ঢাকা, বৃহস্পতিবার 21 February 2019, ৯ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

আজ ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে মায়ের ভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন রফিক, জব্বার ও বরকতসহ ভাষা সংগ্রামীরা। তাদের সে আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের পথ বেয়ে বাংলাই শুধু রাষ্ট্রভাষার অবস্থান অর্জন করেনি, স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তীকালে একুশে ফেব্রুয়ারিও পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনন্য মর্যাদা। দিনটি এখন পৃথিবীর সব দেশেই পালন করা হয়, বাংলাদেশের ভাষা শহীদদের সংগ্রাম ও অবদানের কথা স্মরণ করে বিশ্ববাসী। এর কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ছয় হাজার ভাষা রয়েছে। কিন্তু মাতৃভাষার স্বীকৃতি ও মর্যাদার জন্য বাংলাদেশের ছাত্র-জনতাই কেবল সংগ্রাম করেছেন, আর কোনো দেশে এর উদাহরণ নেই। সে কারণে একুশের চেতনায় এবং এর অন্তর্গত তাৎপর্যে বিশ্বের সব দেশের মানুষই এখন আন্দোলিত হয়, উজ্জীবিত হয়। তারাও নিজেদের মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার তাগিদ বোধ করে। সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয় এবং চেষ্টা করে। এখানেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারির বিশেষ তাৎপর্য এবং অতুলনীয় সফলতা।
আজকের দিনে আমরা অবশ্য কেবলই ইতিহাস স্মরণ করাকে যথেষ্ট মনে করি না। গর্ব ও আত্মতৃপ্তি বোধ করারও সুযোগ নেই আমাদের। কারণ, দুঃখ ও ক্ষোভের বিষয় হলো, দীর্ঘ ছয় দশক তথা ৬৭টি বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনও বাগাড়ম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছি, বাংলাকে যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে পারিনি। আসলে করিনি। ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে বাংলাকে সমৃদ্ধ করতেও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। স্বীকার করতেই হবে, স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছর পরও সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষার যথাযথ প্রচলন ঘটেনি। অথচ প্রচলন ঘটবে বলে বুকভরা আশা নিয়েই ভাষা সৈনিকরা সংগ্রাম করেছিলেন, প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করেছিলেন।
একথা অবশ্য সত্য, আমাদের সাহিত্য অনেক উন্নতি করেছে, বাংলা ভাষাও কম সমৃদ্ধ হয়নি। এখনও নিরন্তর গবেষণা চলছে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে। এসবের ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলা চর্চার সৌকর্য বেড়েছে। একই সঙ্গে এ কথাও আবার স্বীকার না করে পারা যায় না যে, সুনির্দিষ্ট এবং সর্বজনগ্রাহ্য একটি বানানরীতি অনুসরণ করার মতো উন্নত স্তরে আমরা এখনও পৌঁছাতে পারিনি। বহুমাত্রিক অভিধানের অভাবও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এমনকি বাংলা একাডেমি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এখনও একই বানানরীতি অনুসরণ করছে না। উচ্চারণের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমের বানান ও উচ্চারণেও শৃংখলা রক্ষা করা হচ্ছে না। তেমন চেষ্টাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বাংলায় সাইনবোর্ড লেখার বাধ্যবাধকতা মানা হচ্ছে না, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ও লেখা হচ্ছে ইংরেজিতে। মাননীয় বিচারপতিরা আদেশ দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন। নিঃসন্দেহে এ এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিই বটে। এর ফলে বাংলা ভাষার ক্রম অগ্রগতি ও সুষম বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিচ্যুতিও ঘটছে।
ওদিকে আধুনিকতা ও আন্তর্জাতিকতার নামে চলছে ইংরেজির ব্যাপক চর্চা। বিগত কয়েক বছরে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দির ব্যবহারও সীমা ছাড়িয়ে গেছে। স্যাটেলাইট টিভির কল্যাণে শিশুরা পর্যন্ত আজকাল হিন্দিতে কথা বলছে। হিন্দি ভাষার শুধু নয়, ভারতীয় সংস্কৃতিরও অনুপ্রবেশ ঘটছে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে। একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, পাকিস্তান যুগের উর্দুর স্থান দখল করে নিয়েছে হিন্দি ভাষা। অথচ এই ভাষার প্রশ্নে ভিন্নমত ও বিরোধিতা ছিল বলেই বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের পূর্বসূরীরা আন্দোলন করেছিলেন, জীবন দিয়েছিলেন।
আমরা বরং বিশ্বের প্রতিটি ভাষার সুষ্ঠু বিকাশের জন্য চেষ্টা চালানোর পক্ষে। এজন্যই এখন বেশি দরকার হিন্দির আগ্রাসন প্রতিহত করা এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখা। আমরা আশা করতে চাই, এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে। হিন্দি ও ইংরেজির প্রভাব কমিয়ে আনার পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে আমরা বাংলা ভাষার প্রচলন ও প্রতিষ্ঠা দেখতে চাই। তাহলেই সার্থক হবে ভাষা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ। এর মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির মূল চেতনারও বাস্তবায়ন ঘটবে।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ