর। এছাড়াও সমাধি ঘিরে নির্মাণ করা হয় ইমারত। স্থাপত্যিক ও লিপিতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, প্রাক-মুগল ও মুগলযুগে তিন ধরনের ব্যক্তির কবরের উপরে সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হতো। এঁরা হলেন- বিজেতা ও অভিজাত বর্গ, সুফি-সাধক এবং গাজী (ধর্মযুদ্ধে বিজয়ী)। সমাহিত করাকে আরবিতে কবর দেওয়া বলে। বাংলা সমাধি শব্দটি কবর বা স্মৃতি সৌধের বিপরীতে এবং ফারসি মাযার শব্দ কোন উচ্চপদস্থ সম্মানিত ব্যক্তির সমাধি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। দরগাহ কমপ্লেক্স সংলগ্ন অঞ্চলে কোন সুফি বা গাজীর সমাধি থাকলে সাধারণভাবে তাকে বলা হয় দরগাহ। পবিত্র সমাধি হিসেবে ফারসি আস্তানা শব্দটিও বাংলায় অপ্রচলিত নয়। সমাধি লিপিতে সমাধির বিকল্প বেশ কিছু শব্দ পাওয়া গিয়েছে, যেমন- মকবারা, তুরবা, কবর, গুণবাদ, রত্তজা ইত্যাদি।
বাংলার সমাধিগুলিকে দুটি কালাণুক্রমিক যুগে ভাগ করা যায়: (ক) সুলতানি বা প্রাক-মুগল যুগ এবং (খ) মুগল যুগ। বাংলার অন্যান্য মুসলিম সৌধের মতোই প্রাক-মুগল যুগের সমাধিগুলিতে স্থানীয় নির্মাণ রীতির প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু মুগল যুগে তা আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে। ফলে এসময় বাংলার সমাধি নির্মাণে খাঁটি মুগল রীতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। সমাধিসৌধ থেকে বিযুক্ত বেশ কিছু শিলালিপি পাওয়া গেলেও ঐতিহাসিক ঘটনার পারস্পর্য রক্ষা করে এসব লিপি অবলম্বনে ধারাবাহিকভাবে বাংলার সমাধি স্থাপত্য পর্যালোচনা করা সহজ নয়। লিপিতাত্ত্বিক প্রমাণ না পাওয়ার কারণে অনেক সমাধির নির্মাণ তরিখ বা সমাধিস্থ ব্যক্তি সম্পর্কে সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় না। সাধারণত জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে কোন সমাধিকে আনুমানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ গঠন কৌশল ও স্থাপত্যের নির্মাণ শৈলী বিশ্লেষণ করে সমাধিসৌধকে অনেক বেশি নিশ্চয়তার সঙ্গে শনাক্ত করা সম্ভব।
বাংলায় বেশ কয়েকটি সমাধিসৌধ রয়েছে যেখানে কবর দেওয়া হয়েছে উম্মুক্ত অঙ্গনে। কবরের উপরে কোন স্থাপত্যিক আচ্ছাদন রাখা হয়নি। কয়েকজন খ্যাতিমান সাধক পুরুষের সমাধি এর উল্লেখযোগ্য প্রমাণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সিলেটের হজরত শাহজালাল (রঃ)-এর সমাধি এবং পান্ডুয়ার (মালদা, পশ্চিমবঙ্গ) ছোটি দরগায় আলাউল হক (রঃ)-এর ও নূর কুতব আলম (রঃ)-এর সমাধি। ‘মৃত্যুর পর ধার্মিকের কর্মই তাঁকে নিরাপত্তা দেবে ও আচ্ছাদিত করবে’- এই ধারণা থেকেই সম্ভবত উল্লিখিত সমাধিগুলি আচ্ছাদিত করা হয় নি। বাংলায় আগত প্রথম দিকের সুফিদের অন্যতম বাবা আদম (রঃ)-এর সমাধিতেও (রামপাল, মুন্সিগঞ্জ) কোন স্থাপত্যিক আচ্ছাদন নেই। বাংলার প্রথম যুগের গাজীদের সমাধিগুলির মধ্যে ত্রিবেণীর মাযার-মাদ্রাসা কমপ্লেক্স আচ্ছাদনহীন উন্মুক্ত সমাধি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ৬৯৮ হিজরি (১২৯৮ খ্রি) ও ৭১৩ হিজরির (১৩১৩ খ্রি) দুটি শিলালিপির ওপর ভিত্তি করে বলা হয় যে, এটি জাফর খানের সমাধি। এ সমাধিসৌধ পাথরের ভিত্তির উপর ছাদবিহীন দুটি বর্গাকার কক্ষ নিয়ে গঠিত। এটি শুধু বাংলার জ্ঞাত মুসলিম সৌধের মধ্যে প্রাচীনতম নিদর্শনই নয়, বরং পূর্বভারতে বিদ্যমান সৌধগুলির মধ্যেও প্রাচীনতম। মোগড়াপাড়ায় (সোনারগাঁও) পাঁচ পীরের মাযার এর নিকট অবস্থিত চমৎকারভাবে বাঁকানো কালো ব্যাসল্ট পাথরের সমাধিটি সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ এর (মৃত্যু ১৪১১ খ্রিস্টাব্দ) বলে নির্দেশ করা হয়। শবাধারের কুলুঙ্গিতে প্রদীপ-নকশার অলঙ্করণের সঙ্গে গিয়াসউদ্দীনের পিতা সিকান্দর শাহ কর্তৃক ৭৭৬ হিজরিতে (১৩৭৩-১৩৭৪ খ্রি) নির্মিত আদিনা মসজিদ এর মিহরাবের গায়ে উৎকীর্ণ প্রদীপ নকশার মিল রয়েছে। মধ্যযুগে ইরানে নির্মিত সমাধিসৌধে এজাতীয় প্রতীকের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী মনে করা হয়, সিকান্দর শাহকে (মৃত্যু ১৩৯০ খ্রি) আদিনা মসজিদের পশ্চিমে সম্প্রসারিত অংশের উত্তর স্তম্ভপথ বা ‘বে’-তে একটি নয়গম্বুজবিশিষ্ট (বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত) চতুর্ভুজাকৃতি কক্ষে সমাহিত করা হয়েছে।
মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অংশের মতো বাংলার প্রাচীনতম ও সবচেয়ে প্রচলিত সৌধ হচ্ছে কুববা বা গম্বুজ সমৃদ্ধ ঘনক্ষেত্রাকার ইমারত। বিহার শরীফে (ভারত) অবস্থিত ইমাদপুরের কুববা বাংলার প্রথম তুর্কি বিজেতা বখতিয়ার খলজীর (মৃত্যু ১২০৬ খ্রি) সমাধি বলে চিহ্নিত হয়েছে। পরবর্তীকালে এর নির্মাণরীতি বিবেচনায় জেড.এ দেশাই এই সমাধির সময় নিরূপণ করেছেন। পান্ডুয়ায় নির্মিত একলাখী সমাধিসৌধকে বাংলার আঞ্চলিক রীতিতে রূপান্তরিত প্রাচীনতম কুববার নমুনা হিসেবে নির্দেশ করা হয়। প্রচলিত ধারণা মতে, এখানে সুলতান জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ (মৃত্যু ১৪৩৩ খ্রি) এবং তাঁর বেগম ও পুত্র শামসুদ্দীন আহমদ শাহ (চিত্র ১) সমাহিত রয়েছেন। সমাধি গৃহটি ইটের তৈরি। এর চতুর্ভুজাকৃতির বহিরঙ্গে বাঁকানো কার্নিস রয়েছে। কোণের বুরুজগুলি অষ্টকোণাকৃতির এবং উভয় দিকের প্রবেশপথের ভেতরের দিকটি পুরু ইটে অষ্টকোণাকৃতি করা হয়েছে। বাম দিকের শূন্যগর্ভের চারটি কোণে চারটি ছোট প্রকোষ্ঠ তৈরি করা হয়েছে। শক্তভাবে প্রোথিত পাথরের স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো বৃত্তাকার খিলানে ভর করে গম্বুজ তৈরি করা হয়েছিল। এক সময় এই সমাধিসৌধের অভ্যন্তরের পলেস্তরার উপরিভাগ লতাপাতার অলঙ্করণে শোভিত করা হয়েছিল, আর বহিরঙ্গ শোভিত করা হয়েছিল নানা ধরনের পোড়ামাটির শিল্প ও উজ্জ্বল টালি ব্যবহার করে।
পরবর্তী ইলিয়াসশাহী ও হোসেনশাহী যুগে বাংলার স্থাপত্যে একলাখী রীতি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লাভ করে। প্রাথমিক মুগল যুগেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশে একলাখী রীতির দুটি উল্লেখযোগ্য সমাধিসৌধ হচ্ছে বাগেরহাটে ৮৬৩ হিজরিতে (১৪৫৮ খ্রি) নির্মিত খানজাহানের সমাধি এবং চট্টগ্রামে বদর পীরের সমাধি। নির্মাণ শৈলীর দিক থেকে উভয়ের মধ্যেই বেশ মিল রয়েছে। যদিও দুটি সৌধের গায়ে এখন আর মূল অলঙ্করণসমূহ টিকে নেই, তথাপি খান জাহানের সমাধিসৌধটি সংরক্ষিত ইমারত হওয়ায় মূল অলঙ্করণের অনেক কিছুই পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে। চতুর্ভুজাকৃতি সমাধি কক্ষের উপরে বৃত্তাকার বন্ধনীর মধ্যে গম্বুজ বসানো হয়েছে। খানজাহানের সমাধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে শবাধারের পাথর ব্যাপকভাবে খোদাই করা। ছোট পান্ডুয়ায় (হুগলি, পশ্চিম বঙ্গ) দরগাহ কমপ্লেক্স শাহ সফির (মৃত্যু তেরো শতকের শেষ বা চৌদ্দ শতকের প্রারম্ভে) সমাধি রয়েছে। প্রাক মুগল যুগের বাঁকানো কার্নিসযুক্ত এই সমাধিকে পরে মুগল স্থাপত্যের আদল দেওয়া হয়। একলাখী রীতিতে মুগল যুগে তৈরি গুরত্বপূর্ণ সৌধ হচ্ছে বর্ধমানে নির্মিত বাহরাম সাক্কার সমাধি। আকবর এর শাসনামলে ৯৭০ হিজরিতে (১৫৬২-৩ খ্রি) তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। মুঙ্গেরে (বিহার, ভারত) স্থাপিত শাহ নাফার সমাধিতে একই নির্মাণ কৌশল দেখা গেছে। ৯০৩ হিজরিতে (১৪৯৭-৮ খ্রি) এটি আলাউদ্দীন হোসেন শাহের পুত্র শাহজাদা দানিয়েল নির্মাণ করেন। কালো ব্যাসল্ট পাথরে তৈরি হোসেন শাহের (মৃত্যু ১৫১৯ খ্রি) কবরটির নিদর্শন এখন আর পাওয়া যায় না। আনুমানিক ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দেও এই সমাধির অস্তিত্ব ছিল। এছাড়াও গৌড়ে অবস্থিত পরবর্তী সুলতানদের সমাধিসমূহের অস্তিত্বও এখন আর নেই।সুলতানি আমলের সমাধিসৌধের চেয়ে মুগল যুগের সমাধিসৌধের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। সুলতানি আমলের সমাধিসৌধের গঠনশৈলী অনুসরণ করে মুগল যুগে এর গঠন শৈলীতে আনা হয় নানা বৈচিত্র্য। এ ধরনের সমাধি সাধারণত এককভাবে মসজিদ সংলগ্ন অথবা মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত কোন ছোট কমপ্লেক্সের দেয়ালের সঙ্গে অথবা দুর্গঘেরা কোন বাগানে ধর্মীয় বা প্রাসাদ ইমারতের নিকট নির্মিত হতো। লালবাগ দুর্গে (ঢাকা) বিবি পরীর সমাধি ও আনোয়ার শহীদের (বর্ধমান) সমাধি এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মুগল যুগে বাংলায় সর্বপ্রথম অষ্টভুজাকৃতি সমাধি নির্মিত হয়েছিল। সাধারণভাবে কুববা গম্বুজের বাইরের দিকে সোজা কার্নিস থাকে। ঢাকায় নির্মিত কুববা রীতির সৌধের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে নওয়াব শায়েস্তা খানের পরিবারের নারী সদস্যদের সমাধির উপর নির্মিত সৌধ। মুগল সমাধিগুলি সাধারণত একটি উঁচু মঞ্চের উপর নির্মিত হতো। কিন্তু কখনও কখনও সেখানে থাকত বদ্ধ কুলুঙ্গির প্যানেল। ঘনক্ষেত্রবিশিষ্ট গম্বুজের আদি রীতির সঙ্গে মুগল যুগের কুববা রীতি যুক্ত হয়ে আরও দুটি রূপ পরিগ্রহ করে। যেমন- (ক) চতুর্ভুজাকৃতি সমাধি প্রকোষ্ঠের দক্ষিণে সংযোজিত বারান্দা, (খ) সমাধি প্রকোষ্ঠের সামনের বারান্দা বা চারদিকে বৃত্তাকার প্রদক্ষিণ পথের উপরের দিকটি আচ্ছাদিত রাখা। ঢাকায় নির্মিত সৌধের মধ্যে উল্লিখিত প্রথম ধারার দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। প্রথম সমাধিটি খাজা শাহবাজের বলে মনে করা হয়। সমাধি সংলগ্ন মসজিদের গায়ে সংযুক্ত শিলালিপি পাঠে জানা যায়, ঢাকার রমনা অঞ্চলে শাহবাজ কর্তৃক স্থাপিত মসজিদটির নির্মাণ তারিখ ১০৮৯ হিজরি (১৬৭৯ খ্রি)। মসজিদ ও সমাধি কমপ্লেক্সের দক্ষিণ-পূর্বে শেষ দেয়াল ঘেঁষে রয়েছে প্রবেশপথ। বর্তমানে কোন কবরের অস্তিত্ব না থাকলেও দ্বিতীয় সমাধিটি দারা বেগমের বলে শনাক্ত করা হয়। লালমাটিয়া জামি মসজিদের নামায ঘরের সঙ্গে এটি যুক্ত ছিল। মূল সমাধিটি ছিল পশ্চিম দেয়ালের মিহরাবের কাছে। আনুমানিক ১৬২২ থেকে ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আগ্রাতে নূরজাহান কর্তৃক নির্মিত ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধির ধাঁচেই এই দ্বিতীয় ধারার সৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই ধারার সঙ্গে তুলনীয় অন্য সব সমাধিসৌধের মধ্যে বাংলার শাসক শাহ সুজার (১৬৩৯-৬০) পৃষ্ঠপোষণে গৌড়ের (বাংলাদেশ) ফিরুজপুরে অবস্থিত শাহ নিয়ামতউল্লাহর সমাধি (মৃত্যু- সতেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ), ঢাকার বিবি পরী (চিত্র ২) ও বিবি মরিয়ম সমাধি (চিত্র ৩) এবং সতেরো শতকের শেষ দিকে শায়েস্তা খানের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজমহলে নির্মিত বখত হুমার সমাধি।
এই ধারার শেষ উদাহরণ হচ্ছে মুর্শিদাবাদে নির্মিত খুশবাগ সমাধিসৌধ। এখানে আলীবর্দী খান ও সিরাজউদ্দৌলাসহ নওয়াব পরিবারের অনেকেই সমাহিত আছেন। এই ধারার নির্মাণ শৈলীতে নানা ধরনের বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন- শাহ নিয়ামতউল্লাহ ও বিবি মরিয়মের সমাধিসৌধে আচ্ছাদনের প্রয়োজনে বারান্দা দেওয়া হয়েছে; বিবি পরী ও বখত হুমার সমাধির পাশে একদিকে রয়েছে প্রদক্ষিণ পথ এবং এক কোণে সমাধি প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও শাহ নিয়ামতউল্লাহ, বিবি পরী এবং বখত হুমার সমাধিতে তিনটি এবং বিবি মরিয়মের সমাধিতে পাঁচটি খোলা খিলান রয়েছে। বাংলাদেশের স্থাপত্য নির্মাণে সাধারণত ইটের ব্যবহার প্রচলিত থাকলেও বিবি পরীর সমাধিতে পাথরের ব্যাপক ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলির মধ্যে জয়পুর থেকে মর্মর পাথর, গয়া থেকে কালো ব্যাসল্ট পাথর এবং চুনার থেকে ধূসর বেলে পাথর আমদানি করে ভেতরের সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে।
বাংলার দোচালা ও চারচালা ছাদবিশিষ্ট কুড়ে ঘরের আদলে সমাধিসৌধ নির্মাণ সতেরো শতকের বাংলার স্থাপত্যকলার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। একলাখী রীতির মতো এই ধারার স্থাপত্য শুধু সমাধি নির্মাণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বিভিন্ন ধরনের ইমারত নির্মাণেও এর ব্যবহার ছিল। এ ধারার স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে গৌড়ে অবস্থিত ফতেহ খানের সমাধি। ইটের তৈরি এই সমাধিতে রয়েছে দোচালা ছাদ। সমাধি প্রকোষ্ঠটি আয়াতাকার। কদম রসুল সমাধি প্রাঙ্গণের দেয়ালের কাছে দক্ষিণ ও পশ্চিমে রয়েছে প্রবেশপথ। আনোয়ার শহীদের চতুর্ভুজাকৃতি সমাধি প্রকোষ্ঠের পাশে সংযুক্ত প্রকোষ্ঠের ছাদ দোচালা রীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মুগল সমাধিতে যেসব চৌচালা ছাদ নির্মিত হয়েছে তা বাংলার চৌচালার প্রকৃত আকৃতির সঙ্গে তেমন মেলে না। দানীর ভাষায় এগুলি ‘চতুর্ভুজাকৃতি ছাদের ভগ্নরূপ’। এ ধরনের ছাদ নির্মিত হয়েছে ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধিতে। এই রীতির আদি উদাহরণ হচ্ছে ইসলাম খান চিশতির সমাধি। ঢাকা হাই কোর্টের নিকট অবস্থিত এই সমাধির সংস্কার করা হয়েছে। চট্টগ্রামে একই রীতির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে বাগ-ই-হামজা মসজিদ। চৌচালা ছাদকে সুলতানি যুগের স্থাপত্য রীতি বলে নির্দেশ করা হয়। ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধির অনুরূপ উদাহরণ পাওয়া যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরিফিল অঞ্চলে অবস্থিত দুই ধাপবিশিষ্ট সমাধির ধ্বংসাবশেষে। এর ভিত্তিতে দুটি কবর রয়েছে, আর উপরের ধাপে রয়েছে দুটি বাঁধানো সমাধি। শাহজাহান-এর সময় নির্মিত বিশালাকার অষ্টভুজাকৃতি সমাধির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে নওদায় (রাজশাহী) নির্মিত দুটি এবং বুরহানপুরে (রাজশাহী) নির্মিত একটি সমাধির ধ্বংসাবশেষ।
আঠারো শতকে সমাধিসৌধ নির্মাণে মুর্শিদাবাদের নওয়াবদের বিশেষ অনুরাগ লক্ষ্য করা যায়। মুর্শিদকুলী খানের সমাধি তাঁর নির্মিত কাটরা মসজিদের বিশাল প্রবেশদ্বারের নিচেই অবস্থিত। একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠের মধ্যে এই কবর ছিল কাদা মাটিতে আচ্ছাদিত। নওয়াবের শেষ ইচ্ছা ছিল শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের পায়ের ধুলা যেন তাঁর বুকে পতিত হয়। আলীবর্দী খান তাঁর প্রিয় খুশবাগে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে গিয়েছিলেন। জাফরগঞ্জ কবর স্থানে হাজার কবরের মাঝে মীরজাফর আলী খানকে সমাহিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আধুনিক স্থপতিগণ সমাধি স্থাপত্য নির্মাণে অত্যন্ত উচ্চমার্গের মৌলিক নির্মাণ শৈলীর প্রমাণ রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব বাংলার তিন রাজনৈতিক নেতা এ.কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দীন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কবরের (ঢাকায়) উপর নির্মিত সমাধিসৌধ ‘তিন নেতার মাযার’-এ ইসলামি স্থাপত্যের খিলান রীতি ব্যবহার করা হয়েছে। স্থাপত্যিক নন্দনতত্ত্বের বিচারে এটি একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। বাংলাদেশের আধুনিক মুক্তাঙ্গন-সমাধি স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ, ঢাকায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান-এর সমাধি।
[আসমা সিরাজউদ্দিন]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ